বন্দনা

কয়েকদিন আগে আমার মা মারা যায়। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। যে মা আমাদের পৃথিবীর আলো দেখাল আর এত কষ্টের মধ্যে লালন-পালন করে বাঁচার মতো বাঁচাল তাকে আমরা ঠিক সেভাবে বাঁচাতে পারলাম না। একপ্রকার বিনা চিকিৎসাতে মাকে চলে যেতে হয়েছে, ভেবেই নিজেকে ভীষণ দোষী মনে হয়। মনে হয় অকৃতজ্ঞের মতো চাকরি নিয়ে প্রবাসে পড়ে থেকে দিনের পর দিন মাকে উপেক্ষা করেছি। সন্তানের প্রতি তার আকুতিকে কোন গুরুত্বই দিইনি ।

মায়ের সাহিত্যপ্রীতি আমাকে একটু লিখতে শিখিয়েছে। তাই গঙ্গাজলে গঙ্গা পুজো করার মতো মাকে হারানোর ব্যথা নিয়ে কিছু লিখে কিছুটা কৃতজ্ঞতা দেখাব ভেবেছিলাম। কিন্তু তাও বোধহয় হবে না। কারণ, গতকাল মায়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যার সাথে দেখা হয়েছে, আমার মন আগে তাকে নিয়ে কিছু লেখার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।

যদিও তার মহৎ ত্যাগের কথা আগে শুনেছিলাম, তবুও তার সাথে আমার আগে দেখা হওয়ার সুযোগ হয়নি। এবার হল। তাও আবার গ্রামের বাড়িতে মায়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের দিনেই। সে যাহোক, দুদিন সে আমাদের সাথে কাটিয়েই এতকিছু উপকরণ দিয়ে গেল যে তাকে নিয়ে আমাকে লিখতে বসতেই হচ্ছে।

সে কে? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ামাত্রই অনেকে বলবেন, ওঃ! তাই? ঠিকই ভেবেছি, এরকম কাউকে দুদিন কাছে পেয়ে কোন্‌ মানুষ মাকে বা অন্যকে নিয়ে লিখবে শুনি? আরে বাবা, সবাই এক গোত্রের মানুষ । সবই বুঝি ?

কিন্তু না, এখনো তার সাথে আমার সম্পর্ক সোজা বলতে পারছি না। বরং ব্যাপারটাতে আরও ধাঁধা জড়িয়ে দিয়ে বলি, ও আমাকে এই দুদিন যে মিষ্টি সম্বোধনে ডেকেছিল তা ভাবতে পারিনি! একেবারে আনমনা হয়ে তার ও ডাকের অর্থ বোঝার চেষ্টা করেছি। পরে অবশ্য তার একটা কারণ নিজেই খুঁজে পেয়েছি। হ্যাঁ, সেটা বলব নিশ্চয়। এখন দেখি না, আপনারা আর কী ভাবতে পারেন? তবে আমি সুনিশ্চিত যে, তার সম্বন্ধে যে কাহিনী এখন বলব, তা জানার পর আপনারা তার নামে নিশ্চয় “বন্দনা” নেবেন!

এই দেখলেন তো, কথাপ্রসঙ্গে তার নাম বলেই ফেললাম। হ্যাঁ, বললাম, সে একজন মেয়ে এবং তার নাম “বন্দনা”। তবে তাকে মেয়ে না বলে মহিলা বলাই ভাল। মধ্যবয়স্কের কাছাকাছি বা তার নিচে তার বয়স। যদিও সে কিছুটা কালো ও তার শরীরে সে জৌলুস নেই, কিন্তু দেহমনে তার শক্তির যে অভাব নেই তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আর তার হৃদয়! না-না, সেটা এখনই বলতে পারব না। অত তাড়া ভালো নয়।

মেয়েটি সম্পর্কে আমার শালী বা শ্যালিকা। আমার নিজের বৌদির একসময়ের বড় আদরের বোন ।

ব্যস, এবার আপনাদের আর থামাতে পারলাম না। অর্থাৎ, আপনারা অনড় রইলেন আপনাদের চিন্তাধারায়। মানে-

না, আমার আজকের গল্প আপনাদের সে ভাবনাতে জল ঢালল। কেন বলছি, তা জানতে চান? তাহলে আসুন আমার সাথে।

