#প্রশংসক

#গোবিন্দ উপাধ্যায় - মূল রচনাকার

#হিন্দি

#সুমনা_ভট্টাচার্য্য – অনুবাদক


কিছুদিন ধরে অনবরত বৃষ্টি হয়ে চলেছে । চারদিকে জল জমে গিয়েছে । এত বৃষ্টি তে মন উদাস হয়ে গিয়েছে । সকল বেলা যখন এক ফালি রোদ মাটিতে পড়েছিল মনটা পরিতৃপ্ত হয়ে গেল । সন্ধ্যে হতে হতে আবহাওয়া বেশ পরিষ্কার হয়ে গেছিল | ভাবছিলাম বউকে ফোন করে দেই | বেশ কিছুদিন হল কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়নি । তবে, খারাপ আবহাওয়ার কারণে কোথাও যাওয়া ও উপযুক্ত ছিল না। আমার মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত শূন্যতা ছিল| গত কয়েক সপ্তাহ কিছু পড়তে - লিখতে ইচ্ছা করেনি । অফিস থেকে বাড়ি ফিরে টিভির রিমোট নিয়েই বসে থাকি । কোনো চ্যানেলই দীর্ঘ সময়ের জন্য আমাকে বাঁধতে সক্ষম হয়নি । অনেক সময় মনে হয়েছিল যে একটি নতুন গল্পের উপর কাজ শুরু করি । কিন্তু আমি মনে গল্পের কোনও ছবি আঁকতে পারছিলাম না । আমার কোনো টেনশন ছিল না । স্বাস্থ্যের ও কোনো সমস্যা ছিল না । তবু মস্তিষ্ক মনোনিবেশ করতে সক্ষম হয়নি। মনে হল যেন একটু ঘুরে এলে মুড টা বদলে যাবে ।


বউ এর সঙ্গে কথা বলব বলে মোবাইল টা হাতে নিতেই ওটা বেজে উঠল । একটা নতুন নম্বর থেকে ফোন এসেছিল । মোবাইল-এ একটি পুরুষ কন্ঠ ছিল - ‘তুষার বাবু বলছেন ? আমি আপনার গল্প 'দর্দ ' পড়েছি । দারুন লেখেন আপনি, খুব ভালো লাগল …..আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই । আপনার সময় হবে?


আমার ভালো লাগল । কেউ আমার গল্পের প্রশংসা করছিল । কতজন লোক আর পরে এখন ? পড়ার পর এরকম আন্তরিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার লোক খুব বিরল । আমি উৎসাহী হয়ে উঠলাম - ' আরে আপনি যখন ইচ্ছে আসতে পারেন । আমি ৬ টার পর ফ্রি আছি ।’


' স্যার .. তাহলে আমরা আজই দেখা করি । আমি ৭ টা অব্দি আপনার ওখানে পৌঁছে যাবো । প্লিজ স্যার, বাড়ির লোকেশন টা বলুন ।’ মোবাইল এ আগন্তুক এর বিনীত কণ্ঠস্বর শোনা গেল ।


আমি ওনাকে আমার বাড়ির রাস্তা বোঝাতে লাগলাম । শেষে এটা বলতে ভুলে গেলাম - 'যদি কোনো অসুবিধে হয় তাহলে যেন ফোন করে নেয় ।'


আমি মোবাইল টা পকেটে রেখে দিলাম । এখন আর বউ এর সঙ্গে কথা বলার কোনো যৌক্তিকতা রইল না । বিকেল বেলায় ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা টা স্থগিত করতে হল । এই ধরনের পাঠক কোথায় পাওয়া যায়? জগতের ডামাডোলে লেখা- পড়া টা অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে | এরকম মানুষ আমি অনেক বছর পরে পাচ্ছি । এটা ভেবেই আমি উৎফল্লিত হয়ে পড়ছি । আগন্তুক আমার কাছে ভি আই পি র চেয়ে কম ছিল না ।


