বীরভোগ্যা বসুন্ধরা

মানুষের মন বর্ণচোরা।

মারিয়ার জীবনের অভিজ্ঞতা তাই বলে।

মা বাবার একমাত্র সন্তান মারিয়া।পড়াশুনো তে সে বরাবরই ভালো।মাধ্যমিকে ৯৫% ও উচ্চমাধ্যমিকে ৯২% নম্বর পেয়ে পাশ করার পর ইংরেজীতে অনার্স নিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে।তার বাবা অরিজিৎ বাবু নিজে অবশ্য খড়গপুর I.I.Tথেকে পাশ করেন। বাবার নাম অরিজিৎ দেব। বেঙ্গালুরুতে উনার পোস্টিং।মারিয়ার মা নিজেও একজন ইঞ্জিনিয়ার। তিনিও বেঙ্গালুরুতেই চাকরি করেন।ডাক্তারি পড়ারও সুযোগ পেয়েছিলো মারিয়া।কিন্তু তার ছোটবেলা থেকেই শখ ইংরেজির প্রফেসার হওয়ার।প্রচুর ছাত্রীকে তৈরী করবে। নিজেকে উজাড় করে দেবে ভালো ছাত্র ছাত্রী গড়ে তুলার জন্য।তার আগে নিজে সে ইংরেজি সাহিত্যের সাগরে ডুব দিয়ে খুঁজে নিতে চায় অরূপরতন। বড় বাপ সোহাগী মেয়ে সে। তাই বাবা তাঁর নিজের ইচ্ছেটা আর মেয়েকে জানতে দেন না।উনার শখ ছিল মেয়ে ডাক্তারি পড়ুক। কিন্তু মেয়ের ইচ্ছেকেই বেশি গুরুত্ব দেন তিনি।তিনি মনে করেন যে কোনো বিষয়ই হোক না কেন ভালোবেসে পড়লে উচ্চতার শিখরে পৌঁছানো যায়।

যাইহোক, বেথুনে ভর্তি হয় সে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে।হস্টেলে থেকেই পড়াশুনো করতে হবে।বাবা মা দুজনে এসে মেয়েকে হস্টেলে রেখে যান।যাওয়ার আগে মেয়েকে অনেক করে বুঝিয়ে যান সব দিকে চোখ, কান খোলা রেখে চলতে।

মারিয়া তখন সদ্য হস্টেলে এসেছে।১৬ পেরিয়েছে সদ্য সে।দেখতেও সে এতটাই সুন্দর যে, ডানাকাটা পরী বললেও অত্যুক্তি হয় না। মা বাবাকে ছেড়ে এতদূর চলে আসাতে মন তার খুব খারাপ।তাই নিজের রুমে চুপ করে বসেছিল সে।চোখটা ছলছল করছিল।এমন সময় থার্ড ইয়ারের এক দিদি,নাম কৃত্তিকা এসে তাকে বলল," কিরে ঘরে একা একা বসে কার ধ্যান করা হচ্ছে শুনি? বাড়িতে মা -বাবার জন্য মন খারাপ না অন্য কিছু? বাবা চোখে তো জলও আছে দেখছি।উঁহু এ তো অন্য কেস মনে হচ্ছে বাবা।তা বাড়িতে নিশ্চয় অন্য কেও অপেক্ষা করে বসে আছে তাইতো? তা তাড়াতাড়ি নামটা বলে দাও তো খুকুমনি। কিরে কথার উত্তর দিচ্ছিস না যে বড়।বড়দের সম্মান করতে শিখিস নি এখনো। " মারিয়া ভেবে পায় না যে উত্তর দেওয়ার সুযোগ সে পেলো কোথায়? দিদিটাতো নিজের মনেই বকবক করে চলেছে।তার উত্তরের অপেক্ষায় উনি রয়েছেন বলেতো তার একবারও মনে হয়নি।কিন্তু কিছু না বলে চুপ করে থাকে সে।

