১১ অক্টোবর

পুকুরের এই ঘাটে অনেক দিন তেমন কেউ আসে না। আজ জুঁই এসে বসেছে। আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না কেন জুঁই হঠাৎ আমাদের এখানে এলো। আমি একজন ফেবু কবি বলতে পারেন। তবে তেমন নাম বা গুণ নেই। কেউ কেউ বলে আমি লিখতে পারি। তবে আমার বিশ্বাস হয় না নিজের উপর। মানবীর রয়েছে। ও একজন রিপোর্টার। লেখে। প্রতিবাদী নারীশক্তির কথা বিশেষ ভাবে বলতে ভালোবাসে। তাতে নানা বিপদেও পরে, তারপর আবার ঘুরে দাঁড়ায়, আমায় সে সব গল্প শোনায়। আমি কবিতার ভাবুকতায় লিখে ফেলি সে সব কথা।

- কি হলো আমার গায়ে গা ঘেঁসে বসলি কেন?

~ এমনি, ইচ্ছে হল তাই...কেন তোর অসুবিধা আছে!! তাহলে সরে যাচ্ছি।

- না কেউ তো আমায় পাত্তা দেয় না, তাই বলছিলাম। তুই আমায় এতো প্রেফার করিস কেন?

~ সব কিছুর কারণ থাকে না। আমার তোকে ভালো লাগে। আমি তোকে ভালোবাসি। আমার কষ্ট দুঃখগুলো তোকে বললে মনটা হাল্কা হয়ে যায়।

- সে তো বুঝলাম। কিন্তু আমি তো তোর যোগ্য না।

~ এবার ঠাস করে মারব। তোকে এত ভাবতে হবে না। আমার যা ভালোলাগে সেটা করব।

- এই পুজোর সময় এখানে এলি কেন? কলকাতায় কত পুজো। কত আনন্দ। কত আড্ডা। তারপর তুই রিপোর্টার। কত প্যান্ডেল। তারপর তোর প্রেস কার্ড রয়েছে। ভিআইপি হয়ে কত পুজোর বিচারক হতে পারতিস। তুই পাগলি, এখন তুই আমার পাশে বসে আছিস।

~ আমার শান্তি চাই। ভিড় নয়।

- এই পুকুর আর আমি কি শান্তি!!

~ না, শান্তি হল তোর স্পর্শ। জানিস আমি কত কঠিন একটা জীবন পেরিয়ে এসেছি। আজও কাজের জায়গায় রোজ কত লড়াই চলতে থাকে। তোকে তো বলি সব। কতটা কঠোর হয়ে আমায় থাকতে হয়। সমাজ যে দ্রুত মনোবিকার গ্রস্থ হয়ে উঠেছে।

আমি আর নতুন করে কি বলব চুপ করে গেলাম। ও টুপ টাপ করে শিশিরবিন্দুগুলো মাটিতে পড়ার আওয়াজ শুনছে। জল দেখছে। আমার গন্ধ শুকছে। বসে আছে জড়িয়ে।

(২)

গ্রামের এই সময়ে এত কাশফুল ছড়িয়ে থাকে যে মনে হয় ক্যানভাসগুলো ভরিয়ে তুলি, কিন্তু সেই ক্যানভাসে যখন দেবী ভয়ংকরী এসে হাজির হয় তখন ভীষণ চিন্তা শুরু হয়। এখন সেলফি যুগ, সকলেই আধুনিক-আধুনিকা। তবু আমার বন্ধু এক রিপোর্টার, তাও আবার দেখতে সুন্দরী, এসেছে পুরোনো দিনের গ্রামের বাড়িতে দুর্গা পুজোর সময়। তাই সকলে আমায় প্যাক দিতে বাকি রাখছে না। আমার মনের মধ্যেও বেশ ঢ্যাং কুড়া কুড় হচ্ছে।

ভালই লাগছে। শাড়িতে বেশ দেবী দেবী লাগছে। তার উপর আমার কাকীমা সোনার গয়না, পায়ে আলতা লাগিয়ে দিয়েছে। উফ, ফাটাফাটি।

আমি তো মৃন্ময়ী দেখব না নতুন আগমনীকে দেখব বুঝতেই পারছি না। ফিল করছি প্রেম। দুগ্গা পুজোয় এই গ্রামে যে ম্যাডাক্সের মতো অনুভূতি আসতে পারে সেটা ভেবেই বেশ ভালো লাগছে। ও মাঝে মাঝে আমায় দেখছে। হাসছে। আবার চলে যাচ্ছে। আমিও লুকিয়ে লুকিয়ে...