অফিস থেকে বাড়ি ফিরে, সবার আগে আমি আমার ঘরটাকে ভালো করে দেখি । জায়গা জায়গা থেকে প্লাস্টার খুলে খুলে পড়ছে । গত দুই বছর ধরে ঘরের রং ও করা হয়নি । সোফার কুশন গুলোর রং বিবর্ণ হয়ে গেছে । বিছানার চাদর টা ও খুব নোংরা ছিল | অনেক দিন পর বউ এর উপর খুব রাগ হচ্ছে - 'কত উদ্বেগহীন এই মহিলা | ' বউকে ঘর টা গোছাতে বললাম । ও আমার কথায় অবাক হল । ও অনেক প্রশ্ন নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল |


‘আরে আমার একজন ভক্ত আছে | আমার গল্প ওনার ভালো লাগে আর আজ উনি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন ।’ এটা বলতে বলতে আমার ঘাড় টা একটু বেশিই উঁচু হয়ে গেল । বউ কোনো সাড়া দিল না , কিন্তু বিদ্রুপ হাসি তার মুখে নাচ ছিল | আমি এখন কোনো ঝামেলা চাইছিলাম না । আমি পরিবেশে কোনো চাপা উত্তেজনা ও চাইছিলাম না ।আমি কিছু খাওয়ার জিনিস আনতে বাজারে গেলাম । বাড়ি ফিরে দেখলাম ঘর টা ঠিকঠাক ই লাগছে । ঘর টা যতটা গোছানো সম্ভব ছিল বউ গুছিয়ে দিয়েছে । ৭ টা বাজতেই যাচ্ছিল , আমার আগন্তুক প্রশংসক কখনো ও এসে পড়তে পারে । এখন শুধু আগন্তুক এর প্রতীক্ষা ছিল |


৭ টা বেজে ৩৫ মিনিটে ঘরের সামনে একটা স্কুটার এসে থামল । ওটার থেকে যে নামল সে ৫ ফুট লম্বা শ্যামলা রঙের গোলগাল মাঝ বয়েসী এক ব্যক্তি ছিল । আমি আর সময় নষ্ট না করে ওনার কাছে গেলাম । ততক্ষনে উনি ওনার স্কুটার দাঁড় করে ফেলে ছিলেন । আমি অভিবাদন করার জন্য নমস্কার করলাম । আগন্তুক আমাকে দেখে মৃদু হাসতে চাইছিল , কিন্তু মুখ পান মাসালা এ ভরে থাকার জন্য অসুবিধে হচ্ছিল । উনি সময় নষ্ট না করে মুখ টা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলেন - ফিচাক - ট্যাঙ্কার রুপি মুখ থেকে পান মাসালার পিক রাস্তায় ছড়িয়ে গেল । এখন উনি দাঁত বের করে হাসতে পারছিলেন । ঘরে এসেই আগন্তুক মহাশয় সোফা তে বসে পড়লেন ,' কি বলবো স্যার একটু কনফুসিওন হয়ে গেছিল । আমি ২ লেন পেছনে চলে গেছিলাম । 'এইচ ' আর ' যে' জন্য একটু দেরি হয়ে গেল । সরি আমার জন্য আপনাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ।'


উনি বিনম্রতার সঙ্গে বলেছিলেন , কিন্তু উনার চোখ ঘর টা কে ভালো করে দেখছিল । ঘরের আলো তে দেখলাম যে আগন্তুক এর ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি আছে । যার ৩/৪ ভাগ সাদা হয়ে গেছে । মাথার সামনের দিক টাও ফাঁকা হয়ে গেছে । টিউব লাইটের আলোয় উনার মুখে লাগা ধুলো পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল । আমার বউ এতক্ষণে জল আর মিষ্টির ট্রে এনে টেবিলে রেখে দিল । উনি কোনো লৌকিকতা না করে কয়েক টুকরো মিষ্টি দেখতে ই দেখতে উদরস্থ করে ফেললেন | জল খেয়ে খুব বাজে একটা ঢেকুর তুলতে তুলতে নিজের দাড়িতে হাত বোলাতে লাগলেন - ' তুষার বাবু আপনার সঙ্গে দেখা করার খুব ইচ্ছা ছিল । কিন্তু কি বলব আমার ট্রান্সফার সম্প্রতি অন্য শহর এ হয়েছে । ফ্যামিলি এখানে আর আমি এলাহাবাদে । রোজকার আপ এন্ড ডাউন এ সময় ই পাই না | সব কাজ পেন্ডিং হয়ে গেছে আর আপনার সঙ্গে দেখা ও করার ছিল । বাস এক সপ্তাহ ছুটি নিয়ে নিলাম । কাজ ও শেষ হয়ে গেল আর দেখুন আপনার সঙ্গে দেখা ও হয়ে গেল ।


