একটি দুঃস্বপ্ন অথবা অসুস্থ চক্রের গল্প-অরণ্য কুমার

১.

চোখের সামনে খুন হয়ে গেলো সোমা...

কোথায় যেনো ফোন বাজছে...

ধড়মড় করে উঠে বসলো মাজহার। সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজব করছে। তার মানে দুঃস্বপ্ন দেখছিলো সে। ঘড়িতে বাজছে ৩:১০। পাশেই ফোন বাজছে। ফোন হাতে নিতেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো তার। সোমার ফোন।

ফোন ধরতেই অপর পাশে সোমার চিৎকার,”বাঁচাও,মেরে ফেললো আমাকে।”

সাথে সাথেই ফোন কেটে গেলো...

মাজহার তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে গাড়ির চাবি আর মোবাইল নিয়ে এক দৌড়ে গাড়িতে উঠলো।

ঘড়িতে বাজছে ৩:১০।


.

টপ স্পীডে গাড়ি ছুটে চলছে রাতের নীরবতা ভেঙে। ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলার মতো মন-মানসিকতা নেই মাজহারের। একের পর এক ফোন দিয়েই যাচ্ছে সোমাকে। কিন্তু অপরপাশে অনবরত রিং হয়েই যাচ্ছে।

মাজহারের মনে হলো,এক মহাকাল সময় যাবার পর তার গাড়ি এসে ঠেকলো সোমার ড্রাইভ্বওয়েতে। গাড়ি লক করে লিফটের দিকে দৌড়ে গিয়ে দেখলো লিফট আছে ১০তলাতে। অপেক্ষা করার মতো এতো সময় নেই মাজহারের হাতে। পরিচিত সিকিউরিটি গার্ডকে বুঝিয়ে হুড়মুড় করে সিঁড়ি ভেঙে উঠে যেতে লাগলো মাজহার। সিকিউরিটি গার্ডের ঘড়িতে তখন বাজছে ৩:১০।


৩.

ভেতর থেকে কলিংবেলের শব্দ আসছে। অনেকবার বেল দেয়ার পর মাজহার যখন দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলো,তখন ভেতর থেকে কারো দরজার দিকে এগিয়ে আসার শব্দ পাওয়া গেলো। মাজহারের সামনে দরজা খুলে সোমা বললো,”সারপ্রাইজ!”

সোমার মাথার পিছনের দেয়াল ঘড়িতে তখন বাজছে ৩:১০।


৪.

ড্রয়িংরূমের সোফায় বোকা হয়ে বসে আছে মাজহার। এসবের কোনো মানেই বুঝতে পারছে না সে। নিজে থেকে কিছু বলতেও চাচ্ছে না। তার ইচ্ছা সোমা নিজে থেকেই সব বলুক। সে শুধু চুপচাপ দেখে যাছে সোমাকে। খুব সুন্দর করে সেজেছে সোমা। সোমাও কিছু বলছে না। একমনে ডাইনিং টেবিল গুছিয়ে যাচ্ছে। মাজহার তার দিকে তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরেই হয়তো এদিকে তাকালো সোমা।

-স্যরি,এই ট্রিক খাটানো ছাড়া তোমাকে এই সময় এখানে টেনে আনার কোনো উপায় ছিলো না। তুমি নিজেই বলো,অন্য কিছু বললে তুমি আসতে তোমার ঘুম বাদ দিয়ে?কুম্ভকর্ণ একটা।

-কিন্তু,তাই বলে এভাবে?আর আজকে কি এমন বিশেষ দিন যে এতো রাতেই তুলে আনতে হবে আমাকে?

-ভুলে গেছো?জানতাম ভুলে যাবে। কি ভেবেছো?বারবার আমি মনে করিয়ে দেবো?আমি রান্নাঘরে যাচ্ছি,তুমি মনে করার চেস্টা করো।

বেশ বিপদেই পড়েছে মাজহার। মনেই করতে পারছে না কিছু। কি হয়েছিলো এই দিন,এই সময়ে?

“প্রথম দেখা?উহু,সেটাতো এতো রাতে হতে পারে না...

প্রথম ভালোলাগা?

প্রথম ভালোবাসি বলা?

প্রথম হাত ধরা?

প্রথম চুমু?

প্রথম......?

কিছুই মনে পড়ছে না তো...ধ্যাত...পরে ভাববো”

মাজহার টিভি ছাড়ার জন্য রিমোট হাতে নিতে গিয়ে দেখলো রিমোটের পাশে সোমার ডায়রী উল্টিয়ে রাখা আছে...

“তার মানে আমি আসার আগে ও ডায়রীতে কিছু লিখছিলো...যাক,বাবা,বড় বাঁচা বেঁচে গেলাম। ডায়রীর লিখা থেকেই জেনে নেয়া যাবে,আজকের দিনের কথা।“

মাজহার ডায়রী তুলে নিয়ে পড়া শুরু করলো...

পৃষ্ঠা ২৫২

“স্বর্গ কি অথবা স্বর্গ বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে নাকি কোনোদিন ভাবি নি...কিন্তু ওর সাহচর্যে আসার পর বুঝেছি স্বর্গীয় অনুভুতি কাকে বলে। আমাকে ভালোবাসায় ডুবিয়ে রেখেছে এই মানুষটা...মাঝে মাঝে ভাবি,মাজহার কি আসলেই রক্ত-মাংসের কোনো সাধারণ মানুষ?নাকি জেসাসের মতো দুঃখ শুষে নেয়া কোনো পবিত্র আত্মা?”