শ্যালিকা হলেও বন্দনার সাথে যেহেতু আমার দেখা হল এই প্রথমবার, তাই, ওকে নিয়ে গল্প লিখতে যাওয়া মানে একটু ভাবতে হয়ত হোত, কিন্তু তা হল না, কারণ, ওর কাহিনী যে আগেই শুনেছিলাম, তা একটু আগেই আমি আপনাদের বলেছি। বস্তুতঃ, সে কাহিনী না শুনে কারোর উপায় থাকে না। অন্ততঃ, যাদের হৃদয় আছে তারা তার সে কাহিনী শুনে কক্ষনো ভুলবে না। আর যে কোন ভাইয়েরা তো আজীবন এরকম একজন দিদিকে মনে রাখবে? কিন্তু এভাবে তার কাহিনীকে তকমা দেওয়ার আর ভনিতা না করে সোজা বলে তার গুরুত্ব আপনাদের হাতে তুলে দেওয়াই যে শ্রেয় হবে, তা মেনে নিয়ে এগোনো যাক ।

কাজঘরে বন্দনাকে কাছে পেয়ে আমার লেখার কাজটা আরও সহজ হয়ে গেল। কাজটা সহজ হওয়ার আর একটা কারণ হল, ওর স্বামী ও এক ছেলেকে সেই অনুষ্ঠানে পেয়ে। অর্থাৎ, লোকের মুখে ঝাল না খেয়ে নিজে তা ভালোভাবে জেনে নিয়েই এ গল্প লিখতে বসেছি। এর মধ্যে এক বিন্দু মিথ্যে থাকার সম্ভবনাও রইল না।

রবীন্দ্রনাথঠাকুর-এর “দেনা-পাওনা” গল্পে সাত ভাইয়ের কোলে যখন নিরুপমার জন্ম হয়েছিল, তখন তার উপর ভাইয়েদের যে কী পরিমাণ ভাব-ভালবাসা জন্ম নিয়েছিল, তা লেখক স্পষ্ট করে বলেননি। কারণ, স্পষ্টতঃ জিনিস বলার দরকার হয় না। সুতরাং, বন্দনারা ছয় বোনের পর যখন একমাত্র ভাইকে পেল, তখন সে ভাই তো আর সাধারণ হল না? মা-বাবার চেয়ে বোনেরাই খুশি হল বেশি। আর এই বন্দনা তো বোধহয় খুশির সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিল!

বন্দনা সেজো ছিল। তার আগে তার দুই বোনের কেবল বিয়ে হয়েছে। এবার তার পালা। এমনিতেই ওরা গরিব ছিল। মাত্র দু’ বোনের বিয়ে দিতেই ওর মা-বাবা যেভাবে নিঃস্ব হয়ে গেছিল তা বন্দনা দেখেছে। বন্দনা দেখেছিল, বরপনের টাকা যতদিন না তার মা-বাবা দিতে পেরেছিল, ততদিন তার জামাইবাবু তার বড়দিদিকে তাদের বাড়িতে ফেলে রেখেছিল। নিয়ে যায়নি। বিয়ের পরেই প্রায় একবছর দিদি তাদের ঘরে কেঁদে কাটিয়েছে। তারপর, একদিন হঠাৎ তার জামাইবাবু তাদের ঘরে আসে এবং দিদিকে না নিয়ে তার বাবার গরুদুটোকে খুলে নিয়ে চলে যায়। দিদি সেদিন গরুদুটোর মতো নিজে বন্ধনমুক্ত হয়ে স্বামীর সাথে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু তা হয়নি। দিদি অনেক কেঁদেছিল। পরে দিদি একদিন নিজে গিয়ে শ্বশুরবাড়িতে ওঠে।

সুতরাং, বন্দনা বেশ ভালমতোই বুঝতে পেরেছে, যে, কারোর সংসারে এরকম ছয় মেয়ে সন্তান থাকলে তাদের বিয়ে দিতে এই বর্তমান অর্থলোলুপ সমাজে বরপণ-এর আঘাতে ঘায়েল হতে হতে যে কোন মা-বাবা ফকির ও দুঃস্থ হয়ে যাবে বা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে। বন্দনা মা-বাবা আর ভাই ও বোনেদের এতটাই ভালোবাসত যে, এতসব ভাবনা মাথায় রেখে, মা-বাবার সংসার থেকে নিজের বিয়ের জন্য এক পয়সাও খরচ করতে রাজি হল না। ফলে সে জেদ ধরল, বরপণ না নিয়ে যে ছেলে তাকে বিয়ে করতে রাজি হবে তাকেই সে বিয়ে করবে। বন্দনা এতদিনে এটাও বুঝে গেছে যে, কোন ছেলেই তাকে বিয়ে করতে রাজি হবে না। যে সুজিৎ তাকে এত ভালোবাসত, সেও সময় বুঝে কেটে পড়েছে। হঠাৎ, সুজিৎ জানিয়ে দিয়েছে, বন্দনাকে সে কখনো বিয়ে করতে পারবে না। যোগাযোগ রাখা একপ্রকার বন্ধ করে দিয়েছে। সুতরাং, সমস্ত ছেলে জাতটাকে বন্দনার জানা হয়ে গেছে। সে ঠিকই করে নিয়েছিল, বিয়ে করবে না। মা-বাবা ও আদরের ভাই-বোনেদের সাথে সারা জীবন কাটিয়ে নেবে।

