বাবা বলতেন – “তুমি অনন্যা! অনন্যসাধারণ!”

আর ওমনি মা চেঁচিয়ে উঠতেন – “হুঁ! আদিখ্যেতা দেখে আর বাঁচিনা! ওই তো গায়ের রঙ! কালো প্যাঁচার মত! সে আবার অনন্যা!”

বাবা সঙ্গে সঙ্গে বোঝাতেন – “অনন্যা শুধু রূপে হয় না মা! গুণে হয়! হ্যাঁ, আমি জানি তোমার রূপ নেই! কিন্তু গুণ তো আছে! সেই গুণগুলোকেই কাজে লাগাবে তুমি! ওই গুণের জোরেই তুমি অনন্যা হয়ে উঠবে একদিন!”

তখন ভয়ানক রাগ হত মায়ের ওপর কিন্তু এখন বোঝে যে মা নেহাতই ভয় পেয়ে কথাগুলো বলতেন। তিনি জানতেন এই দুনিয়া বড় কঠিন ঠাই! এখানে স্বপ্নের, ভাবালুতার কোনো জায়গাই নেই। রূঢ় বাস্তবের মাটিতে মেয়ে যদি আছড়ে পড়ে আঘাত পায়! তাই আগে থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করা। এইভাবেই সে বড় হয়েছে। বাবার প্রশ্রয়ে আর মায়ের কড়া শাসনে। তবে শেষমেশ মায়ের আশঙ্কাকে মিথ্যে প্রমাণ করে বাবার ভালোবাসাই জয় লাভ করেছে। আজ অনন্যা একটি মেয়েদের স্কুলের শিক্ষিকা। বাড়ি থেকে দূরে একা ভাড়া বাড়িতে থেকে সে চাকরি করে। না! জেদের বশে বা মাকে দেখানোর জন্য নয়, ভালোবেসে সে এই গ্রামের স্কুলটাতে এসেছে। প্রথম কয়েক মাস সে খুব আনন্দে কাটিয়েছে। কিন্তু এখন সে ভালো নেই।

আর দিন কুড়ি পরেই তাঁর স্কুলের পঁচিশ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান হবে। একটা সমিতি গঠন করা হয়েছিল সেই উপলক্ষ্যে। সমিতির প্রথম সভা ছিল দুমাস আগে। সেই সভায় অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা হল। ওই বিশেষ দিনে সকাল থেকে রাত অবধি কি কি অনুষ্ঠান হবে তার তালিকা তৈরি হল। ঠিক হল যে সন্ধ্যাবেলা একটি ছোট্ট অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিগত বছরের কৃতী ছাত্রীদের পুরস্কার দেওয়া হবে আর সেই সঙ্গে হবে খাওয়াদাওয়া, সকাল থেকে! সকালের জলখাবারে কড়াইশুঁটির কচুরি, আলুরদম হবে না কেক, কলা, ডিম? দুপুরের খাওয়ায় খাসির মাংস না মুরগী? রাতে ভাত না লুচি? সব কিছু নিয়ে প্রবল তর্কবিতর্ক হল। কিন্তু আসল কথা কেউই বলল না! ছাত্রীদের কথা! সভা ভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে দেখে অনন্যা সবথেকে নবীন হওয়ার দ্বিধা কাটিয়ে কথা বলতে বাধ্য হল। সে প্রস্তাব দিল ছাত্রীদের নিয়ে সন্ধ্যেবেলা একটা মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। কিন্তু সেই প্রস্তাব তাঁর সহকর্মীরাই কেউ সমর্থন করলেন না! একজন তো বলেই ফেললেন যে ওইসব অনুষ্ঠানের চক্করে পড়লে খাওয়াদাওয়ার বারোটা বেজে যাবে। এই অদ্ভুত যুক্তিতে অনন্যা স্তম্ভিত হয়ে বসেছিল। শেষে সমিতিতে উপস্থিত অভিভাবকরা অনন্যাকে সমর্থন করলেন। আর হয়তো সেটা দেখেই হয়তো সমিতির সভাপতি অনন্যাকে বললেন যে সে ঠিক কি কি করতে চায় তার একটা তালিকা বানিয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করতে।

