#পরিবর্তন

#অরবিন্দ ভারতী - মূল রচনাকার


#হিন্দি

#সুমনা_ভট্টাচার্য্য – অনুবাদক


মোবাইলটা বেজে উঠলো । স্ক্রিনে রাম শাস্ত্রী নামটা দেখে, পুরোহিত ফোন টা ধরে । ওপার থেকে রাম শাস্ত্রীর ভীত কণ্ঠস্বর শোনা গেল ।


“পুরোহিত মশাই মুসলমানেরা রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে মিছিল বের করতে দিচ্ছে না । আপনি পুলিশ নিয়ে আসুন আমি ততক্ষনে লোক জড়ো করছি ।” এইটুকু বলেই ফোনটা কেটে গেল । পুরোহিত মশাই এর মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়, মন অজানা ভয়ে ভরে ওঠে , কপালে ঘাম দেখা দিল আর মাটিতে মিশে গেল , উনি অবিলম্বে পুলিশে কে জানান। আজ রামলীলা তে ভরত এর সঙ্গে মিলন আছে আর শোভা যাত্রা ও বের করার আছে । পুরোহিত মশাই আর রাম শাস্ত্রী মশাই এটা নিয়ে অনেক পরিশ্রম করেছেন । পুরো মিছিল টার বড় মসজিদ এর সামনে একত্রিত হওয়ার ছিল, তার পর ওখান থেকে শোভা যাত্রা বেরোনোর ছিল, কিন্তু তার আগেই এই ঘটনা টা ঘটে গেল ।


ওই দিকে রাম শাস্ত্রী মশাই দু চার জন কে সঙ্গে নিয়ে দলিত দের বস্তির দিকে দৌড়োলেন । বস্তি তে ঢুকতেই রাম শাস্ত্রী আর ওনার লোকদের কুকুরেরা ঘিরে ফেলে । কুকুরেরা প্রথমে ওদের কে শুঁকে আর তারপর হটাৎ করে তীব্র স্বরে চিৎকার করতে থাকে । এরকম মনে হচ্ছিল যে কুকুরেরা বুঝে গেছে যে এরা দলিত বিরোধী । এখন দৃশ্য টা এরকম মনে হচ্ছে যেন উচ্চ বর্ণের লোকেরা নিজেদের এলাকাতে দলিতদের ঘিরে রেখেছে আর আজকে ওদের না মেরে শান্ত হবে না । রাম শাস্ত্রী আর ওনার লোকেরা এমনি ই ঘাবড়ে ছিল , কুকুরেরা ওদের অবস্থা আরও খারাপ করে দিয়েছে । কিছু ছেলেরা পাশে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল কিন্তু কিছু বলছিল না, যেন কুকুরেরা আর ছেলেরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে রেখেছিল । কুকুরের চিৎকার শুনে বস্তির লোকেরা, যারা পাশে পঞ্চায়েত এই বসে ছিল , বাইরে বেরিয়ে এল আর বাইরের দৃশ্য দেখে কুকুরদের তাড়াতে লাগল । কুকুরেরা প্রথমে তো একটু থেমে রাগ দেখালো তারপর আবার চিৎকার করতে শুরু করল যেন বলছে আপনারা জানেন না যে এরা আপনাদের আসল শত্রু আমাদের বাধা দেবেন না । অনেক কষ্টে সুযোগ পেয়েছি। বস্তির লোকেরা যখন দেখল যে কুকুরেরা ওদের পাত্তা দিচ্ছে না তখন ওরা লাঠি বের করে আনল। কুকুরেরা যখন দেখল যে নিজের লোকেরাই শত্রু হয়ে গেছে তখন ওরা হাল ছেড়ে দিল আর চিৎকার করতে করতে পালিয়ে গেল , এমন মনে হচ্ছিল যেন যেতে যেতে বলে গেল পরে আমাদের কিছু বলোনা । রাম শাস্ত্রী আর ওনার লোকেরা যেন প্রাণ ফিরে পেল । ওরা সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদের বেপারে নালিশ করল যে ওরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল কিন্তু ওনাদের সাহায্য করেনি । বস্তির লোকেরা ছেলেদের বকাবকি করল আর রাম শাস্ত্রী আর ওনার লোকেদের পঞ্চায়েত এর ঘরে নিয়ে গেল । রাম শাস্ত্রী কে আসে পাশের সবাই খুব ভালো করে চেনে । এতক্ষনে একজন জল নিয়ে এল , পুরোহিত মশাই জলখেয়ে নিন বলে জল তা এগিয়ে দিল । রাম শাস্ত্রীর গলা তো শুকিয়ে গেছিল কিন্তু উনি জল কি করে খাবেন? রাম শাস্ত্রী বাক্যবাগীশ ছিলেন , উনি কথা টা ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন ,


