সত্যানুসন্ধানী প্রাইভেট ডিটেকটিভ অমরেশ চ্যাটার্জী কলকতার হাতিবাগানের চেম্বারে বসে আতস কাঁচের তলায় একটি চুণী পাথর রেখে দেখছেন।একটি সাধারণ লাল পাথরের থেকে চুণীর উজ্জলতা অনেক বেশী।মুক্তা গোমেদ চুণী প্রভৃতি মুল্যবান পাথর সংগ্রহ করা অমরেশ অর্থাৎ বনি আঙ্কলের নেশা - -এটা তার ভাইপো অস্মিত ভালই জানে।অস্মিত চেম্বারে বসে ডেল কর্ণগীর লেখা 'মানুষ চেনার উপায়' বইটা পড়ছে।বণি আঙ্কলের লাইব্রেরীর আলমারীতে অপরাধ বিজ্ঞানের বই ও ইতিহাসের বই আছে।

বণি আঙ্কল একটি চুণী ও একটি প্রিজম আকৃতির লাল পাথর দিয়ে বললেন-" এই দুটি লাল পাথরের পার্থক্য কি বলতো?" অস্মিত চুণী পাথরটি দেখে বলল-"এই পাথরটি দেখতে খুব ভাল।" -"শুধু তাই নয় চুণীর দাম অনেক বেশী।" এবার অমরেশ অস্মিতের হাতে একটি মুক্তা দিয়ে বললেন-" মুক্তা কি কাজে লাগে বলতো?" অস্মিত বিজ্ঞের মতো বলল-" মুক্তোর মালা গলায় পরে সাজে।জ্যোতিষ বিদ্যায় মুক্তা কাজে লাগে।" -"কিন্তু আসল কাজ হল প্রাচীন আয়ুর্বদ শাস্ত্রে শোধিত মুক্তা ভস্ম রোগ নিরাময়ের কাজে লাগে।মুক্তা দিয়ে তৈরী ওষুধ হার্টের রোগ ও হাই ব্লাড প্রেসারে কাজে লাগে।

বাড়ীর ডোর কলিং বেল বাজল। অমরেশ দরজা খুলতেই স্যুট নেক টাই পরা এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে বললেন-" এটা প্রাইভেট ডিটেকটিভ অমরেশ চ্যাটার্জীর বাড়ী?" -" হ্যাঁ, আমিই প্রাইভেট ডিটেকটিভ অমরেশ চ্যাটার্জী।" -"নমস্কার, আপনার সঙ্গে আমি দেখা করতে এসেছি।আমার নাম স্বপন চৌধুরী।" প্রতি নমস্কার জানিয়ে অমরেশ ভদ্রলোককে ঘরে এনে চেয়ারে বসতে দিলেন।স্বপন চৌধুরী বললেন-" আমার বাবা সাহিত্যিক অনুপ চৌধুরীর কুড়ি রতি পরিমাণ এক টুকরো হীরে চুরী হয়ে গেছে।সেটা অনুসন্ধান করে বার করানোর জন্য বাবা আপনাকে চন্দনগরের বাড়ীতে যেতে অনুরোধ করেছেন।আমাদের বাড়ী চন্দননগরের হাটখোলায়।" অমরেশ কৌতুহলী হয়ে বললেন-"হীরের টুকরোটির দাম কত হবে? চুরি হয়েছে কোথা থেকে?"-"সঠিক দাম বলতে পারব না।হয়তো ছয় লাখ টাকা হবে।আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে রাজস্থানের জয়পুরের রাজ পরিবারের একজন বংশধর হীরেটি বাবাকে উপহার দিয়েছিলেন।বাবা হীরেটি বিছানার তোষকের উপরে চেন দিয়ে পকেট করে তার মধ্যে বহুদিন রেখে দিয়েছিলেন।দুদিন আগে রত্নটি চুরি হয়েছে।" -" ভারী অদ্ভুত লাগছে, মুল্যবান রত্ন সিন্দুক বা ব্যাঙ্কের লকারে না রেখে বিছানার তোষকে রাখতেন কেন?" -"আমার সাহিত্যিক বাবার বিশ্বাস হীরের খন্ডটি তার সৌভাগ্য এনে দিয়েছে।তাই রত্নটি নিজের দেহের সান্নিধ্যে রাখতেন, এটি একটি বিচিত্র খেয়াল।আমি জানতাম বাবা হীরেটি ব্যাঙ্কের লকারে রেখেছেন।" -"হীরেটি চুরী যাওয়ার পর আপনার বাবা স্থানীয় থানায় ডায়েরী করেছেন?" - "হ্যাঁ, চন্দননগর থানায় ডায়েরী করেছেন।তবে বাবার বিশ্বাস আপনার মতো সত্যানুসন্ধানী হীরেটি উদ্ধার করতে পারবেন, তাই আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।" সব ঘটনা শুনে একটু ভেবে অমরেশ বললেন-" ঠিক আছে আমি আগামীকাল চন্দনগরে যাব।আপনি কি করেন? মানে বাবার কাছে চন্দননগরে থাকেনতো?" স্বপন চৌধুরী উৎসাহিত হয়ে বললেন-"আমি চন্দননগরের বাড়ী থেকে যাতায়াত করে কলকাতার শ্যামবাজারে স্টেট ব্যাঙ্কের শাখায় কাজ করি।অফিস থেকেই আপনার বাড়ী এসেছি।" বলে স্বপন চৌধুরী একটি কাগজে বাড়ীর নাম ঠিকানা লিখে দিলেন। অমরেশ বললেন-"আগামীকাল রবিবার সকাল দশটার মধ্যে চন্দননগরে আপনাদের বাড়ীতে যাব।" স্বপন চৌধুরী চলে যাওয়ার পর অমরেশ অস্মিতকে বললেন-"স্বপনবাবুর মুখ দেখে তোর কেমন মানুষ মনে হল?" ক্লাস ইলেভেনের বিজ্ঞানের ছাত্র অস্মিত গোয়েন্দা বই পড়ে ও বণি আঙ্কলকে সাহায্য করে ভালই গোয়েন্দাগিরি শিখেছে।ও বলল-"ঐ ভদ্রলোকের সঙ্গে তার বাবার সম্পর্ক ভাল নয়,ছেলেকে বিশ্বাস করেন না বলেই সাহিত্যিক রত্নটা বিছানার তোষকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন।" -"ঠিক কথা, তবে তারজন্য ছেলেকে অপরাধী ভাবাটা ঠিক নয়।"

