কাজটা ছিল চা বাগানের মজুর মুটেদের হপ্তা দেওয়া আর তার হিসাব রাখার। সকাল থেকে কটা লেবার এল কে কতক্ষন কাজ করল তার হিসাব রাখা, পয়সা গোনা । এসব একদম ভাল লাগে না রবিবাবুর । অন্য সবার মত শ্রমিকের মত পয়সা কম দিয়ে বা পয়সা মেরে রোজগার বাড়াতে পারেন না । তাই চা বাগানের সামান্য রোজগারের সাথে উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া গানের সখটুকুও বেচতে হয়েছে।

রেলকলোনীর কটা বাড়িতে গান শিখিয়ে চারজনের সংসার কোনো মতে চলে যাচ্ছিল । পৈত্রিক ভিটের দেড়খানা ঘর নিয়ে বাস । মেয়েটা ক্লাশ এইটে আর ছেলেটা সিক্সে । একটু একটু পয়সা জমাচ্ছিলেন। বাড়িটা সারিয়ে পাশে একটা টিনের চাল আর পাকা দেয়ালের ঘর আর একখানা কলঘর করবেন বলে। মেয়েটা বড় হচ্ছে। এজমালি কলঘরে যেতে অসুবিধা বোধ করে। সুমি বিভাকে বলেছে বেশ ক’বার। সুমিটার গানের গলাটা খুব ভাল।নিজে যেটুকু জানেন তা শেখাতে গিয়ে বুঝলেন। একটু ভাল তালিম পেলে বড় কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আছে । কুচবিহারে একজন শাস্ত্রীয় সংগীত গায়কের কাছে অসুবিধা সত্তেও তালিম নিতে পাঠালেন। বিভার একদম পছন্দ নয় এসব গরীবের ঘোড়ারোগ । সুমিও রোববারের ছুটির দিনটা সেই সকালে আলিপুরদুয়ার থেকে বেরিয়ে গান শিখে যখন ফেরে তখন বেলা গড়িয়ে যায়। তবুও শেষ দুপুরে একসাথে খেতে বসে ক্লান্ত মেয়েটার গানের ক্লাশের গল্প শুনতে শুনতে মেয়েটার মুখে এক অবর্ননীয় ঔজ্বল্য দেখেন। একঝলক ঠান্ডা বাতাস রবিবাবুর হাড়চামড়া সর্বস্ব বুকটা ঠান্ডা করে।

এর ঠিক বছর দুয়েকের মাথায় চা বাগানটা ধুঁকতে ধুঁকতে বন্ধ হয়ে গেল । মেয়েটার মাধ্যমিক পরীক্ষার তিন মাস আগে। দাঁতে দাঁত চেপে চারটে মাস পয়সা রোজগারের চেষ্টা করে গেলেন। দুই একটা টিউশন ছাড়া বিশেষ কিছু সুরাহা হোল না। শরীরটা আর সাথ দিচ্ছিল না। গ্রীষ্মের এক সন্ধ্যায় ক’দিনের জ্বরে ভুগতে ভুগতে প্রায় বিনা চিকিৎসায় রবিবাবু ইহলোকের মায়া ত্যাগ করলেন। ক্রিয়াকর্ম শেষ হওয়ার পর বিভা সবকিছু হিসাব করে দেখলেন রবিবাবু লাখদেড়েক টাকা রেখে গেছেন। তার মধ্যে কলঘরটা হলেও নতুন ঘরখানার ছাদ দিতে পারেন নি। বিভা দুটি ছেলেমেয়েকে নিয়ে অথৈ জলে পড়ল। আত্মীয়স্বজন কেউ আর এমুখো হয় না বাড়ির শরীকরা আগেই সম্মর্ক ত্যাগ করেছে। ভিভা ভাবছে পেটেরদায়ে ওকের বাড়ি রান্নার কাজ নেবে কিনা সে সময় সুমিটা হঠাৎ যেন বড় হয়ে গেল। একদিন সে মা কে বলল

- এভাবে বইস্যা থাকলে হইব না।


- ত কি করব বল ? আমার শরীলে আর জোর নাই যে খেটে খাব। বিভার চোখে জল।


- মা আমি ভাবতেছি কি বাবার টিউশনি গুলান আমি ধইরা নি।


- তুই বললেই কি অরা করতে দিবে ? তাছাড়া তর লেখাপড়া, তার কি হইব ?