সভাপতির কথা মতই অনন্যা তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী একটা তালিকা বানিয়ে সভাপতি ও বড়দি অর্থাৎ প্রধান শিক্ষিকার সাথে দেখা করল। তাঁরা অনন্যাকে অনুমতি দিলেন কিন্তু শর্তসাপেক্ষে। শর্ত এই যে অনুষ্ঠান এক ঘন্টা থেকে দেড় ঘন্টার মধ্যে শেষ হতে হবে এবং একমাস বাদে তাঁরা মেয়েদের উন্নতি দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন এই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে। অনন্যা তাতেই রাজি হয়ে গেল। কারণ এই স্কুলে আসার পর থেকে তাঁর যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তার ফলস্বরূপ সে জানে যে স্কুলে প্রতিভার অভাব নেই! অভাব শুধু সঠিক পথে পরিচালনা করার মত পরিচালকের। সে কাজ শুরু করল। এক সপ্তাহের মধ্যেই মোটামুটি বেশ কিছু মেয়ে পাওয়া গেল। তাঁদের নিয়ে অনন্যা শুরু করল তাঁর নৃত্যানুষ্ঠানের মহড়া। আর তাঁর এই অদম্য উৎসাহ ও পরিশ্রম দেখে তাঁর দুজন সহকর্মীও তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। পাঠের দায়িত্ব নিলেন কথাকলি দত্ত আর গান শেখানোর দায়িত্ব নিলেন সঙ্গীতা ঘোষাল। তাঁদের আন্তরিক সহায়তায় একমাস পরে ছাত্রীরা বড়দি ও সভাপতির পরীক্ষায় বেশ ভালভাবেই উত্তীর্ণ হল। অনন্যাও অনুষ্ঠানের ছাড়পত্র পেল। ফলত আরো কিছু সহকর্মী তাঁর সহমর্মী হয়ে উঠলেন। ভালোই চলছিল তাঁদের প্রস্তুতি।

কিন্তু রামায়ণ তো মন্থরাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ! অতএব এবার আসরে উপস্থিত হলেন মন্থরাবেশী অনুভাদি, অনন্যার স্কুলের সবথেকে বর্ষীয়ান শিক্ষিকা। প্রথম থেকেই তিনি অনেক ব্যঙ্গের তীর ছুঁড়েছেন অনন্যার দিকে। তাঁর দল ভাঙ্গাবার চেষ্টা করেছেন। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না দেখে বড়দিকে গিয়ে সচেতন করার চেষ্টাও করেছেন অনুষ্ঠানের ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ে। কিন্তু বড়দিও তাঁর কথায় বিশেষ কর্ণপাত করেননি। তবু যে তিনি হাল ছাড়েননি তাঁর প্রমাণ অনন্যা একদিন স্কুলে যেতেই টের পেল। ফার্স্ট পিরিয়ডের ক্লাস শেষ করে সবে টিচার্সরুমে ঢুকেছে অনন্যা, বড়দি তাঁকে ডেকে পাঠালেন। সে বড়দির ঘরে গিয়ে দেখল কিছু বাইরের লোক রয়েছেন। অবশ্য লোক না বলে ছেলে বলাই ভালো। ছেলেগুলোকে অনন্যা চেনে। তাঁর বাড়ি যাওয়ার পথে একটি চায়ের দোকানে বসে গুলতানি করাই এঁদের প্রধান কাজ। অনন্যা ছেলেগুলোকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে বড়দিকে জিজ্ঞাসা করল

-আমায় ডেকেছেন বড়দি?

-হ্যাঁ অনন্যা! এঁরা এসেছেন তোমার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ নিয়ে!

-অভিযোগ? আমার বিরুদ্ধে?

-হ্যাঁ! এঁরা বলছেন তুমি সংস্কৃতির নামে অশ্লীল নাচগান শেখাচ্ছ ছাত্রীদের। তাই এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এঁদের আপত্তি আছে।

-অশ্লীল নাচগান! কোনো প্রশ্নই ওঠে না বড়দি! প্রত্যেকটি গান রুচিসম্মত। আপনি নিজেও তো দেখেছেন!

-দেখেছি। আর সেকথা ওঁদের বলেওছি! তবু ওঁরা...

-দেকুন দিদি! ওসব আপনাদের সহরে চলে। এটা গেরাম তো! এখানকার গাঁ-ঘরের মেয়েরা এসব করে না!

-দেখুন! এমন কিচ্ছু ওদের দিয়ে করানো হচ্ছে না যার পরিপ্রেক্ষিতে আপনারা এসব কথা বলছেন। তবু আপনাদের যখন মনে হয়েছে তখন চলুন আমার সাথে। মেয়েদের নাচ, গান দেখে আপনারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিন যে সেটা অশ্লীল কিনা?

-কিস্যু দেখার দরকার নেই দিদি! হবে না মানে হবে না! এরপর কোনো কথা নেই! আমরা আসি!

ওরা চলে যাওয়ার পরে নীরবতা ভেঙে প্রথম কথা বলে উঠলেন বড়দি

-অনন্যা! দেখছ তো? এই জন্যই আমি আর কিছুতেই ছাত্রীদের উৎসাহ দিতে পারিনা। ভয় পাই!

