প্রিয়তমা ফুলমণি

(ওরফে ফুলি)

আশাকরি ভালোই আছো। ভালো তো থাকবেই। এবারের গোলাপ দিবসে কয়খান গোলাপ তুমি উপহার পেলে কথাটা জানালে বাধিত হতাম । আসলে তুমি সর্বমোট কয়টা ফুল পেলে তা জানতে পারলে একটা সুবিধে হতো এই যে আমি সেগুলোর চেয়েও একটা বেশি গোলাপ লাগিয়ে তোমাকে তোড়া বানিয়ে উপহার দিতাম আমার প্রেমের ভিসুবিয়াসের উদ্গীরণ বোঝানোর উদ্দেশ্যে ।

তুমি হয়তো আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছ যে আমি এক নিরক্ষর ব্যক্তি তোমাকে চিঠি কিভাবে লিখতে পারছি। কারণ তোমার স্বভাব তো আমি হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে ক্ষুরে ক্ষুরে জানি, যে চিঠিটা পড়ার আগে তুমি প্রথমেই দেখে নিয়েছ, 'ইতি' তে কার নাম রয়েছে । তা আমার নাম দেখে যদি চিঠিটা সত্যিই তুমি পড়তে শুরু করে থাক তাহলে সর্বপ্রথমেই তোমার রান্নাঘরের চুলা আগে নিবিয়ে আইস। নাহলে চচ্চড়িটা কড়াইতে লেগে যেতে পারে এবং এর ফলস্বরূপ আবার তুমি পালগিন্নীর সুমিষ্ট বচনভঙ্গীর ফলভোগ করিতে বাধ্য হইতে। আর উনি যেরকম জাঁদরেল মহিলা, তোমার মাসমাহিনা হইতে অন্তত ত্রিশ টাকা কাটিয়া রাখিলেও আশ্চর্যের কিছু নেই।

তুমি তো ভালো করেই জানো সেই যে মাস তিনেক আগে তুমি পুকুরঘাটে চান করে ফেরার পথে তোমাকে প্রথম ট্যারা চোখে দেখেই তোমার প্রতি আমার প্রেমের বন্যা বয়ে গিয়েছিল যেটা ব্রহ্মপুত্রের বন্যাকেও শিশু বানিয়ে তুলতে পারে । তোমার ওই সুন্দর বোঁচা বোঁচা নাক আর মার্বেল গুটির মতো কুতকুতে চোখ আমি এই জীবনে আর কখনো কি আর ভুলতে কি পারব?

ও হ্যা। তুমি তো জানই, ধান ভাঙতে শিবের গীত গাওয়া আমার বরাবরের অভ্যেস । কথা হচ্ছিল আমি লিখতে শিখলাম কবে থেকে ? আর তারপরেই শুরু করলাম আবোল তাবোল বকতে। তো সেই যে সেদিন তোমাকে দেখলাম তার পর থেকেই তোমাকে বারবার হাজারোবার দেখবার জন্য মনটা আমার ছোঁক ছোঁক করত। আর তার সাথে আমার হৃদয়টাও ল্যাটামাছের মতো আকুপাকু করত। তুমি পালবাবুদের বাড়িতে রান্না করতে সেই খবরটাও তোমার পিছু পিছু গিয়ে আমি জোগাড় করে ফেললাম । আর তুমি তা বুঝেও না বোঝার ভান করে গুল্লু গুল্লু চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে ক্ষণিকের তরে, আর আমি জুলজুল চোখে সেই দৃষ্টিকেই এক্কেবারে হৃদয়ের চেম্বারে ক্যাচ করে ফেল্লাম। কিন্তু মুশকিল হলো যে, তুমি হলে পালবাবুদের বাড়ির রান্নার লোক আর আমি হলাম গে সেনবাবুদের বাগানের মালি। তাই হিসাব মতো আমাদের মধ্যে প্রেম বিনিময় দূর অস্ত সাধারণ বাক্যালাপ পর্যন্ত হবার কথা নয় । কারণ সেন বাবু আর পাল বাবুর যে অহি-নকুল সম্পর্ক । আহা, ওই দ্যাখো, আবার আবোল তাবোল কথা বলে চলেছি । জানোই তো এটা আমার একটা বড়ো বাজে স্বভাব ।


