ভালবাসা কারে কয়

ভালবাসা কারে কয়

এক কলেজে পরে দুটো – তিস্তা আর তিতাস - তিস্তা থার্ড ইয়ারে আর তিতাস ফার্স্ট ইয়ারে। আলাপ হল ‘নবীন বরণ’এ। তিস্তা একটু দিদি দিদি গোছের, কচি ছেলে পেয়ে একটু র‍্যাগিং করছিলো – ‘অ্যাই ছেলে তোর নাম কি?’ ‘তিতাস’। ‘হুম! বল তো তিতাস একটি নদীর নাম কার লেখা?’ ‘সবাই জানে’। ‘আচ্ছা!তোর নাম তিতাস কেন?’ ‘আমার মার প্রিয় লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ। তোমার নাম কি?’ ‘আমার নাম যাই হোক! তুই শুধু উত্তর দিবি, প্রশ্ন করবি না খবরদার!’ তিতাস চুপ করে গেছিল। সেদিন তিতাস খুব ভাল গান গেয়েছিল গিটার বাজিয়ে – হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া – আর সেদিন রাতে তিস্তার ঘুম এসেছিল অনেক দেরিতে – মাথায় গুণগুণ করছিল – such a lovely place, such a lovely place, such a lovely face –

সেই শুরু, তারপর আলাপ আরো বাড়তে থাকে – গান, কবিতা, সিনেমা, গল্প, নাটক – কত কথা। কথার জাল বেঁধে ফেলল দুজনকে গভীর বন্ধুত্বে। তারপর একসাথে সিনেমা, নাটক দ্যাখা, বইমেলা যাওয়া, নন্দন চত্বরে সন্ধ্যাবেলায় একসাথে চুপচাপ বসে থাকা, একাদেমি তে একসাথে এক্সিবিশন দ্যাখা, পেইন্টিং দেখে পাল্লা দিয়ে কবিতা লেখা, ক্যাথিড্রালের ফুটপাথ ধরে হাতধরে হাঁটা, আরও কত কি! একে অপরকে ছেড়ে থাকতেই পারে না। সবাই বলে ‘তিস্তা তুই দুই বছরের বড়, অনেক ম্যাচিয়োরড, ও ছোকরা ক্যামন পাগলাটে, কি করছিস?’ তিস্তা হেসে বলে ‘ও পাগলকে আমি ছাড়া আর কে সামলাবে?’ তিতাসকে জন্ম দিয়েই তিতাসের মা মারা গেছেন, মা-হারা ছেলে কি তিস্তার মধ্যে ‘মা’ কেও খোঁজে? তাই বুঝি তিস্তার অপার স্নেহ, অপার প্রশ্রয় তিতাসের প্রতি?

এই ভাবে বছর গড়ায় – তিস্তা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করছে। তিতাস গ্রাজুয়েশনের পর আর পরেনি, সে রেডিও জকি হয়েছে। তিতাসের বাবার ব্যবসা, তিনি চেয়েছিলেন ছেলে এম বি এ পড়বে। তিনি তিস্তাকে বলেন, ‘তুই একটু বুঝিয়ে বল! তুই বললেই শুনবে! তোরা বিয়ে করবি না? সংসার করবি না? কি একটা বাজে কাজ করছে!’ তিস্তা বলে ‘করুক না যা ওর মন চায়। আমি পি এইচ ডি শেষ করেনি। একটা লেকচারারশিপ তো পাবোই। তারপরই বিয়ে করব। তুমি চিন্তা করোনা তো!’

