অবেলা-য়

আমি যেদিন এসেছিলাম, নাকি বাবা-মায়ের কোল আলো করে; হেসেছিলাম ফোকলা, কচি গাল নিয়ে; ওঁরাও হেসেছিলেন চোখে খুশীর অশ্রুবিন্দু নিয়ে। মামার বাড়ীতে আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল সেদিন। হবে নাই বা কেন? বিয়ের দশ বছর পরে আমার মা যে সম্পূর্ণা হলেন। ঠাকুমা নাকি বাবার জন্যে মেয়ে দেখা শুরু করে দিয়েছিলেন; ধরেই নিয়েছিলেন যে আমার মা নাকি গর্ভবতী হবেন না। ঠাকুমার বোধহয় মনে ছিল না যে খুব অল্প বয়সে স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগে তিনি আমার মা’কে ঘরের বউ করে এনেছিলেন। মায়ের শরীর, স্বাস্থ্য হয়ত গর্ভসঞ্চারের সহায়ক ছিল না। চারাগাছে বেশী সার দিলেই কি সে ফুল দেবে?

তবে একমাত্র ছেলের প্রথম সন্তান কে দেখতে তিনিও ছুটে এসেছিলেন সোনার চেন হাতে করে। মনে মনে খুশিই হয়েছিলেন শুধু মুখে...,

“আমার ঘরে এতদিনে লক্ষ্মী এল...তবে...”

এই তবে, কিন্তু, যদি তেই কি আঁটকে থাকবে আমাদের মানে মেয়েদের জগৎ? কেন শুধু মেয়ে বলেই কি?

একবছর আটমাসের মাথায় বোন এল একইভাবে মায়ের কোল আলো করে। আত্মীয়রা বললেন, “আবার মেয়ে?” বাবা খুশি হন নি, যদিও মুখে কিছু বললেন না। দিদু বললেন, “ চাঁদের কণা...এ কিন্তু আগেরটার থেকে অনেক ফর্সা...” কালো মেয়ের তুলনায় ফর্সা মেয়ের বিয়ে দেওয়া সহজ তাই দিদু খুশী হয়েছিলেন। ঠাকুমা যথারীতি নাক সিঁটকোলেন, “ তবুও তো মেয়ে সন্তান...”

মা শুধু অসহায় হয়ে সকলের কথা গিলতে থাকলেন; বুঝতে চাইছিলেন বোধহয়, তাঁর অপরাধটা কোথায়? তফাৎ টা কি? মেয়ে হলেও ন’মাস পেটে ধরতে হয়, ছেলে হলেও...আর তাঁর কাঁধেই তো মস্ত দায়িত্ব নিজের সন্তানকে বড় করে, মানুষ করে তোলার। তাই মা বোধকরি বোনকে একটু বেশীই ভালবাসতে শুরু করলেন; বোঝাতে চাইলেন যে সে অনাহুত নয়। পিঠোপিঠি হওয়ার কারণে আমার খিদে, আমার কান্না, আমার কষ্ট দৃষ্টিগোচর হয়েও হত না। তখন থেকেই বুঝিয়ে দেওয়া হত, ‘তুমি বড় মেয়ে, তাই তুমি বেশী সহ্য করবে।”

দশ বছর পরেও এর অন্যথা হয় নি। বোন দোষ করলে শাস্তি আমাকেই মাথা পেতে নিতে হত। বাবা বলতেন, “ তুমি বড়, তোমার থেকেই তো ওরা শিখবে। ওরা বলছি কারণ ততদিনে আমাদের সংসারে আরো একটি সংযোজন হয়েছে; আরো এক বোন। ততদিনে আমি রজস্বলা হয়েছি। ভাবলাম, ‘আবার কেন? মা যে বলেন টানাটানির সংসার...তাহলে? কি দরকার ছিল...?বেশ তো ছিলাম আমরা দুজনে...’

ঠাকুমা নাকি বাবাকে ঠাকুর-থানে মাথা নুইয়ে বলেছিলেন, “আমার বংশধর চাই।” কেন? আমি, আমার বোন আমরা বাবার বংশধর নই? আমরা দুজনেই তো বাবা-মায়ের অংশ। তবুও বংশধর নই? তবে আমরা কি? শুধুমাত্র মেয়ে?!