তো যাই হোক সেদিনের সেই দৃষ্টিবিনিমযের পর থেকেই ঘন ঘন যাতায়াত শুরু করলাম পালবাবুদের বাড়ির খিড়কি দুয়ারের আশেপাশে । তুমিও যে সুযোগ পেলেই রান্নাঘরের জানালা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারতে আমি আসছি কি না দেখতে সে খবরও এই শর্মার অজানা নয়। এই যে আমাদের এই বন্য প্রেমের অনন্য নিদর্শন এটা তো অনেকেরই সহ্য হবার কথা নয় । বেশি করে নয় পালবাবুদের দারোয়ান ভীমসিং চৌহানের কাছে, যে তোমাকে সবসময়ই নিজের দখলে রাখবার ভীষণ রকম প্রচেষ্টা চালিয়ে যেত সর্বক্ষণ । এদিকে একদিন তোমার ওই কুতকুতে চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকাতে গিয়ে তোমার সাঁতলানো মাছ পোড়া লেগে যায় । আর পালগিন্নী তোমাকে যা নয় তাই বলে বকাবকি শুরু করেছিল। আমার হৃদয়টা তখন কার্গিলের গ্লেশিয়ারের মতো টুকরো টুকরো করে ভেঙে যাচ্ছিল। আর সেই সুযোগে ভীমসিং যখন গিন্নীমার কাছে তোমার আমার চোখাচোখির বর্ণনা দিচ্ছিল তখন ইচ্ছে হচ্ছিল ভীমসিংকে খাইবার পাসে তুলে নিয়ে গিয়ে বকরাক্ষসের মতো কচ কচ করে চিবিয়ে খেতে। কিন্তু অক্ষম আমি সেদিন পারিনি তোমাকে বাঁচাতে। আমাকে ক্ষমা করে দিও গো।

কিন্তু এরপর ধীরে ধীরে খবর পেলাম আমি একা নয় তোমার পেছনে কমেও আট দশ জনের লাইন পড়ে গিয়েছে । আর সাহস সঞ্চয় করে যেদিন তোমাকে কথাটা বলতে এলাম তুমি মুখ ঝামটা মেরে বলে উঠলে "নিরক্ষর বাগানের মালি তার আবার ঢং কতো। বেশ করেছি পাড়ার পটলা আর ছোটকার সাথে লাইন মেরেছি; মারবই তো। আগে নেখাপড়া শিখে ওদের মতো সোন্দর সোন্দর চিঠি চাপাটি লিখতে শেখ তারপর ওদের সাথে নিজের তুলনা করবে।"

ব্যস আমারো জেদ চেপে গেল। ভর্তি হলাম রেতের স্কুলে । ছয়মাসের মধ্যেই আমি মোটামুটি চিঠি লিখতে শিখে গেলাম । ব্যস। আর আমারে পায় কে। তাইতো কই মাছের মতো লাফাতে লাফাতে আমি এবার এসেছি আমার দাবী জাহির করতে । এবার তুমি প্রাণেশ্বরী হৃদয়নন্দিনী (দেখলে তো কতো কঠিন কঠিন শব্দও লিখতে পারি এখন) মা কালীর দিব্যি গেলে বলতো, সবার দেয়া সন্মিলিত গোলাপ ফুল গুলোর চেয়ে একটা বেশি গোলাপের ফুল লাগিয়ে তোড়া বানিয়ে তোমাকে দিলে সত্যি সত্যি তুমি আমার হবে কি না আবার কোন ছুতোয় আমাকে কাট মারবে?

তোমার উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম ।

জনম জনম শুধু তোমারই ।

ইতি

তোমার শুধু তোমারই

হরিদাস মাহাতো

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.