ভূমিপুত্র

উঠুন মশাই ভোর ৪টে বাজে,প্রাতঃভ্রমনে যাবো তো......উফঃ আরে এই উঠবে তো৷রুম্পার এক ধাক্কায় সৌগত চোখ কচলাতে কচলাতে "উঠছি", বলে উঠে ট্রাকস্যুটটা পরে ব্রাশ করে ফ্রেস হয়ে রুম্পাকে সাথে করে বেরিয়ে পরলো৷ রুম্পা-সৌগত-র বিয়ের মাধ্যম ছিল সংবাদ পত্র৷বিয়েটা হতেই তড়িঘড়ি করে পুরী থেকে হনিমুনটা সেরেই বরের সাথে রুম্পার পাড়ি বরের কর্মস্থল ব্যাঙ্গালোরে৷রুম্পা হাউস-ওয়াইফ,মেদিনিপুরের মেয়ে রুম্পা,দিঘা-পুরীর বাইরে তেমন কোথাও বিশেষ যাওয়া হয়নি,এই প্রথম একটু দূরে আসা৷ব্যাঙ্গালোরের প্রথম সকাল টাকে দু-হাতে আলিঙ্গন করতে ইচ্ছে করছে রুম্পার৷কিছুটা রেস্ট নিয়ে আবার দৌড়তে শুরু করছে দু-জনে৷কিছুটা দূরে গিয়ে পার্কের সুইমিংপুলের ধারে দুজনে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসে দেখলো বেশ কিছুটা দূরে এক ৭০ য়ের কাছাকাছি বয়স হবে শার্ট-প্যান্ট পড়া বেশ স্টাইলিশ এক ভদ্রলোক বসে আছেন,সেই বেঞ্চেই উল্টো দিকে মুখ করে সাদা গাউন পরা,মাথায় সাদা নেটের টুপি পরা,এক ভদ্র-মহিলা বসে আছেন৷ভদ্র মহিলা এত ধব-ধবে ফর্সা রুম্পার চোখটা ওদিকে-ই চলে যাচ্ছে বার বার,মনে হচ্ছে শ্বেত-গোলাপ বসে আছে৷৷

সৌগতকে সাথে করে উঠে গেলো সামনে থেকে ভালো করে দেখবে বলে,বিদেশীনিদের দেখার চান্স কেই বা ছাড়ে?সামনে গিয়ে দেখলো উনিও ৭০ য়ের কাছাকাছি কি একটু কম হবেন,সঠিক বুঝতে পারলো না বয়সটা,তবে গলার কানের মুক্তোর দুল-হার টা নজরে ঠিক পড়লো রুম্পার৷বয়স কালে উনিও স্টাইলিশ কিছু কম ছিলেন না,সুন্দরী তো ছিলেনই,এখন এই বয়সে যা রূপ বয়স কালে না জানি কি ছিলেন৷এই সব ভাবতে ভাবতে রুম্পা সৌগতকে একটা ঠেলা মেরে বলল— "দেখো মনে হচ্ছে যেন একটা সাদা গোলাপ বসে আছে"৷৷


রবিবার ছুটির দিনটা বাদ দিয়ে প্রায় রোজই দুজনে প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়ে পরে,আর ওই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাকে একই উল্টো-মুখি ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে,সে পার্কের বেঞ্চেই বসুক বা পুলের ধারের ঢিবি গুলোতেই বসুক,বেশ কিছুটা ব্যবধানে একই জায়গায় অথচ উল্টো মুখে বসে থাকেন দু-জনে....মাস খানেক দেখার পর কৌতুহল আর চাপতে পারলো না রুম্পা,সৌগতকে জিজ্ঞেস করে ফেলল—"আচ্ছা তুমি এনাদের চেনো?তুমি তো ৩ বছর এখানে আছ,উল্টোমুখে বসার রহস্যটা কি বলো তো?ব্যাপারটা বেশ কৌতূহলী লাগে বলো?"সৌগত বলল—"৩ বছরে যে কটা দিন পার্কে আসার সময় পেয়েছি,ওনাদের এভাবেই বসতে দেখেছি,বেশীর ভাগ সময় বিকেলের দিকেই আসতাম তখনও এই ভাবেই দেখেছি ওনাদের বসে থাকতে,রহস্যটা আমিও জানিনা"৷৷ ঠিক সেই সপ্তাহের রবিবার রুম্পা এক প্রকার জোর করেই সৌগতকে নিয়ে পার্কের উদ্দেশ্যে বেরোলো,একটা দিন ছুটি পায় সৌগত, বাড়িতেই কাটাতে পছন্দ করে, তাও স্ত্রীর জোর করাকে উপেক্ষা করতে না পেরে অনিচ্ছা সত্বেও বেরোতে হলো৷৷


