সমাজ সেবার ভুতটা সুজয়ের মাথায় খুব ছোট বেলা থেকেই | পাড়ার কার বাড়ি অতিথি এসেছে মিস্টি আনতে হবে | দাদু-ঠাকমা একা থাকে সব্জি বাজার করে দিতে হবে | পরিবারের সবাই বিয়ে বাড়ি যাবে তাই খালি বাড়ি পাহারা দিতে হবে | এসব কাজে প্রথমে যার নাম আসতো সে হল সুজয় | সুজয় কোনোদিনই পরোপকার করাকে কাজ বলে ভাবে নি | পড়াশোনায় খুব খারাপ ছিল না | সায়েন্স নিয়ে বিএসসি পাশ করেছিল | চাকরির পরীক্ষা দিয়ে চলেছিল নানা জায়গায় | এর মে মাসের এর শেষ দিনে ঠিক সুন্দরবনে আয়লার পরে সুজয় পাড়ার মোড়ের পানের দোকানটায় দাঁড়িয়েছিল | হঠাৎ বিবেকদা এসে বলল

- ঝড়খালি যাবি ?

-সেটা কোথায় ?

- আরে সুন্দরবনে, জানিস না?

সুজয়ের মনটা নেচে উঠল টি ভি র নিউজ দেখে ওর খুব ইচ্ছে হচ্ছিল বিধস্ত দু:খী পরিবার গুলোর পাশে দাড়াতে | সুজয় কিছু না ভেবেই বলল

- যাবো | কবে বেরতে হবে বল ?

- কাল সকালে |

সুজয় বলল

- কটায় ?

- কালকে সকাল সাতটায় | বাগুইহাটি বাস স্ট্যাান্ড | আসবি কিন্তু ....

বিবেকদা বাইক স্টার্ট করে বেড়িয়ে গেল |

সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে আর এক ভয়ংকর ঝড়ের মুখে পড়বে সুজয় কল্পনাও করেনি | কথাটা বলতেই বাবা আর বৌদি রে রে করে তেড়ে উঠল | ওর মা তো চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিল | যেন সুজয় সুন্দরবনে পা দিলেই মরে যাবে | ওর দাদা হাওড়ার একটা অফিসে আপার ডিভিশন ক্লার্ক | রাত আটটায় বাড়ি ফিরলে কেউ কিছু বলার আগেই দাদাকে পাকড়ালো | অনেক কষ্টে দাদাকে দিয়ে সবাইকে রাজি করানো হল |

সকালবেলায় বাগুইআটি বাস স্ট্যান্ডে পৌঁউছে সুজয় বড় গাড়ি বা মিনিবাস জাতীয় কিছু খুঁজছিল | দেখলো বিবেকদা একটা ম্যাটাডোর থেকে হাত নাড়ছে | সুজয় কাছে যেতেই বিবেকদা বলল