ধমকে উঠে কৃত্তিকা, "কিরে বল?" এতক্ষণে মারিয়া সু্যোগ পেয়ে বলে," সত্যি,আমার বাবা- মার জন্য বড্ড মন কেমন করছে।" কৃত্তিকা বলে," আহারে,খুকুমণি, এসো এখন আমার সাথে।" মারিয়া বাধ্য মেয়ের মত তার পিছু নেয়। মনটা কিন্তু তার ভিতরে ভিতরে শক্ত এবং দৃঢ় হয়ে উঠে। বুঝতে পারে র‍্যাগিং এর সম্মুখীন হতে হবে।এসময় মাথা ঠাণ্ডা রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

একটা বড় হলঘরে নিয়ে আসা হ'ল তাকে।সে দেখলো ফার্স্ট ইয়ারের সমস্ত ছাত্রীদেরই ডেকে আনা হয়েছে সেখানে।তারা সকলেই ভয়ে কাঁপছে।একটি মেয়ে,নাম কোনি- তাকে মেঝের উপর জল ছিটিয়ে দিয়ে উলটোভাবে পেনসিল হিল পরে হাঁটতে বাধ্য করা হল।এক পা ফেলতে না ফেলতেই মেয়েটি পড়ে গেল।ভাগ্য ভালো বেশি লাগেনি তার।সব দিদিরা হো হো করে হেসে উঠলো। দ্বিতীয় জন মৈত্রী। তাকে বলা হল ক্যাবারে ড্যান্স করে দেখাতে।সে বললো," দিদি আমি কোনোদিন নাচ করিনি, নাচ জানিও না।কিভাবে নাচ করবো? প্লিজ আমায় ছেড়ে দিন দিদি।" কৃত্তিকাই দলের নেত্রী। সে ঠাস করে মেয়েটির গালে এক থাপ্পড় কষিয়ে দিয়ে বলল, " ন্যাকা চণ্ডী"? ঠাস করে আরেক থাপ্পড় এসে পড়লো তার গালে।মেয়েটি গালে হাত চেপে বসে পড়লো। কাঁদতে শুরু করতেই তাকে ছেড়ে দিল তারা।এবার মারিয়াকে ডাকলো কৃত্তিকা।মারিয়া এগিয়ে এলো, ভয় পেলে চলবে না। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো,কিছুতেই কাঁদবে না সে। হারও মানবে না সহজে।উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগাবে।

তাকে এক দিদি জিজ্ঞেস করলো, " তুমি সাঁতার কাটতে জানো? "সে বললো, "জানি। " মনীষা নামে একটি দিদি বলে উঠলো," গুড, তাহলে এই মেঝেতে সাঁতার কেটে দেখাও তো খুকুমণি।" বারবার খুকুমণি বলাতে মারিয়ার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল।কিন্তু মাথা ঠাণ্ডা রেখে সে উত্তর করলো, " একটা চক লাগবে দিদি।" হো হো করে হেসে উঠলো সকলে।দু একজন বিদ্রূপ করে বলল, "চকের উপর সাঁতার কাটবে রে।দে দে চক এনে দে।" চক হাতে এনে তার হাতে দিলো একজন।মারিয়া চক নিয়ে মেঝের উপর সাঁতার কথাটা লিখে, তার উপর ক্রস চিহ্ন দিয়ে কেটে দিয়ে বললো," সাঁতার কাটলাম দিদি।" দিদিরা এবার একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ক্ষণিকের জন্য।কিন্তু হার মানলে চলবে কেন দিদিদের।তাই এবার কৃত্তিকা নিজেই হাল ধরে।

"ঠিক আছে, বড্ড চালাক মনে ক'র, নিজেকে তাই তো। তোমার চালাকি আমি বের করছি",মনে মনে বলে কৃত্তিকা। সে বলল," তুমি জারোয়ার পোশাক পরে এসে আমাদের দেখাও।"

