যদি প্রেম দিলেনা প্রাণে


প্রথম

++++

বহু মানুষের বড়ো আপত্তি , আমার গল্পে কষ্ট থাকে বেশি ,প্রেমটা থাকে কম। ঠিক করলাম এবার একটা প্রেমের গল্প লিখবো। শারীরিক আলিঙ্গন ,উষ্ণতার চুম্বন দিয়ে মন ভোলানো গল্পের শেষ থাকবে। সোজা ভাষায় হ্যাপি এন্ডিং যাকে বলে আরকি। কিন্তু , স্থান কাল পাত্র যদি কলকাতার কংক্রিট হয় তাহলে কি আর সেরকম রোমান্টিক মাহেন্দ্রক্ষণ আসবে ? এই ভেবে নেট ঘাটতে থাকলাম রোমান্টিক প্লেসেস অফ ওয়েস্টবেঙ্গল লিখে ! উত্তর বঙ্গের একটা নিরিবিলি জায়গাও পেয়ে গেলাম খুঁজে - "টোটো পাড়া" ! নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঘন্টা ৫ এক এর রাস্তা। হলং ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা রাস্তা মরা নদী পেরোতে হয় ,জোয়ার এর সময় যাওয়া যায়না - খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছিলাম ওটা লুপ্ত প্রায় উপজাতি "টোটো" দের একটা ছোট্ট গ্রাম। ভারী অদ্ভুত ওদের জীবন যাপন , জৈব সার দিয়ে বানানো সব্জি ক্ষেত ঘিরেই চলে জীবিকা নির্বাহের সংগ্রাম। পর্যকদের ভিড় এখনো আঁচড়ে পড়েনি ওখানে , তাই প্রকৃতির অকৃত্তিম সবুজের চিরন্তন শোভা, পাহাড়ী নদীর চোরা বাঁক আর উঁচু নিচু রাস্তার মাদকতার ছোঁয়া পেতে চলে গেলাম -টোটোপাড়া ,দিন তিনেক এর ছুটি জোগাড় করে। উদ্দেশ্য একটাই - নির্জন স্থানে রোমান্টিক প্রকৃতির মাঝে শরীর - মনকে ভাসিয়ে দিয়ে একটা প্রেমের গল্প লেখা !


যাইহোক , থাকার সেরকম কোনো জায়গা নেই , দু একটা "রুম স্টে"-জাতীয় বাড়িই ভরসা। কলকাতা থেকেই একটার সন্ধান নিয়ে গিয়েছিলাম , বছর ষাটেকের এক বুড়োর বাড়ি। মাটির বাড়ির আদলে তৈরী দুতলা একটা ছোট্ট বাড়ি , নিচের তলায় বুড়ো থাকে , আর দোতলার ২টো ঘরে গেস্টদের থাকার ব্যবস্থা আর কি ! সাক্ষ্যাতেই বুঝেছিলাম বড্ডো খিটখিটে প্রকৃতির মানুষ। আংশিক পক্ষাঘাতে শারীরিক বল হয়তো কমেছে , হাত পা গুলো অবশের মতো হয়ে থাকে ও মাঝে মধ্যেই কেঁপে ওঠে..... কিন্তু যে ভাবে জমিদারি কায়দায় দাপটে কথা বলেন তিনি , যে দেখলেই মনে হয় কোনো এক সময় টোটো উপজাতিদের ভালোই শাসনে রাখতেন। ওর বাড়ির আসে পাশের মানুষদের সাথে কথা বলে জেনেছিলাম এতো খিটখিটে হওয়ায় বৌ -ও পালিয়েছে কোনো এক কালে।


