কাপুরুষ

কাপুরুষ

পৃথ্বীরাজ আজ পাঁচ বছর পর দেশে ফিরছে। বিমানে বসে সে পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করছে –পৃথ্বীরাজের বাবা ভূদেব ব্যানার্জি আর সংযুক্তার বাবা দিনেশ পাল সহপাঠী ছিলেন কলেজে। প্রাণের প্রাণ বন্ধু, পাশ করে দুজনে এক যায়গায় চাকরী পেলেন। প্রায় একসময় বিয়ে করলেন এবং একসাথে মধুচন্দ্রিমা যাপন করতে বউ নিয়ে দার্জিলিং গেলেন। একবছর পর দুই মাস আগে পরে দুজনে বাবা হলেন। ছেলে বড়, মেয়ে ছোট। আহ্লাদে আটখানা হয়ে ছেলে-মেয়ে দুটির নাম রাখলেন পৃথ্বীরাজ ও সংযুক্তা। দুজনেরি ইচ্ছে বড় হলে ছেলে মেয়ে দুটির বিয়ে দিয়ে নিজেদের বন্ধুত্ব আত্মীয়তায় পরিণত করবেন। পৈতৃক বাড়ি একজনের বালিগঞ্জ, আরেকজনের টালিগঞ্জ। কিন্তু শনি আর রবি এই দুটো দিন তাঁরা সপরিবারে একসাথে থাকতেন, হয় বালিগঞ্জ, নয় টালিগঞ্জ এ।

এই ভাবে বছর গড়াল, ছেলে মেয়ে দুটি একসাথে বড় হতে থাকল। ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছে ওদের বিয়ে হবে। তাই পরস্পরের প্রতি প্রেমের কোনও কমতি ছিল না। বেশ চলছিল এইভাবে, এমন সময় দিনেশ প্রস্তাব দিলেন ব্যবসা করার। ভূদেবও রাজী হয়ে গেলেন। ক বছর বেশ ভালই চলল ব্যবসা, তারপর শুরু হল গণ্ডগোল। কথাতেই আছে – অর্থই অনর্থের মূল। বন্ধুত্বে ফাটল ধরতে সময় লাগলো না। দুজনে ব্যবসা ভাগ করে আলাদা হয়ে গেলেন।

এদিকে পৃথ্বীরাজ ইঞ্জিনিয়ারিং ফাইনাল ইয়ার এ উঠল, ওদিকে সংযুক্তা গ্র্যাজুয়েট হল। দিনেশ মেয়ের সম্বন্ধ দ্যাখা শুরু করে দিলেন। বউ সবিতা প্রতিবাদ করলেন – “কি কর! পিউর বিয়ে তো রাজুর সাথে ঠিক হয়ে আছে!” দিনেশ গর্জন করে উঠলেন – “আমি বেঁচে থাকতে ও বাড়িতে মেয়ে পাঠাবো না!” সংযুক্তা পৃথ্বীরাজ কে বলল – “চল, রেজিস্ট্রি করে নি”। পৃথ্বীরাজ বলল – “পড়াই তো শেষ হল না রে পিউ, তোকে খাওয়াবো কি? বিয়ের পর বাবা আমাদের বাড়িতে ঢুকতে দেবে ভাবছিস?” সংযুক্তা বলল – “সে তো আমাদের বাড়িতেও ঢুকতে দেবে না, কিন্তু রেজিস্ট্রি না করে নিলে আমাকে যে অন্য যায়গায় বিয়ে দিয়ে দেবে!” পৃথ্বীরাজ বলল – “আমায় আগে চাকরী পেতে দে প্লিজ! তুই বিয়ে করবি কেন? জোর করলেই হল! আমার জন্য অপেক্ষা করবি!”

দিনেশ মেয়ের বিয়ে পাকা করে ফেললেন এক ডাক্তারের সাথে। সংযুক্তা কেঁদে ভাসাল, সবিতা মুখ ভার করে রইলেন, কিন্তু দিনেশ অটল – এই খানেই মেয়ের বিয়ে দেবেন, এবং সামনের মাসেই। পৃথ্বীরাজ কাপুরুষের মত বাড়ি থেকে পালিয়ে রেজিস্ট্রি বিয়ে করতে চাইল না। সে মুখ খুলল, প্রথমে দিনেশের কাছে – দিনেশ খেঁকিয়ে তাড়িয়েই দিলেন – “যা, তোর বাপ কে ডেকে নিয়ে আয়! আমার পা ধরে মেয়ে ভিক্ষে চাইতে বল!” অপমানে মুখ লাল করে পৃথ্বী বাবার কাছে গেল। ভূদেব রাগে ফেটে গেলেন – “তোর নিজের মান অপমান নেই, তাই বলে বাবার মান ইজ্জৎ ধুলোই লুটিয়ে এলি? পাশ করিস নি, চাকরি পাস নি, বিয়ে করবি? বেড়িয়ে যা!” আদরের ছেলের বড় অভিমান হল, সে ব্যাগ গুছিয়ে হোস্টেলে বন্ধুর ঘরে থাকতে চলে গেল। যাবার সময় সংযুক্তাকে বলে গেল – “আমি কাপুরুষ নই, পালিয়ে বিয়ে করব না, চাকরি পেয়ে তোর বাড়ি থেকে তোকে নিয়ে যাব, তুই অপেক্ষা করবি”।