কিন্তু নিয়তির ছক ছিল অন্য। তাই, হঠাৎ কোন এক গ্রামের এক গরিব চাষীর ছেলের সাথে একদিন বন্দনার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর বন্দনা বুঝে গেল, কেন ছেলেটি টাকা না নিয়ে বিয়ে করেছে? কিন্তু, তখন আর তার শুধরানোর কোন অবকাশ রইল না। বরং খুশি মনে তাকে মেনে নিল। অর্থাৎ, বন্দনার সংসার জীবন শুরু হয়ে গেল।

বন্দনার স্বামী, দেবানন্দ গায়ের যোগ্যতা বেশ কিছুটা হারিয়েছিল, ছোটবেলায় দু’দুটো বড় দূর্ঘটনায় পড়ে। অবশ্য সে দূর্ঘটনা যে তারই আমন্ত্রিত ছিল তা না বললে ঠিক বোঝা যাবে না। তাই, বলতেই হয়।

গরুর গাড়িতে মানুষ যে চাপা পড়তে পারে তা বোধহয় সংবিধান লেখার সময় বাবা আম্বেদকার ভাবতে পারেন নি। আর তাই, সংবিধানে সে সম্বন্ধে বা তার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা নিয়ে কোন ক্ষতিপূরণ নিয়ে লেখেন নি। কিন্তু, এই দেবানন্দই একদিন শুকনো ক্ষেতের মাঠে ক্ষত হল নিজেরই গরুর গাড়িতে চাপা পড়ে। কেন চাপা পড়ল, তা বলার দরকার নেই। কিন্তু না বলে পারছি না, “এ কেমন মানুষ?” হ্যাঁ, সে কেমন মানুষ বলতে গেলে তার দ্বিতীয় দূর্ঘটনার কথাও বলতে হয়। ইঙ্গুয়াল হার্নিয়া অপারেশনের পর ডাক্তারি মতে ছেলেদের সাধারণতঃ বেশ কিছুদিন বিশ্রাম নিতে হয়। কিন্তু, এই দেবানন্দ কাকে খুশি করতে জানি না, তার ওই হার্নিয়া অপারেশনের এক সপ্তাহ পরেই সাইকেল চালিয়ে দূরের শহরে চলে গেল। সুতরাং, দেবানন্দ যে সাধারণ নয় তা এবার আপনারাও বেশ বুঝতে পারছেন। যদিও, তার অসাধারণত্ব বোঝাতে এখনো কিন্তু আসল কথাটাই বলা হয়নি। তা হল, গরিবের ঘোড়া রোগের মতো তার ছিল দৈনিক মদ্যপানের নেশা।

দেবানন্দের মাহানন্দে দৈনন্দিন সুরাপান তাদের সংসারের ভরাডুবি আটকাতে বার বার ব্যর্থ হতে লাগল।

[পরের পাতায়]

এক এক করে বন্দনার দুটি ছেলে হল। ছেলে দুজন অবশ্য দেখতে খুব সুন্দর হল এবং মায়ের মতোই দেহমনে তাদের সজীবতা ফুটে উঠল।

কিন্তু যে সংসারে বাবা এরকম মদ খায়, তার ছেলেরা আর কতদিন ভালো থাকতে পারে? তারপর যদি গরিবিয়ানা তাদের চেপে ধরে তাহলে আর যাই হোক, এই বিষয়ী বর্তমান সমাজে তার ছেলেদের যে লেখাপড়া হবে না, তা তো যে কেউ জানে? হ্যাঁ, বড় ছেলেটি কোনরকমে ক্লাস নাইনে উঠে বইগুলো তুলে রাখল। আর ছোট ছেলেটি নামে মাত্র পড়াশুনো চালিয়ে যেতে লাগল।

