আবুধাবির হাবু (অণু গল্পের ডালি )

জয়তী চক্রবর্তী ( ভাওয়াল )


অফিসের সামনে থেকে ট্যাক্সি ধরলাম । উঠেই সিটে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলাম । আজ অনেক রাত হয়ে গেল । ড্রাইভারের সিটের পিছনে লেখা ট্যাক্সির নম্বরটা হঠাৎ চোখে পড়তেই চমকে উঠলাম... ডব্লিউ বি- থ্রি নাইন ও থ্রি নাইন এইট টু ! নম্বরের পাশে কালো কালি দিয়ে আরও একটা শূন্য বসানো রয়েছে। বিস্মিত হলাম! ভীষণ চেনা নম্বরটা। ভাবতে ভাবতেই মাথায় এলো। মনে মনে বললাম “ ফেলু মিত্তির! ঠিকই তো! শেষের জিরোটা জেনে বুঝেই জোড়া হয়েছে! কোন রসিক মানুষের কীর্তি।” ইচ্ছে হল পেন দিয়ে লিখে দি “ ত্রি নয়ন ও ত্রি নয়ন একটু জিরো।”

এসব ভাবতে, ভাবতেই পূর্বাশা এপার্টমেন্ট এর সামনে গাড়ি দাঁড়াল।ভাড়া মিটিয়ে নেমে এলাম। এপার্টমেন্ট এর উল্টোদিকে ঝুপড়ি বাজারের মাঝে, হঠাৎ গজানো একটা বাংলো আছে। ফ্ল্যাটের জানলা কিম্বা ব্যাল-কনি দিয়ে স্পষ্ট চোখে পড়ে।

নিছক কৌতূহলে মোরের চায়ের দোকান থেকে টুবলাই খোঁজ নিয়েছে, ওটা নাকি হাবুদার বাংলো। আবুধাবিতে জাহাজে কুকের কাজ করে সে। হাতে সোনার ঘড়ি,চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা, দশ আঙ্গুল ভরা আংটি,গলায় মোটা সোনার শিকল, লম্বা রোগা কালো মুখে সোনালি চমক! প্রতিবার সে রেখে যায় আবার ভরে আনে। এবার নাকি দাঁতও সোনায় বাঁধিয়ে ফিরেছে !

টুবলাই আর আমি এসব দেখে শুনে বেশ রোমাঞ্চিত হই।আর মজা করে বলা বলি করি- চল বিদেশ যাই , ডলার কামাই ,বসে বসে খাই!

সারাদিন হিসেবের গ্যাঁড়াকলে গাড়ি তো দূর,মোবাইল নম্বর মনে রাখতে ইচ্ছে হয় না। তবু ওই গাড়ির নম্বরটা মনে রয়েই গেল।

গাড়িটাকে বেশ কয়েক বার দমদমের গোরাবাজারও সুভাষ-নগরে চোখে পড়েছে। খটকা লাগলো, যখন চোখে পড়লো রোজ হাবু ওই গাড়িটায়! ঘটনাটা খুলে বললাম আমার বর টুবলাই কে । টিভিতে কুমোরপাড়ার মহিলা হোম থেকে কিছু মেয়ের নিখোঁজের ব্রেকিং নিউস দেখে চিন্তিত হয়ে পড়লো টুবলাই ! গাড়িটা আজকাল কালো কাঁচ তুলে সামনের বস্তিতে প্রায়ই যায় আসে। টুবলাই শুনেছে হাবুর ছুটি ফুরিয়েছে। সে ফিরে যাচ্ছে ।মোড়ের চায়ের দোকানের পান্তুকে সোনার কাটা বসানো ঘড়ি দিয়িছে হাবু।তাই তার গুরুর জন্য বেজায় দুঃখ তার।কাউকে ক্যামেরা কাউকে বিলাতি মদ, বিদেশি ডিভিডি দিয়ে বশ করেছে হাবু। সবাই সব জানে কিন্তু কেউ মুখ খুলবে না। সবাই সব জানে কিন্তু কেউ মুখ খুলবে না।

টুবলাই আর আমি স্পষ্ট দেখেছি ব্যাল-কনি থেকে - হাবুর গলি দিয়ে মুখ বাঁধা মেয়েদের দৌড়াতে,থাপ্পড় খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে। আবার ঐ গাড়ি চেপে পাচার হতে।

হাবুর সোনালি চমকের সত্য চোখের সামনে স্পষ্ট হতে থাকে !

মনে সাহস নিয়ে নিউ আলিপুরের একটা টেলিফোন বুথ থেকে প্রথমে একটা বেসরকারি নিউজ চ্যানেলে ও পরে দমদম থানায় ফোন করে টুবলাই। বাকিটা ইতিহাস।

হাবু ধরা পরেছে। ব্যাল-কনিতে দাড়িয়ে কফি খেতে খেতে দেখলাম, হাবুর প্রাসাদ তখনও পুলিশ প্রহরায়...! মনটা হাল্কা হল। আমরা দুজনে কফির কাপ ঠুকে বললাম “ জয় ফেলু মিত্তিরের জয়।”

...............................................................


বিশেষ কথা -

“অফিসের সামনে থেকে ট্যাক্সি ধরলাম । উঠেই সিটে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলাম । আজ অনেক রাত হয়ে গেল । ড্রাইভারের সিটের পিছনে লেখা ট্যাক্সির নম্বরটা হঠাৎ চোখে পড়তেই চমকে উঠলাম...” এবারে শেষ হোক ৫০০ শব্দে রহস্য রোমাঞ্চ।

এভাবেই এক জনপ্রিয় পত্রিকা রহস্যে অণু গল্পের ডালি চেয়ে বসলেন । অবশ্য উদ্দেশ্য ছিল মহৎ । কচি লেখকদের কাঁচা লেখায় মহারাজা সত্যজিৎ রায় বাবুর জন্মদিনে তারে সেলাম জানানো ।

মাথা চুলকে টুলকে মন বলেছে-“ ৫০০ শব্দে রহস্যের জাল সত্যি তৈরি হয় কি ? সমাধান না হয় অনেক দূরের শব্দ!”

ভাবতে ভাবতে এই “আবুধাবির হাবু” জন্মেছিলেন । তখন ও এত অণু গল্পের প্লাবন আসেনি....

.....................................................................................


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.