হতভাগী

হতভাগী

এতদিন পরে এলে নিতে? মুখে এক ফোঁটা জল দেবারও দিলে না কাউকে ? ওইপারের দূতকে এটাই হয়ত বলেছিল সেনদিদা । আমি খুব ছোট থেকেই একজন বয়স্ক দিদাকে দেখতাম যে আমাদের পুকুরে স্নান করতে আসত । বেশ বয়স্ক ছিলো মহিলা ,চুলগুলো সব সাদা, গায়ের রঙ কালো,সবসময় সাদা শাড়ী পড়ত, চোখ দুটো কোঠরে ঢুকে যাওয়া , উচ্চতা পাঁচ ফুট হবে । ওই দিদাকে আমরা সেন দিদা বলতাম । আমাদের পাড়াতেই থাকতো সে । যেখানে থাকতো সেটাকে ঘর বলা চলে না, কারণ সেটা মানুষ বসবাসের যোগ্য ছিলো না । একটা মজা পুকুরের পাশে একখানা মাটির ঝুপড়ি, খড়ের চাল । একটু বৃষ্টি হলেই সেই ঝুপড়ির মধ্যে জল ঢুকে যায় । এমনই জায়গায় থাকতো সেন দিদা ।

মায়ের মুখে সেন দিদার যেটুকু গল্প শুনেছি তা হলো সেন দিদা ছিলো এক মধ্যবিত্ত বাড়ির বউ । সুখেই থাকতো শ্বশুর বাড়িতে । তার দুটো ছেলেও ছিলো । হাসি খুশিতে দিন কাটতো । কিন্তু সুখ বেশী দিন সহ্য হলো না । কপাল পুড়ল । তার স্বামী মারা গেলো । সবাই বলেছিল সে নাকি অপয়া । শ্বশুর বাড়ী থেকে বার করে দিল হতভাগীকে ,একাকে । বাপের বাড়ির কেউ নেই । কোথায় যাবে সে হতভাগী?

সেন দিদা ভেঙে পড়েনি । আত্মহতা সে করতে যায়নি । সে এক কঠিন মানসিকতার মানুষ, জীবন যুদ্ধে একা লড়াই করবার মনের জোর তার ছিলো । যেই জিনিসগুলো তার ইচ্ছা মতো হবার নয় সেইগুলোর জন্য সে কিকরতে পারে? কষ্ট তো আছেই তবু বাঁচতে হবে । একার জন্য হলেও বাঁচাতে হবে । এ জীবন সবাই পায় না, তার স্বামীও পায়নি । সে পেয়েছে তাকে থাকতে হবে ।

প্রত্যেক সমস্যারই সমাধান আছে । সেন দিদার সমস্যারও তাড়াতাড়ি সমাধান হল । এক ব্যক্তি শহরে চাকরি করতে যাবে কিন্তু বাড়ির দেখাশুনার লোক পাচ্ছিল না । সেন দিদাকে দেখে তার খুব কষ্ট হয়েছিলো তাই সেন দিদাকে দেখাশুনা করতে দিয়ে গেছিলো । ওই ঘরেই তার একটা একটা করে সব চুল সাদা হয়েছে । লোকের ঘরে কাজ করে তার দিন চলতো । ঠিকই চলছিলো সব । কিছু বছর পর বাড়ির মালিক সেই বাড়ী বিক্রি করে দিয়েছিল আর সেন দিদার জন্য ওই মাটির ঝুপরিটা বানিয়ে দিয়েছিলো ।

সেন দিদার ছেলেরা তার সাথে কোনদিন দেখা করতে আসেনি । তাদেরকে হয়তো কিছু ভুল বোঝানো হয়েছিল বা অন্য কিছু । সেন দিদা কিছুবার চেষ্টা করেছিল ছেলেদের সাথে দেখা করতে কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিল । খুব কষ্ট হতো তার । একাকিকত্ব টা যেন গিলে খেতে আসতো । কিন্তু বাস্তবকে মেনে নিতেই হবে । আমাদের সবার অস্তিত্বই একা । সময়ের সাথে সাথে মানুষজন আসে আবার দূরে চলে যায় । একা এসেছি একা যেতে হবে ।

