সকাল সকাল ফোনটা বেজে ওঠায়, ঘুম চোখে কতকটা বিরক্তি নিয়ে বাঁহাত দিয়ে মাথার আশেপাশে হাতড়ে পেলাম তাকে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সুনন্দার ঝাঁঝালো চিৎকার "কিরে, তুই এখনো ঘুমোচ্ছিস? আরে সাড়ে সাতটা বেজে গেছে তো..।" মনে পরলো, আজ ওর সাথে আমার ওর বাপের বাড়িতে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে নেমন্তন্নর কথা। অতঃপর একটা লম্বা হাই তুলে উঠে বসলাম। ফোনে জানালাম, ৩০মিনিটে স্নান সেরে রেডি হয়ে স্টেশনে আসছি। ও ততক্ষণে আমার ছুটির দিনের সকালের নিদ্রাটা অসময়ে ভাঙিয়ে আশ্বস্ত হয়ে ফোন রাখলো।

আমাদের বাপের বাড়ির পাড়ার স্কুলটিতে আমার এই বান্ধবীটির সাথে আমি ক্লাস ১ থেকে ১০ অবধি পড়েছিলাম। পরে আমি কলকাতার দিকে মায়ের সাথে চলে আসি। মাঝে বেশ কয়েকবছর যোগাযোগ ছিল না ওর সাথে। তারপর কলকাতায় একটি ছোটোখাটো চাকরী ছেড়ে সুনন্দার শ্বশুড়বাড়ির পাড়ায় প্রাইমারী স্কুলের চাকরী পেয়ে, আবার সাক্ষাৎ হয় ওর সাথে। ছোটোবেলা থেকেই ওদের বাড়িতে বড় করে গোপালের জন্মদিন পালন হতো। তখনও বন্ধুরা মিলে যেতাম নাড়ু মালপোয়া লুচি আলুরদম পাত পেরে বসে খেতে। সেসব দিন মনে পরলেই কেমন একটা শিহরণ হয় শরীর ও মনে। পাছে বিলম্ব বাড়ে, তাই স্মৃতিপুস্তকখানিকে আপাতত বন্ধ করে মনের তাকে তুলে রাখলাম।

প্রায় দশটা নাগাদ আমরা দুজনে পৌঁছলাম কল্যাণীতে সুনন্দার বাপের বাড়িতে। পথে যেতে যেতে বারবার স্মৃতির পাতাগুলো খুলতে চাইছিল মনের ধূলোমাখা কোণে। আমি যেন একটু কড়া শাসনেই তাদের দাবড়ে রাখছিলাম। দশ বছর আগের সেই ব্যথাগুলো নতুন করে নাড়াচাড়া করে আজকের দিনটা মাটি করার কোনো ইচ্ছেই নেই আমার। আসতামই না এখানে কোনোদিন, যদি না সুনন্দা খুব জোরাজুরি করতো কাল।

ওদের বাড়িতে ঢুকে উৎসবের তৎপরতা উপলব্ধি হল। কাকু কাকিমাকে প্রণাম করে কুশল বিনিময় সেরে বারান্দায় এসে বসেছি সবে, ওমনি এক বছর দেড়েকের ছোট্ট ছেলে আমার পেছনের আড়ালখানিকে আশ্রয় করে এসে লুকালো। আমি ওর আত্মগোপনের মাঝে মাঝে কৌতূহলী উঁকি দেখে হাসছি তখন। তার পিছু পিছু একটি বাটি চামচ হাতে সামনে এসে হাজির হলেন একজন। সুনন্দা এসে পরিচয় করিয়ে বলল উনি ওর বড়বৌদি, সম্পূর্ণা। তিনি নাকি এই দুষ্টুর পিছনে এভাবেই দুধরুটির বাটি নিয়ে রোজ সারা বাড়ি ঘোরেন। আর সেও নিত্যনতুন লুকাবার জায়গা খুঁজে ফেরে। আজ আমাকে পেয়ে তার ছোট্ট মনে খুব কনফিডেন্সে ছিল যে, এই জায়গাটি নতুন হওয়ায় নিরাপদ, তাই সহজে খুঁজে পাবেন না তাকে তার বড়মা। তখনের কিছু বাক্যালাপের মধ্য দিয়ে বড় ভালো লেগে গেল আমার সুনন্দার বড় বৌদিটিকে।