এসব প্রেমের মিষ্টি গপ্প তো কতই শুনেছেন, জেনেছেন আসুন যে সমস্যায় আমার কয়েদিন কাটল সেটা লিখি -

বেশ সুন্দর সপ্তমীর দিনটা কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু বিকেলে হঠাৎ কান্ড হল। মায়ের নাকের থেকে হীরের নাকছাবি উধাও।

রহস্য গল্পের শুরু সেখান থেকেই। তবে আমি এখানে অ্যাসিসটেন্ট। দায়িত্বটা জুঁই নিজের কাঁধে তুলে নিল। সে বলল এই রহস্যের সমাধান সে বিজয় দশমীর মধ্যে ১১ অক্টোবরের মধ্যে সমাধান করবেই। আমার তো এক বাড়ি লোকের সামনে শুনে মাথায় হাত। সম্ভব নাকি এই নাকছাবি খুঁজে বের করা!!

পাগলিটা এখানে এসেও আমার মাথায় ভাঁজ ফেলে দিল। ও কি এখন সবাইকে জেরা করবে, সকলেই এই বাড়িতে পুজোর সময় একত্রিত হই। সকলেই তো বাইরে কাজে থাকে। আমি না হয় বেকার কবি, তাই এই গন্ডগ্রামে থাকি। কিন্তু এই বাড়ির বড়দের যে একটা ইমোশন রয়েছে, ইগো আছে কিছু গুরুজনের। জুঁই সেটা শুনে হাসল। বলল “আমি থাকতে কারওর কোনও অপমান হবে না।”

তার মধ্যে আরেক সমস্যা। গ্রামের কিছু মানুষের দল এসে হাজির। আমি যে অবাধ যাতায়াত করি আদিবাসীদের গ্রামে, তারাও যে দুর্গা মায়ের প্রসাদ খেতে আসে, সেই বিষয়ে তাদের আপত্তি। তাদের বক্তব্য ঐ আদিবাসীরা এক সময় ডাকাতি করত। রঘু ডাকাতের মতো তারাও এই বাড়ির জিনিষ লুঠ করেছে, তাদের এই বাড়িতে ঠুকতে দেওয়ার চলবে না। আমার এক কাকা জানিয়ে দিল এখন সময় বদলেছে। মানুষের রক্তের রং লাল। তাই মানুষকে অবহেলা করার কোনও স্থান নেই। সুন্দর এক পরিবেশে সকলে মিলে এই দুর্গোৎসব করব। লোকগুলো এতটাই বদ যে বলে ওদের জন্য মায়ের নাকছাবি চুরি গেছে তাই আদিবাসীদের আসতে দেবে না। বিষয়টা আমার একদম ভালো লাগেনি। জুঁই বলে আমরা আমাদের বাড়ির পুজোতে সকলের জন্য দরজা খোলা রাখব। সকলের অধিকার রয়েছে মায়ের ভোগ গ্রহণ করার। মা নিচু-উঁচু, জাত-পাত, ধর্মের ঊর্দ্ধে। মা বছরে একবার আসেন। তাই এই সমস্ত করে উদযাপনের পথ বন্ধ করার কোনও মানে হয় না। গ্রামের কিছু লোক অসন্তুষ্ট হন।

পুলিশে জানানো হয়েছিল। থানার মেজবাবু এসে সব দেখে গেলেন। সকলকে জিজ্ঞাসাও করলেন। সকলে বিব্রত বোধ করলেও জবাব দিলেন। আসলে যে সময় আমি শেষ ছবি তুলেছিলাম তখনও নাকছাবি ছিল। তখন সপ্তমীর দুপুর দুটো দশ মিনিট আটত্রিশ সেকেন্ড। তারপরেই সেটা নেই।

এই বাড়ি তো গ্রামে। সিসিটিভি নেই। এত বছর ধরে এত গয়না পরিহিত অবস্থায় থাকে। তাই দামী গয়না থাকলেও এই রকম একটা কিছু ঘটবে কেউ ভাবতেও পারেনি। মজার বিষয় সমস্ত গয়না রয়েছে মায়ের অঙ্গে। শুধু নাকছাবিটাই নেই। যে নিয়েছে সে ইচ্ছে করে নিয়েছে জিনিসটা।