- তাড়াতাড়ি উঠে পড় তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম |

গাড়ী চলতে সুরু করলো | ম্যাটাডোরে বেশ কিছু বড় বড় বস্তা জাতীয় জিনিস | ওরা সুজয়কে নিয়ে মোট আটজন | তিনটে মেয়ে আর পাঁছজন ছেলে | একটি মেয়ে বিবাহিত | এর পেছন পেছন আসছে আরও একটা ম্যাটাডোর | ওরা, সবাই বস্তা গুলোর ওপর বসে যাচ্ছে | এদিকের রাস্তা সুজয় ভাল চেনে না | রাস্তার দু'দিকেই মাছের ভেড়ী | গ্রাম গুলোতে ঝড়ের তান্ডবের চিন্হ | রাস্তায় শুকনো খাবার কিছু খেয়ে নেওয়া হল | গোয়াৎখালি যখন পৌঁছল ঘড়িতে তখন সকাল দশটা | ভগ্নস্তুপের মাঝে একটা অস্থায়ী জেটি দিয়ে লঞ্চে ওঠার ব্যবস্থা | কয়েকজন সেচ্ছাসেবী পুলিশ কাগজপত্র চেক করার পরে লঞ্চে ওঠার অনুমতি দিল | স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় সবাই হাত লাগিয়ে ম্যাটাডোরের মালপত্র লঞ্চে তোলা হল | আরো লোকজন ছিলো লঞ্চে | ডেকের ছাউনির মধ্যে ওরা বসে | নিচে খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ আর খাবার জলের ব্যারেল | ঝড়খালি কিছুটা আগে ওরা নেমে গেলো সংগে মালপত্রও | সবাই কাজে হাত লাগালো | এখনো ভালভাবে ত্রান পৌঁছয়নি | প্রথমে শুকনো খাবার বিস্কুট বিতরণ করল ওরা সাথে খাবার জল| একটা খালি জায়গা খুঁজে একটা অস্থায়ী তাবু বানানো হল | বিবাহিত মেয়েটির স্বামীর নাম অতনু | সীমা আর অতনু দুজন হু এর প্রজেক্টে কাজ করেছে অনেক দিন | ওরা অসুস্থ লোকজনদের ওষুধ বিতরণ করতে বেড়িয়ে গেল | বিবেকদা বাকীদের নিয়ে রেস্কিউ এ হাত লাগাতে যাবার আগে সুজয়কে বলল

- অদিতি আর ঝুমা খিচুড়ি বানাবে তুই হেল্প করবি |

ওরা একটা অস্থায়ী উনুন বানাতে সুরু করেছে সুজয় হাত লাগালো | সঙ্গে আনা জ্বালানী কাঠ জল ইত্যাদি এগিয়ে দিল ওদের | দুপুরে খিচুড়ি নিয়ে গেলো সবাই থালা বাটি নয়ে এসে | কাঁচা ঘরবাড়ি কিছুই আস্ত নেই ধ্বংসস্তুপ হাতড়ে যে যে যেটুকু পেয়েছে নিয়ে উঠেছে পাকা স্কুল বাড়িটাতে | তিন জন মারা গেছিল ডেডবডি সরানো হয়ে গেছে আগেই | ওরা তিনজন অপেক্ষা করছিল । বাকিরা ফিরলে বেঁচে যাওয়া খিচুড়ি ভাগ করে খেল | আবার সবাই বেড়লো উদ্ধার কাজে | বিকেলে আরও একটা টেন্ট বানানো হল পাশেই গায়েগায়ে | রাতে ত্রিপল বিছিয়ে মশকিউটো ক্রিম মেখে শুয়ে পড়লো সবাই ছেলেরা আর মেয়েরা আলাদাভাবে। একটু দুরত্ব রেখে | অদিতি আর ঝুমার সংগে রান্না করার সময় পরিচয় হয়েছে সুজয়ের | অদিতি খুব কালো মুখে একটা গ্রাম্য ছাপ | বনগা লাইনে থাকে | ঝুমা থাকে উল্টোডাংগার করবাগানে | দুজনেই পাঁচবছর কাজ করছে | সবাই ক্লান্ত ছিল বলে ঘুমিয়ে গেলো | সুজয়ের এই অনভস্ত্য পরিবেশে ভাল ঘুম হল না | পরদিন একই রুটিন | বিকেলে বেঁচে থাকা জিনিসপত্র অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পে ওদের জিম্মায় ত্রিপল চাপা রেখে আবার লঞ্চ এ উঠে পড়ল ওরা | সুজয়ের বাড়ি ফিরতে প্রায় রাত ন'টা |

পরদিন ঘুম থেকে উঠেই বিবেকদাকে ফোন করলো সুজয় |

- হ্যালো।

- আমি সুজয় বলছি |

বিবেকদা আমার খুব ভালো লেগেছে |

- আমি জানি তোর ভাল লাগবে | জয়েন করবি আমাদের সংস্থায় ?