দু একজন বলেছিলো চরিত্রের কিছু দোষের কথাও। একটি অল্প বয়সী যুবতী মেয়েকে নাকি রোজ রাতেই ওর ঘরে দেখা যায়। বুড়োর অতিরিক্ত হাত পা কাঁপলে নিজেই কোত্থেকে একটা হুইল চেয়ার বার করে সেটা চালিয়েই ঘুরে বেড়ায় - বুড়োর দেখাশোনা ও রান্না করার জন্য একজন রাঁধুনি আছে, 'কুটিতাকি' তার নাম , কিন্তু সে থাকা না থাকা সমান - না শোনে কানে , না পারে কথা বলতে - ওই আদি টোটো উপজাতির কিছু পুরোনো লোক আছে যারা ওদের ভাষার বাইরে কিছুই বোঝেনা ,বলতেও পারেনা ,অথচ রাত হলেই নেশা করে বুদ হয়ে থাকে - সেরকমই ছিল কুটিতাকি !


যাইহোক আমার কি , আমি তো নিরিবিলি চেয়েছিলাম -পেয়েও গেছি , রান্না বান্না চলনসই , জানলা দিয়ে পাহাড়ি জঙ্গল আর ঝর্ণার আওয়াজ - আর সেই মাঝে মাঝে বুড়োর কাছে আসা যুবতী মেয়েটার কল্পনাতেই প্রথম রাত কাটিয়ে দিলাম। পরের দিন সকাল হতেই মনের মধ্যে একটা হালকা প্রেম অনুভূত হলো। আমি বুঝতে পারলাম এবার আমার, প্রেমের গল্প লিখে ফেলা শুধু কিছু সময় এর অপেক্ষা ! আর , গল্পটা প্রেম না পরকীয়া লিখবো এই ভাবনার অবকাশে ঠিক করে ফেললাম আজ রাতে ওই যুবতীকে যেকরেই হোক নিজের চোখে দেখবো , আর সারাটা দিনে একাএকা প্রকৃতির কোলে ঘুরবো -যাতে প্রকৃতির রোমান্টিক ছোঁয়া আমার লেখনীতেও ফুটে ওঠে। বেদুইন মনে গ্রামের ভেতর ঘুরে, সবুজের ছোঁয়া - বিশুদ্ধ অক্সিজেন - দুরের নীল পাহাড়ের আহ্বান , সবই পেলাম , আর সত্যিই মনে মনে ভাবলাম এতো সুন্দর প্রকৃতিতে থাকার সুযোগ থাকলে হয়তো রোজই প্রেমের গল্প লিখতে পারতাম। যাইহোক , বুড়ো বড্ডো রাগী তাই বিকেলের মধ্যেই ফিরে এলাম। রাত আটটা বেজে গেলে রাতের খাবার খেয়ে উপরে উঠে যেতে হবে - এটাই ছিল তার আদেশ। আমি ঠিক করলাম ,রাতের খাবার খেয়ে উপরে উঠে গল্পটা লিখতে বসবো ,আর জানলা দিয়ে বুড়োর ঘরে নজর রাখবো মাঝে মাঝেই , আমার কল্পনার গল্পে ঐ যুবতীর প্রেম কিকরে যেন বারবার চলে আসছিলো।


দ্বিতীয়

******

ঠিক রাত ১০টা , হালকা শীতের রাতে ,নিঃস্তব্ধ প্রকৃতির লাস্যময়ী রূপে আমার লেখা প্রেমের গল্পটা প্রায় জমে উঠেছে, এমন সময় হঠাৎ নজর পড়লো বুড়োর ঘরের দিকে। চমকে উঠলাম এক অপরূপ সুন্দরী যুবতীকে দেখে ,বুড়োর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সন্তর্পনে সে কড়া নাড়ছিল । মনের ভেতর রবিঠাকুরের গান ভেসে এলো তার প্রতি - "..বাহির হয়ে এসো তুমি , যে আছো অন্তরে এসো আমার ঘরে " ...আর একই সাথে মনে মনে বুড়োর প্রতি একটা রাগ ,বিতৃষ্ণা ও ঘৃণার জন্ম নিলো !

