ভর সন্ধ্যায় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। একটানা মেঘের গর্জন চলছে, সেইসাথে মাঝে মাঝেই ভেসে আসছে আলোর ঝলকানি; দূরে কোথাও বজ্রপাত হচ্ছে। ইনভার্টারটা নষ্ট হয়ে গেছে, কাজেই কারেন্ট হঠাৎ চলে যাওয়ায় সারা বাড়িটা যেন অন্ধকারে ডুবে গেছে। আমার বেশ মজাই লাগছে-- কিছুটা সময় বই পড়ার হাত থেকে তো রক্ষা পাওয়া গেল ! আর সত্যি বলতে কি এমন বৃষ্টি-বাদলাতে বই পড়তে একটুও ভালো লাগে না ; মনটা কেমন যেন উদাস উদাস হয়ে যায়। মা মোমবাতি জ্বালিয়ে বারান্দায় সবাইকে ডাকছে। সরষের তেল,কাঁচা লঙ্কা, পেঁয়াজ আর চানাচুর দিয়ে মুড়ি মেখেছে। সবাই মিলে মুড়ি খেতে খেতে বাবাকে জোরাজুরি করতে লাগলাম একটা গা ছমছমে বাস্তব ঘটনা বলার জন্য। বাবা আরম্ভ করলো.....

" সে অনেকদিন আগের কথা। তখন আমি সবে ক্লাস এইটে পড়ি। ভীষণ অভাবের মধ্যে দিয়ে আমাদের দিন কাটছে। মা-বাবার মধ্যে অশান্তি লেগেই রয়েছে। পাশের বাড়ির সমবয়সী মিঠুর সাথে আমি প্রায়ই বিলে যাই মাছ ধরতে তাতে যেমন মাছ খাওয়াও হয় তেমনি বাজারে বিক্রি করে দুটো পয়সাও হাতে আসে। তো সেদিনও রাতে মাছ ধরতে যাবো। কথা ছিল মিঠু এসে আমাকে ডেকে নিয়ে যাবে ভোর তিনটের দিকে। দিনের বেলায় বড়শি, কেঁচো সব জোগাড় করে রেখেছি। হঠাৎ করে রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। বাড়িতে কোনো ঘড়িও নেই যে সময় কত হয়েছে দেখবো। দূরে মোরগ ডেকে উঠতেই ভাবলাম ভোর হয়ে গেছে। বড়শিতে কেঁচো গেথে নিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম। মিঠুদের বাড়িতে গিয়ে বারকয়েক ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে ভাবলাম ভোর হয়ে এসেছে দেখে মিঠু তাড়াহুড়োয় আমাকে ডাকতে ভুলে গেছে হয়তো। হাঁটা লাগালাম বিলের দিকে। তখন শ্রাবণের শেষাশেষি ; নিকষ কালো মেঘের ফাঁকে উঁকি দেওয়া দ্বাদশীর ভাঙা চাঁদের আলোয় চারিদিক ঝকমক করছে-- কাজেই রাত না ভোর তা বোঝার উপায় নেই। বিলে পৌঁছে আমাদের পূর্ব নির্ধারিত জায়গায় মিঠুকে দেখতে না পেয়ে খানিকটা অবাক হলাম। তারপরেই মনে হল ও হয়তো আশেপাশেই অন্য কোথাও বড়শি পেতেছে। বারদুয়েক মিঠু মিঠু করে চিৎকার করেও কোনো উত্তর মিলল না। আমার কথাই ফাঁকা বিলের জলে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। গাটা হঠাৎ ছমছম করে উঠলো। মনকে বোঝাতে লাগলাম ভয় কি কোমরের ঘুনসিতে তো লোহা বাঁধা আছে। যাইহোক গা ছমছমানি নিয়েই বড়শি পাততে শুরু করলাম। হাঁটুর উপর পর্যন্ত জল। আমন ধানের গাছ মাথা ছাড়িয়ে উপরে উঠে গিয়েছে। অর্ধেক বড়শি পাততে না পাততেই চাঁদ মেঘের আড়ালে ঢেকে গিয়ে চারিদিকে হালকা অন্ধকার বিছিয়ে দিল।কাছেপিঠেই কোথাও খলখল করে শব্দ হতে লাগলো। কয়েকমুহূর্ত পরেই ভেসে আসতে লাগলো একটানা য়ুঁ য়ুঁ করে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ। কখনও মনে হচ্ছে কোনো বাচ্চা কাঁদছে আবার কখনও বা কোনো মেয়েমানুষের কান্নার মত শোনাচ্ছে। হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল গতবার মিঠুর পায়ে ঠেকে একটা সদ্যজাত শিশুর দেহ উঠে এসেছিল। কেন জানিনা বারবার মনে হতে লাগলো বাচ্চাটাকে এই জমিতেই পেয়েছিল। ভয়টা আরও জাঁকিয়ে বসল। তড়িঘড়ি বড়শি পাতা শেষ করে সামনের একটা ঢিবিতে উঠে দাঁড়ালাম। ততক্ষণে মেঘের আড়াল সরিয়ে ভাঙা চাঁদকে আবার দেখা যাচ্ছে। চারিদিকটাও একটু একটু করে আলোয় ভরে উঠেছে। বারবার এদিক-ওদিক