আমি মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম । কেউ আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ছুটি ও নিতে পারে? আমি পাশে বসা আমার বউ এর দিকে দেখলাম । ও হাসল । এই বার ওর মুখে আমার আমার প্রতি একটা সম্মান দেখলাম । আমি গলা পরিষ্কার করে আগন্তুক কে বললাম , ' আপনি মনে হয়ে পড়তে খুব ভালো বাসেন? এটাই অনেক বড় ব্যাপার । পড়ার পরে লেখক কে নিজের প্রতিক্রিয়া দেওয়া ।’


' কোথায় আর সময় পাই স্যার ? ও তো যবে থেকে এলাহাবাদ গেছি। শহরে ফিরতে ৩ ঘণ্টা সময় কাটানো মুশকিল হয় । বাস ওই সময়টার সঠিক ব্যবহার করে নিই। আপনার গল্প টাও ওই সময় ই পড়েছিলাম ।’


আগন্তুক নিজের ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে পাশে রাখা পলিথিন ব্যাগ টা হাতাতে লাগল । আমি তখনই লক্ষ্য করলাম যে আগন্তুক নিজের সাথে ব্যাগ টা এনেছে । কালো রঙের ওই ব্যাগে হয়তো ওনার স্কুটার এর কাগজ আছে । আমি ওনার আঙ্গুল গুলো লক্ষ্য করলাম । ওনার চারটে আঙুলে বিভিন্ন ধরনের পাথর বসানো আংটি আছে।

চা এসে গিয়েছিল । আমার দুজনেই চা খেতে লাগলাম । আগন্তুক চা এ চুমুক দিয়ে আবার একটা কথা শুরু করল , ' আপনি চাকরি করেন? তাহলে লেখার জন্য সময় কি করে বার করেন ? লেখা মোটেও সহজ কাজ না । ওটার জন্য অনেক সময় চাই । অনেক মাথা খাটাতে হয় । একটা চিঠি লিখতেই আমার মাথা ঘুড়ে যায় । মোবাইল কে ধন্যবাদ চিঠি লেখা থেকে মুক্তি পেয়ে গেছি ।


আমি হাসতে লাগলাম । আমার এই স্থূলকায় প্রশংসক কে এখন ভাল লাগতে শুরু করেছে । আমি আগন্তুকের সম্বন্ধে এতক্ষনে অনেক কিছু জেনে গেছি । ওনার বউ এই শহরেই কোনো এক স্কুলে পড়ায়। এই জন্য এই শহরে পরিবার রাখা ছাড়া ওনার কোনো উপায় নেই । ওনার দুটো মেয়ে । একজন দিল্লির কোনো সংস্থা থেকে এম বি এ করছে । আর দ্বিতীয় জন এখনো ছোট । ক্লাস টেন এ পরে । উনি আজকাল উনার কাজে হাপিয়ে গেছেন । যেই বড় মেয়ে চাকরি পেয়ে যাবে উনি চাকরি থেকে ভি আর এস নিয়ে নেবেন । উনি অল্প বয়েসে কিছু নাটক এ পাট করেছেন । কিছু নাটক ডাইরেক্ট ও করেছেন । রিটায়ারমেন্ট এর পরে একটা নাটক এর দল বানাবেন । মানুষের নিজের জন্য ও কিছু করা উচিত । আপনি খুব ভাগ্যবান যে নিজের জন্য সময় বের করতে পারেন ।