যাইহোক, তৃতীয় কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে মায়ের কপালে জুটল কটু শব্দের বাণ। মেজো বোন দেখি ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদছে। সে নাকি ঠাকুরের কাছে ভাই চেয়েছিল; হয়নি তাই। ওকে কে নাকি বুঝিয়েছে ভাই হলে ওর আদর নাকি বেড়ে যাবে। সেকি? এমন আবার হয় নাকি? ভাই, বোনে কি তফাৎ? ঠাকুমা এলেন মাস চারেক পরে। এসেই মন্দিরে মাথা ঠুকছিলেন আর গাল পাড়ছিলেন। আমি এর প্রতিবাদ না করে পারলাম না। রীতিমত গর্জে উঠলাম আমি। “ বোন হয়েছে তো কি হয়েছে? বেশ হয়েছে ভাই হয়নি। যা হয়েছে আমাদের হয়েছে...তোমার কি? আর ভাই কি বাজারে কিনতে পাওয়া যায়? মায়ের কি দোষ? আর ঐ ফুটফুটে ছোট বোনটারই বা কি দোষ?”

ততদিনে আমি আমার ছোট বোনকেও কিন্তু নিজের সন্তানের মত ভালবাসতে শুরু করেছিলাম। মা যখন ওকে আমার কোলে দিয়ে বাথরুমে যেতেন, ও কেমন ভাবে আমায় আঁকড়ে ধরে আমার কোলে শুয়ে থাকত। আমার কেমন এক ঐশ্বরিক অনুভূতি হত। আর সেই বোনকে নাকি অঘেন্না করছে ঠাকুমা। রাগের মাথায় আরো কি কি না বলে ফেলেছিলাম। তার ফলে বাবার হাতে খেলাম চড়। “ বড়দের সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয় শেখোনি?”

“বড়রা যদি অন্যায় বলে মনে নেব কেন?”

“চোপ! একরত্তি মেয়ের মুখের কি কথা! বাপ! এ মেয়ে কিন্তু তোকে জ্বালিয়ে মারবে এই আমি বলে দিলুম...” ঠাকুমা মোটা গলায় বলে উঠলেন। উপস্থিত আত্মীয়ারা তাঁর কথায় সায় দিলেন।

আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, “ কেন তোমরা আমার মাকে, বোনকে এমন করে বলছো? ওরা কি অন্যায় করেছে?”

কেউ তো আমার কথা শুনলেনই না, উপরন্তু আমাকে অন্ধকার ঘরে ভরে শেকল তুলে দিলেন। সেদিন রাতে যে আমার খাওয়া হয় নি সেই কথাও বোধহয় কারোর মনে ছিল না। ছেলে না হওয়ার শোকে সকলে এতটাই কাতর। কেন যে এমন হয়? মেয়ে বলেই কি?

তবে শুধুমাত্র মেয়ে বলে বাবা কিন্তু শিক্ষার কোন ত্রুটি রাখেন নি। খরচও করেছিলেন তাঁর সাধ্যমত, যদিও পূত্র সন্তানের জন্যে খেদ একটা থেকেই গেছিল বরাবর। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হলাম। কমার্স পড়তে চেয়েছি। বাবা বাধা দেন নি। কিন্তু আত্মীয়দের সঙ্গে বাকযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। “ মেয়েমানুষ! বাংলা অনার্স নিয়ে পড়ুক” জেঠু বললেন, “ মেয়েদের আর্টস নিয়ে পড়াই ভাল, জানিস মা...ছেলেদের সাথে পেরে উঠবি না।”

জেঠিমা বললেন, “ সেই তো হাতা খুনতী নাড়তে হবে বাপু...অত পাশ দিয়ে হবেটা কি শুনি?”