- সেই রিকয়েস্ট করতেই তো তোমায় ফোন করেছি | সুজয় এপাশ থেকে বলল | বিবেক একটু থেমে বলল

- আমরা কিন্তু চার হাজারের বেশী দিতে পারব না মাসে |

- আরে, টাকা কে চেয়েছে | আমি...

- আরে ভাই, টাকা অনেক কিছু |

লোকই পাচ্ছি না | জয়েন করছে আর ছেড়ে দিচ্ছে | ও কে কাল চলে আয় |

- কোথায় ?

- আমি ন'টায় বাগুইআটি বাজারেও সামনে থাকব | বিবেক ফোনটা কেটে দিল |

পরদিন সকালে বাগুইআটি বাজার থেকে উল্টোডাঙ্গার অফিসে গেল বিবেকের বাইকে চড়ে | স্টেশনের পাশের রাস্তা দিয়ে গিয়ে বেশ খানিকটা ভেতরে অফিস | সামনে রাস্তায় একটা মারুতি সু্ইফ্ট দাড়িয়ে আছে | একটা বড় বাড়ির একতলার দু'টো ঘর নিয়ে অফিস | এছাড়া করবাগানে ঝুমার বাড়ির কাছে একটা টিনের চালার গোডাউন আছে |

অফিসে একটা এক্সিকিউটিভ চেয়ারে জিন্স আর টপ পরিহিতা এক পৃথুলা মহিলাকে দেখল সুজয় | কথাবার্তা একটু আঁতেল স্টাইলে বলেন | চ'এর দোষ উচ্চারনে | নিজেকে বিশাল কিছু ভাবেন | বাকীরা সবাই চেনা | বিবেকদাকে একান্তে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো আসল ব্যাপারটা | ওনার স্বামী নামী ব্যাবসায়ী | ইনার একমাত্র ছেলে আমেরিকাতে সেটেলড এবং ইনি সংস্থার প্রেসিডেন্ট এবং মেইন ফিনান্সার | মাসে কর্মীদের বেতনের টাকাটা ওনার ফান্ডিং থেকে হয়ে যায় | এছাড়াও বছরের তিন চারটে বড় ডোনেশন এর ব্যাবস্থা ওনার স্বামী করে দেন | ডিমান্ড একটাই যে তাকে সব প্রোগ্রামে ক্যামেরার সামনে রাখতে হবে | অফিসের ডিস্পলে বোর্ডে ওনার বিভিন্ন কাজকর্মের ছবি | বাকিদের মধ্যে ছেলেগুলো আর অদিতি বিবেকদার বয়েসি আর ওর বন্ধুও | ওরা সবাই ফউন্ডার মেম্বার | বাকীরা ওর থেকে প্রায় সাত বছরের বড় হলেও ঝুমা ওর সমবয়েসী | ও একবছর হল জয়েন করেছে | গরীব ঘরের মেয়ে, টাকার প্রয়োজনে এসেছে, তবে খুব সেবাপরায়ন | পরদিন সকালে আবার যাওয়া | সবাইকে প্রোগ্রাম বুঝিয়ে দিল ওরা | তারপর ছুটি হয়ে গেলো সুজয়ের | এখানে ম্যাডাম ছাড়া সবাই সবাইকে নাম ধরে ডাকে | পরদিনের প্রোগ্রাম একইরকম ছিলো | ঝুমা আর অদিতিকে দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছিল সুজয় | অদিতির মুখে কোনো কথা নেই মুখ বুজে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যায় ওই কালো রোগা মেয়েটা | সুজয়ও প্রচুর খাটলো এবার | অনেকটাই কাজের সংগে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে | দুদিন সুন্দরবনে আর একদিন কলকাতায় রসদ সংগ্রহ এভাবে তিন মাস কেটে গেছে | আয়লা প্রজেক্ট শেষ হল | এই সংস্থার রুটিন কাজ হল কলকাতার বস্তিগুলোতে ঘুরে ঘুরে স্কুলছুট বাচ্চাদের পড়ানো আর স্কুলে পাঠানো, কিছু নিরক্ষর বাবা মাকে সান্ধ্য ক্লাসে পড়ানো | সীমা বাকি দুটি মেয়েকে সংগে নিয়ে মহিলাদের ফ্যামিলি প্লানিং, নিউট্রিশন আর পারসোনাল হাইজিনের ব্যাপারে কাউন্সিলিং করে | সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যে সাতটা | উল্টো ডাংগা, দত্তাবাদ, পার্কসার্কাস ঘুরে ঘুরে ওরা কাজ করছিল | পুলিশ আর পলিটকাল কানেকশন রেখে কাজ করে ওরা | তাই লোকাল মস্তানের ঝামেলা নেই |