পার্কে পৌঁছিয়েই রুম্পা খুঁজতে লাগলো শ্বেত-গোলাপ কে......হাঁটতে হাঁটতে দেখলো একটা বেঞ্চে ভদ্রলোক বসে আছেন উদাস ভাবে ঘাস গুলোর দিকে চেয়ে৷একটু জোরেই পা চালিয়ে লোকটির কাছে গিয়ে রুম্পা "হ্যালো আঙ্কেল" সম্মোধন করে হাতটা বাড়িয়ে দিতে লোকটি রুম্পার মুখের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে " নমস্কার আমি পৃথ্বিশ গাঙ্গুলী "..........বলে রুম্পাকে জিজ্ঞাসা করলেন "বাঙালি তো"?রুম্পা তৎক্ষনাৎ পুরো দস্তুর বাঙালি বলে একটা হাসি দিয়ে ভদ্রলোককে হাত তুলে নমস্কার জানিয়ে বলল—"আমি রুম্পা দত্ত".....

ততক্ষনে সৌগতও এক দ-ুপা করে এগিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে রুম্পা পরিচয় করিয়ে দিল "আমার হাসবেন্ড সৌগত দত্ত".......বলে রুম্পা ভদ্রলোকের পাশে বসে পরলো,কিছুক্ষন পর সৌগত-ও,তিনজনে মিলে চলল আলাপ পরিচয় পর্ব৷একথা সেকথা বলতে বলতে রুম্পারা জানলো উনি একজন লেখক,সেই শুনে রুম্পা ওনার লেখা কয়েকটা বই-য়ের নাম জানতে চেয়ে যে তথ্য খুঁজে পেল অবাক হয়ে গেল রুম্পা,বই-য়ের যে নাম গুলো শুনলো সেগুলো ওর প্রিয় লেখকদের মধ্যে একজন 'ভূমিপুত্রের' লেখা,ইনি তার মানে সেই 'ভূমিপুত্র'৷

বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী হওয়ার সুবাদে বই পড়ার অভ্যেস টা ওর আছে৷বই মেলা থেকে বেশ কটা বই 'ভূমিপুত্রের' লেখা ওর কাছে আছে৷বেশ বাস্তব বাদী লেখক-কবি হলেন এই 'ভূমিপুত্র'৷লেখা গুলোতে সমাজের অধঃপতন নিয়ে বেশ কাটা-ছেঁড়া করেন,জাত-পাত,ব্যর্থ প্রেম সংক্রান্ত বেশ কয়েক টা বই রুম্পা বইমেলা থেকে কিনে পড়েছে৷সেই মানুষটা এই পৃথ্বিশ গাঙ্গুলী আজ ওর সামনে এটা বিশ্বাস হচ্ছিল না রুম্পার,ও যে ওনার লেখার কত বড় একজন ভক্ত এক নিঃশ্বাসে বলে গেল,সাথে ওনার বাড়ি যাওয়ার আবদার টাও করে ফেলল৷পছন্দের লেখক কে পেয়ে রুম্পা শ্বেত-গোলাপ,যার সাথে আলাপ করতেই সেদিন মেন এসেছিল সেটাই ভুলে গেল৷৷

