জঙ্গলের ধারের ভাঙা বাড়িটা পটাই, শিবেনদের কাছে যেন স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে। ওই দিকের রাস্তা দিয়ে টাউন থেকে গ্রামে ফেরার শর্টকার্ট রাস্তাটা সন্ধ্যের পর আর কেউ ব্যবহার করেনা। কি ছেলে, কি মেয়ে,সবাই ভয় পায়। পটাইদের দৌরাত্য দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ সব করতে পারে ওরা। ওইতো পুঁটি পাগলিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো দিন পাঁচেক ধরে, সবাই ভাবলো কে জানে অন্য গাঁয়ে চলে গেছে বোধ হয়। তারপর ওই জঙ্গলের ধারের পুকুরে ওর উলঙ্গ লাশ ভেসে ওঠে একদিন। গাঁয়ের কারুর বুঝতে বাকি রইল না এটা শিবেন,পটাইদেরই কান্ড। আসলে শিবেন হলো গাঁয়ের নেতার ভাগ্নে, লাটের বাট ও। যা পারে করে। এই পুঁটি এককালে শিবেনদের ঘরে কাজ করতো, তারপর হটাৎই পুঁটিরানীর হাবেভাবে সে কি বদল , যেন পটাইয়ের বৌ ও। গরিব গ্রামের মেয়ে বৌদের এতো বার ভালো লাগেনি। মাস চারেক যেতেনা যেতেই সব কেমন বদল গেলো, পুঁটির কোনো পাত্তাই নেই, হঠাৎ যেন কর্পূরের মত উবে গেল মেয়েটা। সে বেচারির মা-বাপে শিবেনদের বাড়ি হত্যে দিয়ে পরে থাকে দিনের পর দিন। গায়ের মা বৌরা মুখ বেঁকিয়ে হাসে। আসলে কানাভুসো রটে গেছে তো পুঁটির পেটে বাচ্ছা এসেছে। তারপরেই সে মেয়ে গায়েব। যদিও শিবেন বুক ফুঁলিয়ে ঘুরে বেড়ায় একই ভাবে। তবে এরপর যা হলো তা বোধহয় কেউ ভাবেনি, গাঁয়ের যে সব মেয়ে বৌরা মুখ বেঁকিয়ে হেসেছিল ভয় পেল তারাও। পুঁটি শেষে ফেরত এলো, চোখমুখ গর্তে বসা, কঙ্কালের মতো রোগা, বাড়ি থেকে বেরোয়না, কথা বলেনা, ঠিক করে খায়ও না। মেয়েটা শেষে এতটাই উন্মাদ হয়ে গেল যে ওর বাবা মাও আর সামলাতে পারেনা মেয়েটাকে। এপাড়া সেপাড়া চষে বেড়ায় সারাদিন আর বিড়বিড় করে বকে হাসে, আর মাঝেমাঝে পেটটাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে,'কোথায় গেলিরে সোনা' বলে। সন্ধ্যে নাগাদ সে মেয়েকে তার মা টানতে টানতে ঘরে নিয়ে যায়, তারপর দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে।


'শিবু দা, পুঁটিরানীর চেহারাখানা কিন্তু দিনকে দিন বেশ ডাগর হয়ে উঠছে আবার', বলল ভগা। মুরগির একটা ঠ্যাং চাবাতে চাবাতে শিবেন ঘাড় নাড়লো,'আসলে শিবেন সাহা কখনো যাতা মেয়ের দিকে তাকায়না বুঝলি। গ্রামে তো এতো মেয়েই আছে আমার নজর শুধু ছিল পুটু রানির দিকেই, কিন্তু মেয়েটা যে আমায় ঝোলাবে বুঝিনি'। চিকু এর মধ্যে আবদার করে উঠলো,'ওহ শিবু দা তুমিতো ফল খেয়েছো এবার আমাদের একটু প্রসাদ চাখতে দেবেনা?' মুরগির ঠ্যাংটা দাঁতের চাপে গুঁড়ো করতে করতে বলল শিবেন,'তা প্রসাদ খাবি তো খা, সামনেই ইলেক্শনটা শেষ হোক, নয়তো মামা আমায় ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দেবে।'কিন্তু শিবেনের চার চেলা ভগা, চিকু, পটাই আর তোতনএর সমবেত আবদারে হার মানলো শিবেন। জৈষ্ঠ্যের কাঠফাটা রোদে তাই পাঁচমুর্তি একদিন চলে এলো তাদের জঙ্গলের ধারের ভাঙা বাড়িটায়। দুপুরের তাপে কেউ কোথাও নেই, শুধু আপন মনে জঙ্গলের পাশে খেলে বেড়াচ্ছে পুঁটি। তাকে মাংসের লোভ দেখিয়ে ভাঙা বাড়িতে তুলে আনে চিকু আর পটাই। এরপর উত্তাল শরীর খেলার পরে পুটি বিধ্বস্ত হয়েও চিৎকার করতে লাগলো 'শিবেন, আমি তোমায় ছাড়বোনা, কিছুতে ছাড়বোনা'। প্রমাদ গুনল শিবেন, 'এক্ষুনি মেরে দে শালীকে'।