সাত বছর হয়ে গেছে । সুজয় অফ টাইমে কয়একটি টিউশন ও করছে বেতনও আগের থেকে বেড়েছে | এই ২০১৬ তে মোট মাসে হাজার বারো কামাই হয় | বাড়িতে আট দেয় বাকি নিজে রাখে | বাড়ির লোকজনও খুশী |

অদিতি চারদিন ধরে আসছে না | ওর কোনো মোবাইলও নেই | বিবেকদা ডেকে বলল

- সুজয় তুই আদিতির কোনো খবর জানিস ?

- না বিবেকদা | একমাত্র পুর্বপরিচয় হেতু বিবেকদাকেই ও দাদা বলে, গ্রুপের নিয়ম ভেঙ্গে |

- ওর বাড়ি যাব ভাবছি ? তুই যাবি ?

- যেতে পারি কিন্তু আজ পার্ক সার্কাস এ প্রোগ্রাম ছিলো |

- ঠিক আছে রে বাবা ! ওরা একদিন সামলে নেবে |

বিবেকদার সংগে বেড়িয়ে পড়তে হল সুজয়কে | বনগাঁ লোকালে হাবরা ছাড়িয়ে চারটে স্টেশনের পর নেমে একটা রিক্সা নিলো ওরা | একটা সরু রাস্তার মুখে রিক্সাটা ছেড়ে দিয়ে সুজয়কে নিয়ে বিবেক এগিয়ে গেলো | একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল | কাঠা দেড়েক জায়গার ওপর ইটের দেয়ালে টালির ছাদের খুব ছোট একটা বাড়ি | সামনে আধখানা ঘেরা একচিলতে বারান্দা | সামনে জমিটুকুতে কটা ধনেপাতা মুলো আর পালং শাকের গাছ | বিবেকদা অদিতি অদিতি বলে ডাকল | দরজা খুলে সে বেড়িয়ে এলো | মলিন বসন তারচেয়েও মলিন চেহারা | অদিতি বলল

- মায়ের খুব জ্বর | কিছুই খাচ্ছে না |

- কবে থেকে ?

- দিন সাতেক হল | আগে বলিস নি কেন! ঘরে রাখা ঠিক হবে না | হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে |

অদিতি কিছু বলল না অধবদনে দাঁড়িয়ে রইল |

বিবেকদা আবার বলে উঠল

- পয়সা নিয়ে চিন্তা করিস না | আমি দেখছি |

গাড়ি জোগার করে হাবরার একটা হস্পিটালে ভর্তি করে সুজয়রা যখন শেয়ালদা ফিরল তখন ঘড়িতে রাত আটটা | বিবেকদা ব্যাস্ত হচ্ছিল | পারিবারিক ডাইরী ক্যালেন্ডারের ব্যবসাটা রাত আটটা থেকে দশটা ওকে দেখতে হয় | এর ডিসেম্বর মাস | কাজের প্রচন্ড চাপ আছে | তাছাড়া বছর দুয়েক বিয়েও করেছে ও সাংসারিক দায়িত্ব বেড়েছে | সুজয়েরও সন্ধ্যায় একটা টিউশন করা হলোনা | বাড়ি ফিরেও ওর মনটা ভার হয়ে থাকলেও | অদিতির কথা বারবার মনে পড়ছিল | মেয়েটা এতো মন দিয়ে অন্যের সেবা করে বস্তিতে বস্তিতে গিয়ে অথচ ওদের নিজের অবস্থা তারচেয়েও খারাপ | বিবেকদা কে জিজ্ঞেস করেছিল যে সংস্থার তরফ থেকে কিছু হেল্প করা যায় কিনা | বিবেকদা জানালো ওদের এরিয়া অর্থাৎ কলকাতার বাইরে সংস্থা কিছু করতে পারে না |