(৩)

আমি মরছি আমার জ্বালায়। আর জুঁই এসে বলে আদর করো। আমি মনে করিয়ে দিলাম নাকছাবি...তদন্ত। আর সময় নেই। ও সে কিছু শুনবে না। অজস্র আনন্দ যেন ওর সারা শরীর জুড়ে। আমার বুদ্ধি চেতনাকে গ্রাস করছে কাম চেতনা। আমিও ওর ছবি তুলছি। হাসছি। ওর চুলটা ঠিক করে দিচ্ছি। ও নিজেই আমায় জড়িয়ে বাঁচতে চাইছে।

সে তো যৌবনের ধর্ম। ভালবাসার অনন্ত এক পথ। সব বুঝলাম কিন্তু নাকছাবির কী হবে বুঝতে পারছি না। অষ্টমী পুজো হল। তারপর নিয়ম মেনে লাউ বলি ও সন্ধিপুজো। কিন্তু মনের মধ্যে প্রশ্ন। চোর শুধু ঐ টুকু নিল। তারপর....আর কিছু কি চুরির সময় পেল না! তাহলে তো নিচের দিকের গয়নাগুলো আগে খুলত। মাঝখান থেকে উড়ে এসে...আমি যখন এই সব ভাবছি জুঁই হঠাৎ আমায় কানের কাছে এসে বলল খড়-কুঁটো। খড় দিয়ে কী হবে? বাসা বাধব তোমার সাথে। আসলে পুজোর সময় পুরোহিত খড় দিয়ে হাত আংটি তৈরি করে বিষ্ণুকে কল্পনা করে। সেটা দেখেই ওর মাথার মধ্যে বুদ্ধিটা এলো।

আমি বললাম – তোর খুব প্রেমে পেয়েছে! পারবি আমার মতো পাগলের সাথে ঘর করতে?

~ পারব গো পারব। তুমি আমার সব। তোমাকে ছাড়া আমি অপূর্ণ।

- সব জানি, বিয়ের দু’দিন পর হাফিয়ে উঠে বলবি ডিভোর্স।

~ মায়ের সমানে কেউ এসব বলে!! ঠাস করে মারব। আমি রণচন্ডী হলে কিন্তু তোর বুকের উপর মা কালী হয়ে দাঁড়িয়ে যাব।

- সে তো তুই এমনি দাঁড়িয়ে। হঠাৎ খড় দিয়ে ঘর কেন?

~ কারা খড়-ডাল দিয়ে বাসা করে...তাহলে নাকছাবিও নিয়েছে পাখি, ভাল করে দেখ আমার আখি...লেন্সটা কেমন লাগছে?

- হেব্বি...আমার তো তোকে চুমু খেতে ইচ্ছে করছে কোলে তুলে...

~ খুব দুষ্টু হয়েছিস, বলে আমার গাল দুটো টিপে দিল।

আমিও আসতে আসতে লোক চক্ষুর আড়ালে নিয়ে গেলাম পাগলিকে...এ পাগলি শুধু আমার পাগলি। জন্মান্তর আছে কিনা জানি না তবে এ তুমি শুধু আমারই তুমি...হ্যাটস অফ কবীর সুমন।

(৪)

নবমী নিশি ভালোমন্দতে গেল। পুলিশ এসেছিল। তারা নাকি দুটো ছিচকে চোরকে ধরেছে। সেগুলোই নাকি চুরি করেছে বলে সন্দেহ। এদিকে তারা তো স্বীকার করছে না। স্বাভাবিক। চুরি তো কে করেছে কেউ জানে না। হীরে বলে কথা। বেঁচতে পারলে অনেক লাভ।

কিছু মানুষের দল আদিবাসীদের সন্দেহ করছে। এবার ফসল ভালো হয়নি। তাই এই প্রচেষ্টা। আবার আমার বাড়িতে কিছু বোদ্ধার সন্দেহ জুঁই নাকি চুরি করেছে। দশমীর দিন বের করে ক্রেডিট নেবে। ও শুনে খুব হেসেছে। ও জানে এটাই জীবন। মানুষ, মুখ ও মুখোশ। বাঙালি জীবনে হিংসের এতোটা আধিক্য সব সময় নেওয়া যায় না। তবু ও অবলীলায় এই অন্ধকারকে শোষণ করে নেয়। নতুন চেতনার প্রকাশ ওর মধ্যে রয়েছে। নব ভাবনার উন্নতশীল এক প্রকাশ। স্নিগ্ধ আলোড়নে এ এক অপূর্ব বোধনের জ্যোতি। উজানের স্রোত বেয়ে এগিয়ে চলেছে নারী। আমার নারী। আমার কল্পনা থেকে বাস্তব। আমার জুঁই।

