শখ


শখ নামে জিনিসটা বোধহয় কমবেশি সবার মাঝেই রয়েছে। এই শখের ফেরে পায়রা উড়িয়ে আর বাঈজি নাচের বায়না করে বাঙলাদেশ তথা গোটা ভারতের কতশত তথাকথিত সম্ভ্রান্ত পরিবার আজ পথের ভিখারি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।

আমার জন্য তো এই দু অক্ষরের জিনিসটাই ভয়াবহ । ছোটবেলায় শখ ছিল তেলাপোকাদের পায়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখতে আর টিকটিকির ল্যাজ ছিড়ে ফেলতে (শুনেছিলাম ওদের নাকি ল্যাজ কেটে দিলেও নতুন ল্যাজ গজায় । আর তারই সত্যতা প্রমাণ করতে)। কিন্তু বাবার হাতের বলিষ্ঠ চপেটাঘাত আমাকে ধরাশায়ী করে সকল শখের সমাপন করতে বাধ্য করায় । তবে তার পর থেকেই আমার অনুরাগী মন শখের সন্ধানে ধাবমান । তো সেই শখের একটা ঝলক দেখেছিলাম তদনীন্তন পূর্বপাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশের) রীতা দেবীর মধ্যে । শখ যে জীবনে সাফল্য এনে দিতে পারে সেই অনুভূতিটাই এসেছিল শেষ বয়সে আমার জীবনে ।

ব্যাপারটা এরকম। স্মরণীয় কালের মধ্যে আশাকরি কেউ ভুলে যাননি বাঙলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের কাহিনী । সেই পটভূমিতে রচিত এই শখের গল্প । যদিও আমি তার দেখা পেয়েছিলাম প্রায় বৃদ্ধ বয়সে যখন আমরা দুজনেই প্রায একই রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি । তা পরের কাহিনী পরের। একটু ধৈর্যের পরীক্ষা হয়েই যাক।

উনিশশো সত্তরের শেষার্ধে। অধুনা বাঙলাদেশের কুমিল্লা অঞ্চলের এক শহরের অধিবাসী রীতাদেবী। স্বামী বিরাজ সামন্তের ধর্মপত্নী। বিরাজবাবুর সুবিশাল কাপড়ের আড়ত। এলাকার নামজাদা বাসিন্দা। একমাত্র ছেলে নীলাদ্রি । প্রচুর সম্পত্তি তদনীন্তন পূর্বপাকিস্তানে। কিন্তু স্ত্রী রীতাদেবীর স্বপ্ন একটা বুটিকের দোকান খোলার। কিছুটা প্রশিক্ষণ তিনি নিয়েছিলেন কোলকাতায় এসে। বিরাজবাবুর ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েই । কিন্তু বিরাজবাবুর মত না থাকার দরুন বুটিকের প্রশিক্ষণ কোনও কাজেই লাগছে না রীতা দেবীর। ঠিক এমনি সময়েই একদিন জানা গেল শেখ মুজিবুর রহমান বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তখন অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিদার । তবে খানদানী পশ্চিম পাকিস্তানের মহারথীদের পক্ষে কি একজন বাঙ্গালী ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী পদে মেনে নেওয়া সম্ভব ? এর প্রতিবিধান করতেই হবে যেন তেন প্রকারণে। আর তার মোকাবিলা করতেই সেই সময়ে ইয়াহিয়া খান সাহেবের অনুগামী সৈনিকদের আগমন পূর্বপাকিস্তানে। মুজিবুর সাহেব তখন গৃহবন্দী। ঢাকা শহরে খান সেনার রুটমার্চ চলছে। সেই সময়ে একদিন বিরাজবাবুর বিশ্বস্ত কর্মচারী মনিরুদ্দিন এসে মালিককে জানায় যে দেশের অবস্থা ভালো নয়। বিরাজবাবু সপরিবারে কিছুদিন ভারতে গিয়ে থাকলেই ভালো। কিন্তু এত বড়ো ব্যাবসা। হুট করে যেতেও পারছেন না বিরাজবাবু। এরমধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি । তো বিরাজবাবু মনস্থ করলেন সপরিবারে ভারতেই চলে যাবেন। ভিসা পাওয়া অসম্ভব । তবে সেই মনিরুদ্দিনের চেষ্টার ফলে ব্যবস্থা হয়ে গেল বর্ডার পেরুবার। অগ্রিম টাকা জমা দেয়া হল দালালদের হাতে । কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর ঘটনা ঘটে আরেক রকম। সব কিছু সামলে নিতেও তো দুচারদিন সময় লাগে । তো পাওয়া গেল না সেই সময়টুকু । রাজনৈতিক ধরপাকড় ততদিনে শুরু হয়ে গেছে। তো ভারতে রওনা দেবার দিনের দিনদুযেক আগে একদিন খানসেনারা সদলবলে এসে ধরে নিয়ে গেল বিরাজবাবুকে। অপরাধ দেশদ্রোহীতা (?)। যদিও তিনি কোনওদিন কোনও রাজনৈতিক দলের সাথেই যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু ওই। চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী ।