হঠাৎ একদিন, বড়ছেলেটি গ্রামের কোন এক কাকুর হাত ধরে নাগপুরে পাড়ি দিল, কিছু কাজের আশায়। কিন্তু, তার সেই সামান্য রোজগারে যখন সে কাকু গোপনে ভাগ বসাতে লাগল, তখন তার পক্ষে সেখানে রোজ এক-দুবেলা আধপেট খেয়ে দিন কাটানো অসম্ভব হয়ে পড়ল। সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই সে একদিন আবার বাংলায় তার সেই গ্রামে মা-বাবার কাছে ফিরে এল।

হঠাৎ বাইরে থাকা, বড় ছেলেটির চোখ খুলে দিয়েছিল। রঙিন দুনিয়া সে দেখে এসেছে। সুতরাং, তার হাতে টাকাপয়সা দরকার সে জেনে গেছে। তাই সে গ্রামে এসে এক দোকানে বাইক সারানোর কাজে যোগ দিল। তারপর বয়সের তাড়নায়, আচকা টাকা হাতে পেতে গেলে যা করতে হয় তা সে করে বসল। মানে, সেই বাইক দোকানে, মালিকের টাকার ব্যাগ হাতড়ানোর সময় সে হাতেনাতে ধরা পড়ল। সুতরাং, তার চাকরিই শুধু গেল না, আর কোথাও কোন কাজ পাওয়ার সম্ভবনাও বিলীন হল। আর, মা-বাবার মান-সম্মানও গেল।

তারপর থেকেই ছেলেটি রোজ ক্লাবের ঠেকায় আড্ডা মারে। সম্পূর্ণ বেকার হয়ে ঘুরে বেড়ায়।

এভাবেই চলে যাচ্ছিল বন্দনাদের দুঃখের সংসার। আচানক একদিন বিধি বাধ সাধল। একটা ঘটনা ঘটিয়ে বসল।

জানা গেল, বন্দনার ভাই কলুর একটা কিডনি ড্যামেজ হয়ে গেছে। সম্প্রতি, সে কোন মদের দোকানে কাজে ঢুকেছিল। আর সেখানে, এমন মদ খেত যে, তার একটা কিডনিই বিকল হয়ে গেল।

ডাক্তারের কথামতো কলুর কিডনি পাল্টাতে হবে। কিন্তু এত টাকা বন্দনার মা-বাবা পাবে কোথায়? তারা প্রায় মরে মরে কোনরকমে এক এক করে সব মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার কাজটি সম্পন্ন করেছে এই মাত্র কয়েকদিন আগে। এখন তাদের হাতে টাকা কোথায়?

জানি ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে। এতদিন পর্যন্ত জানতাম, সে ভালোবাসা হয় মা-বাবার সন্তানের প্রতি বা প্রেমিক-প্রেমিকার পরস্পরের । কিন্তু কক্ষনো শুনিনি, ভাই বোনের স্নেহ-মমতার ভালবাসাও মানুষকে অন্ধ করতে পারে। হ্যাঁ, বন্দনা, ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে জীবন দিতে রাজি হল। অর্থাৎ, ডাক্তারকে নিজে গিয়ে জানাল, সে ভাইয়ের জন্য নিজের একটা কিডনি দান করবে।

বন্দনা একবারও ভাবল না, তার জীবন ও সংসার ছেড়ে কত বড় একটা ঝুঁকি নিতে চলেছে। বন্দনা পাগলের মতো সেই স্নেহ-মমতায় অন্ধ হয়ে, গোপনে রাতের অন্ধকারে জীবনটাকে হাতে নিয়ে একলা শ্বশুরবাড়ি থেকে রওনা দিল কলকাতার সেই নার্সিংহোমের উদ্দেশ্যে, যেখানে তার জীবনের অর্ধেক , মানে তার প্রানের একমাত্র ভাই কিডনির অভাবে জীবনযন্ত্রণায় ছটফট করছে। একপ্রকার একরোখা বন্দনা পরেরদিন সকালে যথাসময়ে সেই হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে শুয়ে পড়ল, সে এখুনি তার একটা কিডনি ভাইকে দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে আনবে। তার এহেন সাহস ডাক্তারদেরকেও তাক লাগিয়ে দিল। ডাক্তাররা তো রীতিমতো তাকে বার বার প্রশ্ন করতে লাগল, কত টাকা সে নিচ্ছে তার মা-বাবা বা ভাইয়ের কাছ থেকে, এ কিডনি বেচার জন্য। ডাক্তারদের বার বার প্রশ্নের উত্তর সে দিতে পারল না ঠিক করে। কেবল বলে চলল, দয়া করে আমার ভাইকে বাঁচান। শেষে, ডাক্তাররা তার ঠিকমতো বয়ান নিয়ে তার একটা কিডনি কেটে তার ভাইয়ের শরীরে জুড়ে দিল।