কিন্তু সংযুক্তা ও সবিতার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও সংযুক্তার বিয়ে হয়ে গেল। এ যুগের পৃথ্বীরাজ তাকে হরণ করতে এল না। সে পরের বছর চাকরি নিয়ে বিদেশ চলে গেল। মনে ক্ষোভ নিয়ে গেল – “পিউ, কি কাপুরুষ তুই! আধুনিকা মেয়ে, জোর করে তোর বাবা বিয়ে দিল, আর তুই করে নিলি! প্রতিবাদ করলি না!”

এরপর পাঁচ বছর কেটে গেছে – পৃথ্বীরাজ বিয়ে করেনি। এই পাঁচ বছরে না পৃথ্বী, না সংযুক্তা, কেউ কাউকে একবারও যোগাযোগ করেনি। দুই বাবার ঝগড়া অটুট আছে, কিন্তু দুই মায়ের টেলিফোন এ কথা হয়। মার থেকে একদিন জানতে পারল পৃথ্বী - সংযুক্তা সুখী হতে পারেনি। এ বছরের প্রথম দিকে সংযুক্তার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে!

পৃথ্বীর মনে আর সংযুক্তার প্রতি ক্ষোভ রইল না, বরং মেয়েটার প্রতি মায়া হল – “বাচ্চা মেয়ে, বাবার বিরুদ্ধে যেতে সাহস পায়নি, সুখী হলে ভাল হত! এখনো কি আমায় ভালবাসে? আমি তো বাসি! আর কাউকেই তো বিয়ে করতে ইচ্ছে হল না! আর ভুল করব না, ওকে এবার বিয়ে করে নিয়ে যাব”। ভাবতে ভাবতে কলকাতা এয়ারপোর্ট চলে এল, এয়ারপোর্ট থেকে টালিগঞ্জ। হ্যাঁ! টালিগঞ্জ, বালিগঞ্জ না। পৃথ্বী আগে যাবে তার পিউর কাছে। আজ রবিবার, নিশ্চয় সে বাড়ি আছে।

দরজা খুলল সংযুক্তা। স্তম্ভিত! ঘোর কাটতে সময় নিল। পেছন পেছন সবিতা কখন এসে দাঁড়িয়েছেন – “রাজু! এতদিনে আমাদের মনে পড়লো!” গলা কেঁপে উঠল সবিতার। দিনেশও বাড়ীতে ছিলেন সেইদিন। এসে পৃথ্বীর দুহাত জড়িয়ে ধরলেন – “আয় রাজু আয়, পিউ এর কথা শুনেছিস তো? কি যে হয়ে গেল!” “তুই এখনও বিয়ে করিস নি কেন রে? তোর মা তোর মাসির কাছে কতো দুঃখ করছিলেন!”

নাহ! আর সহ্য করতে পারল না সংযুক্তা – “বাবা থাম! রাজু বিয়ে করেনি বলে কি আমাকে ওর গলায় ঝোলাবে? আমি এতটাই বোঝা? আমাকে নামাবার জন্য নিজের এতদিনের মান অপমান ভুলে গেলে!” “আর রাজু! তুমি এতদিন পর কি মনে করে এ বাড়িতে এসেছ? পিউর ডিভোর্স হয়ে গেছে, তাই তাকে দয়া করবে? আমি এখন স্বাবলম্বী, চাকরি করি একটা। কারোর দয়াদাক্ষিণ্য আমি চাই না। তুমি ফিরে যাও”। কথাগুলো প্রায় এক নিঃশ্বাসে বলে সংযুক্তা পেছন ফিরে ওর ঘরের দিকে হাঁটা দিল। হলঘরে তিনটি মানুষ নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে। কাপুরুষ পৃথ্বীর সাহস হল না হেঁটে সংযুক্তার ঘর অব্দি যাবার।

****************************************************************

*সাহিত্যপ্রেমী শারদীয়া ই-পত্রিকায় (২০১৫) প্রকাশিত

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.