" না এই সময় জল খাওয়া আমার কাছে বিষের সমান ।"

সবাই উনার মুখ দেখতে লাগলেন ! রাম শাস্ত্রী এর পর বলতে গিয়ে হটাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন ।

" ওখানে ভগবান রামচন্দ্রের রথ মুসলমানেরা আটকে রেখেছে আর আমি এখানে জল খাবো, ধিক্কার আমার ওপর , ওই হারামজাদা দের যতক্ষণ না শাস্তি দিতে পারছি আমি অন্ন জল গ্রহণ করবো না ।"

এটা বলতে বলতে রাম শাস্ত্রী হাত নাড়াতে লাগলেন আর ওনার চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরোতে লাগল । এমন মনে হচ্ছিল যদি ভুল করেও কোনো মুসলমান ওনার সামনে চলে আসে তার মৃত্যু নিশ্চিত ।

" তাহলে কাপুরুষের মতো পালিয়ে এলেন কেন? ধরে মারতেন শালাদের , নিজে মরে যেতেন বা ওদের মেরে দিতেন।"

বস্তির লোকেদের প্রশ্ন শুনে পুরোহিত মশাই ঘাবড়ে গেলেন ওনার চোখের আগুন নিভতে লাগল আর হাত ও ঠিক ঠাক হয়ে গেল । উনি বস্তির লোকেদের কাছে এরকম প্রশ্ন আশা করেননি । আসলে রাম শাস্ত্রী আসার আগেই বস্তি তে এই খবরটা ছড়িয়ে গেছিল যে শোভা যাত্রা জন্য মন্দিরের দিকে যে মিছিল টা যাচ্ছিল মুসলমানেরা ওটা কে নিজেদের বাসটি তে আটকে রেখেছে।


"এক দুজন হলে তো আমি সামলে নিতাম কিন্তু ওখানে তো ওদের পুরো বস্তির লোকজন আছে , সেই জন্য আমার হিন্দু ভাইয়েদের একত্রিত করতে এসেছি , সেই জন্যই আপনাদের কাছে এসেছি ।" রাম শাস্ত্রী উত্তর দিল ।

"তাহলে নিজের লোকেদের কাছে গেলেন না কেন? " বস্তির লোকেরা জিজ্ঞাসা করল ।

অন্য কেউ হলে এই প্রশ্নে ভুল করে বস্ত কিন্তু রাম শাস্ত্রী কথায় দক্ষ ছিলেন সেই জন্য সঙ্গে সঙ্গে বললেন ,

" আপনারা তো আমার নিজের লোক তাই তো আপনাদের কাছ এসেছি ।"

প্রশ্ন কর্তা ও কম ছিল না সে কথা টা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বললেন ।


"পুরোহিত মশাই আপনি নিজের পাড়ায় গেলেন না কেন?"

"কেন ওখানে কোন পুরুষ মানুষ থাকে না? যে এখানে সাহায্য নিতে চলে এলেন।"


রাম শাস্ত্রী আর উনার সাথী দের কথাটা গায়ে লেগে গেল , এটা অন্য কোনো জায়গা হতো বা আজকের মতো পরিস্থিতি না হতো তাহলে বস্তির লোকেদের সঙ্গে ঝগড়া নিশ্চিন্ত ছিল । পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে রাম শাস্ত্রী নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রেখেছেন আর চোখের ইশারায় নিজের সাথীদের কে শান্ত থাকতে বললেন ।


রাম শাস্ত্রী জবাব দেওয়ার আগেই আরও একজন মানুষ বলতে লাগল ।

"আরে নিজের পাড়ায় কেন যাবেন, ওখানে তো সবাই সভ্য উঁচু জাতের চাকুরীরত লোক জন আর ব্যবসায়ী লোকজন থাকে । লড়াই করা কি ওদের কাজ ?"