পরদিন ভোরবেলা মনিরুদ্দিন আবার এসে হাজির এক ভয়ংকর খবর নিয়ে । সোজাসুজি বলল রীতাদেবীকে 'মা আপনি নীলুদা (নীলাদ্রি) কে নিয়ে যা পারেন সব সাথে করে বেরিয়ে পরুন আমার সাথে' । নীলা বিরাজের কথা বলতেই ও বলে উঠল "মা আপনি দেরি করবেন না। হয়তো খানসেনারা আপনার বাড়ির দিকে রওনা হয়ে গিয়েছে আপনাকে তুলে নিয়ে যাবার জন্য । বাবু কবে আসবেন সব অনিশ্চিত । যা খবর পাচ্ছি যদি সত্যি হয় তাহলে উনি আদৌ ফিরে আসবেন কি না তারও ঠিক নেই ।" রীতাদেবী পুরোটাই বুঝতে পেরে ছেলেকে সাথে নিয়ে ঘরে যা গহনা আর টাকা ছিল সব নিয়ে বেরিয়ে পরলেন। সময়টা আগষ্ট মাস। উনিশশো একাত্তর সাল।

ঘুরপথে কুষ্টিয়া দিয়ে চোরাগোপ্তা রাস্তা দিয়ে বনগাঁর সীমান্তে পৌছলেন। মাঝে গহনার বেশ কিছু অংশ এই গোপন পথে যাবার খেসারত রূপে খুইয়ে ফেলেছেন । বাকিটা গেল বর্ডার পেরুতে দালালদের হাতে । প্রায় অনাহার অর্ধাহারে, কপর্দক শূন্য অবস্থায় কোলকাতা এসে পৌছন তিনি অর্ধমৃত কিশোর নীলাদ্রির হাত ধরে ।

তখনো বাংলাদেশের শরণার্থীর স্রোত তীব্ররূপ ধারণ করে নাই। বিরাজবাবুর কিছু ব্যাবসা সুত্রে পরিচিত লোকের সহায়তায় মাথা গোঁজার ঠাই মিলল। কিছু এন জি ও এবং ভারত সরকারের সাহায্যে অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা হলো মাত্র । কিন্তু এ তো আর বরাবর চলবে না। তাই অনেক খুঁজেও ভালো কিছু না পেয়ে অবশেষে এক লেডিস টেইলরিং এ একটা সামান্য বেতনে চাকরি নিলেন। শুরু হলো বেঁচে থাকার নতুন সংগ্রাম ।

উনি এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা এবং বধূ । তাই বুঝতে পারলেন যে এই বেতনে নিজেদের খাবার গুজরান করাই মুশকিল । ছেলে মানুষ করতে হলে, ভদ্রভাবে বেঁচে থাকতে হলে এবং তার শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হলে আরও অনেক বেশি অর্থের প্রয়োজন। ইতিমধ্যে তখন শরণার্থীর স্রোত বেড়ে গিয়েছে । প্রাথমিক আতিথেয়তার ভাবটা যেন ধীরে ধীরে উড়ে যাচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মন থেকে । এর মাঝেই শুরু হলো ওনার জীবন সংগ্রাম ওনার নিজের শখটাকেই হাতিয়ার করে। দিনে দরজি দোকানে কাজ করে ঘরে ফিরে রাতে শুরু করলেন নিজের শখের বুটিকের কাজটা। প্রথমদিকে কেউ তেমন পাত্তা না দিলেও ধীরে ধীরে ওনার নতুন নতুন ডিজাইনের একটু একটু করে সমাদর বাড়তে লাগলো । আয় কিছুটা বাড়ল। ছেলেকে একটি ইংরেজী স্কুলে ভর্তি করে দিতে সক্ষম হলেন।

