***প্রথম পর্ব


বিকেলের এই সময়টা আমাদের নিজস্ব গঙ্গার ঘাটে এসে বসতে আমার ভীষণ ভাল লাগে। অস্তগামী সূর্য যখন নদীর জলে সিঁদুর গুলে পশ্চিম আকাশে ঢলে পরে আমার মন যেন কোথায় উড়ে যায়। এক মন কেমন করা সুর কানে ভেসে আসে। একেই বোধহয় বলে গোধূলি বেলা, সেই কনে দেখা আলোয় ঘরে ফেরা পাখীদের ঐকতান আর বাড়ি বাড়ি শাঁখের আওয়াজে আমার মন চলে যায় কোন অতীতে। সেই ছোট্টবেলায় , গঙ্গা র পারেই আমাদের বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদে। যৌথ পরিবারে অনেক ভাইবোন মিলে এই সময় খেলা শেষে সবাই ঘরে ফিরে পড়তে বসতাম......

গঙ্গার বুকে ইতি উতি ভেসে চলা নৌকা , জলের ছোট ছোট ঢেউ এর ভাঙ্গা গড়া আর উদাসী হাওয়ার সাথে আমিও এ সময় রোজ কোথায় ভেসে যাই। আস্তে আস্তে সূর্যের শেষ রশ্মিজালের রেশ টুকু যখন কেটে যায় ও পারে পলতার দিকে সব বাড়ি বাড়ি আলো জ্বলে ওঠে, আমিও পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই আমার ঘরের দিকে। এই আশ্রমের শেষের ছোট্ট দোতালা বাড়ির দোতলায় আমার ঘর। জানালা দিয়ে দেখতে পাই পতিত পাবনী গঙ্গা, যা প্রতিনিয়ত স্নিগ্ধ করে আমার অন্তরকে।

আজ দীর্ঘ সাত বছর আমি এখানেই আছি। বাড়ি ফিরে যেতে আর ইচ্ছাই করে না। আগে মাঝে মাঝে মা আসতো, বাড়ি নিয়ে যেতে চাইত, কিন্তু আমি যেতে চাই না দেখে এখন আসা কমিয়ে দিয়েছে। বাবা সেই একবার এসেছিল, শরীর ভেঙ্গে পড়েছে বলে আর আসতে চায় না। সুদূর বহরমপুর থেকে আসাও কষ্টকর। দুই দাদাই বাইরে চাকরী করে। বড়দা দুবাই, ছোড়দা রিয়াদ। দু বছর পর পর আসে। দিদি র শ্বশুর বাড়ি বারাসত। দুবার এসেছিল মা এর সাথে, ও সংসারে এমন জড়িয়েছে বাপের বাড়িও যেতে পারে না।

তবে আমি সত্যি এখানে বেশ ভাল আছি। প্রথম যখন গঙ্গার গায়ে বৈদ‍্যবাটির এই আশ্রমে এসেছিলাম ঠিক জানতাম না কেন এসেছি? আস্তে আস্তে জায়গাটাকে ভালবেসে ফেলেছিলাম। আমার জীবনের সব দুঃখ কষ্ট ধীরে ধীরে দূরে সরে গেছিল।

ডাক্তার জেঠুর সাথে আমার পরিচয় এখানেই। প্রথমদিনই আমায় উনি খুব আপন করে নিয়েছিলেন। এখন আমি এই আশ্রমেরই একজন। এখানে না আসলে আমি জানতামই না যে পৃথিবী তে এত সুন্দর একটা জায়গা আছে। আমাদের এই আশ্রমের নাম "মনের ঠিকানা", সত্যি এখানে এসে সবাই মনের ঠিকানার খোঁজ পায়।

-"দিদি, তুমি এখনো এখানেই বসে আছো, জেঠু তোমায় ডাকছেন। তাড়াতাড়ি এসো।" শ্রেয়ার ডাকে আমার মন ফিরে এলো এখানে। ওর সাথে পা বাড়ালাম ডাক্তার জেঠুর অফিস ঘরের দিকে। এই শ্রেয়া দু বছর ধরে এখানে আছে। এখন ও পুরো সুস্থ, হয়তো এবার বাড়ি ফিরে যাবে।

জেঠুর অফিসটা গেট দিয়ে ঢুকেই উপাসনা ঘরের পাশে। একতলায় একটা ঘরে জেঠুর চেম্বার। পিছনে ছোট্ট নার্সিং হোম। পাশের লম্বা ঘরে এডমিশন আর একাউন্টসের কাজ হয়। এখন সন্ধ্যায় ও দিকটা বন্ধ থাকে।

শ্রেয়া চলে গেল উপাসনা ঘরের দিকে। জেঠু বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমায় দেখেই সেই সুন্দর হাসিটা হেসে বললেন -"আয়, তোর সাথে কথা আছে।"

আমায় বসতে বলে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন। বললেন -"আর্যর কথা মনে আছে তোর। সেই ছোট ছেলেটা ....
ও কাল আসছে। কিছুদিন থাকবে এখানে।"

-"আর্য তো তিন বছর আগেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছিল। ও তো পড়াও শুরু করেছিল জানতাম। প্রথম কদিন আমার সাথে যোগাযোগ ছিল। গত বছর ও কলেজ শেষ করে এমবিএ তে ভর্তি হয়েছিল, এই শেষ কথা হয়েছিল।" আমি একটু অবাক হয়েই বললাম।

