ম্যানেজার

শেষবিকেলের কলকাতামুখী আপ ই.এম.ইউ লোক্যাল ট্রেন। মাঝারি চাপের ভিড়। নানাশ্রেণীর সাধারণ স্থানীয় যাত্রীদের ভিড়ই বেশি। তাছাড়া মহানগরবাসী কিছু ছোট বা মাঝারি চাকুরিজীবি নিত্যযাত্রী শহরতলি থেকে যথাসম্ভব দ্রুত অফিস সেরে রোজকার মত এইসময়ে যে যার বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন। বড় চাকুরিজীবি যে নেই তা নয় তবে তাঁরা স্বাভাবিক ভাবে সংখ্যায় কম।

এককোণের দিকে এই সাতমিশেলি ভিড়ের মধ্যে বিশিষ্ট ওঁরা চারজন মখোমুখি বসে আছেন। শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার এক প্রান্তিক স্টেশন থেকে ওঠেন বলে প্রত্যহ এই নির্দিষ্ট ট্রেনে ওই নির্দিষ্ট সিটে বসে ওঁরা ফিরে যান মহানগরীতে। ওঁদের কথাবার্তায় ব্যাঙ্কসংক্রান্ত নানা ধরণের প্রসঙ্গ থেকে বোঝা যাচ্ছিল ওঁদের চারজনের প্রত্যেকেই শহরতলির কোন না কোন ব্যাঙ্কের শাখা-ম্যানেজার।

ঝকঝকে মহার্ঘ আধুনিক পোশাকপরা মার্জিত মেদতৃপ্ত চেহারার চারজন সুশিক্ষিত সম্পন্ন বাঙালি ভদ্রলোক পরস্পরের সঙ্গে ফিফটি পারসেন্ট ইংরেজিতে নানাধরণের ভারি ভারি প্রসঙ্গে কথাবার্তা বলে চলেছেন। শহরতলির অশিক্ষিত ভিড়ের মধ্যে ওঁরা যেন এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।

এমন সময়ে একটা ম্যাড়মেড়ে রোগাটে ছেলে, বড়জোর বছরদশেক বয়স হয়তো হবে তার, মাঝারি আকারের একটা পেয়ারার ঝুড়ি মাথায় নিয়ে সেই কামরাতে উঠলো। উঠেই সে তার অনভ্যস্ত ক্লান্ত কচিগলায় একঘেয়ে ভাবে হেঁকে ঊঠলো, -

- দু’টাকায় দুটো করে! – দু’টাকায় দুটো পেয়ারা!

তার পরণে একটা রঙহারা ঢোলা রুগ্ন হাফপ্যান্ট। গায়ে আধমরা হাওয়াই শার্টটার নীচের বোতামটা নেই। আর দরকারও নেই সেটার। কারণ পাশের বোতামঘরটাই ছিঁড়ে গেছে। পরের বোতামটা সাদা, সেটার একদিকে একটু কানাভাঙা। তার উপরের বোতামটা খাকিরঙের, একেবারে গলার কাছেরটা কালো। সেটার বোতামঘর থেকে সেটা আলগা হয়ে খুলে গেছে। হাফপ্যান্টের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসা সরু সরু ময়লাটে দুটো পায়ে দুরকমের বিবর্ণ ফিতে লাগানো ক্ষয়াটে হাওয়াই চটি। মাথার এলোমেলো রুখু চুলগুলো ফ্যাকাসে বাদামি রঙের। অপুষ্টিজনিত শুকনো কচি মুখখানার এখানে ওখানে ছোপ ছোপ ময়লার দাগ।

চারজন ম্যানেজার বোধহয় সামান্য ক্ষুধার্ত ছিলেন। সেই দুটোর সময় সমৃদ্ধ লাঞ্চের পর আর তেমন কিছু খাওয়া হয়ে ওঠে নি। তাকে দেখে একজন সোল্লাসে বলে উঠলেন,-

- লুক! দেয়ার আর ফ্রেশ্ গুয়াভাজ্! ফুল অব প্রোটিন অ্যান্ড ভিট্‌মিন সি! অ্যাই ছোঁড়া! আয়, দেখি এদিকে আয়।

