কুমুদপুরের অভিশপ্ত দুপুর

কুমুদপুরের অভিশপ্ত দুপুর

( সত্য ঘটনা অবলম্বনে )

“কি’রে? হল তোর ? আর কতক্ষণ জামা-কাপড় নিয়ে থাকবো হাতে? কখন সেই চানঘরে ঢুকেছিস। এখানেই সকাল আটটা বেজে গেছে, ওদিকে আবার বেরোতে দেরী হয়ে যাবে” - মা রাগতস্বরে আমার উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলে উঠল। বাথরুমের ভেতর থেকে আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম - আর দুমিনিট মা।

আমার মেজাজ আজ সকাল থেকেই ফুরফুরে। বছরে এই তিনচারটে দিনের জন্য খুব উৎসাহ সহকারে অপেক্ষারত থাকই আমি। এইসময় প্রতিবছর আমাদের গন্তব্যস্থল কুমুদপুর। কুমুদপুর একদম পাড়াগাঁ, এখনও আলো আসে নি, কল্যানেশ্বরী মন্দিরের সামনে দিয়ে যে রাস্তাটা ডিভিসি ব্যারেজের দিকে এগিয়ে গেছে, তার ঠিক উল্টো দিকে দেন্দুয়া যাবার পথে রাস্তার ডানদিকে পরবে কুমুদপুর গ্রাম, আমার বড় মামার শ্বশুরবাড়ি। বড় রাস্তা থেকে একমাত্র মেঠো পথের সংযোগ এই গ্রামের। আশে পাশে প্রচুর ফ্যাক্টরী, স্টিল, মার্বেল আর কাঁচের। তবুও যেন ভগবান অতি যত্নে গ্রামটার ছবি এঁকেছেন। প্রকৃতির অঢেল ঐশ্বর্য ঢেলেছেন গ্রামের পরতে পরতে। এই নিয়ে বছর চারেক হল, প্রতিবার আমি মায়ের সাথে কুমুদপুরে এই বিশেষ সময়টাতে আসি আমার বড়মামার শ্বশুরবাড়িতে । কারণ একটাই, এখানে এই সময়ে প্রতিবছরে ধূমধাম করে মনসাপূজা সংঘটিত হয়। দারুণ মজা হয়, ভোরবেলাতে উঠে গ্রামের সকলকে নেমন্তন্ন করতে যাওয়া, তারপর গ্রামের রাস্তায় রাজহাঁসের দুলকি চালে চলা, ছাগলের দুধ, মাটির বাড়ি, প্রতি বাড়িতে গোবর লেপা ও গোবর দিয়ে আলপনা আঁকা, সব মিলিয়ে আমি যেন স্বপ্নের দেশে হারিয়ে যাই। আমি জানি মা’ও তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন এই বিশেষ তিন দিন। একদিকে ছেলের স্কুলের পড়াশুনোর চাপ অপরদিকে সংসারের জাবর কাটা থেকে বেড়িয়ে প্রকৃতির বিশুদ্ধ বাতাসে মন-প্রাণ নতুন করে রিচার্জ হয়ে যায় মা’র। তাই আমাদের মা ও ছেলের গন্তব্য এখন একমাত্র কুমুদপুর।

স্নান সেরে বাইরে বেড়িয়ে দেখি মা-পুরো রেডি, দ্রুত নিজের জামা-প্যান্ট পরে নিয়ে আমি মাকে জিজ্ঞাসা করলাম – মা, এবারে আমরা কতদিন থাকবো ওখানে? মা মুচকি হেসে বললেন, এবারে বেশীদিন থাকা হবে না, তোমার বাবা পরশুদিন অফিসের কাজে বাইরে যাবেন, তাই পরশু সকালের মধ্যেই আমাদের ফিরে আসতে হবে। শুনে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল, কতকিছু প্ল্যান করেছিলাম, কিন্তু তা কি আর হবে? আমার বাবা চিত্তরঞ্জন রেলকারখানার একনিষ্ঠ কর্মী, বাবাকে খুব দরকারী কাজ না পড়লে বাইরে যেতে হয় না, তাই আমি ব্যাপারটার গভীরতা বুঝে চুপ করে থাকলাম।

