শখের খেয়ালে মনের দেয়ালে


কলেজে তখন দিন পনেরোর ছুটি, সবে শেষ হয়েছে দ্বিতীয় বর্ষের সামগ্রিক পরীক্ষাসূচি। বড়োদিনের ছুটিতে বন্ধুদের নিয়ে ইছামতি নদীর পারে ঘুরতে গিয়েছিলাম টাকি শহরে ,সেই প্রথমবার। ভারী সুন্দর লেগেছিলো গাছপালায় ঘেরা ছোট্ট শহরটিকে। পরিচয় হয়েছিল - কয়েকশো বছর পুরোনো রাজবাড়ীর সাথে , গোলপাতার জঙ্গলের সাথে , দুই বাংলার মাঝে ইছামতি নদীর ইচ্ছামতো আছড়ে পড়া স্রোতের সাথে, এমনকি পরিচয় হয়েছিল ভারত-বাংলাদেশ বর্ডারের কাঁটা তারগুলো সাথেও। যদিও বর্ডার অঞ্চল ঘুরে দেখতে যাওয়ার স্মৃতিটা খুব একটা সুখের ছিলোনা। সে এক কান্ড, আর একটু হলেই শহীদ হতে হচ্ছিলো আরকি। না বুঝেই.... কিংবা হয়তো একটু বেশি উৎফুল্য হয়েই , কাঁটা তারের মাঝে হাত গলিয়ে, বীর বিক্রমে কে হাত নাড়তে পারে - এই শিশুসুলভ খেলায় মেতে উঠেছিলাম আমরা চার বন্ধু মিলে। হঠাৎ, শূণ্যে ৩টি গুলি নিক্ষেপ করে এক নিমেষে সামনে এসে হাজির বি.এস.এফ জওয়ান প্রণব কুমার ! ওকে দেখে আমাদের তো তখন প্রাণ ওষ্ঠাগত ! বহু কষ্টে বুঝালাম তাকে যে আমরা উগ্রপন্থী বা নাশকতাবাদী নোই। প্রায় ৩০ মিনিট ধরে জেরা করার পর ছেড়েছিলো আমাদের। মনে মনে প্রচন্ড রাগ হলেও ,ওর কর্তব্যপরায়ণতাকে কুর্নিশ না জানিয়ে পারিনি। জনস্বাস্থ কারিগরি দপ্তরের সরকারি বাংলোয় সেবার ছিলাম আমরা , দোতালার বারান্দা থেকে দেখেছিলাম, ওই হার-হিম করা শীতের রাত্রি জেগে কখনো ওয়াচ টাওয়ারে উঠে - কখনো বা বালির বস্তার আড়ালে থেকে, সে করা নজরে রেখেছে কাঁটা তারের বর্ডার অঞ্চলকে। যাইহোক , পরের দিন সকাল-সকাল উঠে বারান্দা থেকেই সূর্যোদয় দেখার ইচ্ছা ছিল সকলের ...জানার বড্ডো বাসনা ছিল সূর্যটা কাদের বেশি আপন , ভারতের না বাংলাদেশের। কিন্তু , দৃষ্টি আটকে গেছিলো এক ঝাঁক পাখির ডানায়। দূর থেকে মনে হলো কেউ একজন দানা ছড়াচ্ছে , আর নানা রকম পাখির দল, মহাকলরবে তা আস্বাদন করছে। বাংলোর বাইরে বেরিয়ে এসে, একটু এগোতেই বুঝলাম চাদর মুরি দেয়া লোকটি আর কেউ নয় , স্বয়ং সেই প্রণব কুমার ! কঠোর ভাবে বন্দুক হাতে, সারা রাত জেগে বর্ডার সীমান্ত পাহারা দেওয়া এই জওয়ানের নাকি ওটাই ছিল শখ। বড্ডো অদ্ভুত শুনিয়েছিল 'শখের' কথাটা ! কিন্তু, পরপর দুদিন একই দৃশ্য দেখে এবং আরও পাঁচজনের মুখে একই কথা শুনে , ধারণাটা প্রকট হয়েছিল !
ওর প্রতি শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গিয়েছিলো যখন শুনেছিলাম উপর মহলের মানুষদের ঘোর আপত্তি থাকলেও ,কারও কথায় তোয়াক্কা না করেই রোজ ভোরবেলায় ও পাখিদের খেতে দেয় , তাদের সাথে যেন মনের কথা ভাগ করে নেয়। উপর মহলের প্রভাবশালী কর্তারা টিপ্পুনি কেটে ওকে বলতো - "খেতে দিলে, পড়তে দিলে তো শত্রুপক্ষও কোলাকুলি করে , যতসব আদিখ্যেতা ! "
...প্রণব সেবার দুঃখ্ করে আমাদের বলেছিলো - "তোমরাই বলো ভাই - এই নিষ্পাপ এক ঝাঁক পায়রা ,বুলবুলি ,চন্দনা ,মুনিয়াদের কি কোনো জাত ,ধর্ম ,দেশ আছে ?? এই নিষ্ঠুর মানব সমাজ হয়তো একদিন ওদেরও পাসপোর্টের বন্দোবস্ত করে ছাড়বে ! তবুও আমি এই শখের নেশা বদলাবোনা। "
প্রণবের বলা এই মানবিকতার টানে, নাকি সবুজ প্রকৃতির অকৃত্তিম প্রেমের গানে - সেটা বলতে পারবোনা , কিন্তু বারেবার ছুটে গেছি টাকি শহরে ! বছরে একবার না একবার টাকি যাওয়ার হুজুক আমার ব্যক্তিগত শখের তালিকায় পরে গিয়েছিলো যেন ! যতবারই গেছি , একই ভাবে মুগ্ধ করেছে প্রণবের অভ্যাস। নানা রঙের , নানা জাতের পাখির সমাগমে সত্যিই মনে হতো - "...বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান " !

