নুরুউদ্দিন পাগলা

নুরুউদ্দিন পাগলা

সুধাংশু,

কেমন আছো?ভেবেছিলাম তোমাকে লিখবো!বেশ কয়েকদিন লেখার সময় ই পাচ্ছি না।হ্যাঁ!ব্যস্ততা,যেমন টা হয়ে থাকে।সবার জীবনে।তোমার জীবনেও তো থাকে!কি থাকে না?থাকে তো!সেই ব্যাস্ততাকে নিয়েই আমার বাস,ব্যাস্ততা অপার্থিব অভ্যাস।সময় খুব একটা থাকে না এখন।যতটুকুই ওই পাওয়া যায় চলে আসি বাড়ীতে।ছোটবেলার যে সময়গুলোতে গাছে চড়ে,তেতুল পেড়ে কোমড়ে নুন বেধে রেখে নিয়ে ভর দুপরে তেতুল গাছের মগডালে চড়ে পাকা তেঁতুলকে চব্য-চোষ্য করতাম সেই দিনগুলোকে বড় অনুভবকরি।বাড়ির পাশের পুকুরটাতে প্রায় ই সবাই মিলে যেতাম।পাশাখেলাখেলির মত হরি খেলাখেলি হতো।জলের ভেতর একজনের সাথে আরেকজনের খেলা।নিজেকে লুকিয়ে রাখার খেলা।পৃথিবীতে যখন সবাই একে-অপরকে প্রকাশ করতে চায়,তখন ছোট একটা গ্রামে আমরা নিজেদের জলের তলায় লুকিয়ে বড্ড সুখী ভাবতাম।সেই ফেলে আসা দিনগুলোর মাঝে একটা নতুন রকমের টান খুজে পাই।সেসব তখন ছিলো না,এখন হয়েছে।যা কিছু অতিক্রান্ত হয়ে যায় তার প্রতি মানুষের অপরিসীম ভালবাসাবোধ কাজ করে।অবিচ্ছেদ্য টানের মত।কোরবানি ঈদ প্রায় সমাগত।সে বারও নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছি।ঠিক খুব বড় রকমের একটা অনিচ্ছে থাকার সত্তেও বাড়ি ফিরতেই হল।কাজ জমে গিয়েছিল অনেক।ঈদের ছুটি গলা অব্দি না আসতেই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেল।আর আমিও প্রিয় মানুষটার জন্ম দিনে কিছুই না করতে পারার যন্ত্রণা নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে কেয়া পরিবহণের কাউন্টারে পৌঁছুলাম।হাফ ছেড়েইবললাম। -ভাই!টিকেট আছে?

কাউন্টারে বসা ইয়া ভুরিওয়ালা লোকটা চোখে পড়া চশমাটি সামান্য নিম্নগামী সিঁড়ির মত ঠেলে দিয়ে বললেন, ‘আছে!কিন্তু একদাম ১২০০।যাবেন?গেলে নিতে পারেন।’

-ভাই! আপনারা কি ডাকাত?৮০০ টাকার ভাড়া ১২০০!!!

লোকটি ভ্যাবচাকা খেয়ে বলল ‘আপা! ডাকাত হবো কেন?আমরা কাউন্টার,আপনার টিকিট লাগলে নেন, নাইলে যান।’

এমন দূর ব্যবহার দেখে বুঝলাম!ইন্সে বাত কর না ভি বেকার হ্যায়!ম্যাজিস্ট্রেটী পেলে এগুলোর সতেরোগুষ্ঠি উদ্ধার করব বলে মনে মনে শপথ নিলাম আর নিঃশব্দে অজস্র গালিগালাজ করে মনের খেদ দূর করলাম।অবশেষে আমার ১২০০ টাকা গুণে গুণে তার ডেস্কের উপরে দিয়ে টিকেট নিয়ে গাড়িতে বসলাম।