লেখা আমার মাথায় উঠেছিল , মন বলছিলো এর শেষ দেখে ছাড়বো। ..আস্তে আস্তে নিচে নামলাম , লক্ষ্য করলাম বুড়োর ঘরের আলো নিভে গেছে , একটা মোমবাতি জ্বলছে হয়তো ,জোত্স্ন্যা রাতে চাঁদের আলোর সাথে দরজার ফাঁক দিয়ে আসা মোমবাতির ক্ষীণ আলো যেন লুকোচুরি খেলছে। কানে ভেসে এলো বহু পুরোনো কোনো রেকর্ডারে বাজা গানের মতো কোনো সুর.... শোনা যাচ্ছে ঘর থেকে , আর ফিসফিস করে সেই পাজি বুড়ো আর মেয়েটি কি যেন বলে চলেছে। বুড়োটার চরিত্র ও স্বভাব নিয়ে অনেকেই কানা ঘুসো জানিয়েছিল , কিন্তু ব্যাপারটা যে এতটা কুরুচিকর হবে সেটা আমি কল্পনাও করিনি ! সোজা গিয়ে দরজায় টোকা দিলাম , মেয়েটি কিছু পরে এসে দরজা খুললো বেশ অপ্রস্তুত চিত্তে, ঘরের ভেতর গিয়ে দেখলাম -বুড়ো কি যেন লুকানোর চেষ্টা করছে আর তার চাহুনির অভিব্যক্তি বলতে চাইছে - "এখানে কি চাই " ?

আমি দৌড়ে গিয়ে হাত টা চেপে ধরলাম, হাতের ভাঁজে দেখতে পেলাম একটা পুরোনো ছবি। স্ত্রী ও ৪-৫ বছরের ছোট্ট মেয়ের সাথে ঘরের ভেতরেই তোলা একটা খুব মিষ্টি মুহূর্তের ছবি। টেবিলে দেখলাম নানা গল্পের বই , একটা মোমবাতি আর বহু-পুরোনো ছোট মাপের একটি গ্রামোফোন। পুরো ব্যাপারটা বড্ডো গুলিয়ে গেলো , কিছুই ঠিকঠাক ঠাওর করতে না পেরে ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে এলাম। হিমেল একটা স্নিগ্ধ হাওয়া আর চাঁদের কোমল স্পর্শের মাঝেই পিছন থেকে মেয়েটির কণ্ঠ শুনতে পেলাম -

"সাহেব ...একটা বার আমার কথা শুনেন ,মেহেরবানী করে গাঁয়ের বাকিদের মতো আপনিও বাবুজিকে গালাত ভাববেন না , আপনি এ গাঁয়ের কুটুম আছেন , আপনিও যদি গালাত ভাবেন তাহলে বাবুজি খুব দুখ পাবে ".. চেঁচিয়ে বলে উঠলাম রাগত স্বরে - কিসের বাবুজি ? কে বাবুজি ? তোমার মালিক বুঝি ?

মাথা নিচু করে মেয়েটি তার বাবুজীর জীবনের এক অজানা অতীতকে মেলে ধরলো -


যুবতী মেয়েটির নাম সোনাম , ভুটানে জন্ম , এই 'টোটোপাড়া' তে এসেছে বছর ৫-এক হলো, 'বাংলা -হিন্দি ও নানা টিবেটিয়ান' - ভাষা উপভাষার মিশ্রনে বেড়ে ওঠায় এই গ্রামে এসে বড়ো সমস্যায় পড়েছিল সে। হঠাতই পাকে চক্রে দেখা হয় তার এই বাবুজির সাথে। বছর ষাটেকের এই বৃদ্ধকেই সে, তার মৃত বাবার মতো শ্রদ্ধা করে।