পরদিন বরের সাথে প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়ে রুম্পা দেখলো ভূমিপুত্র আজ আসেননি,তখন ওর শ্বেত গোলাপের কথা মনে এল আজও তো দেখছি না ওনাকে৷প্রায় ১২ দিন কেটে গেল ভূমিপুত্র পার্কে আসছেন না৷কিছু কি হলো ওনার?আর শ্বেত-গোলাপ তো সেই ভূমিপুত্রের সাথে আলাপের দিন থেকেই আসছেন না,তাই ওনার সাথে আলাপ টাও আর সারা হয়নি রুম্পার এখনও৷৷

ভূমিপুত্রের না আসার কারন নিয়ে রুম্পা বেশ বিচলিত হয়ে ১৪ দিনের মাথায় আবার সেই রবিবার দেখে সৌগত-র অনিচ্ছা সত্বেও ওকে সাথে করে বিকেল ৫ টা নাগাদ হাঁটা দিল ভূমিপুত্রের ফ্ল্যাটে,ঠিকানাটা আলাপের দিনই নেওয়া ছিল,রুম্পাদের ফ্ল্যাটের পেছন দিকের বিল্ডিং টাতে "A" ব্লকে উনি থাকেন৷৷

"A" ব্লকের কাছে পৌঁছিয়েই রুম্পা-সৌগত দেখলো ভূমিপুত্রের ব্লকের অপজিট "E" ব্লকের সামনে অনেক লোকের ভীর,রুম্পা একটু জোরেই পা চালিয়ে ভীর ঠেলে উঁকি মেরে দেখলো একটা শব-বাহী গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে,সেটা ধরে শার্ট-প্যান্ট পরা একজন বৃদ্ধ পেছন থেকে মুখটা ঠিক দেখা যাচ্ছিল না,দু-হাত দিয়ে গাড়িটা ধরে যে কাঁদছেন এটা বোঝা যাচ্ছে৷গাড়ির ভেতরে চোখ যেতে দেখলো তার মধ্যে শায়িত আছেন সেই শ্বেত-গোলাপ,যাকে প্রথম দিন রুম্পা দেখেছিল,তার চেয়েও তাকে সাদা ফুলে অপূর্ব লাগছে রুম্পার চোখে আজ,সাদা ফুলে ঢাকা বডিটা বের করার সময় পেছন ফিরে কাঁদা ভদ্রলোকের মুখটা দেখতে পেলো রুম্পা,রুমাল দিয়ে চোখ মুছেই যাচ্ছেন,কিন্তু জলের ফল্গুধারা রুমালে আটকাচ্ছে না৷রুম্পা চেনা মানুষটার একেবারে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো...... উনি যদি একটু আর্তনাদ করতে পারতেন তবে হয়ত কিছুটা হলেও শান্তি পেতেন,ওনার চাপা থেকে চাপা গলার কান্না কারো কানে না এলেও রুম্পার কানে ঠিক এলো৷রুম্পা ওর ভূমিপুত্র-কে সান্তনা দিতে পাশে দাঁড়িয়ে আলগা করে পিঠের কাছটা ধরে "কাকু" বলাতে উনি রুম্পার দিকে না তাকিয়েই "আমি ঠিক আছি" বলে রুম্পার থেকে দূরে সরে শ্বেত-গোলাপের কফিনের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন৷রুম্পার ওনাকে দেখে মনে হলো আজ বড্ড বেশী বৃদ্ধত্বের ছাপ লক্ষিত হচ্ছে ভূমিপুত্রের চোখে-মুখে৷ততক্ষনে কফিনটা শববাহী গাড়িতে ওঠানো হয়ে গেছে৷৷


গাড়ির পেছন পেছন বিদেশী একটি মেয়ে ও ছেলে হাঁটছে,আরো অনেক লোকের সাথে ভূমিপুত্র-ও হেঁটে চলেছেন চোখ মুছতে মুছতে,এসব দেখে রুম্পা-সৌগত নিজেদের ফ্ল্যাটে ফিরে এলো৷সেদিন ভূমিপুত্রের বাড়ি রুম্পার যাওয়া না হলেও রহস্য যেন আরো বেড়ে উঠলো ওর মনে,যে লোকটি একটি মহিলার উল্টোমুখে বসে কাটাতেন,সে তার জন্যই আজ এত কেঁদে ভাসাচ্ছেন!!