-কিন্তু এভাবে কতদিন বড়দি? আর মাত্র কয়েকদিন বাকি! এখন যদি আমরা পিছিয়ে যাই তাহলে ওই মেয়েগুলোর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। তা আমি করতে পারব না বড়দি! হয় এই অনুষ্ঠান হবে নয়তো আমি চাকরি ছেড়ে দেব।

বড়দির ঘর থেকে বেরিয়ে অনন্যা সোজা মেয়েদের কাছে গিয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বলায় মেয়েরা তাঁকে জানাল যে তাঁরা তাঁদের দিদির সাথেই আছে। শুধু একটি মেয়ে, একাদশ শ্রেনীর ছাত্রী, যে অনন্যার নৃত্যানুষ্ঠানের প্রধান চরিত্র তাঁকে পাওয়াই গেল না। বাধ্য হয়ে অনন্যা সেদিনের মত মহড়া বন্ধ রাখল। কিন্তু তার পরের দিনও সেই ছাত্রী স্কুলে না আসায় অনন্যা চিন্তিত হয়ে পড়ল। সবার সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিল মেয়েটির বাড়ি যাওয়ার। কথাকলিদি এবং সঙ্গীতাদির সাথে সেখানে পৌঁছে দেখল অনুভাদি মেয়েটির বাড়িতে আগে থেকেই উপস্থিত আছেন। সে কোনোরকম ভনিতা না করে সোজা জানতে চাইল যে মেয়েটি স্কুলে যাচ্ছে না কেন? উত্তরে যা শুনল তাতে হতবাক হয়ে গেল অনন্যা ও তাঁর সহকর্মীরা। ওই মেয়েটির বিয়ে ঠিক হয়েছে সামনের মাসে এবং হবু বর ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন চায়না যে মেয়ে এইসব বেল্লেলাপনা করে বেড়াক! অনন্যারা অনেক চেষ্টা করল মেয়েটির বাড়ির সবাইকে বোঝাবার কিন্তু ভবি ভোলার নয়। তবে কথায় কথায় তাঁরা এটা জানিয়ে দিলেন যে তাঁরা অনুভা দিদিমণির কাছে কৃতজ্ঞ! কারণ দিদি বাড়ি বয়ে এসে জানিয়ে গেছেন যে স্কুলে অনুষ্ঠানের নামে কি কি অসভ্যতা হচ্ছে। আহত, অপমানিত অনন্যার বাড়ি ফেরার পথটা সেদিন অনন্তের পথ মনে হয়েছিল যা শেষই হতে চায় না!

কিন্তু সেতো অনন্যা! তাঁকে তো তাঁর বাবার দেখানো পথে হেঁটে অনন্যা হয়ে উঠতেই হবে। তীব্র যন্ত্রণায় সেদিন সারারাত ঘুমোতে পারল না সে! অনেক ভেবে পরের দিন স্কুলে গিয়ে সে প্রকাশ্যে জানিয়ে দিল যে এই অনুষ্ঠান আর হচ্ছে না! সহকর্মীদের পাশে থাকার আশ্বাস, ছাত্রীদের চোখের জল কিছুই যেন স্পর্শ করল না অনন্যাকে। উল্টে বড়দির কাছে গিয়ে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ছাত্রীদের নিয়ে স্কুল শেষ হওয়ার পরে টিউটোরিয়াল ক্লাসের আর্জি জানাল সে যাতে গত দুমাসের গাফিলতি পুষিয়ে নেওয়া যায়। নির্বিবাদে চলতে থাকল স্কুল।

ক্রমে ক্রমে সেই বিশেষ দিনটি এসে উপস্থিত হল। সকালে উঠেই বাড়িতে ফোন করল অনন্যা। আশীর্বাদ চাইল মা-বাবার কাছে যেন সে তাঁদের গর্ব হয়ে উঠতে পারে! তারপর নিজেকে প্রস্তুত করে স্কুলে উপস্থিত হল। একের পর এক খাওয়াদাওয়া, গল্প, হাসিঠাট্টার মধ্য দিয়ে অবশেষে সন্ধ্যে হল। শুরু হল অনুষ্ঠান। কিন্তু প্রধান অতিথি আর সভাপতির ভাষণ এবং কৃতীদের পুরস্কার প্রদান শেষ হতেই হঠাৎ মঞ্চের সব আলো নিভে গেল। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর যখন সবাই অস্থির হয়ে উঠেছে এমন সময় মাইকে ঘোষণা হল –

“এবার আমরা শুরু করছি আমাদের নৃত্যানুষ্ঠান – বাঁধ ভেঙে দাও! পরিকল্পনা, পরিচালনা এবং নৃত্যানুষ্ঠানের মুখ্য ভূমিকায় অনন্যা বসু! পাঠে কথাকলি দত্ত! গানে.........”

উপস্থিত সবার অভিনন্দন, ছাত্রীদের ভালোবাসা, সহকর্মীদের উচ্ছ্বাস সমস্ত সামলে যখন প্রায় রাত দশটা নাগাদ বাড়ির দিকে রওনা হল অনন্যা তখন তাঁকে পৌঁছে দিতে এসে ওই চায়ের দোকানে গুলতানি করা ছেলেগুলো আর্জি জানিয়ে গেল

– “দিদি! বলচি কি আপনি ওদের নিয়ে পেক্টিসটা চালিয়ে যান! সামনেই তো সরসতী পুজো! এবার কেলাবে ফানশান আপনাদের অনুস্টান দিয়েই শুরু হবে।”

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.