দিনরাত শুধু কাজ আর কাজ । সকালে রান্না করে ছেলেকে ইস্কুলে পৌঁছে দিয়ে দরজির দোকানে । বাড়ি ফেরার পথে ছেলেকে নিয়ে এসে একসাথে ঠাণ্ডা খাবার ভাগ করে খেয়ে আবার বসে পড়তেন বুটিকের কাজ নিয়ে । ধীরে ধীরে কাজের সমাদর বাড়ছিল । বাড়ছিল ক্রেতার সংখ্যা এবং সাথে বাড়ছিল আয় । তখন তিনি দরজি দোকানের কাজ ছেড়ে নিজেরই একটা ছোট্ট আউটলেট মতো খুললেন। কেটে গেল এভাবেই আরও সাতবছর। এরমধ্যে ছেলে কলেজে ভর্তি হলেও মায়ের কাজের ব্যাপারেও নীলাদ্রির শখ জেগে উঠল। ছেলেও মায়ের শখের অংশীদার হতে পড়ল ।

ছেলের মধ্যেও একই শখের প্রবণতা লক্ষ্য করে রীতাদেবী ওকে শেখাতে শুরু করলেন বুটিকের প্রিন্টের গোড়ার কথা। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছে । দিন থেকে মাস। মাস থেকে বছর। এর মাঝে উনি একটা ছোট্ট ছিমছাম দুকামরার বাড়িতে উঠে এলেন। আর গড়িয়াহাটে লিজ নিয়ে ওনার শোরুম প্রতিষ্ঠা করলেন।

ছেলেও নিজেই বেশ শিখে গিয়েছে কাজ। শুধু মাকে সাহায্য করাই নয় নিজেও ব্যাবসার অন্ধ্র রন্ধ্র বুঝে ফেলেছে। বাড়ি থেকে দোকানে আসতে গেলে এবং সেখানে থাকতে গেলে অনেক সময় খরচ হয় যাওয়া আসাতে । এভাবে চললে বেশি সময় দিয়ে বুটিকের ডিজাইনের কাজ করা সম্ভব নয় । ওনার বয়েসটাও বেড়ে যাচ্ছে । তাই ছেলের পরামর্শ মতে দোকানের মালিকানা ছেলের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজের শখের বুটিকের কাজ বাড়িতে বসেই করেন। এভাবে আরও কিছুদিন যাবার পর নিজে পছন্দ করে ছেলের জন্যে বৌ নিয়ে এলেন ঘরে। সুশ্রী চারুকলা অনুরাগী শম্পা। ঘরে বৌ আসাতে সংসার সামলাতে হেল্পার পেয়ে গেলেন। তার সাথে অবসর পেলেই শম্পা শাশুড়ি মাকে বুটিকের কাজ সামলাতেও সাহায্য করে। সোনার সংসার।