সারা রাত সৌগত-র মাথা খেল এই এক টপিক নিয়ে,সৌগত শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পরলো, রুম্পাও কি রহস্য এই ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পরলো৷পরের দিন ৮টায় সেই ঘুম ভাঙলো দুজনের৷তড়িঘড়ি করে সৌগত-র জন্য ব্রেকফাস্ট বানাতে ছুটলো,সেটা বানাতে বানাতেও এক চিন্তা করে যাচ্ছে রুম্পা,ভূমিপুত্র কি আজ পার্কে এলেন?এই মহিলা কি নিছক পরিচিতা?পরিচিতার জন্য এত কেউ কেঁদে ভাসায়?এসব ভাবতে ভাবতে রুম্পা ব্রেড টোস্ট টা আর একটু হলে পুড়িয়ে ফেলছিল৷

ব্রেকফাস্ট টেবিলেও সৌগত রেহাই পেল না,একের পর এক মনে যা প্রশ্ন আসছে করেই যাচ্ছে রুম্পা৷শ্বেত-গোলাপ আর ভূমিপুত্রকে সে এক সূত্রে বাঁধবেই৷সৌগত নির্বাক শ্রোতার মতো শুনে যাচ্ছে, মাঝে মধ্যে হ্যাঁ-না করে কোনো রকমে ব্রেকফাস্ট কমপ্লিট করে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হলো৷সৌগত-র মনেও যে প্রশ্ন আসছে না তা না,তবে অফিসের কাজের চাপে সে সব প্রশ্ন মুহূর্তে ভুলে গেল৷৷

সন্ধ্যে নাগাদ সৌগত বাড়ি ফিরলে এটা-ওটা কথার মাঝে রুম্পা চলে গেল সেই শ্বেত-গোলাপ আর ভূমিপুত্র-তে৷সৌগত-র সারাদিন অফিসের প্রেসার সামলে এই এক আলোচনা শুনতে ভালো লাগছে না৷নতুন বউ কিছু বলাও যাচ্ছে না,তাই কথাটা এড়িয়ে যেতে রুম্পাকে বলল—"ঠিক আছে দু-দিন যাক অফিসের কিছু পেন্ডিং কাজ আছে কমপ্লিট হয়ে গেলে তোমাকে পৃথ্বিশ গাঙ্গুলীর ফ্ল্যাটে নিয়ে যাবো৷এখন এসব টপিক ছেড়ে আমাদের কথা বলো"৷৷

২-৩ দিন কোনোমতে অপেক্ষা করে রুম্পা সৌগত কে অফিসের পেন্ডিং কাজ শেষ কবে হবে জানতে চাওয়াতে সৌগত-র মনে পরে গেল রুম্পাকে থামাতে সেদিনের পেন্ডিং কাজের অজুহাত টা,এ যে কোনোভাবে ভোলার পাত্রী না সেটাও বুঝে গেল,তাই আর কথা না বাড়িয়ে রুম্পাকে নিয়ে সে এই রবিবারই পৃথ্বিশ গাঙ্গুলীর বাড়ি যাবে জানালো৷শুনে রুম্পার মুখটাতে আনন্দের দীপ্তি ফুটে উঠলো৷৷