ততক্ষনে, বড়মামা আর মামী, গাড়ি নিয়ে হাজির হয়ে গেছে বাড়ির সামনে। আমি একলাফে গাড়ির সামনের সিটে উঠে বসে পড়লাম, এই জায়গাটা কোনভাবেই ছাড়া যাবে না কারোর জন্য।

কাঁটায় কাঁটায় ঠিক সাড়ে আটটার গাড়ি ছেড়ে দিল তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। গাড়িতে যেতে যেতে বাইরের দিকে তাকিয়ে আমার মনটা উদাস হয়ে গেল, আমি ভাবসাগরে ডুব দিলাম। আমার নাম সায়ন ব্যানার্জী। এবছর আমার ক্লাস ফাইভ হল, আগের সব বছরগুলোর কথা যদিও ভালো মনে নেই, তবে আগের বছররের স্মৃতি আমার মনে এখনও যেন টাটকা। মামার শ্বশুর-শাশুড়ি, আমার মামাদাদু ও দিদা, এছাড়াও তাদের ছেলে কাঞ্চনমামা ও মামী ওবাড়িতে থাকে। আমার বড়মামীরা তিন বোন, বড়মামী অন্নপূর্না, বোনেদের মধ্যেও বড়, তার দুই ছোট বোন বাবলিমাসি ও ডলিমাসিও ওখানেই থাকে, এছাড়া, গোটাকয়েক গ্রামের কাজের লোক, আমার নিজের তিন মামা, মামাতো ভাই বোন, রাজা দাদা, আর হারাকাকু সব মিলিয়ে পূজোরবাড়ি পুরো জমজমাট যাকে বলে। রাজা দাদা, কাঞ্চনমামার বন্ধু কাম ভাইএর মতো, আর হারাকাকা, ঐ বাড়ির এককথায় কেয়ারটেকার। এত বছর ঐ বাড়িতে যাতায়াতের ফলে আমি বেশ বুঝতে পেরেছি, হারা কাকা ছাড়া ঐ বাড়ি অচল, কারণ জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবেতেই হারাকাকার উপস্থিতি বিনা ঐ বাড়ির জল একটুকু গড়ায় না। আমাকে হারাকাকা খুব ভালোবাসে আবার আমিও হারাকাকাকে, তাই ঐ বাড়িতে গেলেই আমার প্রথম কাজ হারা কাকার লেজুর হিসাবে জুড়ে যাওয়া। এর প্রধানত দুটো কারণ - এক – দুষ্টুমির জন্য মা’এর বকার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া, আর দু নম্বর যেহেতু আমি সকলের ছোট এখানে, তাই মামা-মাসি-দাদারা আমাকে কেউ ক্যারম বা তাস খেলাতে ডাকে না, তাই হারা কাকার সাথে থেকে পুকুরে মাছ চাষ, ছিপ ফেলে মাছধরা দেখা, ফুল তোলা, আবার লুকিয়ে লুকিয়ে হারা কাকার সাথে পাকা মহুয়া ফল খাওয়া দিব্যি চলে। হারা কাকাই আমাকে বলেছে যে এই মহুয়া ফল থেকে দেশীমদ তৈরী হয়, আর শোনার পর থেকে ফল খেলেই আমার মনে হয় যেন মাথাটা ঝিমঝিম করছে, সব মিলিয়ে এক ঐশ্বরিক অনুভূতি। আগেরবারই আমি জেদ ধরেছিলাম হারাকাকার কাছে পুজোর সময় বলি দেওয়া দেখব বলে, কিন্তু ছোট বলে হারাকাকা বলেছিল সামনের বছরে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখাবে আমাকে, কারণ ছোটদের বলি দেওয়া দেখা বারণ, আর মা যদি ঘূনাক্ষরেও জানতে পারে একবার, তবে আর রক্ষে নেই। কিন্তু এই অল্প সময়ে এত কিছু কি করে করব, ভেবে কূল পেলাম না কোন।

এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, নিজেও বুঝতে পারি নি, হঠাত হ্যাঁচকা ব্রেক কষার ঝাঁকুনিতে তন্দ্রা চটে গেল, দেখলাম, ওদের গাড়ি কুমুদপুরের মেঠো রাস্তায় চলে এসেছে, আর সামনে একটা ছাগলের বাচ্চা হঠাৎ চলে আসাতে এই বিপত্তি। পিছন থেকে বড়মামার হুঁশিয়ারি উড়ে এলো, কি রে পিকু, তুই আবার সামনের সিটে বসে ঘুমোচ্ছিস? কতবার বলব ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে ঘুমোতে নেই, আমি কিছু বলার আগেই, মামী বলে উঠল – তুমি চুপ করোতো, এমন করে বলছ যেন ওর জন্যই এমন হচ্ছিল। বাচ্চা ছেলে, ঘুমিয়ে পড়েছে, তাতে ওর দোষ কি? এই বলে আমার দিকে স্নেহমাখা কথা ছুঁড়ে দিলেন - না রে তুই বসে থাক ওখানে, তোর মামার আবার বেশী বেশী,

বড়মামা স্পিকটি নট, আর আমি আড়চোখে একবার ড্রাইভারকাকুকে দেখলাম, তিনিও মুচকি হেসে আমার দিকে চোখ টিপে গান চলিয়ে দিলেন গাড়িতে। তার মিনিট দশেকের মধ্যে আমরা সোজা কুমুদপুর বারোয়ারীতলার পাস ঘেঁষে ডানদিকের অপেক্ষাকৃত ছোট গলির মধ্যে ঢুকে পড়লাম, আর ড্রাইভারকাকু পোঁওও – পোঁওও করে হর্ন বাজাতে বাজাতে একেবারে তিনমহলা বাড়ির সামনে এনে গাড়ি দাঁড় করাল। মা বলে উঠল, যাক বাবা, তাও সাড়ে নটার মধ্যে পৌঁছানো গেল। নাহলে পিকু যা শুরু করেছিল, বারোটাতেও পৌঁছাতাম না হয়ত।

সারা গ্রামে এই একটিই পাকা বাড়ি, তাও আবার তিনতলা, মামাদাদুরা নাকি একসময় বিশাল বড়োলোক ছিলেন শুনেছি। দাদুর বাবার আমলেও নাকি লেঠেল পোষা হত, ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচতে। হারাকাকার বাবা নিজেও একজন বিশ্বস্ত লেঠেল ছিলেন নিজের সময়ে। অনেকটা ছোটখাট জমিদার ছিলেন দাদুর পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ,। ওনাদের সাত পুরুষ ধরে বাস এখানেই। এখন অবশ্য দিন বদলেছে, আগেকার সেই জৌলুষ অনেকটাই ফিকে, তবুও এখনো যা আছে আরো পাঁচপুরুষ বসে খেয়ে যেতে পারবে। সব্জী, ফুল, মুরগী, ছাগল, মাছ, মহুয়া সব বাড়ির লাগোয়া জমি ও পুকুরেই চাষ হয়, প্রত্যেকটির জন্য আলাদা আলাদা লোক রাখা আছে, আর হারাকাকা সবকিছুর সুপারভাইজার হিসাবে দেখাশোনা করে। তবে সবচেয়ে বেশী ইনকাম বোধহয় ঐ দেশীমদ থেকে, যা বাড়ির পেছনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিজস্ব কারখানায় তৈরী হত। হারাকাকা এটার প্রতি খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজর রাখত, যাতে কোনভাবে কিছুই বেহাত না হয়ে যায় । এখানে আমার ঢোকাও ছিল বারণ ।

গাড়ি থামতেই আমি একছুটে ভেতরে চলে এলাম। মামাদিদা আমার গাল টিপে কপট রাগ দেখিয়ে বললেন, - এই বুঝি আসার সময় হল? যা তাড়াতাড়ি সকালের টিফিনটা করে নে। তারপর মায়ের দিকে এগিয়ে বললেন, কি ডলি, এতক্ষনে তোমাদের সময় হল বুঝি ?

