বীরেনের বিরিয়ানি

বীরেন এর একটা ছোট্ট চালের দোকান পাড়ার মধ্যে, পাড়ার লোকেরাই ওর খরিদ্দার। বীরেনের ছোট্ট সংসার। মা, বীরেন আর ওর বৌ গীতা। গত বছর ওদের বিয়ে হয়েছে। মা ষষ্ঠী র কৃপাদৃষ্টি এখনো পড়েনি।

গতকাল পয়লা বৈশাখ ছিল। বীরেনের মহাজন, বিজন বাবুর ওখানে ওর নেমন্তন্ন ছিল। বিজন বাবু মস্ত বড় মহাজন। তার একাধারে চালের, গমের গোডাউন, পাইকারি সাপ্লায়ার, অন্য দিকে বিল্ডার্সের ব্যাবসা। লক্ষ্মী দেবীর আশীর্বাদ যেন তাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দিয়েছে। এক কথায় বলতে পারো ধনকুবের।

বিজন বাবু, প্রতি পয়লা বৈশাখে তার সমস্ত খুচরো ব্যবসায়ীদের এবং নিজের কিছু চেনা পরিচিত দের বিরিয়ানি খাওয়ান বসিয়ে আবার যারা বসে খান না, তারা বাড়ি নিয়ে যান প্যাকেট। সেও ধরো হাজার দুয়েক লোক। বিশাল আয়োজন।

আগে আগে উনি ডাকতেন হয়তো একজনকে, দেখা গেল, সদলবলে হাজির সে। তার ফল স্বরূপ বিজন বাবুর খরচা যেত বেড়ে। হাজার হোক ব্যাবসায়ি মানুষ হিসেবে পাকা লোক উনি। করে ফেললেন কুপনের প্রচলন। কঠিন পাহারা লাগালেন। কুপন দেখিয়ে ঢোকো, কুপন না থাকলে, সেখান দিয়ে একটা মাছি পর্যন্ত ঢুকতে পারবে না।

বীরেন একটা কুপন পেয়েছে। সে মনে মনে ভেবেছে। যাবে একটা প্যাকেট নিয়ে আসবে, সে আর গীতা মহানন্দে খাবে। তাঁর মায়ের আবার ওসব সহ্য হয় না। মাকে দুটো রুটি করে দেবে গীতা।

সেজেগুজে সে হাজির। লাইট, প্যান্ডেল,নকল গোপাল ভাঁড়, লোক হাসাতে জোকার, বাজনা, কি নেই ওখানে!

বীরেনের মনে যেন হাওয়া লেগে গেল। "আহা কোথায় এসে পড়লাম। জিও বিজন বাবু!" মনে মনে বলে ওঠে সে।

দেখে মুস্কো মুস্কো দুটো লোক গেট জুড়ে দাঁড়িয়ে কুপন দেখছে। বীরেন পকেট থেকে বের করে কুপন। কি সুন্দর কুপন। গনেশ আঁকা। নববর্ষের হার্দিক শুভেচ্ছা লেখা। আহা আহা। সে বুক ফুলিয়ে এগিয়ে যায় গেটের দিকে, মাগনা তো আসেনি সে। ওরা কুপন টা নিয়ে দু টুকরো করলো।

বীরেন মনে মনে বলে " কি সুন্দর কুপন টা দেখো, নির্দয়ের মতন ছিঁড়ে ফেললো।" বীরেন ঢুকতে যাবে অর্ধেক কুপন টা হাত নিয়ে গেটের ভিতরে , ঠিক তখনই হঠাৎ বীরেনের নজরে পরে যায় গেটের মুখটা ছেড়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে জনা চারেক বাচ্চা। ওদের মাথাগুলো মেপে যদি দাগ টানি। একটা কোনাকুনি দাগ তৈরি হবে। যতো বার ওরা গেটের দিকে যাচ্ছে। মুস্কো দুটোর ধমকানিতে আবার পুরানো জায়গায় ফিরে যাচ্ছে। চোখে ওদের অনন্ত কালের খিদে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বিরিয়ানির মন কাড়া গন্ধ টা। বিজন বাবুর গনেশ আঁকা নববর্ষের হার্দিক শুভকামনা ওয়ালা কুপন যে ওদের জোটে নি। সেগুলো ছিঁড়ে টুকরো হয়ে হাওয়ায় উড়তে উড়তে মাটিতে এসে মিশে যাচ্ছে। কেউ কেউ দিব্যি পাড়িয়ে চলে যাচ্ছে ছেঁড়া কুপন গুলো।

