চুপ, একটু শোনো


এই বৃষ্টিতে গা-টা ম্যাজ ম্যাজ করছে। বৃষ্টি এককাপ চা দিবি – বলল সোহম।

~দিচ্ছি। এতক্ষণ বলতে পারলে না, দাদা কটা বাজে দেখেছ...আমার এখনও দু-বাড়ি কাজ হয়নি।

সোহম ফটোগ্রাফার। একা থাকে। বৃষ্টি এই ফ্ল্যাটেই রান্না করে। সোহমের ঠিক হাত পুড়িয়ে রান্নাটা আসে না।


চা দিয়ে বৃষ্টি হাসল। বাইরে কালো করে মেঘ জমেছে। বৃষ্টি হঠাৎ জানলার দিকে তাকালো। কাঁচের পাত্রে মানিপ্ল্যান্ট রেখেছিল গাছটা হাওয়াতে মাটিতে পরে গেছে। ইস্ একটু দেখতে তো পারো দাদা...কি করো...এত সুন্দর ফ্ল্যাটটা, গুছিয়ে তো রাখবে। দেখতে সুন্দর লাগে।

-তুই আছিস কী করতে? সব তুই ঠিক করে গুছিয়ে রাখবি। বলতে বলতে ক্যামেরা তুলে ফোকাস করতে লাগল বৃষ্টির দিকে। দাঁড়া নড়বি না। হ্যাঁ, হ্যাঁ ঐ দিকে তাকিয়েই একটু হাস।

~চুপ, একটু শোনো এদিকে এসো আমার ছবি তো রোজ তোলো...আর আমি এই রংচটা চুড়িদারে...ভাললাগে না আদ্যিখ্যেতা..ঐ দেখো দাদা বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে...তোলো তোলো...এদিকে আসো শিগরি...

সোহম তড়াক করে লাফিয়ে গেল ব্যালকনিতে...


~ছবিগুলো ভালো হয়েছে?

-কার তোর!

~মরণ, ঐ বাজ পরার সময়...সোহম মুখ ঘুরিয়ে হাসল...আসছি দাদাবাবু বলে গেট বন্ধ করে দিল। সোহমের মুখ জুড়ে বর্ষার কালো মেঘ নেমে এলো। সোহম বড় একা। তাই তারও প্রয়োজনীয়তা বেশ স্পষ্ট হচ্ছে।

সোহমের ছবি তোলার শখ। ছবি তোলার সাথে অভিনয়, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে শ্যুট করার নেশা অসীম। অতুলনীয়। অপূর্ব। কিন্তু এই শখ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে প্রেমে। সেই প্রেমকাহন এখন উপভোগ্য এক সময়...


(২)

সোহম ফোন করে বৃষ্টিকে। -আজ বিকেলটা অসাম লাগছে। চলে আয়। আর হ্যাঁ জিন্স পরবি কিন্তু...

~না ভালো নেই...কামিজ-সালোয়ার পরছি।

-বলেছি জিন্স।

~ভাল টপ নেই। কুর্তি আছে এমনি...তোমাদের মতো বড়লোকি কোনও জামাকাপড়ই নেই।

-ধুর তোর যা খুশি পর। আমি আজ তোর অনেক ছবি তুলব। আজ তোকে সিনেমা দ্যাখাবো। খুব মজা করব...পপকর্ণ খাবি তো।

~না, আমি তোমার মাথা খাবো...বো...বো বলে এত জোরে চ্যাঁচালো যে সোহমে কানে তালা ধরে গেল।


আজ বিকেলটা অনেক ঘুরেছে দু’জনে। হেঁটেছে। ফুঁচকাও খেয়েছে। শেষে পা ব্যথা করছে বলে ম্যাক্রোপলিস মল-এ ঢুকেছে। বৃষ্টি একটা ফুল দেওয়া নীল ফুল লংস্কার্ট পরেছে, উপড়ে সাদা টপ, খোলা চুল লাল লিপস্টিক...চোখে সরু করে আইলাইনার। সোহম কালো জিন্স আর কমলা পাঞ্জাবি।


টেবিলে বসেছে। সোহম বৃষ্টির পায়ে পা দিয়ে ঘষছে। দু’জনেই দু’জনের চোখের দিকে তাকিয়ে। খাবার অর্ডার দিয়েছে...ধোসা খাবে।

-সিনেমা দেখবি!

~না, তোমার দুষ্টুমিটা খুব বেড়েছে। কি চাও তুমি! হঠাৎ আমি কেন? আমি তো খারাপ চরিত্রের, তুমি কত ভালো ছেলে।

-আমি খুব খারাপ। তোকে আজ হালুম করে খেয়ে ফেলব।

~তুমি ঐ মণিকা দিদিমণিকে নিয়ে যখন বের হও, এমন করো না!

