শিক্ষিত সমাজের উদ্দেশ্যে,

শিক্ষিত সমাজের উদ্দেশ্যে

শিক্ষিত সমাজের উদ্দেশ্যে,

এখন প্রতিদিন কাকভোরে বেরোতে হয় ঘর থেকে, অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয় যে, সময় মতো পৌঁছাতেও হয় অন্যের জমিতে ক্ষেতি করতে। এতো আগের মতো নয়, নিজের জমি, যখন খুশী যাও, যা খুশী কর। তা সাইকেলে যেতে অনেকটাই সময় লেগে যায়। পাকা পিচ-রাস্তার পাশ ধরে চলে গেছে বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্র, ভারি উর্বর এই মাটি। এই সব তিন-ফসলী জমি তে মূলত ধান-পাট চাষই হয়ে থাকে, যেতে যেতে তারপরেই চোখে পড়ে যায়, শস্য ভর্তি মাঠের মাঝখানে একটা দোতলা সাদা রঙা বাড়ি। যেন সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশের অনেকটাজমিন্যাড়া, সেখানে আম-কাঁঠাল-শাল-সেগুনের ছোট ছোট চারা। বাড়িটা মূল ক্ষেতি জমি থেকে অনেকটা উঁচুতে, মাটিফেলে উঁচু করা আর কি, যাতে জল না জমে আর মূল পিচ-রাস্তা থেকে সরু পিচ-রাস্তা গিয়ে মিশেছে বাড়ির পাকা উঠানে।

প্রতিদিনই দেখতে না চাইলেও আমার চোখ চলে যায়, চলেই যায় ঐ বাড়িটার দিকে। দেখলেই মনে হয়, যেন এক রাজ-হংস উদ্ধত ভঙ্গিতে আমার দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। দীঘির ঠিক মাঝখানে বসে থাকা তার সেই দৃষ্টি যেন আমার চোখ পুড়িয়ে দেয় ! ইসস ! মূর্খ-মানুষ, পেটের কথা খালি মুখে চলে আসে, কথাটা হচ্ছে, আমার চোখ জুড়িয়ে দেয়। চারিধারে যখন ফলের গাছ গুলি বড় হবে, তখন তার সৌন্দর্য কেমন হবে সেটা আমি এখনই বেশ কল্পনা করতে পারি। যদি ঈশ্বর কৃপা করেন আমি সেই সৌন্দর্য আর এ পোড়া চোখে দেখে যেতে চাই না !

বাড়িটা বাগান-বাড়ি। সপ্তাহে-দু-সপ্তাহে এক-দু-দিন বাবু দল-বল নিয়ে ফুর্তি করে যান। তখন সারারাত মোচ্ছব চলে, তরল ফোয়ারা ওড়ে। ওই বাড়িটায় দেখাশোনা করার জন্য রোজ কে থাকতে পায় বল তো ? আমার একমাত্র ছেলে, বিদ্বান-শিক্ষিত-গ্র্যাজুয়েট ছেলে আমার। নিজে খেয়ে না খেয়ে মুখে রক্ত তুলে যে জমিতে ধান ফলিয়ে এই দুই হাতে তাকে বড় করলাম কি না শেষে আমারই ওই পাঁচ-কাটা ধানী-জমির ওপর গড়া ওই বিশাল প্রাসাদে মাধ্যমিক-ফেল বাবুর খিদমদ খাটার জন্য ! তা কোনটা লাভ কোনটা লোকসান, সেটা ও নিশ্চয় আমার থেকে ভালোই বোঝে, তা হলে পড়াশোনা করলে লোককে জ্ঞানী বলা হয় কেন ? সেই জ্ঞানী ছেলে আমার রোদে পুড়ে,জলে ভিজে চাষ করার থেকে পাখার তলায় বসে ভৃত্যের ন্যায় জীবন-যাপন টাই শ্রেষ্ঠ মনে করলে। তাতে লোকসান কিছুই হয় নি অবশ্য ওর, ক্ষেত থেকে এক মরসুমে যা রোজগার হতো, সেটা এখন ওর একমাসের মাইনে। সত্যিই ও যে শিক্ষিত, ঠিক বুঝে নিয়েছে অর্থের মহিমা।