বেশ কিছুদিন ধরেই সেন দিদার শরীরটা খারাপ । বয়স প্রায় আশি ছুঁয়েছে । এখন আর লোকের বাড়িতে কাজ করতে পারেনা । পাড়ার লোকজন কিছু চাল ডাল দিয়ে যায় আর সেগুলো একদিন রান্না করে তিন দিন খায় সেন দিদা । কীইবা করবে শরীর যে বয় না প্রতিদিন । যত দিন যেতে লাগল শরীর ততই খারাপ হতে লাগল । ময়লা একটা কাপড় পড়ে শুয়ে থাকতো । কেউ দিয়ে গেলে খেতো না হলে নয় ।

একরাতে আকাশ মেঘে ঢেকে গেলো । চারিদিকে ঘোর কালো অন্ধকার । প্রচুর ঝড় উঠ ল । পুকুর পারের সেই ঝুপড়িতে সেন দিদা একা । বাইরে ঝ ড় বাড়তে লাগল ,মেঘ জোরে জোরে হুঙ্কার দিচ্ছে । এদিকে ঝুপড়ির ভিতরে সেন দিদার শরীরটা কেমন যেন আকুপাকু করছে । বুকে খুব যন্ত্রণা করছে ,মাথাটাও খুব ঘুরছে ,তেষ্টায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে । মনে হতে লাগল যেন আকাশ ভরা বৃষ্টি ঝুপড়ির চাল ছিন্ন করে এসে তার গলায় পড়ুক । কিন্তু তা হচ্ছে না । একদিকে ঝ ড় বাড়ছে অন্যদিকে বাড়ছে সেন বুড়ির তেষ্টা । এক ফোঁটা জল । এক ফোঁটা জল শুধু চায় সে । মাথার কাছে রাখা ঘটিতে এক ফোঁটা জল নেই । দরজার কাছে বসানো কলসিতে জল আছে । সেই কলসি যেন তাকে ডাকতে লাগলো । আয় হতভাগী আয় ।

খাটিয়া থেকে কলসির দূরত্ব তিনহাতের বেশী হবে না তবুও এ দূরত্ব তার কাছে অনেক । কিন্তু এক ফোঁটা জল না পেলে যে হবে না । তার শরীর মন সবটা চাইছে এক ফোঁটা হলেও জল দিয়ে তার তৃষ্ণা মেটাতে । সারা জীবনের তৃষ্ণা মেটাতে । খাটিয়া থেকে পড়ে বুক ঘসে ঘসে এগিয়ে গেলো কিছুটা । আর একটু ,আর একটু গেলেই কলসি । কিন্তু বুড়ি যে আর পারছে না তার শরীরটা টানতে, আর না । শরীরের উপর তার যেন আর কোন জোর নেই । থাক শরীর । বেরিয়ে এলো শরীর ছেড়ে । শরীর পড়ে রইল কলসির একহাত দূরে । মুক্ত হলো সে । আকাশ ভেঙে জল নামল আর সেই জলে সমস্ত তৃষ্ণা তৃপ্ত হলো । চলে গেলো চিরশান্তির দেশে । সব লড়াই শেষ হলো ,এবার শুধু শান্তি ।

পরের দিন সকালে দেখে ছিলাম কলসি থেকে কিছু দূরে পড়ে আছে সেন দিদার শরীরটা । দরজা ভেঙে বের করেছিল সবাই শরীরটাকে । খুব কেঁদেছিলাম তখন । প্রায় আট বছর হয়ে গেলো সে নেই তবুও ভুলতে পারি না তাকে । বড়ো হবার পর তার একাকীকত্বের যন্ত্রণা উপলব্ধি করতে পারি অনেক বেশি । সেন দিদার একাকীকত্বকে আজ খুব ভয় লাগে । স্মৃতিতে বেঁচে থাকুক সেন দিদা ,মরে যাক হতভাগীর একাকীকত্ব ।

***************************************************

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.