ঠাকুমা আদর করে রেখেছিলেন নামটা। তিনি দুর্গাভক্ত ছিলেন। বলতেন, সব মেয়েদের মধ্যেই মা-দুর্গা থাকেন। তিনি অবশ্যি আজ বেঁচে নেই, থাকলেও কি হতো! এই ক্লাস এইটে পড়া রোগাপটকা মেয়েটা নামেই দুর্গা, কাজে নয়। নাহলে কি সে আজ রকের মাস্তানগুলোর হাড় আস্ত রাখত? নাহ্!

..

সেদিনের পর একদিন, স্কুল থেকে ফেরার সময় এবার সেই ছেলেগুলোর একটা দুর্গার পথ আটকে ছিল, কোনরকমে পালিয়ে বেঁচেছে। কিছুটা এগোতে একজন খপ করে দুর্গার হাত চেপে ধরল। মুখ তুলে দেখে, ও পাড়ায় মা যে বাড়িতে রান্নার কাজ করেন সেই বাড়ির ছোট মেয়েটা। সে বলল, "তুই ছবিমাসির মেয়ে না? চল তো!" হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল দুর্গাকে। যে ছেলেটি তার পথ আটকে ছিল তার কলার ধরে বলল, "ফের যদি তোকে রাস্তায় নোংরামি করতে দেখি!" তারপর দুর্গার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, "অ্যাঁই চলে আয়!" সেদিন সেই দিদিকে দেখে মনে হয়েছিল, সবার মধ্যে না হলেও মা-দুর্গা মেয়েদের মধ্যেই থাকেন।

..

পরদিন মা এসে বললেন, "তোকে ও বাড়ির ছোট মেয়ে ডেকেছে। তুই কিছু করেছিস?"

উত্তর দেয়নি সে। শুধু চুপচাপ গেছিল ও বাড়ি, মায়ের হাত ধরে। দুরুদুরু বুকে যখন মায়ের পিছনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল দুর্গা। তখনই একজন হাত টেনে সামনে এনে বলল, "অ্যাঁই তোর নাম কি রে?" মুখ তুলে দেখে সেই দিদিটা। আবার সে বলল, "এতো লজ্জা কিসের? নামটা বল!" নামটা নিজে বলেনি। মা বলে দিয়েছিলেন, "দুর্গা!"

"তুই আমাকে ছোড়দি বলিস!"

..

তারপর আর অসুবিধে হয়নি দুর্গার। ফ্রি টিউশন থেকে শুরু করে আত্মরক্ষার নানান কৌশল শিখিয়েছেন ছোড়দি। ছোড়দি নিজে একজন দুর্দান্ত অ্যাথলিট ছিলেন। দুর্গাও ছোড়দি বলতে অজ্ঞান ছিল।

মা বলতেন, "মেয়েদের বেশি খেলাধুলা করতে নেই, শান্তশিষ্ট হয়ে সাবধানে থাকতে হয়। শরীরের সব ঢিলে হয়ে গেলে, বিয়ের পর স্বামীর বিশ্বাস পাবি কি করে?"

তারচেয়ে বেশি আর মা বলতেন না। এতে মেয়ের টিউশন, জামাকাপড়, খাওয়া খরচ বাঁচে।

..


ছোড়দির বিয়ে হয়ে গেছে বহুদিন। দুর্গার সাথে আজও ফোনে যোগাযোগ আছে। মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছিলেন তিনি।

সেদিন বস নিজের কেবিনে ডেকে পাঠিয়েছিলেন দুর্গাকে। নানা অছিলায় কুপ্রস্তাব দিচ্ছিলেন। বোঝাচ্ছিলেন, অল্পসময়ে মেয়েদের প্রোমোশনের শর্টকাট।

মাথা নিচু করে উত্তরহীন চুপচাপ বসেছিল সে। পিঠে হাত দিতেই খপ করে হাতটা ধরে মুচড়ে বলল, "এখানে কাজ করতে আসি। নিজেকে বিক্রি করতে নয়!"

মাথা উঁচু করে কেবিনের বাইরে আসতে জীবনে প্রথমবার তার মনে হলো, 'প্রতিটা নারীর মধ্যেই লুকিয়ে আছেন মা-দুর্গা। প্রয়োজন তাকে জাগানোর।'

(সমাপ্ত)

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.