নীতা, কত বছর পর তোমাকে দেখলাম বলো তো? তা প্রায় সতেরো বছর তো হবেই। আরো সুন্দরী হয়েছো! শরীরটা আগের চেয়ে অনেকটা ভারি! রঙটা যেন ফেটে পড়ছে তোমার! চোখ দুটো তেমনি স্নিগ্ধ আছে! আর হাসিটা! এখনো বুকে দোলা দেওয়ার মত! তাও আড়াল থেকে চোখের কোণ দিয়ে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখেছি তোমাকে! সরাসরি তাকাতে ভয় হয়েছিল। হ্যাঁ, আজো আমি সমালোচনাকে এড়িয়ে চলি! তোমাকে হাঁ করে দেখছি- পাছে এই ব্যাপারটা কারো চোখে পড়ে যায়! অথবা ইন্দ্রাণী যদি দেখে সব বুঝে যায়! তাহলে তো অশান্তির চূড়ান্ত হবে!

জানি, তুমি জানলে বলবে ভীতুর ডিম কোথাকার! এই সমালোচনার ভয়েই তো এত বছর এই দিকে পা মাড়াই নি। বড় মাসি বার বার বলেও আমাকে জলপাইগুড়ি আনতে পারেনি। এখন মাসির বয়স হয়েছে, সেদিন বুবুনকে দেখার জন্য ফোনে খুব কান্নাকাটি করছিলেন। তাছাড়া ইন্দ্রাণীকে সেই বিয়ের সময় দেখেছেন। তাই ভাবলাম একবার যাই ইন্দ্রাণী আর বুবুনকে নিয়ে ঘুরেই আসি। কিন্তু বিশ্বাস করো, ভাবিনি তোমার সাথে দেখা হয়ে যাবে! অবশ্য ভাববো নাই বা কেন? তুমি হলে গিয়ে বড় মাসির সেজো ননদের ভাসুরের মেয়ে। কাজেই বড় মাসির নাতির অন্নপ্রাশনে অবশ্যই নিমন্ত্রিত হবে তুমি।

বড় মাসির বড়ছেলের পৈতের সময় যখন এসেছিলাম, তখন তোমার সাথে প্রথম দেখা। তোমার আঠারো, আমার বাইশ। প্রথম দেখাতেই কি যে হল দুজনার, দুজনাই একসাথে সর্বনাশের পথে পা বাড়ালাম! অনুষ্ঠান বাড়িতে সকলের অগোচরে সেকি পাগলামো আমাদের! একদিন তো বাজার থেকে আসছি বলে দুজনাতে করলা নদীর ধারে চলে গেলাম। অনেকক্ষণ নদীর পারে, নৌকোর ওপর সময় কাটিয়ে তারপর যখন বাড়ি ফিরলাম, প্রচণ্ড বকুনি খেয়েছিলাম। আর সেদিনই তোমার মায়ের চোখে সন্দেহের ছায়া ঘনীভূত হয়!

সে সময় তো ঘরে ঘরে টেলিফোন, মোবাইল ছিল না। চিঠিই ছিল সম্বল। তা চিঠি দেবো কি করে? তুমি তোমার বান্ধবীর দাদার অফিসের ঠিকানা দিয়েছিলে। আর আমি আমার হোস্টেলের। তখন আমি বর্ধমানে এম,এ পড়ছি। তুমি তখন বি,এ ফার্স্ট ইয়ার। যেদিন তোমার চিঠি আসতো, আনন্দে পাগল হয়ে যেতাম! কি ঝকঝকে মুক্তোর মত তোমার হাতের লেখা! কত বড় চিঠি আর কত সুন্দর করে ভালোবাসার কথা লিখতে তুমি! কতবার যে পড়তাম সেই চিঠি! আমি তোমার মত পারতাম না অত সুন্দর করে আবেগ দিয়ে লিখতে। সেজন্য তোমার অভিমান হত!

তারপর একদিন তোমার সম্বন্ধ এলো। তুমি আমাকে ছাড়া আর কাউকে তোমার জীবন সাথি হিসেবে মেনে নিতে পারবে না তাই একদিন রাতে কাউকে কিছু না জানিয়ে ঘর ছাড়লে। আমার কাছে পালিয়ে আসবে বলে তুমি স্টেশনে এসে এক কোনে চুপটি করে ট্রেনের অপেক্ষা করতে লাগলে। কিন্তু বিধাতা বুঝি চায় না আমাদের মিলন হোক। স্টেশন মাস্টার কি করে তোমাকে দেখে ফেললেন। তিনি তোমার বাবার বন্ধু। তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তাঁর অফিস রুমে বসিয়ে গোপনে বাবাকে খবর পাঠান। তোমার বাবা এসে তোমাকে সেখান থেকে বাড়ি নিয়ে যান।

পরে বড় মাসির কাছে জেনেছিলাম, তুমি তিনদিন নাওয়া খাওয়া ছেড়ে ঘরে দোর দিয়ে আছাড়ি পিছাড়ি কেঁদেছিলে আমার জন্য। পাড়াতে, আত্মীয় স্বজনের কাছে তোমার বদনাম রটল। তোমার সম্বন্ধ ভেঙে গেল! তুমি শান্ত হয়ে সব সইলে! তোমার বাবা আমার বাবাকে একখানা কড়া চিঠি লিখলেন যেন আমি তাঁর মেয়ের সাথে কোন যোগাযোগ না রাখি। তুমি আমার জন্য গৃহত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে! সবার সমালোচনা মুখ বুজে হজম করেছিলে! অথচ আমি এক আহাম্মক, সমালোচনার ভয়ে বাবার এক ধমকেই চুপসে গেলাম!

অথচ আমি তো পুরুষ! আমারও উচিত ছিল ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কিছু অন্তত করা। কিন্তু আমি সেসব কিছুই করিনি। কিন্তু বিশ্বাস করো নীতা আমিও খুব কষ্ট পেয়েছি! হয়তো প্রকাশ করিনি। আর তাই তো অনেক দিন পর্যন্ত একলা রাতে, অথবা কোন বৃষ্টিস্নাত দিনে তোমার মুখটা মনে পড়লে পাগলের মত লাগতো!

তারপর আর আমাদের যোগাযোগ ছিল না। বড় মাসির বাড়ি যাওয়াও ঘুচল আমার। সময়ের গতিতে একদিন সব ভুলে গেলাম। পড়াশুনা শেষে ভাল চাকরি পেলাম। ইন্দ্রানীকে ভালবেসেই বিয়ে করলাম। হ্যাঁ, ভালোবেসেই। ইন্দ্রাণী খুব ভাল মেয়ে। আমাকে ভালই রেখেছে। এত বছর তোমাকে ভুলেই ছিলাম।

কিন্তু বড়মাসির নাতির অন্নপ্রাশনে এসে তোমাকে আবার দেখে ভীষণ চঞ্চল হয়ে পড়েছি! তুমিও কি আমার মতই অনুভব করছো নীতা? জল ভরতে যাওয়ার সময় আমি যখন বারান্দায় ছিলাম, তখন আমাদের চার চক্ষুর মিলন ঘটেছিল। তুমি একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিয়েছিলে। খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে জানো! খুব জানতে ইচ্ছে করছে, তুমি কেমন আছো? আমার কথা মনে পড়ে তোমার? আচ্ছা, তুমি ফেসবুক করো? কি নামে একাউন্ট আছে? অন্তত ফোন নম্বরটাও যদি দাও আমায়! তবে না হয়-


~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.