- বাবা লোকজনকে বইল্যা বইল্যা দূর্গাপুজা কালিপুজার প্যান্ডালে গান গাওয়াইতো । লোকজন তো চিনে আমারে। সবাই তো হাততালি দিছে তখন।


- দ্যাখ চেষ্টা কইরা । নইলে আমি রান্নার কাজ নিব ।


বিভা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এইটুকু মেয়েকে কেই বা মানবে।ভগবান শেষ পর্য্যন্ত মুখ তুলে চাইলেন। সবগুলো টিউশন না পেলেও, যা পেল তাতে তিনজনের দু’বেলা দুমুঠো ভাত জুটে যাবে । সুমি একটা রোববার দেখে কুচবিহারের উদ্দেশ্যে রওনা হল। গান শেখাটা আর এত খরচ করে চালাতে পারবে না। পৌঁছে একটু অবাক হয়ে গেল। ক্লাস চলছিল তখন । গুরুজী খুব রাশভারী মানুষ । অথচ আজ ওকে দেখে ক্লাশ ছেড়ে উঠে এলেন


- এস মা । চল পাশের ঘরে বসি।


একটু থেমে বললেন


- সব শুনেছি মা । রবিকে চিনতাম। কিন্তু তোমাদের ঠিকানা না জানায় যেতে পারিনি ।

সুমি মুখ নিচু করে বসে আছে । গুরুজী আবার বললেন


- ভবিতব্য মেনে নাও। চরৈবেতিঃ । এগিয়ে চল। এটাই জীবনের সত্য।


- গুরুজী আমার একমাসের বেতন। আমি সামনের মাস থেকে আর.....


- ওটা থাক মা। ক্লাশে যাও। তোমার মধ্যে গান আছে। কিছু হয়ে দেখাও বাবার স্বপ্ন পুরণ কর। আর কিছু লাগবে না আমার।


ক্লাশে বসে সুমি সেদিন ভাল করে গলা মেলাতে পারছিল না। শুধু দু’চোখ জলে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। বাড়ি ফিরে মাকে সব বলল। মা বলল


- তোর বাবা ওপর থেকে সব কিছু করাইতিছে। ভগবানে বিশ্বাস রাখ।


মায়ের চোখেও জল। সবকিছুর মাঝে নিজের অধ্যবসায়ে সুমি মাধ্যমিকটা সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করে গেল। আলিপুরদুয়ারের শ্যামাপ্রসাদ স্কুলে আর্টস নিয়ে ভর্তিও হয়ে গেল। পুজোর ঠিক আগে একদিন সৃজন এল বাড়িতে । সুমির বন্ধু বাবলির কাছে ওর নাম শুনেছে। সুমির ব্যাপারে ওর দুর্বলতা আছে। বাবলির কাছে সুমির খবর নিয়েছে অনেকবার । বাবলি সুমিকে বলেছে সে কথা। ওর বাবার টি এস্টেটে শেয়ার আছে । আরও অনেক বিজনেস আছে । বিশাল বাড়ি। সৃজন পড়শোনার পাঠ চুকিয়ে এখন ঠেকে ঠেকে আড্ডা মেরে আর ক্লাবে মাতব্বরি করে দিন কাটায়। ওকে দেখে সুমির অসস্তি হচ্ছিল । সুমি মাকে এগিয়ে দিয়ে আড়ালে রইল।


- মাসীমা সুমি কোথায়?


- কেন বাবা, আমারে কও?


- না তুমি বুঝবে না । সুমিরে ডাকো । এগ্রিমেন্টের ব্যাপার আছে। ওকে পুজোর পোগ্রামে আটিস্ট বানাবো।


- আরে মাসিমা, আমরা বিনা পয়সায় গাওয়াইবো না । পাঁচ হাজার টাকা দিব অরে।


ওদের একজন বলে উঠল। কথাগুলো সুমি আড়াল থেকে শুনছিল। বিরক্ত লাগছিল তাও টাকার অঙ্কটা শুনে সামনে এল।


- আমি গাইব। কবে হইব?


মা কে কিছু বলতে না দিয়ে সুমি বলে উঠল।


- অক্টোবরে, দশমীর পরের দিন।


কথাটা বলেই সৃজনরা বেড়িয়ে গেল। টিউশন থেকে যা আসছে, তাতে দুটো ভাত ডালের জোগার কোনোমতে হয়ে যায়। পু্রোনো বইও চেয়েচিন্তে জোগার হয়ে যায়। কিন্তু সামান্য কাগজ, খাতা, পেনের বা সামান্য জামাকাপড়ের জন্যও বাবার সামান্য জমানো টাকায় হাত পরে।

পোগ্রামের সাতদিন আগেই ওরা সুমির মায়ের হাতে টাকাটা এডভান্স দিয়ে গেল। সুমির কেমন যেন লাগছিল। তবু পুজোর জামাকাপড় গুলো কিনতে পারলো বলে খুশীই হল সে। প্রোগ্রামের আগে সুমি গুরুজীর সাহায্য নিয়ে গানগুলো খুব যত্ন করে তুললো। ওরা সুমির জন্য পুরো একটা ঘন্টা বরাদ্দ রেখেছিল। প্রোগ্রামের পর সবাই মুর্হুমুহু হাত তালিতে ফেটে পড়ল। সুমির মায়ের চোখে আনদাশ্রু। সুমির বাবা তো এই চেয়েছিল। সৃজনও নিজে এসে বাহবা দিয়ে গেল। বাড়ি ফিরে সুমি বাবার ফোটোর সামনে দাঁড়াল চোখে জল। এই সাফল্যে যে মানুষটা সবচেয়ে বেশী খুশী হোতো সেই আজ নেই। ভাই বলল