আগন্তুক এসেছে আধা ঘন্টার বেশি হয়ে গেছে । আমি আমার প্রশংসা তে এতো বিভোর হয়ে গেছিলাম যে গত কিছু বছরে যা কিছু সাহিত্যিক উপলব্ধি হয়েছিল সব টেবিল এ এনে রেখে দিয়েছি । ওই সব পত্রিকা যেখানে আমার লেখা বেরিয়েছে আর তার সাথে প্রকাশিত আমার দুটো বই ও । আমার মনে হলো আগন্তুক এখন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছিল । উনি কিছু পত্রিকার পাতা 'এমনি ই' ওল্টাতে লাগলো । আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার লেখা প্রকাশিত হওয়া পত্রিকার পাতা গুলো বের করে দিতে লাগলাম । কিন্তু এই কাজ টা বেশিক্ষণ চলল না । উনি মোটামুটি সারেন্ডার করে পত্রিকার গুচ্ছ গুলো নিজের হাত দিয়ে চেপে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বললেন ,' অদ্ভুত স্যার, আপনি সত্যিই জিনিয়াস । আমার খুব গর্ব হচ্ছে যে আমি আপনার মতন একজন বিদ্বান ব্যক্তির সঙ্গে বসে আছি ।'


যদিও ওনার বলার ভঙ্গিমা তা খুব সুন্দর ছিল , কিন্তু এর নেপথ্যের ভাব ছিল যে ' এবার থামুন দাদা আর কত বিরক্ত করবেন ।'


আমার মনে হল যে হয়তো বেশি উৎসাহী হয়ে আমি একটু বেশি বেশিই করে ফেলেছি । এটা তো প্রথম সাক্ষাৎ ছিল । যে মানুষ টা ছুটি নিয়ে দেখা করতে এসেছে, সে পরে আবার নিশ্চই আসবে । বাকি গুলো পরে কখনো দেখাবো । দুটো বই ই উপেক্ষিত পরে রইল । আগন্তুক ও ওই বই গুলোর দিকে তাকাল না আর আমি ও ওই গুলি দেখানোর চেষ্টা করলাম না ।


রাত প্রায় ৯ টা বাজতে যাচ্ছিল । বউ রান্না করতে ব্যস্ত ছিল । উভয় শিশুরা একজন একজন করে দেখে দেখে চলে গেছিল । ওরা ওদের পছন্দের টি ভি সিরিয়েল দেখতে পারছে না । আগন্তুক ও এখন যাওয়ার মুডে ছিল । পরিবেশ টা উদাসীন হতে লাগল । আমি ওনাকে আরও এক কাপ চা এর জন্য বললাম । উনি বিনম্রতা সঙ্গে অপ্পত্তি জানাল । এখন উনার হাতে পলিথিন ব্যাগ টা এসে গেছিল । আমি ভাবলাম উনি যাওয়ার প্রস্তুতি করছেন , কিন্তু উনি গলা টা পরিষ্কার করে গম্ভীর ভাবে বললেন, 'স্যার আপনার কাছে একটা অনুরোধ ছিল । আমার অধ্যাপিকা পত্নী শখ করে বীমা পলিসির কাজ করে । এই ট্রান্সফার এর জন্য সব কিছু এত অগোছালো হয়ে গেছে যে ও ওর কোয়াটারলি টার্গেট পুরো করতে পারেনি । আমি ভাবলাম যে আপনার সঙ্গে যখন দেখা হবে তো আপনাকে অনুরোধ করে নেব।'


আগন্তুক কে এখন দক্ষ ব্যবসায়ী মনে হচ্ছিল । আমি এটার জন্য একটু ও প্রস্তুত ছিলাম না । তাহলে কি আমি আমার একটা সম্পূর্ণ বিকেল এক বীমা এজেন্ট এর জন্য নষ্ট করে দিলাম । তিনি আমার একটা গল্প পড়েছেন । পত্রিকা তে আমার মোবাইল নম্বর ও ছেপে ছিল । বাস উনি আমার প্রশংসক হয়ে চলে এসেছেন ।


আগন্তুক অনেক গুলো বীমা পরিকল্পনা সম্পর্কে বলছিলেন । অল্প সময়ের জন্য , লং টার্ম স্কিম, মানি ব্যাক পলিসি ... কিন্তু আমি তো ওনার ঠোঁটের গতিবিধি দেখছিলাম।



bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.