ভাই বেঁচে ফিরল। দেখল, দিদি কত শান্তিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। অসম্ভব যন্ত্রণা চেপে বন্দনা হাসি মেখে ভাইকে পাওয়ার আনন্দে মেতে গেল।

কিন্তু ঈশ্বর বোধহয় সে আনন্দ বেশিদিন মেনে নিতে পারলেন না। বন্দনার হাসি কেড়ে নেওয়ার সহজ উপায় বেছে নিলেন। হ্যাঁ, কলুর অন্য কিডনিটাও খারাপ হয়ে গেল।

বন্দনা পারলে তার অন্য কিডনিটাও হয়তো দিয়ে দিত। কিন্তু তা আইনতঃ গ্রাহ্য হল না। ফলে, যমরাজের ইচ্ছাই পূর্ণ হল। অর্থাৎ, কলু মারা গেল! বন্দনা চোখের জল ফেলতে ফেলতে তার দুঃখ কোনরকমে কমাতে লাগল।

এই সময়টা হয়ে উঠল বন্দনার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। একদিকে ভাইকে হারানো আর অন্য দিকে স্বামী ও সন্তানের কাছ থেকে রোজ মারধোর ও গালমন্দ খাওয়া। জানি না, এ সময় মানুষ কী করে? বন্দনা ছেড়ে দিল নিজেকে নিয়তির ওপর, আর মুখ বুঝে সব কষ্ট সহ্য করতে লাগল।

শুনেছি, এই সময়, মদের পয়সা পেত না বলে তার স্বামী তার কিডনি তোলার কাটা অংশে মারত আর বন্দনা তা সহ্য করত! এমনকি, তার বড় ছেলেও এব্যাপারে কম যায়নি। সেও নাকি মাকে মারত! এসব, বলতেও আমার কষ্ট হয়, কিন্তু এসবই হয়েছে, বন্দনার সেসব দিনগুলিতে।

লোহা পেটাই খেয়ে খেয়ে যেমন শক্ত ষ্টীলে পরিণত হয়, তেমনই বন্দনা অচিরেই আরও শক্ত হওয়ার শক্তি পেল। সে বুঝতে পারল, এভাবে হেরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং, বন্দনা একসময় আবার রুখে দাঁড়াল। নিজেই ছুটে গেল সরকারি হাসপাতালে। আর সেখানে, ডাক্তারের কথামতো চেক-আপ করাতে লাগল নিজেকে। অবশ্য, দ্বিতীয়বারের বেলায়-ই সে বুঝে গেল, সে ডাক্তারের এত আগ্রহ কেন তার প্রতি? বন্দনা, তৃতীয়বার চেক-আপের দিনে সে ডাক্তারের ফান্দে যখন প্রায় আটকে যাবে, ঠিক তখনই সেখান থেকে ছুটে বেরিয়ে যায়। তারপর, কাউকে কিছু না বলে একাই ছুটে যায় কলকাতায় সে হাসপাতালে, যেখানে সে কিডনি হারিয়েছিল। সেখানে ডাক্তারের ফ্রি চিকিৎসা এবার পেল ঠিকই, তবে তারা যে আর ফ্রি চিকিৎসা করবে না, তাও জানিয়ে দিল দ্বিতীয় দিনেই। বন্দনা তখন কাঁদতে লাগল। ওর কান্না ও দুঃখ বুঝে এক সহৃদয় ডাক্তার তখন ওকে এক পরামর্শ দিল। না, খারাপ নয়, এবার সে ভালো পরামর্শই পেল। বন্দনা সে ডাক্তারের কথামতো, তার ভাইকে দেওয়া কিডনি যে ফ্রি ডোনেশান ছিল, তার উপযুক্ত প্রমান সমেত বয়ানপত্র বা সার্টিফিকেট তৈরী করাল। তারপরই সে সার্টিফিকেট নিয়ে সোজা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে গেল। কেউ ভাবতেও পারল না, যে, বন্দনা এভাবে মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছে যাবে? বন্দনা মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে যে কোন সরকারি হাসপাতালে কিডনি সংক্রান্ত আজীবন ফ্রি চেক-আপের অনুমোদন বা পাশ পেল। বন্দনা খুশি হল।