পৃষ্ঠা ২৫৭

“মানুষটা এতো ভালোবাসে আমাকে?এতো ভালোবাসে?আমি কি এতোটা ভালোবাসার যোগ্য?মাজহার,তুমি আমাকে এতো ভালোবেসো না,প্লিজ,একটু কম ভালোবাসো। আমি এতো ভালোবাসার যোগ্য নই। তুমি যতটা ভালোবাসো,তার ১০ভাগ ভালোবাসাওতো আমি তোমাকে বাসতে পারি না। আমাকে ক্ষমা করে দিও মাজহার”

পৃষ্ঠা ২৬৩

“আমি কি মানুষটার উপর বিশ্বাস হারাচ্ছি?”

পৃষ্ঠা ২৭৫

“মানুষটা কি বদলে যাচ্ছে?”

পৃষ্ঠা ২৮৬

“মানুষটা বদলে গেছে। যার চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সবথেকে নিরাপদ বোধ করতাম,আর তার চোখে দেখছি কেবল পালাই পালাই ভাব।”

পৃষ্ঠা ২৯৩

“সত্যি,মাজহার?তুমি পারলে?তুমি না বলেছিলে,তুমি এতোদিন অসম্পূর্ণ ছিলে?আমি এসে তোমাকে পূর্ণ করেছি?স্রষ্টা তোমার জীবনগাঁথা অসমাপ্ত রেখে দিয়েছিলেন,আমি আসাতে পূর্ণ হয়েছে?তুমি ছিলে শুন্য মরুভুমি,আমি তোমাকে দিয়েছি মরুদ্যান?

তার পরও তুমি কি করে পারলে আমার জায়গা তনুজাকে দিতে?”

পৃষ্ঠা ৩০২

“মাজহার বুঝে গেছে,আমি সব জানি। এতোদিন যে মানুষটার হাত ধরে স্বর্গ দেখেছি,এখন সে মানুষটাই হয়তো আমাকে ঘাড় ধরে নরক দেখাবে।”

পৃষ্ঠা ৩১০

“খুনীর জন্য ফাঁসি খুবই সহজ শাস্তি,যাবজ্জীবনও। শরীরের খুনের জন্য সেটা অনেক বড় শাস্তি হতে পারে,কিন্তু ক; মনের খুনের জন্য?এরকম খুনীর জন্য সৃষ্টি করা উচিত time-loop(casual-loop) বা সময় চক্র যেখানে সে বারবার ঘুরে ফিরে একই ঘটনার সামনে উপস্থিত হবে,বারবার ঘুরে ফিরে দেখবে,কিভাবে সে নিজ হাতে খুন করেছিলো।

তুমি আমাকে মানসিকভাবে খুন করেছিলে অনেক আগেই মাজহার। অবশেষে শারীরিকভাবে খুন করে আমাকে মুক্তি দিলে। কিন্তু আমি তো তোমাকে ছাড়বো না। কারণ,আমি তো তোমাকে ভালোবাসি। আমি তোমাকে জড়িয়ে নিলাম আমার সাথে এই সময় চক্রে। তুমি পাবে না তনুজাকে। তোমার থাকতে হবে আমার সাথে।

আচ্ছা,মাজহার,তুমি কি জানো,তুমি কখন আমাকে খুন করেছিলে?৩রা অক্টোবর,ঘড়িতে বাজছিলো ৩:১০।”


.

হাত থেকে ডায়রি ফেলে দিলো মাজহার। ঘেমে গেছে সে। তখন রান্নাঘর থেকে সোমা বললো,

-ডাইনিং টেবিলে খেতে এসো। গরম গরম বড়া ভাজছি। চুলা থেকে একবারে তোমার প্লেটে দিবো। নাহলে খেয়ে মজা পাবে না।

“আসছি” বলেই ঘড়ির দিকে তাকালো মাজহার। ঘড়িতে বাজছে ৩:১০।

সোমা কি করছে সেটা দেখার জন্য রান্নাঘরের দিকে এগোলো সে। তখনই সে দেখতে পেলো একটা মানুষের অবয়ব চুপিচুপি এগিয়ে যাচ্ছে সোমার দিকে। সোমা রান্নায় মনোযোগী বলে টের পাচ্ছে না। মানুষটার হাতে ঝিক করে উঠলো ছুরির ফলা। মানুষটা একটু থেমে পিছন দিকে ফিরে তাকালো। তখন মাজহার দেখতে পেলো খুনীর চেহারা। চিনতে পারলো খুনীকে। মাজহারের চোখের সামনে মাজহার ছুরি হাতে এগিয়ে যাচ্ছে।

চোখের সামনে খুন হয়ে গেলো সোমা...

কোথায় যেনো ফোন বাজছে...

ধড়মড় করে উঠে বসলো মাজহার। সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজব করছে। তার মানে দুঃস্বপ্ন দেখছিলো সে। ঘড়িতে বাজছে ৩:১০। পাশেই ফোন বাজছে। ফোন হাতে নিতেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো তার। সোমার ফোন।

ফোন ধরতেই অপর পাশে সোমার চিৎকার,”বাঁচাও,মেরে ফেললো আমাকে”

সাথে সাথেই ফোন কেটে গেলো...

মাজহার তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে গাড়ির চাবি আর মোবাইল নিয়ে এক দৌড়ে গাড়িতে উঠলো।

ঘড়িতে বাজছে ৩:১০।




#অরণ্য_কুমার

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.