কিছুদিন পরে শম্পার কোলে সন্তান এলো। সোনার সংসার তখন সুখের সংসারে পরিবরতিত। কিন্তু এদিকে রীতাদেবী বেশ বয়স্ক হয়ে পড়েছেন । কাজে ভুল হয় । কখনো চোখের অসুবিধার জন্য চোখ ব্যাথা করত। তো ততদিনে এই বুটিকের কাজের হাল শম্পা ধরে ফেলেছে। ওর ছেলেও বড়ো হচ্ছে । যদিও নাতি ঠাকুমার খুব নেওটা কিন্তু বড়ো হবার সাথে সাথে ওরও একটা আলাদা ঘর প্রয়োজন । এদিকে মা হয়ে পড়েছে বাড়তি বোঝা । শুরু হলো খিটিমিটি । শাশুড়ি বৌ এর ইটারনাল দ্বন্দ্ব । শেষে নীলাদ্রি একদিন মাকে বলেই ফেলল কথাটা । ওনার বৃদ্ধাশ্রমে থাকার পরিকল্পনার কথা । রীতাদেবী স্তব্ধ হয়ে গেলেন নিজের ছেলের কথা শুনে । যে ছেলেকে প্রাণ দিয়ে আগলে মানুষ করেছেন সেই যদি এতোটা বেইমান হতে পারে তো পরের ঘরের মেয়েকে দোষ দেবেন কেন। উনি খুব আত্মাভিমানী ছিলেন । তাই একদিন নাতির হাত ধরে ছেলের সাথে উপস্থিত হলেন যোগমায়া বৃদ্ধাশ্রমে । যেটা কেবল মহিলাদের জন্য । ছেলে মাকে মাসকাবারি খরচটা দিয়ে মাতৃদায় সম্পন্ন করে যেত। সাথে নাতি আসত। প্রথমদিকে ছেলে নাতি সহ মাসে একবার করে আসত। কখনো বৌমাও থাকত সঙ্গে । কিন্তু ধীরে ধীরে সেই আসাটারও ব্যবধান বেড়ে বেড়ে প্রায় না আসার পর্যায়ে পৌছে গেল। মাসোহারাটা ব্যাঙ্কের মাধ্যমেই পৌঁছে যেত। আর যোগাযোগের একটা ক্ষীণ সুত্র ছিল মোবাইল ফোন । সেটাও প্রায় অব্যবহৃত হয়ে পড়েছে এখন। রীতাদেবীর আত্মসম্মান বোধ প্রখর। জীবনে হার মানতে তিনি নারাজ। ভাবলেন একদিন পাকিস্তানী হানাদারদের কাছে সর্বস্ব খুইয়েও যখন তিনি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন সফল করে তুলেছিলেন তখন নাহয় আরেকবার চেষ্টা করে দেখা যাক। এই বৃদ্ধাশ্রমে বসে থেকে গল্প করে সময় যেন আর কাটছিল না । তাই আবার একদিন শুরু হয়ে গেল পুরোন শখের পরিচর্যা। জীবনে হার মানতে যে তিনি নারাজ । আবার নতুন করে শুরু করলেন টুকটাক বুটিকের কাজ। বৃদ্ধাশ্রমের তাঁর রুমমেট কে নিয়ে চলে এলেন কিছু প্রাথমিক সাজসরঞ্জাম কিনতে। প্রাক্তন ক্রেতাদের সাথেও যোগাযোগ করলেন। ওদের থেকেও কিছু এডভান্স পেতে অসুবিধা হলো না। নামডাক আগে থেকেই ছিল । তাই প্রতিষ্ঠা পেতে দেরী হলো না। ওই বৃদ্ধাশ্রমের মাঝেই শুরু করলেন পুরোনো শখের পরিচর্যা । দুবছরের মাঝেই যোগমায়া দেবী বৃদ্ধাশ্রমের প্রায় ত্রিশজন মহিলা এখন তাঁর কর্মসঙ্গীনী। বৃদ্ধাশ্রমের চেহারাটাও আমূল পরিবর্তিত হয়ে গেছে । প্রায় প্রতিটি রুমে এখন এসি রয়েছে । সামনে কেয়ারী করা সুন্দর ফুলের বাগান । কাছেই একটা অফিসঘর ভাড়া নিযেছেন। প্রোডাকশন বেড়ে যাচ্ছে সাথে চাহিদাও। আর তখনই আমার সাথে ওনার আলাপ হয় । ওনাদের প্রোডাকশন ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব তো এখন আমারই । আর হবে নাই বা কেন ? আমিও তো ওদের পাশের লাগোয়া বৃদ্ধাশ্রমের একজন অধিবাসী যদিও আমরা তখনো রুমে এসি লাগানোর পর্যায়ে পৌঁছতে পারিনি । আমার তো কোনও শখ নেই। বোধহয় তাই জন্যে ।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.