জুঁই বলল ~ কিছু খুঁজে পেলি! হাদু। এদিকে আয়। তোকে আদর করলে, তোর আদর পেলে মাথাটা খুলে যায়। আর নেশাতুর হয়ে যাই। দেখ এখানে এসে থেকে সিগারেটও খাইনি। যখনই কেমন কেমন করেছে তোর কাছে চলে গেছি। ব্যাস সব ঠিক। তুই আমার প্রাণ। তুই আমার জীবন। ইস এত দিন তোকে চিনি, এটা ভেবেও দেখিনি।

- বুঝলাম।

~ কিরে ব্লাশ করছিস কেন মেয়েদের মতো! লাল হয়ে গেল গাল দুটো। সু স্যুইট...

- প্রেম পড়ে হবে, রোম্যান্টিকতার আড়ালে ট্রাজিক দশমী আসছে। আমার মাথাটা পাগল পাগল লাগছে। তুই কী করবি কিছু ঠিক করলি। তোকে সন্দেহ করছে বাড়ির লোক। আবার ওদিকে আদিবাসী। আদিবাসীদের ধরব কি করে!!

~ আসুক। কাল সকালটা শুধু হতে দে।

- কেন কাল সকালে তুই কী করবি?

~ হিঃ হিঃ হিঃ তোকে আদর করব।

(৫)

বাড়িতে অনেক পায়রা, চড়ুই রয়েছে। অন্যান্য গাছে কাকের বাসাও আছে। একটা চড়ুইয়ের বাসা থেকে ভোরের সূর্যের আলো বেরিয়ে আসছে বেশি। দশমীর সকাল বিষাদময়। মা চলে যাবে। তার উপর আবার নাকছাবি পাওয়া যাচ্ছে না। কী মুশকিল বিষয়। জুঁই ঐ আলোটা লক্ষ্য করছিল। তাই আমায় মই ধরতে বলে নিজেই উঠল বাড়ির সাইডে একটা পাঁচিলের কোণায়। আমি বললাম পারবি না, আমি উঠছি। গিয়ে একটু ঘাটাঘাটির পর দেখে তার ভিতরে নাকছাবি। নেমে এলো। বলল “কী বলেছিলাম না... ১১ অক্টোবরে পাবোই, কেমন মজা...”

চারিদিকে এক আলোময় আভা ছড়িয়ে পড়ল....অন্ধকারময় এই সমাজে যেখানে নারীদের নির্যাতিত হতে হয়, আমিও হয়তো আমার মায়ের উপর মানসিক নির্যাতন করে ফেলি...সেখানে দাঁড়িয়ে জুঁই এক সুভাষিত জ্যোতি। এক আলোকশিখা। অমরত্বের আত্মবোধনে নারীশক্তি মহামায়ার প্রাণশক্তি যেন ওর ভিতর বিরাজ করছে। এই মূর্ত নারী যেন বুদ্ধি, অহং, মনের ঊর্দ্ধে নতুন এক পুণ্য আবেশ। ভালবাসা, শাসন সবেতেই আমার কবি জীবনের নতুন অধ্যায় সূচনা হল, আজ থেকেই...

আজ আমার জন্মদিনের দিনে যে এত সুন্দর এক উপহার আমি পাবো ভাবতেও পারিনি। জুঁই যখন এসেছিল তখনই বলেছিল এবার তোমার জন্মদিনে একটা উপহার দেবো। কিন্তু সেটা নাকছাবি উদ্ধার বুঝতেই পারিনি। কি কান্ড। তবে জুঁই অপেক্ষা করছিল আরেকটা সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য। বাড়ি ভর্তি সমস্ত লোকের সামনে ঘোষণা করল কেউ বিসর্জন হয়েছে বলে মন খারাপ করবেন না, আজ থেকে বোধন হবে শুরু...“আমিও আপনাদের পরিবারের একজন হব। এই গাধাটাকে বিয়ে করে ঘোড়া বানাবোই”...সকলে তো হেসে কুটোপাটি...আমি মানে ইয়ে...

=============================================================================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.