“না। বৌদি। আমার মেয়েরা যতদূর পড়তে যায় আমি পড়াব...” বাবা বললেন।

বাবা বোধহয় তখন থেকেই আমার মধ্যে নিজের না জন্মানো ছেলের ছায়া দেখতে শুরু করেছিলেন। আমিও বলে দিলাম, “ আমি বাবার মত হব। অ্যাকাউন্টস অফিসার...অডিট হবে... ওভার টাইম করব...রাত দশটায় বাড়ি ফিরব।”

আ! কি অবুঝ ছিলাম আমি! তখন তো জানতাম না যে ভবিষ্যতে রাত দশটাতেও বাড়ি ফিরে আমায় এঁটো বাসন মেজে কিচেনে ভাত চাপাতে হবে। শ্বশুর ,শাশুড়ী, বর সকলে অপেক্ষা করে বসে আছেন। ড্রয়িং রমে বসে টিভি সিরিয়াল দেখতে ব্যস্ত তারা।

“আমি তো বলে গিয়েছিলাম, লেট হবে, অডিট চলছে...কেউ কিছুটি করেননি? আমার ভরসায় বসে আছেন?”

“তোমারই তো সংসার মা..” শ্বশুর বললেন। আমাদের তাড়া নেই বিকেলে প্যাটিস-ট্যাটিস খাওয়া হয়েছে.. তুমি আস্তে ধীরে কর...”

“মানে? আমি সেই দুপুর থেকে না খেয়ে...এক কাপ চা খাবারও সময় পাই নি...”

“খাওনা..ঐ তো রাখা আছে মাইক্র-ওভেনে...” বর বলল। এরা কেউ এক গ্লাস জল আমায় গড়িয়ে দেবে না আমি ফিরলে। আমিও তো খেটে টাকা রোজগার করছি। শাশুড়ী বললেন,

“অত টাকা টাকা করো কেন বৌমা? তোমার টাকার তো আমাদের দরকার নেই? সনুর কি কম ইনকাম নাকি? তুমি তোমার সংসার সামলাও দেখি। আর আমারাও দাদুভাইয়ের মুখ দেখি।”

হায়! কপাল! তাহলে এত কষ্ট করে, লড়াই করে লেখাপড়া শিখলাম কেন? নিজে রোজগার করছি, সেটাও কি আমার অপরাধ? শুধুমাত্র আমি মেয়ে বলে? সব মেয়েদেরই কি একই অবস্থা? কাকে যে শেয়ার করি মনের কথা?

কলেজের সময় থেকেই আমার বান্ধবীদের সংখ্যা কমে গিয়েছিল। বেশীর ভাগেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তবে বেশ ক’জন বন্ধু হয়েছিল আমার। আমরা রেগুলার রকে বসে আড্ডা মারতাম। ঝিলমিলে বেড়াতে যেতাম, ভাগ করে মোগলাই পরোটা খেতাম, ব্ল্যাকে টিকিট কেটে সিনেমা দেখতাম, পূজোর সময় ঠাকুর দেখতাম...। পাড়ার এক কাকু একদিন আমাকে দেখে ফেললেন ওদের সঙ্গে, বাবাকে নালিশ করলেন। ব্যাস! হয়ে গেল আমার স্বাধীনতার দফারফা। বাবা আমায় পাত্রস্থ করতে উঠে পড়ে লাগলেন। আমি আবার প্রতিবাদী হলাম।

“আমার অপরাধটা কোথায়?”

“তুমি মেয়ে, তোমার ছেলেদের সঙ্গে অত ওঠাবসা ভাল দেখায় না লোকে কি বলবে?” মা কড়া গলায় বললেন।

“আমি কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করব কি করব না সেটাও লোকে ঠিক করে দেবে মা?”

দিদুও মায়ের কথাতে সায় দিলেন। “ নাতনি...ঘি আর আগুন পাশাপাশি রাখলে কি হয় জানিস?”

কি যে বলছেন এরা আমি তো মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝছি না। কে ঘি আর কেই বা আগুন? ওরা তো আমার বন্ধু। বন্ধুর আবার কোন জেণ্ডার হয় নাকি?

আমার কথা তো কেউ শুনলই না। প্রতি শনিবার-রবিবার কেউ না কেউ আমাকে দেখতে আসতে থাকল। কেউ বলল, “ গায়ের রঙটা চাপা...” কেউ বলল, “ রোগাটে গড়ন...” তারপর কত প্রশ্ন। আমি রান্না করতে পারি কিনা? ঠাকুর পূজো করতে পারি কিনা? চুল ছোট করে কাটা কেন? শাড়ি পরিনি কেন? চাকরি করব কিনা? আরো কত কি? আমার খুব খারাপ লাগত। আমি কি বাজারের দ্রব্য যে আমায় বেছে বেছে দেখবে? আমার কি কোন সম্মান নেই? কই ছেলেদের তো কেউ এমন প্রশ্ন করছে না। আমার কষ্ট হচ্ছিল খুব। আমি রোজ বালিসে মুখ চেপে কাঁদতাম। একে তো আমাকে আমার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যেতে দিচ্ছে না কেউ; উপরন্তু রোজ রোজ নতুন নতুন পাত্রের সামনে আমাকে ফ্যাশান শো করতে হবে। কেন? আমি মেয়ে, তাই?