-" হ্যাঁ, ও সুস্থ। তবে ওর হয়তো অন্য কিছু প্রবলেম হচ্ছে। ও আমায় মেল করেছিল দু দিন আগে। আজ কথা হয়েছে। ও এখানে এসে কদিন থাকতে চায়।"

-"তাহলে........" আমার কথা শুরুর আগেই জেঠু বললেন -"আমি বাদলকে বলেছি বলাকায় ওর থাকার ব্যবস্থা করতে। তুই একবার সব দেখে নিস। আর্যকে এতো তাড়াতাড়ি সুস্থ করতে পেরেছিলাম তোর জন্য। ও তোকে নিজের দিদির মতোই ভালবাসে। মন খুলে তোকে সব বলে। ডাক্তার হিসাবে আমায় হয়তো সব বলতে ভরসা পায় না। তাই তোকেই সব জেনে আমায় জানাতে হবে ।"

-"ঠিক আছে। তবে ও প্রথম প্রথম ফোন করলেও ইদানীং আর করতো না আমায়।"

-"ওর নাকি ফোন হারিয়ে গেছিল, সাথে সবার নম্বর। ও কোনো ভাবে ইমেইলটা জোগাড় করে মেল করেছিল আমায়। তোর নম্বর ও হারিয়ে ছিল ফোনের সাথে। যাইহোক আমি উঠলাম, তুই দেখে নে একবার। ও কাল সকালেই পৌঁছে যাবে বলেছে।"

আমিও উঠে বলাকার দিকে এগিয়ে গেলাম। উপাসনা-ঘরের থেকে ভেসে আসছে শ্রেয়ার গান......"আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে, এ জীবন পুণ্য কর....."

আমবাগানের ফাঁকে ফাঁকে এই ছোট ছোট পাঁচটা কটেজ বানিয়েছিল জেঠু, নাম গীতালি, শ্যামলী, বলাকা, চৈতালি, পূরবী। কোন আবাসিকের আত্মীয় বা বাড়ির লোক এলে থাকে এখানে। আর পুরানো কোনো আবাসিক এলেও থাকতে দেওয়া হয় এই কটেজে। কোনোটায় চারজন কোনটায় দুজনের থাকার ব্যবস্থা। ওধারে কৃষ্ণচূড়া শিমুল আর পলাশের মাঝে যে বড় দোতলা বাড়ি ওখানে সব ছেলে আবাসিকদের থাকার ব্যবস্থা। আর আমার ঘরের পিছলে বকুল আর রাধাচুড়া গাছের পাশের নতুন একতলা বাড়িতে মেয়ে আবাসিকদের। ডাক্তার জেঠু মনের ডাক্তার। খুব বড় সাইকোলজিষ্ট। এই আশ্রম ওনার গত পঁচিশ বছরের নিরলস প্রচেষ্টার ফল। উনি ছাড়াও এখানে আরো তিনজন ডাক্তার আছেন। এখানে অন্য পদ্ধতিতে সবার মনের চিকিৎসা হয়। আমি জানি অনেকেই এই "মনের ঠিকানা" কে পাগলা গারদের সাথে তুলনা করে। কিন্তু দীর্ঘ সাত বছর এখানে কাটিয়ে আমি বুঝেছি বাইরের পৃথিবীর থেকে এই ছোট্ট আশ্রম অনেক ভাল জায়গা। ঐ পৃথিবীটাকেই আমার পাগলা গারদ মনে হয় মাঝে মাঝে। সুস্থতার মুখোশ পড়ে একদল অসুস্থ রুগী ওখানে খোলা ঘুরে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। আর অসহায় দের উপর দাঁত নখ বের করে ঝাঁপিয়ে পরে সুযোগ পেলেই। এখানে মনের অসুস্থতা দূর করে সবাইকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে সাহায্য করা হয়। আর সমাজে বেঁচে থাকার যুদ্ধটাও আমাদের মতো ভুক্তভোগী মেয়েদের শেখানো হয়। আমার পায়ের নিচে আজ মাটি এনে দিয়েছে এই "মনের ঠিকানা"।

সব রকম বয়সী লোকের চিকিৎসা হয় এখানে। মেহুলী দি আর শুভমদা দেখেন ছোটদের। আর জেঠু আর অজিত-দা দেখেন বড়দের। এছাড়া সরমা দি আছেন। উনি সাইকোলজির স্টুডেন্ট ছিলেন। বহুদিন জেঠুর সাথে থাকতে থাকতে এখন উনি জেঠুর ডান হাত বলতে গেলে। সবাই ওনার পরামর্শ নেয় প্রয়োজনে।

এছাড়া আছে দুজন মেয়ে নার্স, তিনজন ছেলে নার্স। বাদলদা, গনেশদা আর কাকলী দি আছে বাকি সব কিছু দেখাশোনা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও অন্যান্য সব কিছুর জন্য। এছাড়া কয়েকজন অফিস স্টাফ, রাঁধুনি মালী সবাই আছে। ভাবতে অবাক লাগে এদের বেশির ভাগ এক সময় জেঠুর পেশেন্ট ছিল। যেমন আমি।

আমিও আজ এখানে চাকরী করছি সবার সাহায্য করার জন্য। জেঠুই আমায় এখানে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন। ওনার লক্ষ্য সুস্থ মনের সাথে সবাইকে সুস্থ জীবন দিয়ে সমাজের মুল স্রোতে ফিরিয়ে দেওয়া। আমি আজ শুধু সুস্থ নই স্বাবলম্বীও শুধু ওনার জন্য। এই আশ্রম ছেড়ে কোথাও যাওয়ার কথা আর আমি ভাবতেই পারি না।


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.