বিবেকদা এরমধ্যে কয়েকবার অদিতির বাড়ি গেছে | আরও সাতদিন পরে অদিতি জয়েন করলো | ওর মা এখন ভালো আছে | অদিতি আবার কাজে ডুবে গেলো | বিবেকদা ছাড়া ঝুমার সঙ্গে সুজয়ের পটে ভালো |

২২শে ডিসেম্বর ভোরে ফোনটা এল

- সুজয় চটপট তৈরী হয়ে নে অদিতির বাড়ি যেতে হবে | বিবেকদার গলা |

সুজয়ের মন কিছু বলছিল তবুও প্রশ্ন করল

- কি হল ?

- অদিতির মা আর নেই রে |

ওর যখন পৌঁছল আর কেউ আসেনি তখনও | আসেপাশের ঝুপড়ি বাড়ি গুলো থেকে কিছু লোক এসেছে | বিবেকদাকে দেখে অদিতি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো |

- বিবেক আমি কি নিয়ে বাঁচবো? আমার যে আর কেউ নেই | একাত্তরে বাবা যুদ্ধের সময় একা দেশ ছেড়েছিল | আমার তিনকুলে কেউ নেই এখানে .... অঝোরে কেঁদে চলেছে মেয়েটা |

- আমরা তো আছি | বিবেকদা সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছে.....

সংস্থার বাকি প্রায় সকলে এসে গেছে | শেষকৃত্যের জন্য সুজয়রা দেহটা নিয়ে বেড়িয়ে গেল |

শ্রাদ্ধের আয়োজন কালীঘাটে করা হল সবাই মিলে চাঁদাতুলে | শ্রাদ্ধ সেরে ফেরার সময় বিবেকদা বলল

- অদিতির সাঁইত্রিশ বছর বয়েস হয়ে গেলো | ওই কালো মেয়ের আর বিয়েও হবে বলে মনে হয় না | সুজয় দেখিস না কেউ যদি, তোর চেনাজানার মধ্যে থাকে।

সুজয় উত্তর দিল না | মনটা ভীষন তোলপাড় হচ্ছে ওর |

সেই দিন রাতে শুয়ে সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলল | ও অদিতিকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে | হোক না ওর চেয়ে সাত বছরের বড় | এছাড়া অদিতির পাশে দাড়ানোর অন্য কোনো রাস্তা নেই |

সকালে দাদাকে অফিস বেড়নোর আগে বলল

- দাদা আমি বিয়ে করব ভাবছি |

দাদা হাসির ছলে বলল

- ঠিক আছে, করে ফেল আমি ভোজ খেতে আসব | সুজয় আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। ওর দাদা বেড়িয়ে যেতে যেতে হাসতে হাসতে বলল

- রাতে কথা হবে

সারাদিন সুজয় দত্তাবাদে কাজে ব্যাস্ত ছিল | অদিতিও কাজে এসেছে খুব বিষন্ন দেখাচ্ছিল ওকে | রাতে খাবার টেবিলে কথাটা তুলল ওর দাদা

- বাবা শোনো, মা তুমিও, সুজয় বিয়ে করবে পাত্রী দেখো |

- পাত্রী আমার দেখা হয়ে গেছে |

সুজয় বলে উঠল | মা বলল

- পাত্রীটি কে ?