যাই হোক, কিছুদিনের মধ্যেই আমার একটা “হিল্লে” হল। ঠাকুমার ভাষায়। গ্রাজুয়েশানের রেজাল্ট আউট হলেই বিয়ে। “বাবা...প্লিজ আমি এম. কম করতে চাই...আমি তোমার মত চাকরী করব, প্লিজ...।”

“তোমার শ্বশুর বাড়ির লোকেরা, জামাই অ্যালাউ করলে কোরো...”

“মানে? আমার ইচ্ছের কোন দাম নেই? আমি কি করব...সেটাও ওরা ঠিক করবেন? কেন? কোথাকার কে উড়ে এসে বসে আমার জীবনে...”

“পিংকি....” বাবা হুংকার ছাড়লেন। আমি চুপ করে গেলাম, কিন্তু রাগে পায়ের বুড়ো আঙ্গুল মেঝেতে ঘষতে থাকলাম। রান অ্যাবে ব্রাইডের মত পালিয়ে যেতে পারতাম তো যেতাম।

“শোন মিনতি, তোমার বড় মেয়েকে সামলাও... এরকম বনেদী পরিবার, ভাল চাকরী-ওয়ালা ছেলে আর পাওয়া যাবে?”

“এত সুন্দর ঘর ,বর পেতে চলেছিস নাতনী... তোর ভাগ্য কত ভাল, বল একবার?” দিদুন আহ্লাদে আটখানা।

আমি আর কি করে ওদের খুশীতে বাধা হব? বুঝতে পারলাম যে আমি আমার ভাগ্য তৈরী করতে পারি না, সেই অধিকারই আমার নেই। যে পরিবারে আমার জন্ম, যেখানে আমি বড় হয়েছি সেখানে আমার স্থান কিছু দিনের ছিল। কারণ আমি মেয়ে, আর এটাই নাকি রীতি। ঈশ্বরের কাছে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হল, ‘এমন রীতি কে বানিয়েছে?’ একটা অজানা, অচেনা পরিবারকে আপন করে নিতে হবে; বিয়ের পর দিন থেকে তারাই হবে আমার হত্তাকর্ত্তাবিধাতা। আমার অনিচ্ছায় আমি শৃঙ্খলিত হলাম, আর এ বন্ধন কিসের বন্ধন জানি না। আজও বুঝে উঠতে পারি নি। আমার গোত্র স্থানান্তরিত হল, আমার পদবী পরিবর্তিত হল; বলাই বাহুল্য আমার অনিচ্ছ্বায়। আমার বাবার দেওয়া পদবী আর আমি ব্যবহার করতে পারব না? আমার স্বামী যাকে আমি ক’দিনই বা চিনি তার পদবী আমাকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে? কেন? এটাই নাকি সামাজিক নিয়ম। ইচ্ছে হল এই সামাজিক নিয়মটাকে বদলে দিই; পারিনি তখন।

শ্বশুর বাড়ীতে পা রাখতে না রাখতেই আমি উপলব্ধি করতে শুরু করলাম যে আমি একজন মেয়ে, একজন বউ। বাড়ির আর সকলের মত আমি স্বাধীন নই। রান্নাঘরে যেতে গেলে আমায় অনুমতি নিতে হবে, টিভি দেখতে গেলে আমায় অনুমতি নেতে হবে। খিদে পেলেও আমি খেতে পারব না যতক্ষন না বাড়ির পুরুষ মানুষেরা নিজেদের খাওয়া শেষ করছেন। আমি সোফায় ঠেস দিয়ে বসতে পারব না কারণ সেটা অশোভনীয়। কথায় কথায় আমাকে মাটির প্রতিমার সামনে মাথা ঠুকতে হবে, সে আমার বিশ্বাস থাক আর না থাক। আমার পছন্দের জামাকাপড় পরতে পারব না কারণ বউমানুষদের শাড়ীতেই নাকি বেশী ভাল লাগে।