...শেষ ২-৩ বছর আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি চাকরি ক্ষেত্রে অনেক দায়-দায়িত্ব বেড়ে যাওয়ায়। এ বছর গরমের ছুটিতে ভেবেছিলাম যাবো , রওনা হয়েও মালঞ্চ অবধি গিয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল। শুনেছিলাম বর্ডার অঞ্চলে গোলাগুলি চলছে , নদী পথে একদল অনুপ্রবেশকারী দেশে ঢুকেছে ,যাদের সাথে কোনো এক উগ্রপন্থী জেহাদি দলেরও নাকি যোগ রয়েছে ! তাই রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সুরক্ষার কারণে ! যাইহোক , সে কারণেই এবারের শীতের সময়কেই বেছে নিয়ে সপ্তাহ দুই আগে গিয়েছিলাম টাকি। মনের ভিতর যেই অশুভ আশঙ্কা বাসা বেঁধেছিলো , সেটাই সত্যি হলো।.... প্রণব আর নেই। কয়েকমাস আগের সেই এনকাউন্টারে প্রাণ দিয়ে, আমাদের মাতৃভূমিকে সুরক্ষিত করেছে সে ! ....জীবনের মৃত্যু ঘটে , কিন্তু মানবতার নয় ! প্রণব তাই আজও যেন বেঁচে আছে ওর সেই 'শখের খেয়ালে' গড়ে ওঠা বিশ্বাস ও ভালোবাসার বন্ধনে। আজ হয়তো আর কেউ ভোরের শিশিরে পা ভিজিয়ে , চাদর মুড়ি দিয়ে, টাকির এই বর্ডার অঞ্চলে একঝাঁক পাখিদের উদ্দেশ্যে খাবার দিতে আসেনা ,কিন্তু ওরা আজও আসে, দলে দলে -ঝাঁকে ঝাঁকে ,কুহু কুজনে ভোরবেলাটাকে একই ভাবে রাঙিয়ে তুলতে । ওদের ডানায় কোন দেশের বাতাসের ঘ্রান আছে জানিনা ,ওদের পালকের চাদরে কোন ধর্মের বাণী আছে জানিনা , শুধু জানি.. ওদের মনের পাসপোর্টে হয়তো শুধু , ওদের পরম প্রিয় বন্ধু প্রণবের নামটাই লেখা থাকবে সর্বদা ! নিঃস্বার্থ, অকৃত্তিম ভালোবাসায় ভরা শখের খেয়ালে, হয়তো ঠিক এভাবেই মনের দেয়ালে চিরকালীন স্থান করে নেওয়া যায় ।...'প্রণব কুমার অমর রহে ' !!

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.