- দিদি তুই কাঁন্দিস না। তুই আজকে সেই গাইছিস। সবাই বলতেছিল।


সুমি ভাইটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল। অনুষ্ঠানের করে সুমির বড় লাভ হল। একসঙ্গে প্রায় দশটা নতুন গানের ছাত্রী পেল সে। মাসে প্রায় তিন হাজার টাকা বাড়তি রোজগার। একটু পরিশ্রম বাড়ল। তবু সে খুব খুশি। পাঁচ ছয় জনের গ্রুপ করে বিভিন্ন বাড়িতে শিখিয়ে বেড়ায়। কিন্তু নতুন একটা সমস্যা সুমিকে আঘাত করল। পাড়ার সব রাস্তার মোড়ে মোড়ে সৃজনকে বাইক সহ দেখা যেতে লাগল। সুমির টিউশন আসা যাওয়ার পথে, বাইক নিয়ে ওর সাইকেলের সঙ্গে যেতে যেতে গায়ে পড়ে কথা বলা শুরু করল। সুমি লোকলজ্জা, ভয়ে অস্থির হয়ে যাচ্ছিল। একদিন মাকে সব খুলে বলল। পুরনো স্কুটি কেনার পরামর্শটা বিভাই দিল। সুমিরও মনে ধরল কথাটা। সাইকেলের দোকানের মনাদার প্রচেষ্ঠায় সস্তায় একটা সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ী কিনে ফেলল সে। তাও মাত্র ছ’হাজার টাকায়। বাবার টাকাটা ভেঙ্গে বাবার শুরু করা অসমাপ্ত ঘরটা শেষ করল। ‘রবীন্দ্রনাথ স্মৃতি সঙ্গীত বিদ্যালয়’ শুরু করল সে । শুধু রেলের অফিসার্স বাংলোর মোটা বেতনের টিউশন গুলো স্কুটি নিয়ে যাতায়াত করতে লাগল। সৃজন মাঝে মাঝে পিছু ধাওয়া করলেও, সুমির নাগাল সেভাবে পেল না । সুমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

সেদিন সকাল থেকেই অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হচ্ছিল। সুমির বিকেলের গানের ক্লাশে কেউ এল না । সন্ধ্যের দিকে বৃষ্টিটা কিছুটা ধরে এল। সুমি রেলের অফিসার্স কলোনীর একটা টিউশন যাবার জন্য তৈরী হচ্ছিল। বিভা এসে বলল

- মা’রে, যাস কোথায় ?


- টিউশন যাইতেছি।


- এত রাতে ? মানে বৃষ্টি বাদলার দিন তো তাই বলতেছিলাম।


- না যাইলে পেট চলব ? এই একটা টিউশনই মাসে হাজার টাকা দেয়। তুমি কবে যে

বুঝবা !


সুমি বেড়িয়ে গেল। বাইরে বেরিয়ে দেখল চারদিক ভীষন ফাঁকা ফাঁকা ।রাস্তা ভেজা তাই নতুন হাতে জোরে স্কুটিও চালাতে পারছিল না। ডি আর এম অফিসের পাশে তেলে ভাজার দোকানে কয়েকটা ছেলে। পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখল সৃজন বাইকে বসে আছে। আরো কিছুটা গিয়ে হঠাৎ দেখল সৃজনও বাইক নিয়ে পাশে পাশে চলছে। সুমি গাড়ীর গতি বাড়াল। বাইকের গতিও বাড়ল।কিরে আমায় এভয়েড


- করতেছিস ? তুই বুঝিস না আমার মনের কথা ?


সুমি ভালই বোঝে। এই সব বাপের পয়সায় ফুটানি মেরে বেড়ানো ছেলেগুলোকে সে ভালো করে চেনে। সুমি দাঁতে দাঁত চেপে রইল।


- তরে আমি বড় আর্টিস্ট বানায়ে দিব। ‘মা কসম’ বলতেছি।

সুমি ব্রেক কষে গাড়ী দাঁড় করে দিল। বলল


- বুঝছি। আর কি বলবি বল ?


সৃজনও একটু থতমত খেল।


- না মানে তরে দিয়া বিরাট ফাংসন করব। মোটা টাকা পাবি।


সুমি দুইহাত জোড় করে বলল


- একখান কথা কই ? তরে আমার জন্য আর কিছু করতে হইব না। আমি ভদ্দর লোকের মাইয়া। তোর সাথে দেখলে লোকে অন্য কিছু ভাবতে পারে।


সৃজন বলল


- এটা তর শেষ কথা।


- আরও কিছু শুনতে চাস ?