স্বামীর সোহাগও দু’ বছরের মধ্যে মলিন হতে শুরু করল; যেদিন শুনল যে আমিও মাল্টি-ন্যাশানাল কোম্পানীতে জয়েন করতে চলেছি। কান্নাকাটি করে, রাতের অন্ধকারে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় আমি এম. কম পাশ করেছিলাম ভালভাবেই। শ্বশুর, শাশুড়ী, ননদ কেউ ভালভাবে নিল না ব্যাপারটা। কিন্তু এই প্রথম আমি নিজের জেদ বজায় রাখতে সমর্থ্য হলাম। আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলাম নিয়মের বেড়াজালে। তাই শাস্তি স্বরূপ চাকরী করে এসেও অথবা চাকরী করতে যাওয়ার আগে আমাকে সংসারের কাজ করেই যেতে হত।

পাঁচ বছর যেতে না যেতেই শাশুড়ি আমাকে বাঁজা বলে গালমন্দ করতে শুরু করলেন। কিন্তু তাঁর নিজের ছেলে যে নাকি কেরিয়ারিস্ট, সে তো সন্তান চায় না। আমি কি করতে পারি?

যাই হোক সাত বছরের মাথায় আমি একটি পূত্র সন্তানের জন্ম দিলাম। মন চাইছিল মেয়ে হোক। তারপর কিছুদিনের জন্যে আমার আদর অবশ্য বেড়ে গিয়েছিল আমার ছেলের দৌলতে। কিন্তু সেটাই একটা কারণ হয়ে দাঁড়াল আমার চাকরী ছেড়ে দেবার। মন খারাপ হয়েছিল, কিন্তু ছেলেকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম যে নিজের দিকে তাকানোর সময় পাইনি। বাড়িতে এতগুলো মানুষ তারা শুধু আদর করবেন আর যেহেতু ও আমার ছেলে তাই মানুষ করার দায়িত্ব শুধুই আমার। ধীরে ধীরে আমি আমার প্রতিবাদের ভাষাও হারিয়ে ফেললাম। আগেও যে সেটা খুব ফলপ্রসু ছিল তা নয়। বলা হত, “ সকলেই তো ঘরকন্না করচে, তোমার বোনেরা, তোমার জায়েরা সবাই তো...কারুর মুখেতে রা’ নেই..শুধু তোমারই মুখে যত চোপা! জানতে হয়, বুঝলে জানতে হয় কি করে গুছিয়ে সংসার করতে হয়...তুমি তো সে ধারার মেয়েমানুষ নও...” হ্যাঁ, আমি আলাদা। আমি মুখ বুজে সহ্য করতে পারি নি। যা, আমার মনের কথা, আমার নিজের ভাল-মন্দের কথা আমি জানাতে চাই,চেয়েছিলাম; ভূল করেছিলাম?

ধীরে ধীরে দেখলাম আমার স্বামীও আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাকে আমি বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছিলাম যে আমার ক্লান্ত শরীর কিছুতেই রাতে বিছানায় যৌন উল্লাসে তার সঙ্গী হতে দেয় না। দুজনের ভাল লাগা, ভালবাসা শুধুমাত্র রেস্টুরেন্ট, সিনেমা হল আর দূর দেশে বেড়াতে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকল।

ছেলের সব দোষের জন্যে আমি দায়ী আর গুনের ভাগীদার বাড়ির আর সকলে মানে সেই বংশ। “কোন বংশের ছেলে দেখতে হবে তো!” আজ আমার ছেলে উচ্চ-মাধ্যমিকের রেজাল্ট আনতে যাচ্ছে। মানে এখন সে নাবালক। এখন সে আমার কাছে অনেক কিছু লুকোতে শিখেছে। অনেক মিথ্যে কথাও বলে। লুকিয়ে লুকিয়ে স্মোক করে; বন্ধুদের পার্টিতে গিয়ে ড্রিংঙ্কও করে বোধহয়। বিয়ার। ওর বাবা বলে, “বিয়ারটা আবার মদ হল নাকি?” তা বেশ। আমি তো কিছুই জানি না যেন। মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানীর পার্টিগুলোতে আমি যেন কোনদিন যাই নি। ছেলেও তো বলে, “ মা তুমি কিছু বোঝো না...এটাই লেটেস্ট ট্রেন্ড...” নিজের জামাকাপড় সে নিজেই পছন্দ করে কেনে, তাতে তাকে বাঁদর লাগুক আর লোফার লাগুক। কি করা যাবে? আমার পছন্দ তো ব্যাকডেটেড। আমি মেয়ে হলেও বুঝতে পারি সব, সেটা ওরা পুরুষেরা বোঝে না।