রবিবার দুজনে গিয়ে হাজির হলো পৃথ্বিশ গাঙ্গুলী ওরফে ভূমিপুত্র-র ফ্ল্যাটে৷ দরজা খুলে দুজনকে দেখে আসুন সম্মোধনে ঘরের ভতরে ঢুকতে আহ্বান জালালেন৷একথা সেকথা ঘন্টা খানেক আলোচনার পরই সুযোগ বুঝে রুম্পা সেদিনের কথা তুলল—"উনি কে ছিলেন কাকু?সেদিন আপনার ফ্ল্যাটে আসছিলাম তখন একজনের".....রুম্পার কথা শেষ হতে না হতেই ভূমিপুত্র বলে উঠলেন—"উনি মেরিলিন.......মেরিলিন ডিকোস্টা"৷রুম্পা বলল—"উনি আপনার অনেক দিনের পরিচিতা ছিলেন না কাকু"?ভূমিপুত্র একটু থমকে বললেন—"হ্যাঁ সেই কর্ম জীবন থেকেই,খুব মেধাবী ছিল"......বলতে বলতে ওনার চোখ দুটো ছল্ ছল্ করছিল রুম্পা লক্ষ্য করেই বলল—"আমি একদিন ওনাকে পার্কে দেখেছিলাম,কাকু ওনার কি হয়েছিল"?চোখের কোন দুটো চশমা সরিয়ে মুছে নিয়ে বললেন—"হার্ট ব্লকেজ,চিরকালই অবাধ্য,নিজের প্রতি মায়াটা ওর বরাবরই কম ছিল".........৷কথা গুলো বলতে বলতে ওনাকে ইমোশনাল হতে দেখে রুম্পা সেদিনের টপিক টা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল—"এই বয়সে যিনি এত সুন্দরী,বয়স কালে না জানি কি ছিলেন"..........ভূমিপুত্র রুম্পার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন—"সে আর বলতে,লন্ডনের অফিসে যেদিন কাজে জয়েন্ করেছিলাম,সেদিনই ওর সাথে আমার প্রথম দেখা,পিঙ্ক গাউন পরা যেন ডানা বিহীন কোনো পরী,অপরূপ সুন্দরী যাকে বলে,ওর বয়স তখন ছিল ২৫......"৷বলেই চুপ করে গেলেন ভূমিপুত্র,রুম্পাও আর কথা বাড়ালো না,পরিচয়টা যে অত্যন্ত গভীর ছিল সেটা রুম্পার নারী হৃদয়ের বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হলো না৷

দেখতে দেখতে ২-৩ মাস কেটে গেল,রুম্পা-সৌগত জমিয়ে সংসার করছে,সকাল-বিকেল সময় পেলেই এখানে-ওখানে পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে,নতুন বিবাহিত জীবন বেশ উপভোগ করছে৷পৃথ্বিশ কাকুও আগের মতন পার্কে না এলেও মাঝে মাঝে এসে বেঞ্চে বসেন,রুম্পা-সৌগত ওনাকে দেখতে পেলেই একা মানুষটাকে সঙ্গ দেয়৷৷

আজও ওদের সাথে পৃথ্বিশ কাকুর দেখা হলো,ওরা তিন-জনেই বসে গল্প করছে এমন সময় রুম্পার হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে বললেন—"এটা নতুন এডিশন আজ সকালেই হাতে পেয়েছি,আমার কপি টাই আপনাদের দিলাম, পড়বেন এটা"৷ চলি বলে রুম্পা-সৌগত-র মাথায় আশির্বাদ করার মতন করে হাত বুলিয়ে বললেন "ভালো থাকবেন আপনারা"৷রুম্পার কি হল সেদিন পৃথ্বিশ কাকু কে বড্ড ওর পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করতে ইচ্ছে করছিল,ঢুক করে সেরে ফেলল প্রনাম টা,ওর দেখা দেখি সৌজন্য বশত সৌগতও ওনার পায়ে হাত টা দিয়েই দিল৷৷