- আছে একজন, আমার সাথে কাজ করে | তবে মেয়েটা আমার চেয়ে সাত বছরের বড় | বাবা বলল

- কি বললি ? জানোয়ার কোথাকার | এ বাড়িতে এসব নস্টামি চলবেনা না

সুজয় খাবার ছেড়ে উঠে গেলো | পরদিন সকালেও কিছু না খেয়ে বেড়িয়ে গেল | বাড়ি থমথম করছে ।

অফিসে গিয়ে অদিতির আড়ালে সবাইকে জানিয়ে দিল কথাটা | বিবেকদা শুধু পিঠটা দুবার চাপড়ে দিয়ে চলে গেল | সবাই কাজ করছে একসাথে কিন্তু থমথমে পরিবেশ | বিকেলে ফেরার সময় সুজয় অদিতিকে ডাকলো

- অদিতি একটু কথা আছে তোমার সাথে |

- বল্

- বাড়িতে একা থাকছো?

- হুঁ

- ভয় লাগে না ?

- মানিয়ে নিতে হবে |

- অদিতি আমায় বিয়ে করবে?

অদিতি চমকে উঠল !

- কি বলছিস তুই ! পাগল হয়ে গেছিস !

সুজয় দৃঢ়ভাবে বলল আমি শুধু তোমার মত নিচ্ছি | আমি সিদ্ধান্ত আগেই নিয়েছি |

- না এ হয় না ! হতে পারে না | কথার মাঝে অদিতি একটা বাসকে হাত দেখিয়ে উঠে গেল | অবিরত একটা ঝড় বয়ে চলেছে সুজয়ের মনের মধ্যে ।

পরদিন সকালে ম্যাডামের ঘরে ডাক পড়ল সুজয়ের

- সুজয় কি সব শুনচি ?

মানে কথাটা ইনার কানে গেছে | সুজয় মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল |

- হ্যাঁ | ঠিকই শুনেছেন |

- আজ আমার রান্নার মেয়ে আসেনি | তা বলে আমি কিন্তু রান্না করি নি | স্যান্ডউইচ খেয়ে চলে এসেচি | কেন বলতো ?

- কেন? সুজয় হাল্কা ভাবে বলল

- কারণ সব কাজ সবাইকে মানায় না | যেমন এই বিয়েটা তোমায় মানাচ্চে না |

- কিন্তু আমি যে আমার সিদ্ধান্তটা বদলাবো না |

- তাহলে কাজটা বদলে নাও দিকি |

সুজয় কথা না বাড়িয়ে বেড়িয়ে গেল অফিস ছেড়ে |

বেলা তিনটে নাগাদ বিবেকদার ফোনটা এলো |

- তুই কোথায় ? কাজে আসিস নি ?

- আমি আর যাবো না |

- পাগলামি করিস না | সংস্থাটা অনেক কষ্টে দাঁড়িয়েছে | ভেঙ্গে ফেলিস না যেন | ম্যাডামকে আমি সামলাবো |

সুজয়ের আবেগে চোখে জল এসে গেলো | হঠাৎ খেয়াল হল অদিতির কথা |

- বিবেকদা অদিতি এসেছে?

- না রে | একবার যা ওর কাছে |

সুজয় যখন অদিতির বাড়ি পৌঁছল তখন সুর্য্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে | দরজা বন্ধ | সুজয় ডাকল

- অদিতি অদিতি

কোনো শব্দ নেই | সুজয় জোরে দরজার শেকলটা ধরে নাড়ালো

- অদিতি আমায় একটু আশ্রয় দেবে | প্লিজ | আমি সব ছেড়ে তোমার কাছে এসেছি .....

দরজাটা খুলে গেল | কেঁদে ওর চোখমুখ ফুলে গেছে | সুর্য্যাস্তের রক্তিম আলোতে কালো মেয়েটাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল সুজয়ের | সুজয় বলল

- কাছে ডাকবে না আমায় ?

অদিতি হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল । সুজয়ের হাত দুটোর ওপর মুখ রেখে অঝোরে কাঁদতে লাগলো...

— সমাপ্ত —

--------------------------------------------------

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.