তাকাতে লাগলাম আশেপাশে বা দূরে কোথাও মিঠু আছে কি না। কিন্তু নাহ্ তার কোনও পাত্তাই পাওয়া গেল না। আকাশ থেকে যেন রূপোর গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ছে ! বিলের জলে চাঁদের আলো পড়ে মায়াবী রূপোলী রঙ ধরেছে ! যতদূর চোখ যায় শুধু রূপোলী জল আর জল ! হঠাৎ বিলের ওপারে দুটো তালগাছের দিকে চোখ পড়তেই আমার গা ছমছমানি আরও বেড়ে গেল সেইসাথে বাড়লো বুক ধড়ফড়ানিও। তালগাছের মাথাদুটো বারবার নুইয়ে নুইয়ে একে অপরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে আর কারা যেন সাদা ধবধবে শাড়ি পরে গাছদুটোর মাথায় বসে তাদের লম্বা লম্বা পা দোলাচ্ছে ! সঙ্গে ভেসে আসছে সেই একটানা কান্নার আওয়াজ। আমি সেদিক থেকে কিছুতেই নিজের চোখ সরাতে পারছিলাম না। ক্রমশঃ কান্নার আওয়াজ ক্ষীণ থেকে জোরালো হতে লাগলো মনে হচ্ছিল যেন ওই কান্না আমার দিকেই ধেয়ে আসছে। ভয়ে আমার হাত-পা শিউরে উঠলো আর শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। আমি দড়দড়িয়ে ঘামতে লাগলাম। গলা শুকিয়ে কাঠ ! চিৎকার করব সে ক্ষমতাও নেই আর তাছাড়া চিৎকার করলে শুনছেই বা কে ! আমার বুক ধড়ফড়ানির আওয়াজও আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। বারবার গলা শিরশির করে উঠছে মনে হচ্ছে যেন পিছন দিক থেকে কেউ এসে আমার গলা টিপে ধরতে চাইছে। রাম নাম জপে ভয়ার্ত স্বরে মিঠু বলে চেঁচাতে লাগলাম। দূর থেকে মিঠুর সাড়া পাওয়া গেল, 'এ-ই-ই-তো

আমি-ই-ই ভয় নে-এ-ই'। খানিক বাদে দেখতে পেলাম ও চেঁচাতে চেঁচাতে এদিকেই আসছে। কান্নার আওয়াজটা ঠিক যেখান থেকে আসছিল সেখান থেকেই একটা বড়সড় রকমের পাখি ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গেই সেই কান্নার আওয়াজটা থেমে গেল। মিঠুর বড়শি পাতা শেষ হতেই দুজনে গিয়ে বসলাম একটা ঢিবির উপরে। তারপর সেই রাতে দুজনে মিলে গল্প করতে করতে মাছ ধরলাম। তালগাছের মাথা দুটোকে

আর কখনই

কাছাকাছি আসতে

দেখিনি।"....বাবার গল্প শেষ হতে না হতেই চিরশত্রু কারেন্ট আবার চলে এল। আর মা ওমনি তার আসল রূপে প্রকাশিত হয়ে চেঁচাতে লাগলো "যা পড়তে বস, অনেক গল্প শুনেছিস এবার একটু মন প্রাণ দিয়ে বইটা পড় তো দেখি"। অগত্যা পড়তে বসলাম।

---------(সমাপ্ত)----------

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.