মারিয়ার উপস্থিত বুদ্ধি দারুণ। সে শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলে," দিদি,প্রথমত,ওরা কোলকাতাতে নয়,আন্দামানের জঙ্গলে থাকে।,দ্বিতীয়ত ওদের মত সাজতে হলে,আমার বিষাক্ত তীর ও ধনুক লাগবে।মনে রাখতে হবে তারা কিন্তু সভ্য মানুষদের দেখলেই বিষাক্ত তীর দিয়ে তাদের মেরে ফেলতে উদ্যত হয়।কেবল পোশাক পরলেই তো হবে না।আচরণটাও তাদের মতোই হতে হবে।" একথা শুনে দু তিন জন দিদি মিলে একসঙ্গে তাকে চেপে ধরে।বলে , " তোর সারা গায়ে আজ সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে তবে ছাড়বো।"এই বলে তার গায়ে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিতে উদ্যত হয় তারা।ঝটিতে,স্বর্ণালীদি এসে, ওদের শান্ত হতে নির্দেশ দেয়,বলে,"বেশি বাড়াবাড়ি করিস না,কলেজ থেকে তাড়িয়ে দেব,ওকে আমার হাতে ছেড়ে দে।আমি দেখে নিচ্ছি।" এতো বড় কথা বলা সত্ত্বেও, সব দিদিরা মারিয়াকে ছেড়ে দিলো।যেন জোঁকের মুখে লবন পড়ল।

স্বর্ণালীদিকে,তখন মারিয়ার দেবদূতের মতো লাগছিলো।তার খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেলো স্বর্ণালীদির সাথে।অপরদিকে সে হ'ল তার রক্ষাকর্ত্রী। তার কিন্তু একটু খটকা লেগেছিল মনে।এত পাওয়ার রাখে স্বর্ণালীদি!কিন্তু সে ভাবে যাকগে তার ভালোর জন্যই তো করলো।,

মারিয়া ও স্বর্ণালীর ঘনিষ্ঠতা দুদিনের মধ্যেই সকলের নজর কাড়ে।

রুমিতা, মারিয়ার রুমমেট, মারিয়াকেএকদিন বলে," এই শোন,সব দিদিরা বলছে স্বর্ণালীদি মেয়েটি ডেঞ্জারাস। ও হস্টেলের অনেক মেয়ের ক্ষতি করেছে।তুই কেন ওর সঙ্গে এত মাখামাখি করছিস বলতো? " মারিয়া উত্তরে বলে," অন্য দিদিদের রূপ তুই দেখিসনি?এর মধ্যেই ভুলে গেলি? ওরা যা বলে, হিংসেতে বলে। " মারিয়া কোনো কথাতেই কান দেয় না।এইভাবে দুমাস কেটে যায়।তাদের দুজনের ঘনিষ্ঠতা ক্রমশ যত বেড়ে চলে, অন্যান্য মেয়েরা তাদেরকে ঠিক ততটাই এড়িয়ে চলে।স্বর্ণালীকে মারিয়া নিজের

লোকাল গার্জেন বানিয়ে ফেলেছে প্রায়।স্বর্ণালীও তাকে নিজের বোনের চোখে দেখার মত ভাণ করে।

একদিন কলেজে স্বর্ণালী বলে মারিয়াকে," এই মারিয়া আমার সাথে একটু যাবি রে প্লিজ।এই কাছেই আমার এক বান্ধবীর বাড়ি।আমাকে কিছু নোটস নিতে হবে ওর বাড়ি থেকে।চল না বোন।" মারিয়া বলে," আরে বাবা অত করে বলতে হবে না, আমি তোমার সাথে নরকেও যেতে পারি।" স্বর্ণালী ফিসফিস করে বলে, " নরকের দরজাতেই আজ ছেড়ে আসবো তোমাকে। " চমকে তাকাই মারিয়া তার নতুন পাতানো দিদির দিকে।জিজ্ঞেস করে," কি বললে?" স্বর্ণালী বলে," ভয় পেয়ে গেলি তো।একটু মজা করলাম। " কিছুক্ষণের মধ্যেই এক বিশাল তিনতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো তারা।স্বর্ণালী কলিং বেল বাজালে,একটি দারুণ হ্যাণ্ডসাম ছেলে এসে দরজা খুলে দেয়।সে বলে," কি রে তুই,হোয়াট এ প্লেজান্ট সারপ্রাইজ! আয়, আয় ভিতরে এসে বোস।কিন্তু তোর সাথে এই ছোট্ট মেয়েটি কে?" মারিয়া বলে," আমি মোটেই ছোট্ট মেয়ে নই।আমি মারিয়া।আমি ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছি ইংলিশ অনার্স নিয়ে।" ছেলেটি ঘাড় দুলিয়ে এক অদ্ভুত ভঙ্গি করে বলে," আই এম অনীশ, অনীশ কর। চা না কফি।" মারিয়া বলে না,না কিচ্ছু লাগবে না।" এই সময় স্বর্ণালী বলে, " কে বলবে মারিয়া তোর প্রথম পরিচিত।বরং আমাকেই অচেনা মনে হচ্ছে।যাই হোক,তোরা বোস।আমি উপর থেকে নোটগুলো নিয়ে আসছি।মারিয়া বোধহয় বিস্কুট ছাড়া কিছু খাবে না।ও কোথাও কিছু খায় না।আমি অনিমাদিকে বলে তোর আর আমার বোনটার জন্য কিছু খাবারের ব্যাবস্থা করছি। " মারিয়া বলে, "আমি কিছু খাবো না দিদি, খুব জোর একটা বিস্কুট খেতে পারি।তোমরা খেলে খেতে পারো। " কিছুক্ষণের মধ্যেই কফি আর বিস্কুট নিয়ে নিচে নেমে আসে অনিমাদি।পিছনে স্বর্ণালী।ওরা কফি খেতে শুরু করে।মারিয়া কেবল একটি বিস্কুট খায়।কিন্তু খাওয়া শেষ হতে না হতেই কেমন এক আচ্ছন্নতা গ্রাস করে তাকে।সোফাতে, যেখানে সে বসেছিল,সেখানেই এলিয়ে পড়ে সে।