- ভুল করলি তুই, পরে পস্তাবি।


সুজন সাঁ করে বাইক নিয়ে চলে গেল। সুমি টিউশনটাও ঠিক করে করতে পারল না । বাড়ি ফিরে কিছু না খেয়ে শুয়ে পড়ল । বিভাও কিছু খেল না । রাতে মেয়ের পাশে শুয়ে বিভারও এক অজানা আশঙ্কায় ঘুম আসছিল না ।


- সুমি, মা’রে ঘুমায়ে পড়ছিস ?


- না বল, আমি জাগনা আছি ।


- কি হইছে। বলবি না আমায় ?


- কিছু না।


সুমি একটু থেমে আবার বলল


- সৃজনটার সাহস দিন দিন বাড়তিছে। আজ আবার ডি আর এম অফিসের ওখানে ধাওয়া করছিল। আমি দিছি আচ্ছা করে। আবার থ্রেট দেয়।


- মা অরা কিন্তু পয়সাওয়ালা। মুখ লাগতে যাস না।


- বেশী বাড়াবাড়ি করলে ওরে মাইরে, নিজে গলায় দড়ি দিব।


বিভা অন্ধকারেই সুমির মুখ চেপে ধরে, ফুপিয়ে কেঁদে ফেলল। সন্ধ্যার দিকে টিউশন যাবার সময় নির্জন রাস্তায় সুমির ক’দিন গা ছমছম করছিল। কিন্তু সৃজন কে আর দেখতে পেলনা । প্রায় একমাস পরে একদিন হঠাৎ সে সুমির সামনে পড়ে গেল। সৃজন বাইক ঘুরিয়ে চলে গেল। দেখতে দেখতে সুমির উচ্ছমাধ্যমিক পরীক্ষা এসে গেল। সুমি ‘পি ডিভিশনে’ কোনো মতে পাশ করল । সুমি বুঝতে পারছিল এই পড়শোনায় ভবিষ্যতে চাকরী পাবার কোনো সম্ভাবনা নেই । গানের উপর নির্ভর করে মা আর ভাইকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কলেজে ভর্তি হলেও ক্লাশ বেশী না করে গান শেখা আর গান শেখানোয় মনোযোগ দিল ও।

নভেম্বরের শেষ দিক এক শীতের রাতে ফাঁকা রাস্তায় সুমি গান শিখিয়ে ফিরছে । হঠাৎ দেখে সৃজন তার বাইক নিয়ে ওর গাড়ীর পাশে। চমকে গিয়েও নিজেকে সামলে নিয়ে স্কুটির গতি বাড়ালো। সৃজন বাইক নিয়ে ওর গাড়ির সামনে এসে সুমিকে দাঁড় করিয়ে দিলো । সুমি এই ঠান্ডায় ঘামতে লাগলো । শিরদাড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে যাচ্ছে। সৃজন বলল


- সামনে মঙ্গলবার মানে ৪র্থ ডিসেম্বর ইন্সটিউট হলে ‘আমার বাংলা’ টি ভি র ‘গানের ভুবন’ প্রোগ্রামের অডিশন আছে। আমি লাইন রাখব তুই সকাল আটটায় চইলা আসিস ।


- আমি যাইব না। তুমি কি আমার গারজেন ? আর আমি যাইব, না যাইব তুমি বইলবার

কে ?


- কেউ না, হইছে ? চইলা আসবি। এই সুযোগ বারবার আসে না।


সৃজন চলে গেল। সুমির সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছিল। চার তারিখ সকালে সুমি কলেজ যাবার জন্য তৈরী হচ্ছে। একটা ওর ভাইয়ের বয়সী ছেলে কড়া নাড়ল দরজার।


-দিদি ন’টা বাইজা গেছে। দশটায় কম্পটিশন শুরু। তুমি শিগগির চলো।


- আমি যাইব না।


- দিদি চলো, সৃজনদা কাল রাত বারোটায় লাইন দিছে । তাও আট নম্বরে লাইন পাইছে। চলো না দিদি...


ছেলেটার গলায় আকুতি। সুমি মাকে বলে স্কুটি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল। পৌঁছে দেখে চারিদিক লোকে লোকারণ্য। অনেক দূর দূর থেকে লোক এসেছে। ছেলেটা ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেল। ওকে দেখেই সৃজন বিদ্ধস্ত চেহারায় ওকে লাইনে ঢুকিয়ে দিয়ে বেড়িয়ে এল । দাঁতে দাঁত চেপে বলল


- কম্পিটিশন শেষ না কইরা বার হলে, আমি তর ঠ্যাং ভাইঙ্গা দিব।


সৃজন হনহন করে ভীড়ের মধ্যে চলে গেল। প্রথম রাউন্ড সুমি অনায়াসে পার করে দিল । জাজ’রা খুব প্রশংসা করল। দ্বিতীয় রাউন্ডের জন্য চলিশ জন বাছাই হয়েছে। প্রায় তিনটে বাজে। ভাই একবার দূর থেকে দেখে গেছে। সুমি দেখে সেই ছেলেটা হলের মধ্যে এসে ওকে একটা প্যাকেট দিয়ে গেল। বলল