সত্যিই ওর মা ঠিকই অনুযোগ কে মাঝে মাঝে, এইভাবে মিথ্যা জেদ করে ঝুপড়িতে থাকার কোন মানে আছে? জেদ যখন করার ছিল, তখনই করতে পারি নি, ছেলে যখন জেদ করে, না খাওয়ার ভয় দেখিয়ে জমিটা বাগিয়ে নিল জেদটা তখন করা উচিৎ ছিল। কি আর করার, নিজের আত্মাকে কোন লোভের হাতছানি থেকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় কোনওরকমে আয়ত্ব করেছি, কিন্তু ছেলে যখন তারই জিনিস চেয়ে স্থির লক্ষ্যে নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে, কোন বাপ শান্ত থাকতে পারে ? মার কুড়ুল তো নিজের পায়েই মারলি, আমি আর ক'দিনআমাকে ওই প্রাসাদে থাকার জন্য ডাকলে, শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম, এইভাবে যদি সব চাষের জমি এমন মনোহর ইমারতে ভরে ওঠে তবে দুপুর-রাতে পাতে কি নিয়ে খেতে বসবি রে? নোটের-বান্ডিল ! ও মাথা নিচু করেছিলো, আমিও উত্তর পাই নি, তাই ঝুপড়ি ছেড়ে যাই নি। বউয়ের হয়েছে যতো জ্বালা, সে আমাকেও ছাড়তে পারে না, মরণ অবধি, আবার ছেলেকে না দেখেও থাকতে পারে না। কিন্তু আমি ঠিক করে নিয়েছি, যত-দিন দেহেতে প্রাণটা আছে,চোখে দৃষ্টি আছে, ততদিন এইভাবেই রাজ-হংস দেখতে দেখতে মহাজনের জমিতে যাব। রোজ যখন চোখে পড়েযায় বাড়িটা, প্রতিদিন প্রার্থনা করি, এই দেখাই যেন শেষ দেখা হয় ঠাকুর ! কতো লোকেরই তো হয় ক্ষেতে কাজ করতে করতে রোদের তাতে দেহটা খুব গরম হয়ে গিয়ে অস্বস্তি হচ্ছে বলে গাছের তলায় জিরাতে বসলো তারপর এক্কেবারে সব কন-কনে ঠাণ্ডা। চারপায়া চড়ে ধরাধাম ছেড়ে সে স্বর্গ-যাত্রা, ও কি আরাম, ভাবলেই আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, মৃত্যুকে কেন যেলোকে ভয় পায় কে জানে ? যারা ভয় পায় তাদের কাছেই গুটি-গুটি পায়ে আসে ব্যাটা আর আমি যে কতদিন ধরে আসন সাজিয়ে বসে আছি।

ওর মায়ের কোন সাধই তো কোনদিন পূরণ করতে পারি নি, মুখ-ফুটে কোন দিন কিছুই চায় নি, জানে স্বামী দিতে পারবে না বদলে একরাশ দীর্ঘশ্বাস উপহার দেবে। তাই ওর শেষ বয়সে ছেলের কাছে সুখে থাকার এত-টুকু সাধপূরণ হোক, আমি মনে-প্রাণে চাই। কৃপা করো প্রভু অনেক দিয়েছ তুমি আমায়, শেষ কৃপা কর, আমায় হাত ধরে মায়ার-সাগরটা পার করিয়ে দাও, তাতে আমার মুক্তি মেলে, বউয়েরও, ছেলেরও।।

ইতি

জনৈক অশিক্ষিত চাষী

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.