প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।ইলেকট্রিকের তারগুলোর উপর দিয়ে পাখিরা ঘরে ফিরছে।আকাশে এক টুকরো চাঁদ পাখা মেলতেই বাজি পটকার আওয়াজ আসতে শুরু করল।আর আমি আগামিকাল বাড়িতে গিয়ে কি কি দেখবো আর ঘোরাফেরা করবার জল্পনা-কল্পনা করতে লাগলাম।জানালার খোলা হাওয়ার টানে যেন আমার শৈশবটীকে দেখতে পেলাম।দুর্গাপূজার কিছুদিন পরেই ঈদ হতো।পুজোতে অন্যরকম হয় বাংলাদেশে।বিশেষত,আমাদের এ অঞ্চল টায়। আমাদের এদিকটাতে পুজো বেশি হয় না।তবে যা হয় ঐ বছর ঘুরে মা,পিসি,কাকুদের প্রনাম করা।মুসলমান পাড়াতেই আমাদের বাস।ঈদের দিন দলে দলে লোককে সাদা পাঞ্জাবী পরে ঘোরাফেরা করতো। উৎসবমুখরতা ছাড়িয়ে যেটির জন্য আমাদের চোখ উন্মীলিত হয়ে থাকতো –তা অন্য কিছু!অন্য কেউ!-নুরুউদ্দিন পাগলা।

সেদিন কোরবানির গোধূলির সাথেই সাথেই নুরউদ্দীন কপাটের সম্মুখে দাঁড়ালো।বাড়ির চারপাশ পাখিসব কলরবে মাতিয়ে রেখেছে।আকাশ সহ চারপাশের গাছের পাতায় পাতায় কালিমা লেপটে গেছে।নুরুউদ্দিন আস্তে করে দরজায় টোকা দিল।দরজা খুলল না।আমরা দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।একপাল কাক কা কা ডাকে মাথার উপর দিয়ে দিগন্তের সীমানায় পৌছুলো। শ্যাওলা পড়া ইটের প্রাচীরের দিকে তাকিয়ে রইল। সাহেরা বেগম সান বাঁধানো বারান্দায় বসে কারিকুরারে তরকারি রান্না করছিলেন।দরজায় টোকা পড়ার মাত্র উঠে এলেন।টিনের দরজার মাঝ বরাবর বৃত্তাকার ফুটো দিয়ে বাইরের দিকটা তদারকি করলো।সন্দেহের অবকাশ নেই।টোকা কে দিয়েছে? টোকা কে দিয়েছে?

নুরুউদ্দিন দিয়েছে।

সাহেরা বেগম মাথার উপর ঘোমটা টি টেনে দেয়।দরজার ওই পার থেকে বলল,-কে বাহে?নুরুউদ্দিন!!!নুরুউদ্দিন ফিক থেকে হেসে দেয়। তোতলানো স্বরে বলে,-হ অ অ অ অ অ অ,ফুউউউউউউফুউউউউ,আআআমিইইইই!

-তুই আবার আইচিস?রাগত স্বরে বলে সাহেরা বেগম আহত পাখির মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।

নুরুউদ্দিন ফিক করে হেসে বললেন,”হ ফুফু!কাইল্কা যামু!”

সাহেরা বেগম দরজার ওপার কাঠ হয়ে রইলেন।দরজা খুললেন না।

কয়েকঘণ্টা আগেও নুরুউদ্দিন এই জায়গায় বরাবর দাড়িয়ে ছিল।বামনডাঙ্গায় বেড়াতে এসে ঘুমভাঙ্গার পর পর পশ্চিমের দিকে যায়।পশ্চিমের দিকে যাওয়ার কারণ এই যে,ব্রাশের মাথায় ক্লোজআপ লাগিয়ে বামডান –ডানবাম স্পীডে ব্রাশটা সেরে পা ছড়িয়ে কলের পাড়ে বসে দিনের অর্ধেক কেটে যায়। নুরুউদ্দিনের ব্রাশকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ।সূর্য মাথার উপরে অব্দি না আসা পর্যন্ততার ব্রাশ করা চলতে থাকে।কিছুক্ষণ পর পর হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়ালোকজনের সাথে কুশল বিনিময় করে।নুরুউদ্দিন সামনে এগিয়ে যাওয়ার পর কথকব্যাক্তিশব্দহীন হাসি হাসে।ব্র্যাশ চিবোতে চিবোতে শার্টের অর্ধেক লালায় ভিজে যায়।পিচ্চিপিচ্চি ছেলেরা পেছন থেকে চিৎকার দিয়ে ওঠে ‘নুরুউদ্দিন পাগলা!নুরুউদ্দিন পাগলা”।নুরুউদ্দিন ঈষৎ আড়চোখে পেছনে তাকায়,একটু থমকে যায়।পিচ্চিপাচ্চার দল থমকে যায়।নুরুউদ্দিন ফ্যালফ্যালিয়ে হাসে।থমকে যাওয়ার পিচ্চিরদল লাফিয়ে উঠে বলে “নুরু পাগলা!নুরুপাগলা”তিনবছরের শিশুটিও তিড়িংবিড়িং নাচে আর আধো আধো বোলেবলে, ‘নুওওদিসসপাগগা”