বাড়ি গিয়ে রুম্পার তর সইলো না,প্যাকেট টা খুলে বইটা কতক্ষনে পড়বে,তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে প্যাকেট টা খুলে বইটা নিয়ে পড়তে বসে গেল,বইটি বেশ মোটা,নাম "ভূমিপুত্র".......... বইটা সেদিন ৫০ পাতার বেশী পড়তে পারলো না রুম্পা,সেখানে ওনার ছোট বেলার কথা,ওনার মালদার গ্রামের বর্ননা ইত্যাদি কিছুটা পড়ে রুম্পার মনে হচ্ছিল বইটা হয়তো ওনার আত্ম জীবনী,ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো রুম্পা রাত ৩টে বাজে,চোখ ভরা ঘুম,কখন যে ঘুমিয়ে পরলো,সকালে উঠে দেখলো বই টা আধ খোলা অবস্থায় রেখেই ঘুমিয়ে পরেছিলো কাল৷তড়িঘড়ি করে রুম্পা ব্রেকফাস্ট বানানোর পর সৌগত বলল আজ আর ও অফিস যাবেনা৷কাল রাতে ওর ও ভালো ঘুম হয়নি,রুম্পা পাশে জেগে থাকাতে৷তাই আজ অফিস ডুব মারবে৷দুজনে ব্রেক ফাস্ট শেষ করে,রুম্পা কোনো রকমে ভাত-মাছের ঝোল রান্না করে,দুজনে খেয়েই রুম্পা আবার বসে পরলো বইটা মুখে গুঁজে,বিকেলে সৌগত অনেক বার রিকোয়েস্ট করা সত্বেও পার্কে হাঁটতে গেলো না৷বই মুখে বসে থাকলো,শ্বেত -গোলাপ মানে মেরিলিনের পর্ব টা কখন আসবে৷আদৌ কি ওর বিষয়ে কিছু লিখেছেন?পড়ে যাচ্ছে মন দিয়ে এমন সময় আধ ঘন্টাও হয়নি বেল বাজল, দরজা খুলে দেখলো সৌগত,মুখটা থমথমে করে ফিরে এসে বলল—"একটা খারাপ খবর আছে রুম্পা"......রুম্পা বলল—"খারাপ খবর মানে?তোমার-আমার বাড়ির লোকরা সবাই ভালো আছেন তো"?......সৌগত বলল— "ওদের কিছু হয়নি,আজ সকালে পৃথ্বিশ গাঙ্গুলী কে প্রতিবেশীরা মিলে নার্সিংহোমে ভর্তি করেছে,উনি সুইসাইড এটেম্ট করেছেন প্রচুর পরিমানে ঘুমের অসুধ খেয়ে,সকালে কাজের লোক এসে অনেক ডাকা-ডাকি করেও যখন সাড়া পায়নি তখন সবাই মিলে দরজা ভেঙে ওনাকে নার্সিংহোমে ভর্তি করেন৷অবস্থা খুব ভালো না".....৷শুনেই রুম্পা ওনাকে দেখতে যাবে বলে বায়না ধরাতে সৌগত বলল কোন নার্সিংহোমে আছেন সে খবর টা 'ও' আনতে পারেনি৷

রুম্পার চোখের জল গাল বেয়ে নেমে এল,স্বামীর কাঁধে মাথা রেখে বলল—"কেন এমন করলেন বলো তো"?সৌগত একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল—"জানি না"!

রুম্পার বইটার প্রতি আরোও ইন্টারেস্ট জন্মে গেল যদি ওনার সুইসাইড এটেম্ট করার রহস্য জানতে পারে৷বই টি নিয়ে আবার পড়তে লাগলো,চারদিনের মাথায় ২৫০তম পেজে গিয়ে এক পরীর সাথে ভূমিপুত্রের প্রেমের কথার উল্লেখ পেল........সেখানে লেখা এক পরীর সাথে প্রেমে হাবুডুবু ভূমিপুত্র,প্রথম পরিচয়ে পিঙ্ক গাউনের উল্লেখ থাকায়,রুম্পার বুঝতে এতটুকু কষ্ট হলো না মেয়েটি ওর শ্বেত-গোলাপ,সেই ছিল ভূমিপুত্রের প্রথম ও শেষ প্রেম৷এর পর ওদের প্রেমের বাক্য বিনিময় সব ধাপে ধাপে বর্নিত আছে৷কিভাবে উনি ওনার পরীকে বাংলা ভাষা সহ বাঙালী আদব কায়দা শিখিয়েছিলেন,আর ওনার পরীও একজন বাঙালী গোঁড়া ব্রাক্ষন বাড়ির বউ হতে গেলে যা যা শিখতে হয়,শাড়ি পরা থেকে শুরু করে,ছোট চুল বড় করে সেটাকে বিনুনি,খোঁপা করা, কপালে টিপ পরা,হাতে চুড়ি পরা,লক্ষ্মীর পাঁচালী আধো বাংলায় পড়া,এমন কি ওনার জন্মদিনে ভালোবাসা মিশ্রিত আধপোড়া পায়েস রান্নার কথা,সব শেখার অদম্য প্রচেষ্টায় কিভাবে নিজেকে ব্রতী করেছিল,এমন কি এই 'ভূমিপুত্র' নাম টাও তার সদ্য বাংলা শেখা রমনীর থেকেই পাওয়া,গ্রামের সাথে মিল রাখতেই এ নামটি বেছে ছিল তার পরী৷সে-সব কথার বর্ননা আছে একের পর এক৷এর পর লেখা আছে—মানসিকভাবে নিজেকে পুরোপুরি বাঙালীয়ানায় রপ্ত করলেও ধর্মের দিকে পুরোপুরি পিছিয়ে থাকলো পরী৷৷