বীরেনের যে কি হয়। মনটার মধ্যে কেমন যেন হতে থাকে, একটা অন্য রকমের অনুভূতি। এই অনুভূতি টা অন্য রকমের। একটু আগের অনুভূতি টার মতন নয়। ভাবে ইশ! বাচ্চাগুলো তো কুপন পাই নি। আমরা তো তবু কোনো কোনোদিন ভালো মন্দ খাই। কিন্তু ওরা কি এসব চোখে দেখতে পায়। সারাটা জীবন কি শুধু ই গন্ধ শুঁকে ই যাবে।

অর্ধেক কুপন হাতে নিয়ে সে ভেতরে ঢোকে। এখানে ও লাইটের ব্যবস্থা রয়েছে রাস্তার দুপাশে। সেখানে শিয়ালের আঙুর ফল টকের গল্প, বকের ঝোল খাওয়ার গল্প, কাকের নুড়ি ফেলে জল খাওয়ার গল্প। আরো কত গল্প, লাইটের মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে।

খাওয়ার যেখানে ব্যবস্থা করা হয়েছে সেই জায়গা টা বেশ খানিকটা দূরে। সাইন বোর্ড এ বিজন বাবুর কোম্পানির নাম বারবার করে চলে যাচ্ছে, আবার ফিরে ফিরে আসছে। দূরে একটা স্টেজ করা রয়েছে , সেখানে স্টেজ আলো করে সপরিবারে সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে বিজন বাবু বসে আছেন। আরেকটা স্টেজ করা রয়েছে সেখানে বড় বড় বক্স। মাঝে মাঝে সবুজ, সাদা লাইট আকাশের দিকে চলে যাচ্ছে। রাত্রে নাচ আর গান হবে। ডি জে। বিজন বাবু শৌখিন লোক।

বীরেন এগোতে থাকে। দেখে বসে খাওয়ার জায়গাটা তে বিশাল ভিড়। সবাই চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে আছে। উঠলেই বসবে। আর মনে মনে বলছে যেন," আর কত খাবি রে বাবা! ওঠ এবারে"। আর যেখানে প্যাকেটের ব্যবস্থা, সেখানে ও লম্বা লাইন। বীরেন লাইন দেয়। তার আগে গোটা ষাটেক লোক হবে মনে হচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর পৌঁছানো গেলো সেই হাঁড়ির কাছে।

আহা কি গন্ধ। মন কেমন করা। প্লেট চলছে হাঁড়ির মধ্যে, ঐ প্লেট অবলীলায় আলুগুলোকে ভেঙ্গে দু টুকরো করছে। তুলে আনছে মশলা মাখানো বিরিয়ানির ভাত সাথে আলু। আলু বিরিয়ানির আয়োজন। চিকেন বা মটন বিরিয়ানি করতে গেলে খরচা অনেক। বিজন বাবু বিচক্ষণ লোক।

বীরেন বলে, "আমার টাতে এক টুকরো আলু বেশি দিও, ভাই। আরেকটু সাদা ভাত দাও, উপর থেকে"। ওরা দিয়ে দেয়। বিরিয়ানির প্যাকেট টা, তার সাথে আরেকটা ছোট প্যাকেট স্যালাডের আর একটা প্যাকেট যেখানে আছে দুটো লাড্ডু।একটা সুন্দর ক্যারি ব্যাগের মধ্যে দিয়ে বীরেনের হাতে দেয়,যার গায়ে জ্বল জ্বল করে লেখা বিজন বাবুর কোম্পানির নাম।