- তোমার রাত হইয়া যাইব। তোমার বাড়িতে আমি খবর দিয়া দিবনি।


সুমি প্যাকেট খুলে দেখে কেক কলা আর একটা জলের বোতল। ক্ষিদেও পেয়েছিল। দ্বিতীয় রাউন্ডে পুরো একটা করে গান গাইতে হল। শেষ হল রাত দশটায়। সুমি থার্ড পজিশন পেল। দশজন যাবে পরের রাউন্ডে শিলিগুড়িতে। বাইরে এসে দেখে মা এসেছে। সঙ্গে ভাই আর সেই ছেলেটা টোটো নিয়ে এসেছে । বাড়ি ফিরে খেয়াল হল ছেলেটার নামই জিজ্ঞেস করা হয়নি


- ভিতরে আয় । কি নাম তর ?


- বিজন। আজ যাই রাত হইয়া গেছে। পরে আসবখন।


সুমি পয়সা দিয়ে টোটোওয়ালাটাকে বলল বিজন কে বাড়ি পৌঁছে দিতে। বিজন না না করতে করতে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল। পরদিন রবিবার। সুমি কুচবিহারে গিয়ে গুরুজীকে সব কথা বলল। উনিতো খুব খুশী। নিজেই একটা ঠিকানা দিলেন একজনের। উনি আধুনিক গান, রবিন্দ্রসঙ্গীত সবই শেখান। সুমিকে ওঁর কাছে কম্পিটিশনের জন্য আধুনিক গান শিখতে বললেন। শিলিগুড়ির প্রোগামের প্রায় একমাস বাকী। সুমি একটা সি ডি প্লেয়ার কিনে ফেলল কম দামের। বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু গানের সি ডি জোগার করল। বিজনও একদিন এসে অনেকগুলো ভাল গানের সি ডি ধার হিসাবে দিয়ে গেলো। ছেলেটা ভাইয়ের চেয়ে এক ক্লাশ উপরে পড়ে। বড় ভালো আর পরোপকারী ছেলে। সুমির কেমন মায়া পড়ে গেছে। শিলিগুড়ি যাবার দিন এসে গেল। ঠিক হল ভাই আর মায়ের সঙ্গে যাবে। মায়ের শরীর ভাল যাচ্ছে না শুনে বিজন বলল


- দিদি আমিও যাইব তোমাদের সাথে।


- না তোর পড়া নষ্ট হইবে। এগারো ক্লাশের পরীক্ষা সামনে।


- না, মাসীকে যাইতে হইব না। আমি একটা রবিবার ম্যানেজ কইরে নিব।


সুমি হেসে সম্মতি দিল। শনিবার দুপুরে ওরা শিলিগুড়ি পৌঁছল। আমার বাংলা চ্যানেলের পক্ষ থেকে থাকার ব্যবস্থা করেছিল। হোটেল নিউ প্যালেসে। ওরা এই প্রথম হোটেলে থাকল। রাতের খাবারও খুব ভাল। ভাইতো খুব খুশী। বিজনের থাকা নিয়ে অসুবিধা হচ্ছিল। সুমি বলে কয়ে একই রুমে একটা এক্সট্রা বিছানা জোগার করল। পরদিন হলে পৌঁছে সুমি দেখল মোট আশীজন প্রতিযোগী । হল পুরো ভর্তি। সামনের চারটে রোয়ে কম্পিটিটরদের বসতে দিল। ঠিক সকাল ন’টায় শুরু হয়ে গেল কম্পিটিশন । ওইদিন ত্রিশ জনকে বাছাই করা হল। সুমি প্রথম রাউন্ডে পঁচিশ নম্বরে এল। সুমিদের বলা হল থাকতে হবে আর এক রাত্রি। বিজন ওর মোবাইল থেকে বাড়িতে সুমির মাকে খবর পাঠাল। পরদিন সুমি একটা ভজন গাইল। দারুন গাইল। তারপর দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা। যখন সুমির স্টেজে ডাক পড়ল। সুমির চোখে জল। ভাই দু’টো আনন্দে চিৎকার করছে। স্টেজে মোট দশজনকে ডাকা হল। সুমির স্থান অষ্টম।

২৩শে জানুয়ারী কলকাতায় মেগা অডিশন। হল থেকে বেড়নোর সময় সুমির মনে হল ভীড়ের মধ্যে সৃজনকে দেখল। একটু পরেই আর দেখতে পেল না । বুঝল মনের ভুল। সেদিন ওরা যখন আলিপুরদুয়ার পৌঁছল তখন ঘড়িতে রাত আটটা। স্টেশনে বেশ কিছু চেনা আর অচেনা লোক ওদের নিতে এসেছে ওদের নিতে। অনেকে সুমির নাম ধরে চিৎকার করছে। এত তাড়াতাড়ি সবাই জেনে গেছে দেখে সুমি খুব অবাক হয়ে গেল। বাড়ি ফিরে রবিবাবুর ফোটোতে প্রনাম করে সুমি ওর মা কে জড়িয়ে ধরল।