আমি ততক্ষণে রান্নাঘরের সামনে, ক্ষিদেয় পেট যত না জ্বলছে, তার চেয়েও বেশী হল চিন্তা, এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করার চিন্তা। কোনওক্রমে লুচি ও বেগুনভাজা মুখে পুরে সোজা বাগানে হাজির হলাম হারাকাকার খোঁজ করতে।

বেশী খোঁজাখুঁজি করতে হল না আমায়, দেখলাম পুকুরপাড়ে একমনে হারাকাকা ছিপ নিয়ে বসে আছে। এক ছুটে দৌড়ে হারাকাকার কাছে পৌঁছে গেলাম। আমাকে দেখে হারাকাকা ফোকলা দাতের একগাল হাসি হেসে ইশারায় পাশে বসতে বলে, ইশারায় জিজ্ঞাসা করল কখন এসেছি। হারাকাকার কাছে আগেই শুনেছি, মাছ ধরার সময়ে জোরে কথা বলা বারণ, তাই ফিসফিসিয়ে আসার সময় বলে চুপ করে ফ্যাঁতনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। হারাকাকা, পুকুর থেকে তিনটে চারাপোনা তুলে বলল, চল পিকুবাবু, তোমাকে সব ঘুরিয়ে দেখাই আগে। আমিও হারাকাকার পিছু পিছু কথা বলতে বলতে পুরো বাগানময় ঘুরতে লাগলাম। বাগানে কতো রকমের যে নাম না জানা ফুল ফুটেছে। আমি জানি আমার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর একমাত্র হারাকাকার কাছেই আছে। আজ পর্যন্ত বিরক্ত হতে দেখলাম না ওনাকে। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে কখন যে সকাল গড়িয়ে প্রায় দুপুর হতে চলেছে বুঝতেই পারি নি। হঠাত দূর থেকে মায়ের গলা যেন পেলাম – “পিকুউউউ, তাড়াতাড়ি আয়, বেলা বয়ে যাচ্ছে যে, আর কতক্ষন রোদে রোদে ঘুরবি ?” আমি চমকে পিছনে ঘুরে দেখলাম, আমার সাথে হারাকাকাও শুনেছিল মা’এর ডাক, তাই বলল- “যাও পিকুবাবু, এবারে ঘরে যাও, আবার বিকেলবেলাতে নাহয় এসো আমার কাছে, তখন তোমাকে আমি পাকা মহুয়া খাওয়াবো।“ আমি হারাকাকার কাছ থেকে উঠে ঘরের দিকে হাঁটা লাগিয়েই আবার পিছন ফিরে বললাম –“হারাকাকা, কালকে কিন্তু আমাকে পুজোর বলি দেওয়া দেখাতে হবে, মনে আছে তো তোমার ?” হারা কাকা আবার ফোকলা দাঁত বার করা হাসি হেসে আমায় টা টা করে নিজের কাজে ডুবে গেল।