বীরেন প্যাকেট নিয়ে পা চালিয়ে চলতে থাকে। এবার ফেরার তাড়া। পেয়ে গেছে ভাই প্যাকেট। তাড়াতাড়ি তে বাইরে বেরিয়ে দেখে। ঠিক যে জায়গায় বাচ্চা গুলোকে দেখে গেছিল। তার থেকে একটু দূরে ওরা বসে আছে। মুস্কো গুলো বোধহয় তাড়িয়ে দিয়েছে। একটা তো, আরেক টার গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমোচ্ছে। বীরেন ধীরে ধীরে এগোয় ওদের দিকে। বলে,"এই শোন না, এটা তোরা নে। ভাগ যোগ করে খেয়ে নে"।

বাচ্চাগুলোর তো অমাবস্যায় চাঁদ দেখার মত অবস্থা।

এরকম ও হয়। লোকে তো ওদের শুধু বলে,"দূর হটো"।

ইনি আমার কেমন লোক, নিজে না খেয়ে, আমাদের দিয়ে দিচ্ছে। কোনো ভুল হচ্ছে না তো। ওরা বীরেনের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।

" তাড়াতাড়ি খেয়ে নে তোরা" বীরেন বলে।

"আমরা যাবো বাবু ভিতরে। সবার শেষে। যখন সব লোক চলে যাবে, তখন হাঁড়ির তলায় যা পড়ে থাকবে অবশিষ্ট আমরা পাবো। তবে গতবারে কম পইরা গেছিল, তেমন কিছু পাই নাই"। বাচ্চা গুলোর মধ্যে থেকে একজন বলে ওঠে।

" বাবু আপনে খাবেন না?"

"না রে , আমার শরীর খারাপ তাই খাবো না । চল তোরা খেয়ে নে"। বলে বীরেন হাঁটা দেয়। সাইকেল রাখার জায়গাটায়। সাইকেলে উঠে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। আরেক রকমের অনুভূতি ওকে গ্রাস করে। এটা আবার একটু অন্য রকম। আগের গুলোর থেকে একদম আলাদা। আনন্দ! এক অনাবিল আনন্দে চোখের কোন ভিজে ওঠে। সে প্যাডেল মারে জোরে জোরে।

পথে নগেনের পরোটার দোকানে দাঁড়ায়। "নগেন দা আটটা পড়োটা ঝটপট প্যাক করে দাও তো, সাথে দুটো ডিম সেদ্ধ, আর পেঁয়াজ দিও"। নগেন দিয়ে দেয় তাড়াতাড়ি।

নগেন দা জানতে চায় , "কেন গো বিজন দার ওখানে যাও নি?"

"গিয়েছিলাম তো, ওখান থেকেই ফিরছি গো। কি ভিড়! চলি নগেন দা"। বলে বাড়ির দিকে সাইকেল চালায় বীরেন। বাড়ি ফিরে গীতার হাতে পড়োটার প্যাকেট টা ধরিয়ে দিয়ে জানতে চায়, "মায়ের খাবার হয়ে গেছে কি?"

গীতা বলে - হ্যাঁ।

"বিরিয়ানি করে নি বিজন বাবু এবার? গীতা জানতে চায়।

"করেছিল তো। ভেতরে চলো সব বলছি। কখন থেকে তুমি বসে আছো। চলো থালা নিয়ে এসো। আমরা একসাথে খাই" বীরেন বলে।

খেতে খেতে বীরেন, গীতা কে সব বলে। গীতা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সমস্ত ঘটনাটা শোনে। চুপ করে থাকে। অপলক দেখতে থাকে বীরেন কে।

বীরেন একটু লজ্জা লজ্জা ভাবে বলে, " বলো গীতা, ঠিক করিনি, আমরা তো অনেক সময় খাই, কিন্তু ওরা তো তেমন খেতে পায় না। বলো!"

গীতা বীরেন কে জড়িয়ে ধরে বলে, " আমার বীর সোনা। সাধে তোমাকে আমি বীর বলি!" বীরেন গীতার কপালে ঠোঁটের আলতো ছোঁয়ায় পরম যতনে স্নেহচুম্বন দেয়।

দুজনের চোখে অকারণে জল চিক চিক করতে থাকে। বীরেনের চোখে ভাসতে থাকে ঐ বাচ্চা গুলোর আনন্দে বিহ্বল মুখগুলো সেই মুহূর্তে যেটা সে দেখেছিল।

সমাপ্ত

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.