অতঃপর, পূজার ঘরে ডাক পরলো সবার। সেখানে ঢুকে সুনন্দার ছোটোবৌদি, অপর্ণাকে দেখলাম শাশুড়ির সাথে পূজার আয়োজন সম্পূর্ণ করছেন। পরিচয় দানের পর তিনি আমার দিকে চেয়ে একগাল হাসলেন ব্যস্ততার ফাঁকে। সুনন্দার মা ছোটোবৌয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ওনার কথায়, এ বৌ ঘরে এসে বহুবছর পরে বাড়ির শ্রীবৃদ্ধি করেছেন। কাজে কর্মে সে একেবারে শাশুড়ির ডানহাতের চেয়েও সচল। বড়ই পয়মন্ত। শেষ কথাটা শোনার পর আমার পাশে দাঁড়ানো সম্পূর্ণা বৌদি ধীর পায়ে বেড়িয়ে গেলেন ঘর হতে।

বেলা এগারোটার দিকে ঠাকুরমশাই এসে গেলেন। পূজাতে বসেই তিনি কয়েক সেকেন্ডের বিচক্ষণ পর্যবেক্ষণে জানালেন, কিছু অধিক তুলসীপত্র প্রয়োজন। কথাটা শুনেই বড়বৌ উঠতে গেলে, সুনন্দার মা মেয়েকে ডেকে বললেন, "সুনু তুই যাতো। বড়বৌমা তুমি বিট্টুকে দেখো। পূজার কাজে আর হাত লাগানোর দরকার নেই।" মায়ের কথা অনুসরণ করে সুনন্দা উঠে গেল। পূজা শুরু হল। ঘরে সুনন্দার বাবা ও বড়দা এসে বসেছেন তখন। ছোটদাকে ওদের মিষ্টির দোকান সামলাতে হয়। আজ সেখানে ব্যবসা বেশি, তাই তিনি বাড়িতে অনুপস্থিত।

সুনন্দার মা, ছেলে কোলে নিয়ে ছোটোবৌকে ঠাকুরমশাইয়ের পাশে বসতে বললেন। দেখলাম, বিট্টু তার বড়মায়ের কোল ছাড়তে অনিচ্ছুক। তাও একপ্রকার বুঝিয়ে সুঝিয়ে তার বড়মা তাকে নিজ জননীর কোলে পাঠালেন। এই এক ঘন্টায় শিশুর বড়মাকেই আমি তার স্নান, খাওয়া, আদরে বায়না মেটাতে দেখেছি ধৈর্য সহকারে। ছোট্ট বিট্টু মায়ের কোলে বসে সামনের বিবিধ জিনিস দেখে নিজেকে সংবরণে ব্যর্থ হয়, আর সেগুলো ছুঁতে অবিরাম হাত পা ছিটোতে থাকে। মায়ের হাতের কানমলা খেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার তার স্বভাবগত আচরণ শুরু করে দেয় সে। একের পর এক উপাচারে আরতি হচ্ছে তখন, হঠাৎই বিট্টুকে ছুটে গিয়ে কোলে তুলে নিয়ে, প্রদীপটা দূরে সরিয়ে দেন বড়বৌদি। সুনন্দার মা চিৎকার করে ওঠেন "এখানে না এলে কি চলছিলো না তোমার?"

মাকে থামিয়ে দিয়ে তখন বেশ উঁচুগলায় বলে ওঠে সুনন্দা "মা, বিট্টুর পরনের রেশমের পাজামাতে আগুন লেগে যাচ্ছিল পঞ্চপ্রদীপের ছোঁয়ায়। তোমরা তো পিতলের গোপালের পূজায় মত্ত ছিলে, বড়বৌদি যে তার মানস গোপালের দিকে ঠায় নজর রাখছিল, সেটা বুঝতেই পারোনি। আর বুঝবেই বা কি করে? তোমাদের অনুভূতিগুলোতো নিষ্প্রাণ, সংস্কারাচ্ছন্ন।"

কথাটা শোনামাত্র সুনন্দার মা আর ছোটোবৌদি বলে উঠলেন "সেকি? কোথায় দেখি?"