শিবেনরা আর সে দিন থেকেই জঙ্গল বাড়ির দিকে পা বাড়ায়নি। আর বাড়াবেই বা কি করে। ভোটের কাজ, বড্ড ব্যস্ত যে ওরা। দিন পাঁচেক বাদে যখন লাশ ভেসে উঠলো পাঁচ জনই বুক ফুলিয়ে অস্বীকার করলো। গায়ের লোক বুঝলেও কিছু বলেনা। শিবেনের মামা জানায় সেদিন তো সারাদিনই ওরা দেওয়াল লিখন, পোস্টার মারার কাজ করেছে। দেখতে দেখতে ভোট শেষ, এতদিন ওরা কেউ জঙ্গল বাড়ি দূরে থাক ঘরে যাওয়ার সময় ও পায়নি। এবার ভোট শেষ, আজ খুব মজা হবে । চিকু ও ভগা চটপট সন্ধ্যে নাগাদ হাজির হয় জঙ্গল বাড়িতে ।ঝাড়পোঁছ করবে এখন ওরা।অমাবস্যার রাতে অন্ধকার বেশ তাড়াতাড়ি নেমে পড়েছে । সদর দরজাটা খুলতেই এক রাশ কালো অন্ধকার আর তীব্র পচা গন্ধ ঝাঁপি পড়লো ওদের উপর । হাতড়ে হাতড়ে কোনোরকমে লাইটটা জ্বালতে গিয়ে চিকু দেখলো বাল্বটা জ্বলছেনা । একটা বাজে গালাগাল দিয়ে বলে উঠলো,' কিসের গন্ধরে ভগা? মুখেভাতের ভাত উঠে আসে... য়েহে' ।ভগা পকেট থেকে লাইটার জ্বাললো , যদিও ওই তীব্র অন্ধকার যেন কিছুতেই ওই নরম শিখাতে কাটছেনা, প্রায় অন্ধকার ই রইলো । করিডোর পেরিয়ে ঘরের কাছে যেতেই গন্ধটা যেন আরো বেশি ঝাপটা মারতে লাগলো । দুজনেরই একটা কেমন অন্যরকম অস্বস্তি হচ্ছিলো যা এতবছর ধরে এই চেনা বাড়িতে এসে কোনোদিন হয়নি । ভগা বলল,' হ্যা র চিকু কোনো মোষ টোস মরেছে নাকি রে? ইঁদুর মরলে এত্ত গন্ধ হয়নাতো । লাইটারটা আবার নিবে গেলো । কেমন একটা দমবন্ধ করা পরিবেশ । চিকু ঘেন্নায় মুখ বেকিয়ে কোনোরকমে 'যাহ তেরিকা ' বলে ওই নিশ্চিদ্র অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে লাইট জ্বালতে গেল । হঠাৎ নরম বস্তার মত কিছুতে একটা আছাড় খেয়ে পড়ে যায় ।এরপর ই গগনবিদারী এক চিৎকার করে ওঠে ও । তারসাথে একটা ফ্যার ফ্যার করে কিছু চিরে ফেলার আওয়াজ আর সব শেষ । ভগা কয়েকমুহূর্তের জন্য বুঝে উঠতে পারলোনা এই কয়েক সেকেন্ডে এই তীব্র অন্ধকার আসলে কি ঘটে গেল । শুধু বুঝলো ওর শিরদাঁড়া বেয়ে এক অদ্ভুত কারেন্ট খেলে যাচ্ছে । কোনোরকমে লাইটারটা জ্বললো আবার, এরপর ঠিক যা ওহ দেখলো তাতে দশ বারোটা খুন করা শক্ত হৃদয়ও আর চলার শক্তি পেলোনা, অতএব সেখানেই সে তার ধুকপুকানি থামিয়ে দিলো ।