এদিকে ভালো চাকরির সুবাদে ভূমিপুত্রের বাড়িতে বিয়ের জন্য পাত্রী নির্বাচন শুরু হয়ে গেল৷ক্যুরিয়ারে বেশ কিছু ব্রাক্ষন পাত্রীর ছবি বাড়ি থেকে তার কাছে পাঠানো হলো৷ছবি গুলো ফেরৎ দেওয়ার সাথে উনি ওনার পরীর ছবি সহ ডিটেল্স পাঠিয়ে মতামতে জানালেন একে ছাড়া কাউকে তিনি বিয়ে করতে পারবেন না৷পত্র পেয়ে ওনার মা অসুস্থ হয়ে গেলেন,সেই খবর পেয়ে উনি বাধ্য হলেন দেশের বাড়ি মালদা যেতে৷সেখানে গিয়ে ওনার পরীর নামে মা সহ জ্যেঠি-কাকিদের সাপ-ব্যাঙ খাওয়া থেকে কুমারিত্ব আদৌ আছে কিনা, সে সকল কুরুচিকর মন্তব্যের সম্মুখিন হতে হলো ওনাকে৷ওদের অটল সিদ্ধান্তের ফল স্বরূপ রক্ষনশীল ব্রাক্ষন বাড়ির বউটা তার আর হওয়া হলো না৷এদিকে ভূমিপুত্রও অন্য কাউকে বিয়ে করা তার পক্ষেও অসম্ভব সে কথা সাফ বাড়িতে জানাতে ওনার মা দিব্যি দিলেন এই মেয়েকে বিয়ে তো দূর কোনোদিনও যদি মুখ দর্শনও করেন তবে ওনার মার মরা মুখ দেখবেন৷উনিও সারাজীবন বিয়ে না করার প্রতিজ্ঞার কথা জানাতে ওনার মা একে বারে শয্যা নিলেন৷শয্যাশায়ী মার কথা অমান্য করে পরীকে নিয়ে ঘর বাঁধার সাহস তার হয়নি৷লন্ডনের চাকরীটা ছেড়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আবার পারি দিলেন লন্ডন,পরীকে গিয়ে সব জানালেন,উনি সেই সঙ্গে নিজেকে শেষ করার প্ল্যান করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন,কারন সেখানে আবার বাধ সেধেছিল পরী........টিপিকাল বাঙালী মেয়েদের মতো 'ও' সেদিন নিজের মাথার দিব্যি দিয়ে কথা নিয়েছিল যতদিন পরী বেঁচে থাকবে ততদিন ভূমিপুত্র যেন নিজের কোনো ক্ষতি না করে৷তাই নিজেকে শেষ করতে না পেরে, চাকরী ছেড়ে মালদা চলে যান৷সেই দুজনের শেষ কথপোকথন........৷৷