একদিন তিস্তা জিজ্ঞেস করল তিতাসকে – ‘কবে বিয়ে করবি আমায়?’ তিতাস চমকে উঠল – ‘বিয়ে! বিয়ে কেন করতে হবে? এই তো বেশ আছি’। তিস্তা হেসে বলল – ‘আমরা প্রেম করি। বাড়ির লোক, বন্ধু-বান্ধব সবাই তো আশা করে!’ ‘কেন করে? প্রেম করছি মানে? আমরা বন্ধু! বিয়ে কেন করতে হবে?’ – ভুরু কুঁচকে ওঠে তিতাসের। শান্তস্বরে বলে তিস্তা, ‘আমরা বন্ধু। কিন্তু আমরা তো একে অপরকে ভালবাসি। নাকি? তুই আমায় ভালবাসিস না?’ ‘বাসি তো! কিন্তু – বিয়ে না! প্লিজ!’ ‘কেন? বিয়েতে আপত্তি কেন তোর?’ – এবার একটু বিরক্ত হয় তিস্তা। ‘বিয়ে করলেই তোর বাচ্চা হবে!’ ‘তো?’ – এবার অবাক হবার পালা তিস্তার। ‘তুই মরে যাবি!’ কেঁদে ফেলল তিতাস, একদম বাচ্চা ছেলের মত, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। জড়িয়ে ধরল তিতাসকে নিজের বুকের সাথে তিস্তা – ‘কাঁদিস না, কাঁদিস না। আমি মরে যাব না। এত মেয়ের বাচ্চা হচ্ছে, তারা সবাই মরে যাচ্ছে কি?’ এক ঝটকায় তিস্তাকে সরিয়ে দিল তিতাস। লাল ফোলা চোখ তিস্তার চোখের ওপর রেখে চাপা গলায় বলল, ‘না! তোর বাচ্চা হবে না! তুই বিয়ে করবি না!’ বলেই বেড়িয়ে গেল তিতাস বাড়ি থেকে।

তিতাসের বাবা, তিস্তা দুজনেই চেষ্টা করল তিতাসকে কাউন্সেলরের কাছে নিয়ে যাবার। তিতাস গেল না। এদিকে তিস্তার সাথে তিতাস একটা দূরত্ব সৃষ্টি করে ফেলল। তিস্তা বলল একদিন ওর মাকে – ‘মা, আমার বিয়ে হবে না। তুমি বোনের বিয়ে দিয়ে দাও’। মা বোন দুজনেই রেগে গেল। ‘একটা পাগলের জন্য নিজের জীবনটা নষ্ট করবি?’ ‘আমার কপাল মা!’ বোন বলল, ‘দিদি তুই বলছিস কপাল? হাসব না কাঁদব?’ পরের দিন বোন দ্যাখা করল তিতাসের সাথে – ‘তিতাস, এই তোর ভালোবাসা! জানিস না, একটা মেয়ের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সন্তান? কেন করছিস অন্যায় আমার দিদির সাথে?’ তিতাস কাঠ কাঠ গলায় বলল – ‘কি বলতে চাস? আমি তোর দিদিকে ভালবাসিনা, তাই তো? হ্যাঁ তাই। খুশ?’ পরের দিন তিতাস ফোন করল তিস্তাকে – ‘দ্যাখ তিস্তা, আমি তোকে খুশি রাখতে পারব না। কি দরকার বল এমন সম্পর্কের? লেটস পার্ট অ্যাওয়ে! তোকে বলব বলব করে বলতে পারিনি – আই লাভ সোনালী নাও, ইউ নো হার, রাইট? ও তোর মত সেকেলে না। ও বিয়ে বিয়ে করে ঘ্যান ঘ্যান করে না, র‍্যাদার করবেও না। শি বিলিভস ইন ওপেন রিলেশনশিপ। আমি ছাড়াও ওর আরও বয় ফ্রেন্ড আছে। তাই ও তোর মত পসেসিভ না। আই নিড স্পেস, হুইচ শি গিভস। আই অ্যাম হ্যাপি উইথ হার। দ্যাখ, তুই বাচ্চা ভালবাসিস, ইউ মাস্ট ম্যারি। ম্যারি সাম গুড গাই ডিয়ার অ্যান্ড বি হ্যাপি। আই হেট বেবিস!’ এতগুলো কথা বলে থামল তিতাস। খেয়াল হল তিস্তা কোন উত্তর দিচ্ছে না। ‘তিস্তা, তুই শুনছিস?’ ‘হ্যাঁ!’ ব্যাস ওই একটা শব্দ উচ্চারণ করে ফোন কেটে দিল তিস্তা।

তিস্তা চলে গেছে কলকাতা ছেড়ে দূর শহরে। একটা কলেজে পড়ায়। কিন্তু প্রতি শনিবার রাত নটায় এফ এমের একটা নির্দিষ্ট ফ্রিকয়েন্সিতে টিউন করতে ভোলে না – আর জে তিতাস পরিচালনা করে সবার প্রিয় অনুষ্ঠান – ‘ভালবাসা কারে কয়?’

*********************************************************************

*২০১৫ সালে শারদীয়া "ঝিনুক - একটি আধার" পত্রিকায় প্রকাশিত

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.