-তুই নিজেকে নিয়ে ভাব, আমায় নিয়ে ভাব। অন্য মেয়ের নাম নিচ্ছিস কেন... আমি অনেক কেঁদেছি এবার হাসব। তোর হাসি দেখব। নিঃস্বার্থ ভালোবাসা চাই বুঝলি। চুপ করে বাইরেটা দেখ, এত সুন্দর মুড বাইরেটা দেখ...কাঁচের ওদিকে সূর্য অস্ত যাচ্ছে।

~সত্যিই গো কি সুন্দর।


ওখান থেকে বেরোনোর পর কলকাতার অলিগলির প্রেম করতে করতে দু’জনে চলেছে।

-কি রে তোকে তোর ঝুড়ির ঘরে পৌঁছে দেবো!

~আবার তুমি এমন বলছ। দেখো আর তোমার সাথে বেরোবো না। যাও। কাল থেকে বৃষ্টি আর আসবে না কাজে বলে দিলাম। ফোন করলে সুউচ অফ করে দেবো।

-দিবি, আমি তোর ঘর চিনি, তোর ঘরে গিয়ে থাকব। তোর মা তো আমায় ভালইবাসে।

~দাদাবাবু...


(৩)

পরের দিন সকালে...

-সব চাকরি ছেড়ে দিবি বুঝলি। সব ফ্ল্যাটে বলে দিবি...আমি তোকে বিয়ে করছি।

~অসভ্য...এসব বলা যায় নাকি। এই কমপ্লেক্সে সবাই তোমাকে কি খারাপ ভাববে তা তুমি বুঝতে পারছো না...

-আমায় কেউ খাওয়াতে আসে! আমি নিজের চেষ্টায় রোজগার করি। আর তুই আমাকে যতটা বুঝিস কোনও মেয়ে বোঝে না। তুই জানিস আমি বদ চরিত্রের নই। মদ খেতে পারি কিন্তু অশ্লীল কিছু করি না। তোর কি আমার সাথে থাকতে অসুবিধা আছে? আমি এখন তোর দায়িত্ব নিতে পারব।

বৃষ্টি সোহমকে জড়িয়ে ধরে...অনেকক্ষণ একে অপরকে আদর করতে করতে বৃষ্টি কাঁদে...

~কি বলছ এসব! আমি তো চাইনি যে তুমি আমায় দয়া করো। আমি তোমার যোগ্য না।

-লিসেন, আমি তোর যোগ্য না। তুই খাঁটি সোনা। তোর মতো মনের মেয়ে আজকালকার দিনে পাওয়া মুশকিল। সব ঠকবাজ। আমি ফটোর লাইনে কম মেয়ে তো দেখিনি। অনেকদিন এই লাইনে ঘষটেছি। তুই সৎ। আর তুই আমার পুরো খেয়াল রাখিস। তোকে ছাড়া আমি এই একা জীবনে সুখী হবো না।

~তুমি ভেবে দেখো আমার যোগ...

-চুপ। যোগ্যতা তোর অনেক বেশি। তাই তো আমি তোকে চাই। হঠাৎ করে আমি তোকে ভালবাসছি ভাবিস না। আমি তোকে অনেকদিন ধরেই ভালবাসি। আর তুইও বাসিস। বুঝলি। তুই আমার জন্য চিন্তা করিস কিনা বল! আর তুই আমার যোগ্য হয়ে উঠবি। আমি টাকা, ঘর, ভাষা দেখে মানুষ বিচার করি না। আমি মনের দিকে তাকাতে জানি। আমার কাছে মানুষ আসল।

~হ্যাঁ, ভাবি তো তোমার কথা। তুমি তো আমার সিনেমার নায়ক।

-আয়ে, কাছে এসো আমার নায়িকা হও সোনা...কি হল ভয় পাছিস কেন? আমি তোমায় সোনা বলব...পাগলি।

~তুমি জিনিষটা বোঝার চেষ্টা করো...থামিয়ে দিল সোহম, বৃষ্টির ঠোঁটের উপর আঙুল দিয়ে আলতো স্পর্শ করল। বৃষ্টি স্পন্দিত হল...

-চুপ করে অনন্ত সুখে ভেসে চলো, অনুভব করো, ভুলে যাও আমি কে, তুমি কে...ভাবো আমরা কি। অনুরণন আসুক... চোখের পলকে, চিবুকে, গালে চুমুর শব্দ হতে থাকে...গড়িয়ে যাওয়া ঘামে ধুয়ে যায় সমস্ত গ্লানি

তখন বাইরে খুব জোড়ে বৃষ্টি ও বাজের শব্দ হচ্ছে...



bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.