ওরা কুড়ি হাজার টাকা দিয়েছে যাতায়াত হাত খরচ আর কলকাতায় দু’দিন থাকার জন্য। সমস্যাটা হল যদি চান্স পায় তাহলে তিন মাসের ওপর কলকাতায় থাকতে হবে। টিউশনি বন্ধ হয়ে গেলে মা আর ভাই ‘সুগত’র চলবে কি ভাবে ? মা বলল ছাত্র ছাত্রীর বাবা-মার সঙ্গে কথা বলতে। অর্ধেকে মত গার্জেন বলল ওরা মাসে মাসে পয়সা পাঠিয়ে দেবে। ওর মা আর ভাইয়ের অসুবিধা হবে না। সুমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। আকস্মিক ভাবে স্থানীয় একটা ক্লাব সুমির সাফল্যে উপহার সরূপ ত্রিশ হাজার টাকা অনুদান আর অনেক শুভকামনা জানিয়ে গেল।

২১শে জানুয়ারী সুমি মায়ের সঙ্গে ট্রেনে এসি থ্রী টায়ারে চেপে বসল। সঙ্গে গুরুজী । ভাই ছোট কাকার বাড়িতে খাবে। কাকীমাই জোর করল। সবাই যেন হঠাৎ করে দয়ালু হয়ে উঠেছে। সুমি এটুকু বোঝে পুরো ব্যাপাটাই ওর সাফল্যর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মেগা অডিশনে চল্লিশ জনের মধ্যে থেকে চব্বিশ জনের মধ্যে স্থান করে নিতে সুমিকে বিশেষ বেগ পেতে হল না। সুমি তিন নম্বরে থাকল। মা আর গুরুজী ফিরে গেলেন। সুমির জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হল। সুমির কাছে এই তিনতারা হোটেলে থাকা খাওয়া, নতুন বন্ধু , অসাধারন সব শিক্ষক, দুর্দান্ত অর্কেস্ট্রা সব কিছু স্বপ্নের মত ছিল। ওর ভাষা নিয়ে সবাই প্রথম প্রথম মজা করত। একদিন সুমি শুয়ে পড়েছে । ওর বাকী তিনজন রুমমেট গল্প করছে। সুমি জেগেই ছিল। তমসা বলল


- সুমি ‘ঘুমাইলি’ নাকি ?


-না আমি জেগে আছি।


- ওমা, দেখ সুমি ‘জাগনা নেই’ জেগে আছে।


- আমি এখন তোমাদের মত কথা বলি।


- ওমা তাই ! সত্যি ?


- সত্যিই তো বলতেছি।


‘বলতেছি’ শুনে। সবাই হো হো করে হেসে উঠল। সুমিও হেসে ফেলল। এদের আর্থিক অবস্থা সুমির চেয়ে অনেক ভাল। তা সত্বেও ওরা সুমিকে খুব ভালবাসে। নিজের মত করে দেখে। স্বপ্নের মত সবকিছু চলছে। ধীরে ধীরে বন্ধুরা এক এক করে বাদ পড়ে যেতে লাগল। সুমি লড়াই করে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। বেস্ট সিঙ্গার এওয়ার্ড পেল পাঁচবার। একজন বিচারক ওর গানে মুগ্ধ হয়ে এবং ওর আর্থিক অবস্থা জেনে পঁচিশ হাজার টাকা আর একটা স্কেল চেঞ্জার হারমোনিয়াম গিফট করল। সুমি শেষ দশে পৌঁছে একবার বাড়ি এল।

আলিপুরদুয়ার স্টেশনে পৌঁছে এইরকম রাজকীয় সম্বর্থনা পাবে ও সে কথা স্বপ্নেও ভাবে নি। হুডখোলা জীপ, ব্যন্ড, রাশিরাশি ফুলের মালা অনেক অনেক লোক। সুমি অবাক হয়ে দেখল চেনা মানুষ ছাড়াও অজস্র অচেনা মুখ। মনে হল বাবার স্বপ্ন সার্থক হবেই। ওকে চাম্পিয়ান হতেই হবে। মা আর ভাইয়ের মুখে উজ্জ্বল হাসি। সুমি মাকে প্রায় আশিহাজার টাকা দিল। দু’দিন পরেই ফিরতে হবে । গানের ক্ষতি হবে নাহলে। স্টেশনে বাড়ির সবাই, প্রতিবেশীরা এমন কি কাকারাও এল, সঙ্গে আরো অনেক লোক। স্টেশনের সামনে দেখল একপাশে সৃজন বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । ওকে দেখে সুমির করুনা হচ্ছিল। এখনো ওর পেছন ছাড়েনি দেখে হাসিও পাচ্ছিল। এরপরের লড়াইটা আরও কঠিন ছিল । একটু ওপর নিচ হলেই সোজা স্টেজের বাইরে। অনেক গুলো ধাপ পেরতে হোল শেষ ছয়ে পৌঁছতে । সুমি ‘মেগা ফিনালে’র স্বপ্নটাকে সত্যিই ছুঁয়ে ফেলল। সে’দিন কে বা কারা যেন আলিপুরদুয়ারের সারা আকাশ আতস বাজিতে ছেয়ে ফেলেছিল। চারিদিকে সেদিন আলোর রোশনাই আর বাজির আওয়াজ। উত্তবঙ্গের এই ছোট্ট শহরটার রাতে ঘুম ছিল না। সুমি সেকেন্ড পজিসনে থেকে ফাইনালে গেছে। ওকে আর কেউ আটকাতে পারবে না। সুমি আর আলিপুরদুয়ারের গর্ব।