নুরুউদ্দিনের আগমনের খবর ঐ গ্রামে হাসির ঝাঁক বেঁধে উঠত।সবার মুখেরকৌতুকের হাসি দেখা দিত।সেদিন সকালেও পশ্চিম দিকের সরকারি কলের পাড়ে কাপড় ধুতে গিয়ে ১ ঘণ্টা অব্দি সানপাড়ে বসে দুটো চাকা সাবান ১ টা শার্টে ঘষে ঘষে ফেনারাশির দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিল। তৎক্ষণাৎ এক বিবাহিত মহিলা পানি ভরানোর জন্য এসে দাঁড়ালো। নুরুউদ্দিন ফেনারাশি বাতাসে পুট পুট করে ফুটে যাওয়া দেখছিল।পাশে দাঁড়ানো জল জ্যান্ত মানুষের পায়ের শব্দ টের পাই নাই। মহিলা মাথার কাপড় বাঁশঝাড়ের হাল্কা হাওয়ায় উড়ে যায়।মাথার ডগডগে সিঁদুর উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।আর কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে জুবুথুবু হয়ে মহিলাটি বলে,-দাদা!একটু জল নিতাম।

নুরুউদ্দিন আধভেজা পোশাকে দাড়িয়ে পড়ে।চোখ বড় বড় করে বলে, ‘তোমরা হেন্দু!!!’

উচ্চারণের ভঙ্গিমা দেখে মহিলা না হেসে পারলেন নাহ।নুরুউদ্দিন সামনে এগিয়ে এসে বালতি টি নিয়ে চাপকলের কালে রেখে পানি ভরতে ভরতে জিজ্ঞেস করে,“ক্যা!বাহে!তোমার বাড়িটা কোন দিকে?” ওই সামনে, বলে মহিলা জল নিয়ে চলে যায়।

নুরুউদ্দিন ধপ করে সানপাড়ে বসে পড়লো।ফুটে যাওয়া ফেনার অবসাদ থেকে আবার সাবান ঘষতে থাকে।মাথার উপর সবুজ কলাগাছ সগৌরবে সাঁ সাঁ করে উড়তে থাকে।আর কিছুক্ষণ সময় গড়িয়ে যায়।আরেক মহিলা ক্ষণকাল কলপাড়ে দাড়ায়।নুরুউদ্দিন কাপড় আছড়ে আছড়ে তখন তিন ঘণ্টায় পদার্পণ করছিলো।শার্ট বলেই কেবল বেচারা প্রতিবাদ করতে পারে নাই।মানুষ হলে এতক্ষণে হাড্ডি –গুড্ডি অব্দি পরিষ্কার হয়ে যেত।এবার প্রথমার ব্যাতিক্রম হল না।নুরুউদ্দিন ফিকি হাসি দিয়েজিজ্ঞেস করে, ‘ক্যা!বাহে পানি নিবেন?’

মহিলা টর্নেডোর মত বেগে কলপাড় ছেড়ে সাহেরা বেগমের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।গিয়েই বললেন, “কিসব পাগল-ছাগল অতিথি পোষেন?”

তারপর শ্রাব্য-অশ্রাব্য।গ্রাম যেমন ভালবাসার তেমনি বিদ্বেষের ও।ঝড়ের বেগে কিছুক্ষণ ঝগড়া চলল।সাহেরা বেগম সেদিন নীরবে অশ্রুঝরাতে লাগলেন।সলেমান সাহেব চোখ টিটিয়ে দরজা বন্ধ করলেন।সেদিনের পর থেকে নুরুদ্দিনের জন্য দরজা একেবারেই বন্ধ হয়েছিল।আজ বাড়ী ফিরলাম।আবার ও ঈদের ছুটিতে।অতঃপর আজ শুনলাম মায়ের কাছে শুনলাম বসুধার দ্বার ও তার জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।মাঝে মাঝে এমন মনে হলে বেশ মন কেমন করে,কি ই বা ক্ষতি হয়,যদি আমরা একটু সামান্য মানবিক হই বোকা-সোকা মানুষদের কাছে।

ভাল থেকো

ভালবাসা যেনো

লীনা

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.