তবে আমি কি সত্যি সত্যি বুঝতে চাই? আমার অস্তিত্ব যেখানে সঙ্কটে, আমি বুঝেই বা কি করব? এতদিন স্বামী বলত, এখন ছেলে বলে, কি এমন করেছো... যা করেছো নিজের সংসারের জন্যেই তো করেছো। তবে আমারও জেদ। এবার আমি করব। ও কলেজে ভর্তি হলেই আমি ওকে বলে দেব, “ আমার আর কোন দায়িত্ব নেই। তোমাদের ব্যাপার তোমরা বুঝে নাও।” জানি অশান্তি হবে, ঝগড়া হবে। কিন্তু এটা আমাকে করতেই হবে। আমি ওদের কাউকে জানাই নি যে আমি একটা স্বনির্ভর প্রকল্পের ব্যবসায়িক সংস্থা খুলেছি। কাল তার উদ্বোধন। আমার পি.এফে আর সেভিংসের টাকা আমি বিনিয়োগ করেছি একটি ফুড প্রসেসিং কোম্পানীর জন্যে। আমার সঙ্গে আমারই মত আরো চারজন মেয়ে আছে। বাবা মারা যাওয়ার আগে বাড়ির একতলাটা মার নামে করে দিয়েছিলেন; সেখানেই অফিস। আর আমার সেই কলেজের বন্ধুরাই আমার জন্যে লোন, পলিটিকাল হেল্প ইত্যাদির ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

আমি শেষ বয়সে কারোর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে চাই না। না আমার স্বামীর না আমার ছেলের। বাবা বেঁচে থাকতে ও বাড়ি ছিল আমার বাপের বাড়ি। আর এ বাড়ি তো চিরকাল আমার শ্বশুর বাড়ি। ঘরের কালার চুজ করব, “তোমার একার বাড়ি কি যে তোমার ডিশিসানই সব?” জানালার পর্দা চেঞ্জ করব, “ বউমা, আমাকে না জানিয়ে এসব করে তুমি ঠিক করো নি।” পরীক্ষার আগে জন্মদিনের পার্টিতে বাধা দিয়েছিলাম। ছেলে বলল, “মম আমার বাড়িতে আমি একটু মস্তিও করতে পারব না?” এটা ওদের সকলের বাড়ি। শুধু আমার বাড়ি নয়।

তাই ওখানে আমার কোন স্থান কালও ছিল না; আজও নেই...ভবিষ্যতে যে থাকবে তেমন আশাও করি না। তাই আমার সঠিক স্থান আমি নিজেই খুঁজে নিয়েছি। আমার প্রতিষ্ঠান। “অবেলা”। কাল থেকে ওটাই আমার ডেসটিনি। ওখানে আমার বন্ধুদের, তা সে ছেলেই হোক আর মেয়ে, তাদের অবাধ যাতায়াত। ওখানে কেউ নেই যে আমায় বলবে, ‘এটা কোরো না’, ‘এটা করতে নেই’। কেউ মনে করিয়ে দেবে না যে আমি একজন মেয়ে। এখানে আমি নিজের, আমার বাবার দেওয়া পদবী ব্যবহার করতে পারব। একবার, অন্ত্যত একবার আমি নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ার চেষ্টা করব। একবার অন্ত্যত আমি নিজের মত করে বাঁচব। কাল উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে নতুন করে বোধন হবে আমার। নতুন করে শুরু হোক পথ চলা উজানের পথে, নতুন স্বপ্ন চোখে নিয়ে, নতুন অথচ স্বার্থহীন ভালবাসাকে সাথী করে।

===================================================================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.