আজ মেগা ফিনালে। শহরের সবার চোখ টিভির পর্দায়। ইন্সিটিউট হলে স্থানীয় ক্লাবের পক্ষ থেকে বড় পর্দা লাগানো হয়েছে। যাতে অনেকে একসাথে দেখতে পারে। বিজন ওর রাঙ্গাদাদার সঙ্গে ভীষণ ব্যস্ত। এল সেই মহেন্দ্রক্ষণ। প্রথম রাউন্ডে সুমি দারুন গাইল। সেকেন্ড রাউন্ডে সুমি সেই মারাত্বক ভুলটা করে ফেলল।


‘আজ নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমের

চাঁদ সুর্য্য তারা জোছনার......’


গানের কথাগুলো টেনশনে গুলিয়ে ফেলল। পরে অনেকটা মেকআপ করে নিল। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেল। সুমি প্রথম রাউন্ডে বিদায় নিল। সেদিন আলিপুরদুয়ারে শ্মশানের নিঃস্তব্ধতা । তিনদিন পরে এক মঙ্গলবারে যখন সুমি আলিপুরদুয়ারে ফিরছে, সেদিন কেউই খবরটা জানেনা। সুমিই মাকে আর ভাইকে জানাতে বারণ করেছিল। এই হতাশার মধ্যে হইচই আর সুমির ভাল লাগছিল না। আবার নতুন করে বাঁচার লড়াই। আবার সেই টিউশনি করে সংসার চালান। এ’কদিনে যেটুকু পয়সা এসেছে তাতে ঘরে বসে থাকলে বড়জোর একবছর চলবে। এইসব হাবিজাবি চিন্তা করতে করতে স্টেশনে পৌঁছল তখন প্রায় সকাল সাতটা। সঙ্গে ভারী ব্যাগ ছিল। সেকেন্ড এ সি’র দরজার কাছে এসে দাড়িয়েছে। ফেরার টিকিট ‘আমার বাংলা’ কেটে দিয়েছিল। এটাই হয়ত সুমির শেষবার এসিতে চাপা । ভাই এগিয়ে এল সাথে বিজন। লাগেজ নিয়ে প্লাটফর্মে দাড়াতেই একটা ফোন এল বিজনের কাছে। বিজন চাপা গলায় জানালো সুমিদি নেমে গেছে। সুগত এগিয়ে এসে লাগেজ হাতে নিল। আজ স্টেশনে কোনো ভীড় নেই। চারিদিক খুব নিরুত্তাপ। হঠাৎ একদল লোক হুড়মুড় করে এসে ফুল দিয়ে শাঁখ বাজিয়ে ওকে বরণ করল। এদের মধ্যে পরিচিত মুখ নেই বললেই চলে। অসস্তি কাটিয়ে বাইরে আসতেই দেখল সৃজনকে । ওকে দেখেই সৃজন বাইক স্টার্ট করে বেড়িয়ে গেল। সুমির মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। বাড়ি ফিরেই ও বিজনকে চেপে ধরল


- তোর বাড়িটা ঠিক কোনখানে?


- ওই তো খেলার মাঠটা ছাড়িয়ে।


- মানে, সৃজনের বাড়ির কাছে ?


বিজন নিরুত্তর। মাথা নিচু করে রইলো।


- কে হয় তোর ?


- জেঠুর ছেলে,রাংগাদা । মানে বড়দা।


- আগে বলিস নি কেন ?


- তুমি তো জিগাও নাই। দিদি, সৃজনদা এখন অন্যরকম হয়ে গেছে। চা বাগানের কাজ দেখে। ওর জন্যই তুমি এতদুর যেতে পেরেছ। সব জায়গায় ও তোমায় না জানিয়ে পিছু পিছু গেছে। আলিপুরদুয়ারে সবাইকে জানিয়েছে। ক্লাব থেকে এতসব ব্যবস্থা করেছে । দিদি তুমি ওকে ভুল.......


- তুই বার হইয়া যা। আর আসবি না আমাদের বাড়ি...যা চইলা যা...