ফ্রি চিকিৎসার পাশ পেলেই তো আর জীবন চলবে না? জীবন যে আরও অনেক কিছু নিয়ে জড়িত? স্বামী-সংসার-সমাজকে নিয়ে বেঁচে থাকা যে জীবনের বড় লড়াই? সুতরাং, কয়েকদিনের মধ্যেই বন্দনা আবার জীবন যুদ্ধের বাকি লড়াই সামলাতে ব্যস্ত হয়ে গেল।

“সংসার সমর মঞ্চ” নাটকের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথমেই বন্দনা এতদিন ঠিকমতো না বুঝে ফেলে রাখা সবচেয়ে দরকারি কাজটি সম্পন্ন করল। হ্যাঁ, ওর কৌশলী ও কার্যকরী পরামর্শে ও ভালবাসায় ওর স্বামী এখন মদ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এটা যে খুবই সফলতা তা ওর স্বামীকে দেখেই বুঝেছি।

লড়াকু বন্দনাকে এখন দেখলে কেউ বলতে পারবে না যে, তার একটা কিডনি নেই। বরং, সে এখন আরও বেশি মজবুত। সে শুধু চাষবাসের বা মাঠের কাজই করে না, কেউ বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করতে ছুটে আসে। গ্রামের সবাই তো কলকাতায় কোন ডাক্তার দেখাতে বা ভর্তি হতে গেলে আগে তার কাছে ছুটে যায় আর বন্দনাও সঙ্গে সঙ্গে তাকে সঙ্গ দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

গল্প এখানে শেষ হতে পারত। কিন্তু হল না, কারণ, বন্দনা যতদিন এই পৃথিবীতে থাকবে ততদিন ওর গল্প আরও সংযোজিত হতে থাকবে। হ্যাঁ, তারই একটা ছোট উদাহরণ দিয়ে আপাতত আমি আমার আজকের গল্প শেষ করব।

কাজঘরে বন্দনার সাথে আমার দেখা হওয়ার পর থেকেই ও আমাকে “ভাই “ সম্বোধনে ডেকে ছিল। হ্যাঁ। কেন ভাই বলত, এতক্ষণে আপনারা তা নিশ্চয় বুঝে গেছেন। ভাইকে হারিয়ে ও দুনিয়াতে আর এক ভাই খুঁজছে বুঝে আমি তার সে ডাকে সাড়া দিই। আমার মন ওকে নিয়ে ভাবতে থাকে। তাই, আমি ওর আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতাম। আমার রঞ্জন রশ্মির চোখ ওকে স্ক্যান করে দেখতে পেত, ওর কিডনির ওই কাটা অংশ, কেমন শান্তিতে আছে। আমরাই যেন বেশি চিন্তান্বিত।

মায়ের ভোজবাড়ীতে আমরা রাজনীতির স্থানীয় বিধায়ক মহাশয়কে আমন্ত্রণ করেছিলাম। সৌজন্যতা বজায় রাখতে। আর উনিও সে সৌজন্যতা বজায় রাখতে এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে, তবে নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে, একেবারে রাতের বেলায়। এরকম রাতে এভাবে সাহস নিয়ে যে তিনি আমাদের বাড়িতে আসবেন তা বুঝতে পারিনি। যাহোক, সশস্ত্র প্রহরী নিয়ে তিনি এলেন আর আমরাও সমাদরে তাঁকে বরণ করলাম।

বিধায়ক মহাশয় অনেক ভাল কথা বললেন। আমরাও খুশি হয়ে হয়ে অনেক কথাই বললাম।

ভেবেছিলাম, এইসময়, বন্দনা আমাদের সামনে এসে বিধায়ককে ওর বৃক্ক দানের কথা বলে কিছু সাহায্য আদায় করে নেবে। কিন্তু না, তা হয়নি। পরে বিধায়ক চলে যেতে বন্দনাকে বলেছিলাম, কেন তুমি সামনে এসে বিধায়কের কাছে কিছু চাইলে না? ও বলল, সেটা কি ঠিক হোত? এইসময়, এরকম সুযোগ নেওয়ার কথা ওনার ভালো নাও লাগতে পারত?

ভেবে দেখলাম, বন্দনা হয়তো ঠিক। সবসময় সুযোগের ব্যবহার করাটা অনেকটা স্বার্থপরতার লক্ষণ। ও যে স্বার্থপর নয়!

সাধারণ মানুষ অবশ্য বন্দনাকে বোকা বলে!

=======================================================================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.