মাতৃপরিচয়

বাচ্চাটার নরম নরম পাতলা আঙুল গুলো রমিতার গায়ে মুখে খেলা করে বেড়াচ্ছিল অটোর মধ্যে। আগের স্টপেজ টা থেকেই উঠেছে বাচ্চাটা মায়ের সাথে। রমিতা হাত বাড়াতেই দিব্যি তার কোলে চলে এল। মাঝে মাঝে রমিতার মা কনা দেবীর চুড়ি ধরে নাড়ছে। ভারী মিষ্টি বাচ্চা। ওর মা শিখিয়ে দিচ্ছে এটা মাসিমনি, ওটা দিদুন। রমিতাদের নামার স্টপেজ এসে পড়ায় ও বাচ্চাটা কে টাটা করল। বাচ্চাটা মিষ্টি গলায় বলল তা তা মাতিমনি।

নামার পর ভাড়া মিটিয়ে কিছুদূর চলে এসেছিলেন কনাদেবী। হঠাত ঘুরে দেখেন রমিতা নেই। চলে যাওয়া অটো র দিকে শূন্য দৃষ্টি তে তাকিয়ে। ফিরে একটা হাত রাখলেন রমিতার কাঁধে। চমকে তাকিয়ে রমিতা বলল, আমার আর কখনো মা হওয়া হল না। ওর ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা পাতলা হাসি টা এই মুহূর্ত টায় যেন ওর মৃত মনের ছবি বলে মনে হল কনাদেবীর।

অনেক দেখেশুনে ই একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন কনাদেবী আর সরোজ বাবু। কিছু কম রাখেননি করতে। বিয়েতে যতটুকু সাধ্য করেছিলেন। খুব কাছের আত্মীয়ের চেনা সম্বন্ধ। ছেলে ভাল চাকুরী করে। একমাত্র ছেলে। এর থেকে বেশী কিই বা চায় বাবা মা তার মেয়ের জন্য। ছেলের বাড়ির লোক দের ও তাঁদের ভালোই লেগেছিল। রমিতা বরাবর ই আত্মসচেতন মেয়ে। তাই তার বিয়েতে যে পন দিয়েছেন সরোজ বাবু সেটা তিনি গোপনই রেখেছিলেন মেয়ের কাছে।

বিয়ের কিছুদিন কাটার পর ই অত্যাচার টা শুরু হয় রমিতার উপর। তার গয়না সব শ্বাশুড়ী চেয়ে নিয়েছিলেন। রমিতা দিতে আপত্তি করেনি। আসলে কিছু সন্দেহ তার মনেই আসেনি। এরপর ই তার ওপর চাপ আসতে থাকে বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনার। পনের ব্যাপার টাও চাপা থাকে না আর। প্রতিবাদ জানায় রমিতা। ফলাফল স্বামী র হাতে প্রচণ্ড মারধোর। বাচ্চাটা তার ফলেই নষ্ট হয়ে গেছিল রমিতার। ডাক্তার জানিয়েছিলেন সে আর কখনো মা হতে পারবে না। বাপের বাড়ি ফেরা, ডিভোর্স কেস ফাইল এসব আর রমিতার মনে কোন দাগ কাটে নি। তার বাবাই যেখানে তাকে পনে বিক্রি করেছে, সেখানে আর বাইরের লোক কি মর‍্যাদা দেবে তাকে, এমন একটা ভাবনাতেই সে আকণ্ঠ মরে ছিল।

জন্মদিনের সকালে যখন রমিতা মায়ের সাথে বেড়িয়েছিল তখনো ভাবতে পারেনি ওর জন্য কি অপেক্ষা করছে। অটো টা তাই যখন মন্দির এর সামনে না থেমে অনাথাশ্রম এর গেটে থেমেছিল তখন রমিতা অবাকই হয়েছিল। কনাদেবীর হাত ধরে ভিতরে ঢুকল রমিতা। কত আশ্রয়হীন শিশু চারিদিকে। রমিতার চোখ টা অজান্তে ঝাপসা হতে শুরু করল। তার মধ্যেই ও স্পষ্ট শুনল, এই অনাথাশ্রম থেকেই তুই দুটো সন্তান দত্তক নিবি রমি। ওরা শুধু তোর পরিচয়ে মানুষ হবে। রুদ্ধ কন্ঠে রমিতা বলল, কিন্ত আমি যে একা মা। কনাদেবী জোর করে ওর চোখেরজল মুছিয়ে বললেন, পৃথিবীতে মানুষ হতে যে মায়ের পরিচয়ই যথেষ্ট, সেটা কি তুই জানিস না!

=====================================================================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.