বিজন চলে গেল। মা আর ভাই সুগত ঘটনাটা ভালোভাবে নিল না। বাড়ির পরিবেশ থমথমে। বিভা একদিন সুমিকে বোঝাতে গেল যে বিজনরা কত উপকার করেছে। সুমি গোঁজ হয়ে রইল। আবার সেই একঘেয়ে জীবন। সেই টিউশন করে সংসার চালানো আর গান শিখে যাওয়া । একটু নামী শিল্পী হওয়া, একটু মাথা উঁচু করে বাঁচা । সব স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল । দিন পনের পরে বিজনের প্রতি মনটা একটু নরম হল সুমির। বাড়িতে ডেকে সম্পর্কটা স্বাভাবিক করে নিল। বিজন আর ওর সৃজনদার কথা বলে না। সুমি ভিতরে ভিতরে ভাঙ্গছিল । সংসারের চাপ আর নিতে পারছিল না।

আরো অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। জুনের শেষ । রবিবারের এক সন্ধ্যায় সুমি পড়ার বই এর পাতা ওল্টাচ্ছিল। ফোনটা বেজে উঠল। সুমি অলস হাতে মোবাইলটা হাতে তুলে নিল।

- হ্যালো


- হাই, আমি রঞ্জন রায় বলছি নিউজার্সি থেকে।


খুব ভারী একটা কন্ঠস্বর।


- বলুন।


- আমি একজন প্রোগ্রাম অরগানাইজার । আমি ‘ওভারসীজ আর্টিস্ট’ এনে এখানে পুজোয় পোগ্রাম করাই। আমি আপনার ব্যাপারে ইন্টারেস্টেড ।


- আমি কিন্তু ফাইনাল...


- জানি। আপনার কিন্তু প্রচুর ফ্যান এখানে। আপনি ভীষন পপুলার। আপনার ফাইনাল থেকে বেড়িয়ে যাওয়াটা একটা অ্যাকসিডেন্ট ।


সুমির পুরনো যন্ত্রনাটা গলার কাছে আবার দলা পাকিয়ে যাচ্ছিল।


- আমায় কি করতে হবে ?


- আপনাকে এখানে একমাসের জন্য আসতে হবে। আট থেকে দশটা প্রোগ্রাম করতে হবে বিভিন্ন জায়গায়।


- আমাকে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে।


- হ্যাঁ, অবশ্যই।


- এটা কি কলকাতার কাছে ?


ওপর প্রান্তে মৃদু হাসির শব্দ।


- ম্যাডাম, আমি আমেরিকা থেকে বলছি । আপনাকে আমরা যাতায়াতের দুজনের টিকিট, হোমস্টে থাকা খাওয়া, ইন্টারনাল প্লেস টু প্লেস টান্সফা্রের খরচ দেব। এছাড়া আমার কমিশন বাদ দিয়ে পঁচিশ মতো দেব আপনাকে ।


- পঁচিশ হাজার টাকা ?


- না, পঁচিশ হাজার ডলার। পয়ষট্টি দিয়ে গুন করতে হবে। আপনি কথা বলুন সবার সাথে । আমি কাল এইসময় আবার ফোন করর ।

সুমি চিৎকার করে ভাইকে ডাকল। ওর মাও ছুটে এল।


- ভাই, পঁচিশ গুন পয়ষট্টি কত হয় রে ?


- কেন ?


- বল না।


সুগত মোবাইলের ক্যালকুলেটর টিপে বলল


- ষোলো লাখ পঁচিশ হাজার ।


- মা একা পারবে না। তুই বিজনকে একটা ফোন কর ।


সুগত কিছু না বুঝেই ফোনটা করল।


- আমি সুমিদি বলছি। সৃজনদার নম্বরটা দে।


- আমরা একসাথে থাকি। এখানেই আছে । দেবো ফোনটা।

- হুঁ

ফোনে সৃজনের গলা


- হ্যালো


- আমি সুমি বলতেছি।


- বল


নিরুত্তাপ আওয়াজ সৃজনের গলায়।


- কাল সকালে একবার আসতে পারবা।


- কেন ?


- দুজনে একসাথে গলায় দড়ি দিব।

সুমির গলার স্বর ধরে আসছে। একটু থেমে আবার বলল


- আমেরিকায় গান গাওয়ার সুযোগ পাইছি। মার সাথে যাইব। তোমারেও যেতে হবে সাথে।

অনেক টাকা দিবে। তোমারে আমি নিজের খরচে নিয়া যাইব।


ফোনটা কেটে দিল সৃজন। মা আনন্দে কাঁদছে বাবার ফোটোর সামনে। ভাই তিড়িং বিড়িং করে লাফাচ্ছে।


সৃজন সকাল অবধি অপেক্ষা করেনি। সুমিদের বাড়ির দরজার কড়াটা পনেরো মিনিট পড়েই নড়ে উঠল। সুগত দরজাটা খুলে দিল। সৃজন হাসিমুখে দাঁড়িয়ে...

সুমিও ঝকঝকে একমুখ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে। ওর দু’চোখে ঝিরঝিরে বৃষ্টির মতো অশ্রুমাখা ভালোবাসা। আর বুকে এক দিঘী জলের তিরতিরে কাঁপন...

  • সমাপ্ত -



bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.