অস্মিতের মা অর্থাৎ অমরেশের বৌদি বাড়ীর ভিতর থেকে ওদের খাওয়ার জন্য ডাক দিলেন।ওরা দুপুর একটার পর মধ্যাহ্ন ভোজন করতে গেল।অস্মিতের স্কুলৃ গ্রীষ্মের ছুটি চলছে।পড়ার চাপ কম থাকায় বণি আঙ্কলের চেম্বারে এসে বই পড়ে।পরেরদিন সকাল আটটার মধ্যে অমরেশ স্নান প্রাতঃরাশ সেরে বেরনোর জন্য প্রস্তুত হলেন।অমরেশের বৌদি বললেন-" অমরেশ তোমার ভাইপো বায়না ধরেছে তোমার সাথে রত্ন উদ্ধারে যাবে।কি করি বলোতো?" অমরেশ বললেন-" এখনতো ওর স্কুল ছুটি চলছে।তুমি নির্ভাবনায় ওকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও।" ও আমাকে সাহায্য করতে পারবে।" অস্মিত মায়ের কাছে যাওয়ার অনুমতি পেয়ে খুব খুশী।ও অমরেশের সঙ্গে কলকাতার হাতিবাগান থেকে বেরিয়ে হাওড়া হয়ে সকাল দশটার সময় ট্রেনে চন্দননগর স্টেশনে এসে নামল।বৈশাখ মাসের তপ্ত সকালে ওরা রিক্সায় চড়ে ওরা গঙ্গার ধারে হাটখোলা নামক জায়গায় সাহিত্যিক অনুপ চৌধুরীর বাড়ীতে এল।কলিংবেল টিপতেই স্বপন চৌধুরী এসে দরজা খুলে অমরেশদের বাড়ীর দোতলায় সাহিত্যিক বাবার ঘরে নিয়ে গেলেন।অনুপ চৌধুরী পালঙ্কের বিছানায় বসে গল্প বলে চলেছেন।এক যুবক কপি রাইটার কম্পোজার কম্পিউটারের কী বোর্ডে আঙ্গুল দিয়ে তা নথিকরণ করছেন। অনুপ চৌধুরী গোয়েন্দা অমরেশকে অভ্যর্থনা করে বললেন-" আসুন, আসুন ইন্দ্রবাবু।" অমরেশরা ঘরে ঢুকলেন।স্বপন চৌধুরী বললেন-" বাবা ইনি ইন্দ্রবাবু নন।ইনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ অমরেশ চ্যাটার্জী।" অমরেশ বললেন-"আপনার বাবা ঠিকই বলেছেন, অমরেশ মানে দেবরাজ ইন্দ্র।" সাদা ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত চশমা চোখে অনুপ চৌধুরী হেসে বললেন-" আমি তাহলে উপযুক্ত ডিটেকটিভ ডেকে এনেছি একটি মুল্যবান রত্ন উদ্ধারের জন্য।" বলে অনুপবাবু শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে গদীর চেয়ারে বসতে দিলেন।মুখোমুখী বসে অনুপ চৌধুরী বললেন-" বছর ত্রিশ আগে জয়পুরের রাজবংশের এক রাজকুমার আমাকে কুড়ি রতির হীরের খন্ডটি উপহার দেন।তারপর থেকেই আমার সাহিত্যিক জীবনের নাম যশ খ্যাতি বেড়ে যায়; হীরের খন্ডটি আমার বিছানার তোষকে চেন দেওয়া পকেট করে বহুদিন রেখে দিয়েছিলাম।দুদিন আগে বৃহষ্পতিবার সন্ধ্যায় দেখি বিছানার তোষকের পকেটের চেনটি খোলা।ভিতরে হীরের টুকরোটি নেই।হীরে চুরী যাওয়ার জন্য আমি চন্দননগর থানায় ডায়েরী করেছি।আমার বিশ্বাস আপনি সত্যানুসন্ধানী গোয়েন্দা বুদ্ধি দিয়ে চুরী হওয়া রত্নটি উদ্ধার করতে পারবেন।" ইতিমধ্যে প্রৌঢ় পরিচারক ট্রেতে করে ঠান্ডা পানীয় এনে টেবিলে রাখল।অমরেশ বললেন-"গোয়েন্দা হিসাবে আমার উপর এত বিশ্বাসের কারন কি?" চোখের চশমা খুলে অনুপবাবু বললেন-"খবরের কাগজে পড়েছি আপনি সল্টলেকের একটি অভিজাত পরিবারের বাড়ী থেকে চুরি হওয়া ত্রিশভরি সোনার গহনা উদ্ধার করেছেন।তাই ভাবলাম আমার রত্নটি আপনি উদ্ধার করতে পারবেন।"অমরেশের নির্দেশে স্বপনবাবু যুবক কম্পিউটার কপি রাইটারকে ঘরের বাইরে পাঠালেন।