আধঝুড়ি প্রোটিন আর ভিটামিন ‘সি’ নিয়ে সে এগিয়ে এলো ওঁদের কাছে। মাথা থেকে ঝুড়ি নামিয়ে বেশ কষ্টে সে তার প্যাংলা দুটো হাত দিয়ে ঝুড়িটা ধরে থাকলো। কারণ একেবারে নীচে মেঝেতে নামিয়ে রাখলে ওঁদের সমৃদ্ধ ভুঁড়ির জন্য নিচু হয়ে পেয়ারা বাছতে বিশেষ অসুবিধা হবে। ওঁরা চারজনে মিলে যথাসম্ভব ঝুঁকে পড়ে ঝুড়িটা থেকে সাগ্রহে পেয়ারা বাছাই করতে লাগলেন। সেইসঙ্গে চললো অত্যন্ত নায্য দর কষাকষি,-

- দু’টাকায় মাত্র দুটো?

- হ্যাঁ, আজ দুপুরে পাড়া টাটকা পেয়ারা।

- তোদের বাড়ির গাছের পেয়ারা বুঝি?

- আমাদের বাড়ির গাছ! আমরা তো লাইনের ধারে ঝুপড়িতে থাকি। এসবই বাজার থেকে কিনে আনা।

- কিন্তু টাকায় দুটো মানেই তো একেবারে গলাকাটা দাম হাঁকাচ্ছিস রে!

- কী করবো বাবু, অনেক চড়া দামে কিনতে হয়েছে।

- তোদের বাড়ি – ইয়ে ঝুপড়িতে কে কে থাকিস?

- মা, বাবা, একটা ছোট বোন আর আমি।

- তোর বাবা কী করে?

- বাবা খবরের কাগজ ফেরিওলা।

- দু’টাকায় তিনটে করে দে না।

- না বাবু, পারবো না। বাজার বড্ড বেশি চড়া যাচ্ছে।

- পারবি না? তবে দুটো পেয়ারাই নিলাম।

- চারজনে খাবেন, চারটে পেয়ারা নিন।

- নাঃ, যা দাম! দুটোই চারজনে ভাগাভাগি করে খাবো।

সমবেত বাছাবাছির পরে শেষপর্যন্ত দুটো পেয়ারাই তুলে নিয়ে চারজনের মধ্যে একজন ম্যানেজার দু’টাকার একটা কয়েন ছেলেটার হাতে দিয়ে দিলেন। তারপর যথেষ্ট জোরে যথেষ্ট আফশোষের গলায় বলে উঠলেন,-

-হাও স্যাড! লুক দ্যাট বয়! কোথায় এই বাচ্চা ছেলেটা এখন স্কুলে যাবে, খেলবে, দৌড়বে – কিন্তু তার উপায় নেই। হোয়্যাট আ ক্রুয়েল সোসিও-ইকনমিক্যাল ক্যন্ডিশ্যন ইজ রানিং ইন দিস আনফরচ্যুনেট্‌ কান্ট্রি!

ঠিকমত চেষ্টা করলে ছেলেটা হয়তো এই মহামূল্যবান, শিক্ষা-চপচপে, হৃদয়বান কথাগুলোর খানিকটা অর্থ অন্তঃত বুঝতে পারতো। কিন্তু সেরকম কোন চেষ্টা করার বদলে নেহাৎই এক গেঁয়ো অশিক্ষিতের মতো শুধু পেয়ারা বিক্রির চেষ্টায় সে পেয়ারার ঝুড়িটা আবার তার মাথায় তুলে নিয়ে কামরার অন্যদিকে চলে গেল।

সঙ্গে সঙ্গে পেয়ারাগুলো বেরিয়ে এলো। দাম দেওয়া ভদ্রলোকের হাতে কেনা দুটো পেয়ারা ছাড়া একজনের হাতে দুটো, আরেকজনের হাতে একটা পেয়ারা দেখা দিল। চতুর্থজন বোধহয় তেমন দক্ষ ম্যানেজার নন। তাঁর কুন্ঠিত হাত একেবারে ফাঁকা। অন্যরা তাঁর দিকে ভৎর্সনার ভাবে তাকালেন। যিনি দামটা দিয়েছিলেন তিনি অত্যন্ত ভদ্র এবং চাপাগলায় বললেন,-

- ইস! ওকে হাবিজাবি নানা কথাবার্তায় ব্যস্ত রাখলাম, তবু অন্তঃত একটা ম্যানেজ করতে পারলেন না?

============================================================================================================

বর্ষবরণ সংখ্যা কৃষ্টি

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.