মালদার বাড়ি চলে এসে কর্মজীবনের একেবারে ইতি টেনে দিলেন,সেখান থেকেই তার শুরু পরীর দেওয়া নামকে আশ্রয় করে বই লেখা৷মালদা যাবার ২-বছর বাদে ওনার মা ও ৮ বছর বাদে ওনার বাবা গত হলে,মালদার সমস্ত জমি-জমা, বসত বাড়ি বিক্রি করে চলে আসেন কলকাতায়,সময় কাটাতে নিযুক্ত হন এক পত্রিকা অফিসের সাথে৷অর্থ উপার্জনের সাথে সাথে বাড়ল পরিচিতি ,শুরু হল ছদ্মনামে লেখা বইগুলি ছাপা৷৫ বছর পর ভালো পত্রিকায় কাজের অফার পেয়ে চলে আসা ব্যাঙ্গালোরে,সেই সাথে নিয়তির পরিহাসে আবার দেখা পরীর সাথে দীর্ঘ ১৫ বছর পর,ওনার "A"ব্লকের অপজিট "E" ব্লকের বাসিন্দা পরী৷মুখোমুখি হওয়া সত্যেও কথা বলা হয় নি পরীর স্বপ্ন ভঙ্গ কারের,কথা বলেনি পরীও,হয়ত কিছুটা মাকে সম্মান জানাতে,কিছুটা স্বপ্ন ভঙ্গের অভিমানে৷তা সত্বেও পরীর খোঁজটা নিতে নিজেকে আটকাতে পারলেন না,এটা জানার চেষ্টায় 'ও' সংসার পেতেছে কিনা?এক প্রতিবেশীর থেকে জেনেছিলেন পরীও অবিবাহিতা, ওনার মতই সব হারিয়ে আজ একা৷৷আমেরিকা থেকে ৩-৪বছর অন্তর ওর এক ভাইপো আর তার বউ আসে,এরাই ওর সহায় সম্বল আর কেউ নেই৷৷

ষষ্ঠ দিনে বইটির একেবারে শেষ অধ্যায়ে ৫০০তম পেজে চলে এসেছে রুম্পা,সেখানে লেখা "আজ না আছেন 'মা',না আছে আমার 'পরী' ............না আছে আর কোনো দিব্যি৷মৃত্যু তো সেই ৩০ বছরেই ঘটে গিয়েছিল,পরীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটে,এখন খালি এই নাম মাত্র জীবনটা শেষ করে পোড়ার পালা,ভূমিপুত্র আজ প্রস্তুত যেখানে তার পরী আছে সেই পরীর দেশে যাওয়ার জন্য৷পরীর মৃত্যুর পর যে ক-মাস বাঁচলাম শুধু বই-য়ের অসমাপ্ত অধ্যায়টা শেষ করার উদ্দেশ্যে,যেদিন বই টি ছেপে পাঠক সম্মুখে চলে আসবে সেদিন চির নিদ্রায় শায়িত হবে 'ভূমিপুত্র'......"৷৷

রুম্পার কাছেএখন জলের মতন পরিস্কার ওনার সুইসাইড এটেম্ট করার কারন টা,বই টি তখনও হাতে আকঁড়ে বসে আছে রুম্পা ,দরজার বেলের শব্দে ঘড়িতে তাকিয়ে দেখল সন্ধ্যে ৭টা,সৌগতর আসার সময় এখন,তাড়াতাড়ি বইটা হাতে করেই উঠে গেল দরজা খুলতে৷বাড়িতে ঢুকেই সৌগত রুম্পাকে জানালো আসার পথে ভূমিপুত্রের মৃত্যু সংবাদ জানতে পারলো সে,বিকেল ৫টা নাগাদ উনি পরলোকে গমন করেছেন,তার সাথে সেদিনের পাওয়া সুইসাইড নোটে ওনার শেষ ইচ্ছের কথাটাও রুম্পাকে জানালো........উনি বলে গেছেন ওনার মৃত্যুর পর ওনার চিতাভস্ম টা যেন মেরিলিনের কবরের পাশেই কবর দেওয়া হয়.....৷কাল পোষ্টমর্টেম করার পর ওনার দেহ শিল্পি ভবনে কিছুক্ষন শায়িত রাখা হবে ভক্তদের উদ্দেশ্যে৷৷

রুম্পা তার প্রিয় লেখক কে হারানোর যন্ত্রনায় বইটাকে যতটা পারলো আষ্টে-পৃষ্টে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল—"তারপর মহাপ্রস্থানের পথে এগিয়ে যাবেন 'ভূমিপুত্র' ওর 'পরীর' সাথে নবজন্মে মিলনের আশ্বাসে"৷৷


সমাপ্ত :-

.................................


bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.