অমরেশ উঠে বিছানার চাদর তুলে তোষকের চেন দেওয়া খালি পকেটটি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলেন।পরে তিনি চেয়ারে বসে বললেন-"অনুপবাবু আপনার বাড়ীতে যারা থাকেন তাদের পরিচয় বলুন?" অনুপবাবু বললেন-"বাড়ীতে আমার ছেলে স্বপন ও তার স্ত্রী সাগরিকা থাকে। আমার নাতি মানে ওদের দশ বছরের ছেলে আছে।এছাড়া অনেকদিনের কাজের লোক সুবোধ এই বাড়ীতে থাকে।" অমরেশ ও অস্মিত গ্লাসের ঠান্ডা পানীয় শেষ করল। অস্মিত মোবাইল ফোনের অডিওতে রেকর্ড করছে।অমরেশ বললেন-"বাইরে থেকে এই বাড়ীতে কারা আসেন?" অনুপবাবু পালঙ্ক থেকে উঠলেন।কম্পিউটার টেবিলে রাখা সদ্য প্রিন্ট করা কাগজটি হাতে নিয়ে বললেন-" আমার কম্পিউটার কম্পোজার বিবেক বিশ্বাস আসে।সকাল নটা থেকে বারোটা ও দুপুর তিনটে থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করে।ও আমার মুখে বলা উপন্যাস কম্পিউটারে ড্রাফট করে প্রিন্ট করে দেয়। এখন আমি অসুস্থ. হার্টের রোগ আছে।তাই ডাক্তার তরুণ সরকার প্রতি সপ্তাহে আমাকে দেখতে আসেন। আমার শিক্ষক বন্ধু এই পাড়ার রত্নেশ্বর সেন বিকালে আমার ঘরে গল্প করতে আসে।" --"আপনার কাউকে হীরে চোর বলে সন্দেহ হয়?"--'আমার মনে হয় বাড়ীর জানাশোনা কেউ চুরি করেছে।সেই হীরে চোর ধরতেইতো আপনাকে ডেকে এনেছি।"--"অনুপবাবু হীরে উদ্ধার করতে আপনার বাড়ীতে আমাদের থাকতে হবে।" -"নিশ্চয়ই থাকবেন।বাড়ীর তিনতলায় আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করেছি।এখন গিয়ে বিশ্রাম নিন।"


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.