" লড়াই করার জন্য আমাদের মতো ছোট জাতির লোকদের ওরা সামনে এগিয়ে দেয়।"

বস্তির লোকদের প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না রাম শাস্ত্রী আর বস্তির লোকেদের প্রশ্ন শেষ ই হচ্ছিল না ।


রাম শাস্ত্রী বস্তির লোকেদের সব প্রশ্ন উপেক্ষা করে বলতে শুরু করলো ।


"ভাইরা মুসলমানেরা আমাদের হিন্দু ধর্মের উপর হামলা করেছে সেই জন্য আমাদের হিন্দুদের এটা দায়িত্ব যে আমরা সবাই মিলে ওদের একটা শিক্ষা দেওয়া উচিত । আজ যদি আমরা একত্রিত না হই তাহলে ওই দিন দূরে নেই যেদিন আমরা মুষ্টিমেয় হিন্দুদের নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য এই শহর থেকে পালিয়ে অন্য শহরে গিয়ে বাস করতে হবে ।"


রাম শাস্ত্রীর কথা শেষ হওয়ার আগেই একজন বস্তি বাসি উত্তেজিত স্বরে বললো , "তোমরা তো নামেই বন্ধু ।"


"আজকে মুসলমানেরা তোমাদের মেরেছে তাই তোমার আমাদের হিন্দু মনে হচ্ছে , নইলে তোমাদের কাছে আমরা তো আবর্জনা খুঁটে খাওয়া মুচি, নোংরা নালার পোকা যাদের কাছে কেন তোমরা দূর দিয়েও যাওয়া পছন্দ করো না ।"


"আপনাদের মনে হয় কোন ভ্রান্ত ধারনা হয়েছে, আমাদের মনে এরকম কোনো ব্যাপার নেই ।" রাম শাস্ত্রী তোতলাতে তোতলাতে বলল |


"যদি সেরকম কোনো ব্যাপার না থাকে তাহলে বলো রামলীলা কমিটি তে তোমরা কতজন দলিত কে সদস্য বানিয়েছ ?"


" কতজন দলিত কে তোমরা মেলা কমিটির দায়িত্ত্ব দিয়েছ ?" বস্তির লোকেরা প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেই যাচ্ছিল । যেগুলোর রাম শাস্ত্রীর কাছে কোনো উত্তর ছিল না । উনি এটা বুঝতে পারছিলেন না যে এই চামার দের কি হয়েছে ? এতো বুদ্ধি এদের কোথা থেকে এল ? কি হয়েছে এদের যে এরকম কথা বলছে , দলিত দের এই পরিবর্তনের পেছনে কে আছে? উনি বুঝতে পারছেন না । যদি এরা সাহায্য না করে ? এর পরে কি হবে ভেবে রাম শাস্ত্রী ভয়ে পেয়ে গেল । অবশেষে যখন রাম শাস্ত্রী প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার হয়ে গেল আর ওনার মনে হল যে এ ভাবে কোনো কাজ হবে না তো উনি সঙ্গে সঙ্গে বস্তির লোকেদের হাত জোর করে অনুরোধ করতে লাগলেন।


" ভাই সব আমি মানছি যে কিছু ভুল হয়েছে যে গুলো আমাদের এক সঙ্গে বসে আলোচনা করে ঠিক করতে হবে । কিন্তু এটা এসব কথার আলোচনা করার সময় না । এখন আমাদের সামনে যে সমস্যা টা আছে ওটার মোকাবেলা করতে হবে , পরে বসে এসব নিয়ে আলোচনা করবো ।”


রাম শাস্ত্রীর এই কথায় কিছুক্ষনের জন্য সবাই নীরব হয়ে যায়, বস্তির লোকেরা নিজেদের নেতার দিকে তাকিয়ে থাকে । রাম শাস্ত্রী মনে মনে খুশি হলেন যে এবার কাজ টা হয়েই যাবে মনে হয়, এখন ওই মোল্লা দের সঙ্গে বোঝা পড়া করে নেই পরে এদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নেবো ।


বস্তির নেতা যে এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিল নীরবতা ভেঙে বলতে শুরু করলেন ।


"রাম শাস্ত্রী মশাই আমরা বস্তির লোকেরা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোচনা করে আগেই কিছু নিয়ম বানিয়েছিলাম| যেগুলো আমরা সব বস্তির লোকেরা মেনে চলি । সেই নিয়ম গুলোর মধ্যে এটাও একটা নিয়ম যে আমার বিনা কারনে কোনো ঝগড়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ব না । চোখ বন্ধ করে কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবো না । এই ধর্ম, এই মন্দির আপনাদের উঁচু জাতের লোকেদের শখ । আমাদের জন্য তো পেট আগে তার পর শখ, আমরা আমাদের বাচ্ছাদের ভালো শিক্ষা দেব এরকম প্রতিজ্ঞা করেছি । যেটা বাবা সাহেব এর বলে যাওয়া পথে নিশ্চই পূরণ করবো । ধর্ম যেহেতু আপনাদের উঁচু জাতির লোকেদের সব সময় সুবিধা দিয়েছে সেই জন্য ধর্মের রক্ষা করা আপনাদের কর্তব্য আমাদের না । আমরা এই লড়াইয়ে আপনাদের সঙ্গে নেই ।"




bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.