শিবেনের হাত-পা টেনশনে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে । কোনো ভাবেই চিকু আর ভগাকে ফোন করে পাওয়া যাচ্ছেনা । ওরা ঠিক আছে তো? এদিকে যে ভয়ঙ্কর কান্ড ঘটে গেছে । পটাইয়ের বীভৎস মৃতদেহ নতুন রেললাইনের ধারে পরে আছে । ট্রেন তো এখনও চলেনা এইদিক দিয়ে, কিন্তু মানুষের পক্ষে এই নারকীয় হত্যা করা সম্ভব নয়, যেন বাঘ বা ওই জাতীয় জন্তু খুবলে খাবলে খেয়েছে ওকে । যদিও সবার নজর বিরোধী দলের দিকে তাও বোঝা যাচ্ছে সাধারণ কোনো খুনির পক্ষে এটা ঠিক সম্ভব নয় । ওদিকে আবার তোতন শেষ দুপুরে স্নান করছিলো তাদের বাড়ির লাগোয়া পুকুরে । অনেক্ষন বাদে তার বীভৎস মৃতদেহ ভেসে ওঠে পুকুরে । যেন পাঁচ দশদিনের বেশি মরা ।ফুলে ফেঁপে ঢোল হয়ে গেছে, সাথে তীব্র দুর্গন্ধ । শিবেন কাউকে কিছু না বললেও খুব ভয় পেয়েছে । মন চাইছে জঙ্গল বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেয় চিকু, ভগার । শুধু সাহসে কুলোচ্ছেনা । এবার কি তবে ওর পালা? পুঁটির বীভৎস মৃতদেহটা শুধু চোখের সামনে ভেসে উঠছে । কিছুতেই আর নিজেকে স্থির রাখতে পারছেনা ও। পুলিশও এসে গেছে এর মধ্যে। শিবেনের এই অস্বাভিক আচরণ তাদের নজরে ঠেকছে। কিছুকি লুকোতে চায় ও না বলতে চায়? শেষে পুলিশ জিজ্ঞেসাবাদ করার জন্য ওকেই তুলে নিয়ে যায় । শিবেনের আর কিছুতেই মাথা কাজ করছেনা । ওহ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে পুঁটির ফুলে ঢোল হওয়া মৃতদেহটির চোখে মুখে প্রতিহিংসা । এবার ওর পালা যে । শেষে কেঁদেই ফেলে শিবেন, 'আমরা যে নৃশংস ভাব পুটিকে খুন করেছি, এবার আমার পালা অফিসার, আমায় বাঁচান।'


পাঁচ বছর কেটে গেছে, বিরোধী দল ভোটে জিতে গাঁয়ের অনেক উন্নতি করেছে। বিশেষ করে ওই জঙ্গল বাড়িতা ডেমোলিশ হয়ে গেছে।জঙ্গল সাফ করে পার্ক করেছে। জঙ্গলের কাঁচা রাস্তা ভেঙে টাউনে যাওয়ার শর্টকার্ট রাস্তাটা পাকাও হয়ে গেছে। এখন আর লোকের একাএকা রাতের বেলাও ওই রাস্তা দিয়ে ফিরতে ভয় করেনা। শুধু ভয় একটাই । রাত বাড়ার সাথে সাথে শিবেন পাগলার বাড়ি থেকে ওর হাড় কাঁপানো চিৎকার ভেসে আসে,' না পুঁটি না, আমায় ক্ষমা কর, আমায় এবার একটু মুক্তি দে। হে ভগবান, আমায় বাকিদের মতন মেরে দাও, মুক্তি দাও।' ওর চিৎকারে ছোট শিশু থেকে বড় সবার বুক কেঁপে ওঠে। না পুঁটির ভয়ে না, লোকের ক্ষতি করার পরিণামের ভয়।







bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.