আমি চেয়ে দেখলাম, বড়বৌদির দুচোখ তখন ছলছলে, বিট্টুকে কোল হতে নামিয়ে আবার দরজার দিকে চলে গেলেন তিনি। তার স্বামীটি ঘরের এক কোণে মেরুদণ্ডহীন জড়বৎ বসে আছেন তখন, ঠিক আমার বাবাকেও যেমন বসে থাকতে দেখেছিলাম আমার ৭ বছরের ছোটো ভাইটা রাস্তায় এক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার দিন। ঠাকুমা সেদিন অবলীলায় নিয়তির পরিহাসে নাতির অকালে চলে যাওয়ার জন্য দায়ী করে এক সদ্য সন্তানহারা জননীকেই অকথ্য ভাষায় দুষছিলেন। আমার বাবাও ঠিক এরকমই অপ্রতিবাদী বোবা কালা হয়ে বসে ছিলেন সেদিন ভাইটির সাদা কাপড়ে ঢাকা দেহের পাশে। আর আমার মা ক্ষণে ক্ষণে জ্ঞান হারাচ্ছিলেন তখন। কি আশ্চর্য! এই দশ বছরে আমরা প্রযুক্তির প্রয়াসে কত্তখানি আধুনিক হয়ে গেছি, অথচ দশ আলোকবর্ষ আগের সংস্কারাচ্ছন্ন চিন্তাধারা থেকে এখনো সরে আসতে পারিনি এতোটুকু। আজও ঘরের সকল মঙ্গল অমঙ্গল, অনিচ্ছাকৃত চাওয়া পাওয়ার বেহিসাবের জন্য, সেই ঘরের বৌয়ের দিকেই অঙ্গুলি তাক করা হয়। বড়বৌদির শূন্য মাতৃজঠরই আজ কিনা এ বাড়িতে তার অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার পরিণামে তাকে অশ্রুসিক্ত চোখে শ্বশুরবাড়িতে হওয়া গোপাল সেবা হতে দূরে সরে থাকতে হচ্ছে। তৃষ্ণার্ত মাতৃত্ববোধকে অবমাননা করে এ কোন মায়েরা গোপালের জন্মদিন পালন করছেন? তাতে কি গোপাল আদৌ খুশি হচ্ছেন? আমার মনের অবাধ্য প্রশ্নগুলো শান্ত হল ঠাকুরমশাইয়ের ধীর গলার বাক্যে ... "বড়বৌমা, এদিকে এসোতো একটু। আরতির আশীর্বাদটা আজ তুমিই দাও তোমার স্নেহের বিট্টুকে। তুমি যে ওর যশোদা মা হয়ে আজ ওকে রক্ষা করেছো, তাই এই আশিস আজ তোমার হাতেই পাক এবাড়ির গোপাল। আর তুমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকোনা এভাবে, দেখছো না গোপাল বিচলিত হয়ে উঠছে ...।"

বড়বৌদি দুচোখের জল মুছে এগিয়ে এলেন সংকোচিত মাতৃত্ববোধে।

সেদিন বিকেলে সুনন্দাদের বাড়ির ছাদে গিয়ে একটু হাঁটতে গিয়ে দেখি, বেশ কয়েকটা মাটির টব আছে সেখানে। কিন্তু সবই খালি, একটাতে শুধু তুলসী গাছ লাগানো। আমি সুনন্দাকে ডেকে জানতে চাইলে, ওর বড়বৌদি এসে বললেন "ওগুলো আমার সখে কেনা গো। আমি বীজ ছড়িয়ে দি, গাছ হওয়ার জন্য। কিন্তু এমন কপাল আমার দেখো, একটা বীজেরও অঙ্কুরোদগম হয়না। আমার মতোই বাজা সব টবের মাটিগুলো, অথবা হয়তো আমার ছোঁয়াই ...।" কথাগুলো বলতে বলতে অজান্তেই নিজের প্রতি নিজের একটা ঘৃণা উগড়ে উঠছিল তার। তখনই হঠাৎ একটি টবের দিকে চেয়ে আমি বলে উঠি "বৌদি দেখো, অঙ্কুরোদগম হয়েছে"। কথাটা শোনামাত্রই সে উল্লাসিত হয়ে ওঠে "এতো আগের সপ্তাহে ছড়ানো কুমড়োর বীজ গো। এতো বছরের চেষ্টায় নতুন জীবন কি তাহলে সৃষ্টি হল আমার অপয়া হাতে? তাহলে কি গোপালজির কৃপায় আমার মাতৃত্বের বীজ অঙ্কুরিত হবে এবার? আমি কি সম্পূর্ণা হয়ে উঠতে পারবো এ জীবনে ?"

বড়বৌদির এই নিষ্পাপ বিশ্বাসকে তখন বিজ্ঞানের যুক্তিতর্ক আর কুসংস্কারপন্থী চিন্তাধারার টানাপোড়েনের মধ্যে বিচার করার ধৃষ্টতা আমার বিজ্ঞানমনস্ক মনের ছিল না। শুধু দূরে চেয়ে দেখলাম, পশ্চিমাকাশে তখন অস্তমিত সূর্য যেন আগামীর আশার অঙ্কুরিত প্রতিশ্রুতি দিতে দিতে ডুবছে।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.