দায়িত্ব

মাঝরাতে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো উন্মিশের। কোনোমতে ফোনটা সাইলেন্ট করেই পাশের রুমে চলে যায় ও। আহেলি বা অহনের ঘুম যেন না ভাঙে!

-“রিপোর্ট চলে এসেছে স্যার। আজই অপারেশন করতে হবে”

-“ঠিকাছে তোমরা ও.টি. রেডি কর, আমি আসছি” ফোনটা রেখেই ডক্টর উন্মিশ চ্যাটার্জি রেডি হতে থাকে তাড়াতাড়ি, আর চেষ্টা করে যেন একটুও শব্দ না হয়। এত রাতে উন্মিশ আবার হসপিটাল যাচ্ছে জানলে আহেলি রাগ করবে। উন্মিশের এই রাত-বিরাতে হসপিটাল যাওয়া আর এত রুগীঅন্ত প্রান দেখে আহেলি খুব বিরক্ত হয় আজকাল। রাগে গজগজ করে, “এই দুনিয়ায় কি তুমি একাই ডাক্তার?” তাই ওর জাগার আগেই বেড়িয়ে পড়তে হবে।

প্রথম প্রথম এমন ছিল না। বরং উন্মিশকে নিয়ে তো আহেলির গর্বের শেষ ছিল না। কিন্তু যখন ওদের দুজনের মাঝে উন্মিশের কাজ চলে এল, একে একে কোথাও ঘুরতে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল, আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ কমে এল, পুজো-পার্বণও উন্মিশের হসপিটালেই কেটে যেতে লাগলো, গর্ব বিরক্তিতে পরিণত হতে সময় নিল না। প্রায় রোজ অশান্তি হতে থাকে। গতকাল সন্ধ্যায় তো ছেলের জন্মদিনের পার্টিতেও উন্মিশ থাকতে পারেনি। একটা এমারজেন্সি কেস চলে এসেছিল। আবার এই রাতেও।

উন্মিশ ভেবেছিল ভোরে আহেলির ঘুম ভাঙার আগেই ও অপারেশন শেষ করে ফিরতে পারবে। কিন্তু ভাগ্য সহায় না হলে যা হয়! যখন উন্মিশ ফিরল আহেলি জেগে গেছিল। আজ আহেলি অশান্তি করল না, রাগও দেখাল না, শুধু চুপ করে রইল। এই নিরবতা আরও বেশি ভয়ানক। অনেক্ষন পর আহেলি জানালো, অহনকে নিয়ে ও আজই বাপের বাড়ি চলে যাবে। এভাবে থাকা ওর পক্ষে সম্ভব নয়।

-“এটা কি বলছ আহেলি! আমি একজন ডাক্তার। আমি আমার কর্তব্যগুলো থেকে কি করে বেড়িয়ে আসবো! যদি মাঝরাতে এমারজেন্সি কল আসে আমি কি বলবো আমার ঘুম তোমার প্রানের থেকেও বেশি প্রিয় আমার কাছে? কোন অপারেশন থাকলে কি আমি এই বলে চলে আসবো যে আমার ছেলের জন্মদিনের আইসক্রিম গলে যাবে? কি করবো আমি?”

আহেলিই বা কি করবে! আহেলি কিছু বলল না। ওর সিদ্ধান্ত অটল। উন্মিশও মনে মনে ভেঙে পরে। এই কি সেই আহেলি যে ওর এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র শক্তি ছিল!

.....................................................................

দুদিন হয়ে গেল আহেলি অহনকে নিয়ে চলে গেছে। রাত অনেক হয়ে গেলেও আজ উন্মিশের চোখে ঘুম ছিল না। কোন এক শূন্যে যেন ও হারিয়ে যাচ্ছিল প্রতি মুহূর্তে। এমন সময় ফোনটা বেজে ওঠে। আহেলি।

-“অহন রাত থেকে বমি করছে। মনেহয় বিকালে কিছু খেয়ে নিয়েছে বাইরে, তার থেকে ফুড পয়সন হয়ে গেছে। একেবারে নেতিয়ে পড়েছে ছেলেটা। এখানে তো বড় নার্সিং হোমও নেই, সরকারি হসপিটালে নিয়ে এসেছি, কিন্তু ডাক্তার নেই, বলছে কাল ভোরে আসবে” কাঁদো কাঁদো গলায় আহেলি জানায়।

-“তুমি চিন্তা কোরো না। আমার এক চেনা ডাক্তার আছে ওখানে। ডক্টর দেবেশ সেন। ওকে আমি ফোন করে দিচ্ছি, আর আমিও বেরচ্ছি এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব”

যতক্ষণে উন্মিশ পৌছালো হসপিটালে, ততক্ষণে অহন অনেকটা ভাল হয়ে উঠেছিল। স্যালাইন চলছিল। তবে সময়মত দেবেশ এসে না পৌছাতে পারলে অবস্থা গুরুতর হতে পারতো। আজ আহেলির চোখে জল আর সঙ্গে বোধয় অপরাধবোধও ছিল।

-“কাল যদি ডক্টর দেবেশ ঠিক সময়ে না আসতে পারতো?”

-“এখন আর এসব ভেবো না। অহন এখন তো ভাল আছে আহেলি”

-“ডক্টর দেবেশের স্ত্রীও যদি আমার মত তাকে ফোন অফ রেখে হসপিটাল যেতে মানা করতো! তাহলে কি হত উন্মিশ?”

একটা রাত সমস্ত সত্যি, সমস্ত পরিস্থিতি আহেলির সামনে তুলে ধরতে যথেষ্ট ছিল। এক ডাক্তারের তো শুধু তার পরিবারের প্রতি নয়, তার প্রতিটা পেসেন্টের প্রতি দায়িত্ব থাকে। তাই তো ভগবানের পরের স্থানটাই তাকে দেওয়া হয়। কি করে আহেলি সব ভুলে রইল এতদিন! আজ আবার বহুদিন পর আহেলির চোখে উন্মিশের জন্য গর্ব স্পষ্ট ছিল। একটু হেসে এগিয়ে এসে উন্মিশ আহেলির হাতটা ধরে। বহু বছর পর আজ উন্মিশ আবার ওর স্ত্রীকে ফিরে পেয়েছে, যে ওর চলার পথে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র ভরসা... একমাত্র শক্তি...


---- শেষ ----

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.