ট্রেনে এক ভদ্রলোকের পাশে এক বোরখা পরা মেয়ে সমানে পায়ের জুতো দিয়ে পাকে চেপে চলেছে স্বর্ণাভর।সে ছোটো থেকেই রগচটা স্বভাবের।তাই বলে উঠে, " কি ব্যাপার বলুন তো আপনি আমার পা জুতো দিয়ে চাপছেন কেন? লাগছে তো আমার।" কোনো ফল হয় না।ক্রমশ পায়ের উপর জুতার চাপ বাড়তেই থাকে।রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে স্বর্ণাভ বলে," আর একবার যদি পায়ে চাপ দিয়েছেন,আমি কিন্তু আপনার বোরখা খুলে ছিড়ে দেবো। " সঙ্গে সঙ্গে কামরার সকলেই প্রায় প্রতিবাদ করে উঠে।"খবরদার এমন কথা বলবেন না।আপনার সাহস তো কম নয়,বোরখা খুলে দিবেন বলছেন।জানেন, এটা একটা ক্রাইম।আর তখন থেকে বলছেন যে উনি নাকি আপনাকে জুতো দিয়ে পায়ে চাপ দিচ্ছেন।কিন্তু এটা কোনো রকমেই সম্ভব নয়।উনি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মুসলিম বলে মনে হচ্ছে।উনি খামোখা কেন এরকম করতে যাবেন?" স্বর্ণাভ বলে, " আর একবার পায়ে চাপ দিয়ে দেখুন,আমি কি করি।" এর পরে পরেই আবার জোরে তার পায়ের উপর

চাপ পড়াতে আর রাগ সামলাতে না পেরে সত্যি সত্যিই বোরখাটা উপরে টান মেরে তুলে দেয় স্বর্ণাভ। এবারে সকলের হতভম্ব হওয়ার পালা।মেয়েটির মুখ কাপড় দিয়ে শক্ত করে বাঁধা,বাঁধা তার হাতদুটিও পিছমোড়া করে।এবার স্বর্ণাভই তৎপরতার সঙ্গে মেয়েটির বাঁধন খুলে দেয়।মেয়েটির মুখ থেকেই শোনা যায় যে সে মারিয়া।ইতিমধ্যে স্টেশন এসে গেছে।প্রায় লাফ দিয়ে নেমে পরতে চায় ছেলেটি।কিন্তু স্বর্নাভ চোখের পলকে হ্যাঁচকা টানে তুলে আনে তাকে কামরার ভিতরে।মারিয়া বলে, "এ অনীশ"। স্বর্ণালীর ঘটনাও খুলে বলে সে।সবাই মিলে রেলওয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয় অনীশকে।স্বর্ণালীর বাড়িতে হঠাৎ হানা দিয়ে তাকেও তুলে আনে পুলিশ।আর একবার উপস্থিত বুদ্ধির জোরে বেঁচে যায় মারিয়া।


সমাপ্ত

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.