তার এই বাবুজীর নাম ছিল তানজিম পেমা। পেশায় ছিল ফরেস্ট রেঞ্জার অফিসার। স্বল্প পরিসরের কর্ম জীবনের বেশির ভাগ সময়টাই দাপটের সাথে পরম দক্ষতায় সামলেছেন চিলাপাতা ও জলদাপাড়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ছিল তার এক ছোট্ট সাজানো সংসার। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনায় মাথার পেছনে আচমকা প্রবল আঘাত পেয়ে গৃহ বন্দি হয়ে পরে সে বেশ কয়েক মাস , আংশিক পক্ষাঘাতের কারণে দৈহিক বল হারায় তার, কর্ম জীবন থেকে নিতে হয় স্বেচ্ছা অবসর !

সচ্ছল আমুদে জীবনে রাশ পড়তে থাকায় ও সর্বোপরি শারীরিক ভাবে দৈহিক মিলনে অসমর্থ হয়ে পড়ায় 'তথাকথিত অক্ষম' স্বামীকে ফেলে ৬ বছরের শিশু কন্যাকে নিয়ে পালিয়ে যায় তার স্ত্রী, নতুন করে ঘর বাধার আশায়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো , সে সময় কোনো প্রতিবাদও করেনি পেমা। জীবন দিয়ে ভালোবাসতো যেই দুটো মানুষকে ,তাদেরকে কোনো রকম কষ্ট হয়তো দিতে চাইনি ও। সবার কাছে খিটখিটে ,বদ মেজাজি ও দুশ্চরিত্র তকমায় সমাদৃত এই বুড়োর রোজ রাত্রের অদ্ভুত অভ্যাসের কথাটা শুনে চোখের পাতা ভারী হয়ে গিয়েছিলো আমার -

ওই পুরোনো গ্রামোফোনে গানের সুর বাজিয়ে ও নানা রকম গল্পের বই থেকে একটার পর একটা গল্প পরে সে তার স্ত্রী ও চোখের মণি ছোট্ট মেয়েটিকে ঘুম পাড়াতো। পাছে প্রতিবেশীরা পরিহাস করে, এই ভেবে আজও তাই ঘরের আলো নিভিয়ে ,একটা মোমবাতি জ্বেলে, গ্রামোফোনে হালকা সুর ভাসিয়ে , রোজ রাতে পুরোনো ছবিগুলো ঘেটে স্ত্রী ও মেয়ের স্মৃতি রোমন্থন করে পেমা। মনের খেয়ালে ছবির উপর হাত বুলিয়ে গল্প শোনানোর ফাঁকে ঘুম পাড়ায় ওদের । তার কিছুক্ষনপর চোখদুটো কে বন্ধ করে ঈশ্বরের কাছে ওদের সুস্থ ও সুন্দর জীবনের প্রার্থনা করে। প্রকৃত দায়িত্বশীল স্বামী ও স্নেহশীল পিতারা সবাই বোধহয় এরকমই হয় !


.....সোনাম এর মধ্যে পেমা বোধহয় আজও ওর মেয়েকে খুঁজে পায় , যেরকম সোনাম তাঁর বাবুজীর মধ্যে খোঁজে, হারিয়ে ফেলা মৃত বাবাকে !


না , এবারও আমার প্রেমের গল্প লেখা হয়ে উঠলোনা বোধহয় । প্রেমের গল্প লিখতে গিয়ে জীবনের গল্প দেখলাম? নাকি জীবনের গল্প লিখতে গিয়ে পবিত্র কিছু প্রেমের হদিস পেলাম ? - জানিনা ! ...ফেরার পথে সেই অসমাপ্ত প্রেমের গল্পে দাড়ি টেনে , শেষ দুটো লাইন লিখেছিলাম -


'প্রেমের গল্প লিখুক গুণী জনে , আমার লেখায় প্রেম করেছে আড়ি -

জীবনের কিছু গল্প যে আমায় টানে ,যাদের আজও ফেরা হয়নি বাড়ি !'


===========================END==================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.