সকাল সকাল মর্নিং ওয়াক সেরে একরাস কাশফুল হাতে নিয়ে ফিরছি, আমার মা কাশ ফুল খুব ভালবাসে। যেদিন থেকে মা পক্ষাঘাতে হাঁটাচলা ছেড়েছেন, এমন কি কথা বলাও, সেদিন থেকেই প্রতি বছর এই সময়টা এলেই আমি কাশফুল এনে মায়ের সামনে রাখি। কেমন একটা শিশুর সরলতা দেখি আমি আমার মায়ের চোখে

মুখে। পুজো আসছে। আমার কথা না বলা বোবা মাও সেটা বুঝতে পারে।

বাড়ির অভিমুখে ফিরছি, কটা হবে বড় জোর সওয়া সাতটা, পাড়ার মণ্ডপে দেখলাম মঙ্গল দা ইতিমধ্যেই এসে গেছেন, মঙ্গল দা আমাদের পাড়ার পূজোর ঠাকুর বানান, হাতের কাজ খুবই সুন্দর। চোখ এমন আঁকেন, শুধু ইচ্ছে করে যেন তাকিয়েই থেকে যাব। সেই ছোট বেলা থেকেই মঙ্গল দা আমাদের পাড়ার ঠাকুর তৈরি করে আসছেন। ছোট বেলায় এমনো শুনেছিলাম মায়ের মুখে যে মঙ্গল দা এমনই সুন্দর আর প্রানবন্ত ঠাকুরের চোখ আঁকেন যে দশমীর দিন যখন মা বিদায় নেন, তখন নাকি মায়ের চোখ ছল- ছল করে ওঠে। উনি কাঁদতে কাঁদতে মর্ত্যলোক ছেড়ে যান। কাছে গিয়ে বললাম, " কি মঙ্গল দা, এত সক্কাল সক্কাল? কাজের খুব চাপ বুঝি? "

মঙ্গল দা রীতিমত তটস্থ হয়ে উঠলেন, আমাকে তো ছোটকত্তা টত্তা বলে অস্থির। কথায় কথায় জানালেন যে আজ মঙ্গল দা মায়ের চোখ আঁকবেন। তাই সকাল সকাল। ঠান্ডা বেলায় ঠান্ডা মাথায় চোখ না আঁকলে জীবন্ত হয়ে উঠবে না মায়ের চোখ। আচ্ছা ভাল কথা, বলে চলে আসতে যাব মঙ্গল দা কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ছোটকত্তা একটা কথা বলব অপরাধ নেবেন না। মঙ্গল দার বিনয় প্রদর্শনে আমি রীতিমত অপ্রস্তুত। কোনক্রমে বললাম, "আরে না না, বল না কি বলবে, তোমার কথা কোনদিন শুনি নি? সেই ছোট্ট থেকে তোমাকে দেখছি, ছোট তে তুমি ঠাকুর রঙ করতে আর আমরা ছোট ছোট ছেলে মেয়ে রা মিলে তোমার চারপাশে ঘিরে থাকতাম, আর তোমার ছোট ছোট চাহিদার যোগান দিতাম। পান টা, জল টা, কখনো তুলি এগিয়ে দেওয়া, কখনও রঙ গুলে দেওয়া, ছোট ছোট হাতে অনেক কিছুই তো করেছি, আর আজ সেই হাত বড় হয়ে তোমাকে কি ফিরিয়ে দিতে পারে? বল না কি বলবে?"

তাও আড়ষ্ট ভাব কাটতে চায় না মঙ্গল দার। শেষে মণ্ডপের এক কোনের দিকে ইঙ্গিত করে দেখাল আমাকে। ওকে কিছু একটা খেতে দিতে পারবে? মনে হয় ওর বুকের দুধ শুকিয়ে গেছে। বাচ্চাটা না খেতে পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে।

এবার আমার দৃষ্টি গেল মণ্ডপের এক কোনায়। শত ছিদ্র একটা কাপড়। ব্লাউজ আছে কিনা আমার সন্দেহ।মাথায় রুক্ষ শুষ্ক চুলের জটাই বলে দেয় বহু যুগ তেল তো দূরের কথা জলই পড়ে নি। যতটা শীর্ন হওয়া সম্ভব মেয়েটি ততটাই। দেখে মনে হয় বয়স বড় জোর ষোল হবে। কোলে একটা ততোধিক শীর্ণকায় উলঙ্গ মানব শিশু। যদিও প্রথম দর্শনে শিশুটি যে মানুষের বাচ্চা তা বোঝার উপায় নেই। হুঁক বিহীন ব্লাউজের টুকরোর ভেতর থেকে কিশোরী স্তন বেরিয়ে আছে। শিশুটির মুখ সেই স্তনের কাছেই। তরুনীর তাতে কোন ভ্রুক্ষেপই নেই।তবে দেখেই বোঝা যায় সেই স্তনে অবশিষ্ট আর কিছুই নেই। এক বিন্দুও শিশু খাদ্য বেরবে না। সারারাত অঝোর নয়নে বৃষ্টি হয়েছে, তাই বোধ হয় এই মন্ডপের নিচে আশ্রয় নিয়েছে ওরা।

মঙ্গল দা আবার বলল, "ছোটকত্তা, মা তো জগন্ময়ী, তাহলে এদের কে মা কেন দেখতে পায়না বলতে পার? এসব দেখে কিভাবে মা কে জীবন্ত করব বলতে পার? কি হবে মা কে জীবন্ত করে? এদেরকে কে দেখবে বলতে পার?"

তখনন থেকে মেয়েটি আমার দিকে জুলজুলে চোখে তাকিয়ে আছে। এগিয়ে গেলাম কোনের দিকে। দু'হাত ধরে তুলে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলাম। নাহ পারল না। পড়ে গেল। শিশুটিকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারবে না ও। এবার হাত বাড়িয়ে ধুলো কাদা মাখা ঘুমন্ত শিশুটিকে কোলে নিলাম। আর এক হাত বাড়িয়ে বললাম হাত ধরে আস্তে আস্তে আসুন। দেখলাম মঙ্গল দার চোখের কোনটাও চিকচিক করে উঠেছে। মঙ্গল দাকে বললাম, "আজ থেকে তোমার এই জীবন্ত মায়ের দায়িত্ত্ব আমি নিলাম তুমি ওই মাকে প্রান দাও। আশা করি এই বার বিদায় লগ্নে তোমার মৃণ্ময়ী মায়ের চোখ আর ছলছল করবে না। হাসিমুখেই বিদায় নেবেন। মা তো একজনই। একই অঙ্গে হাজার রূপ। এই মায়ের মুখে হাসি ফুটলে ওই মা নিশ্চয় কাঁদবেন না।"

এগিয়ে এসেছি ততক্ষনে অনেকটা। মঙ্গল দা হাসি হাসি মুখে কি বললেন শোনা গেল না বটে। তবে মঙ্গল দার চোখের জলই বলে দিচ্ছিল, তিনি আশীর্বাদই করেছেন। অভিশাপ হয়ত দেননি। হাতে আমার কাশফুল গুলো তখনও ধরা আছে। আমার বোবা মাও নিশ্চয় আজ খুব খুশি হবেন।

-সমাপ্ত-

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.