বাগান থেকে ফিরে কলতলায় হাত – পা ধুয়ে, সোজা এক ছুটে ঘরের ভিতরে ঢুকলাম। এই ঘর আমার হাতের তালুর মতো চেনা, মা’ বলত – এটা একটা ছোটখাটো জমিদার বাড়ি, সত্যি প্রায় তাই, প্রতি তলায় আটটা করে কামরা আছে, নিচের তলায় বাড়ির প্রত্যেকের একটা করে নিজস্ব কামরা। উপরের তলায়ও আটটা কামরা, যার মধ্যে চারটি কামরা বন্ধ থাকে, সারাবছর, আর এই পূজোর সময়ে সকলের জন্য তা খুলে দেওয়া হয়। মাটিতে ঢালাও বিছানা করে সে এক এলাহী ব্যাপার। বাকি চারটি কামরার মধ্যে দুটি কামরা মামাদাদু ও দিদার, একসাথে ভেতর থেকে সংযুক্ত। একটি কামরায় সকলে মিলে ক্যারম, তাস ও আড্ডা দেওয়ার জন্য মামারা রেখে দিয়েছে, লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেটও খাওয়া হয় সেখানে, আমি দেখেছিলাম। আমি ছোট বলে কেউ খেলা নেয়না, খালি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি, আর স্ট্রাইকার বা গুটি বোর্ডের থেকে ছিটকে নীচে পড়ে গেলে আমার কাজ ছিল তা কুরিয়ে এনে দেওয়া। অপর কামরাটি আমি সকল সময়ে বন্ধই দেখেছি। একটা বিশাল বড় লোহার তালা লাগানো দরজাতে, মনে হয় যেন দশবছর হয়ে গেছে, কামরাটা খোলা হয় না। কাউকে জিজ্ঞাসা করেও কোন লাভ হয়নি, কারণ আমি বুঝেছি ঐ কামরা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেই সকলে কেমন যেন প্রশ্নটা এড়িয়ে যায়। বাড়ির তিনতলাতে মাত্র চারটি কামরা, সেখানেও একটা কামরা খেলার জন্য খুলে নিয়েছে মামা-দাদারা, আর বাকি তিনটেতে তালাবন্ধ, যদিও অত্যধিক লোক হলে ঐ কামরা গুলো খুলে থাকার ব্যাবস্থাও করা হয়। এই বাড়িটার সব ভালো লাগে আমার শুধু ভালো লাগে না জানলা গুলো, এইটুকু এইটুকু জানলা তাও হাতের অনেক উপরে, বেশী আলো আসে না, ঘরের মধ্যে সবসময় কেমন যেন একটা আধা আলো-আবছায়া ভাব, দিনের বেলাতেও কিছু ভালো করে খুঁজতে গেলে টর্চ বা হ্যারিকেন বা নিদেনপক্ষে ছোট কুপিই ভরসা। ঘরগুলোর মধ্যেও কেমন যেন ভ্যাপসা গন্ধ ছড়িয়ে থাকে সবসময়, বিশেষ করে নীচের তলার ঘরগুলোতে।

আমি তো ঘরে ছুটে ঢুকে পড়লাম, কিন্তু এসে মাকে দেখতে পেলাম না, শুধু মা কেন, কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছি না কোন ঘরে। কিন্তু মা’যে আমাকে ডাকল, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রায় বারোটা বাজে। এইসময়ে সকলে কোথায় গেল ? আটখানা ঘর দেখে ফিরে ভিতর বারান্দায় এসে হাঁফাতে লাগলাম। বার কয়েক, মা, মামী, মামাদাদু, মামাদিদা বলে চিৎকার করেও কোন লাভ হল না, কেউ কোথাও নেই! এরকম তো কখনো হয় না, আমাকে ডেকে মা তো কখনো এরকম ভাবে চলে যায় না। কিছুই মাথায় ঢুকছে না। কি করি ? বাইরে গেল নাকি? ধুত্তোরই, আমি আরো কিছুক্ষন বাগানে থাকতে পারতাম। কি করব, কি করব ভাবছি এমন সময়ে হঠাত করে মনে হল যেন উপর থেকে ক্যারম পিটানোর আওয়াজ আসছে না ? হ্যাঁ, ঠিকই তো, স্ট্রাইকারের শব্দ বেশ শুনতে পাচ্ছি, দোতলা থেকেই আসছে যেন। বুঝেছি, কেউ না থাকার সুযোগে, মামা, দাদারা ক্যারমের আসর বসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি যে এতবার ডাকলাম, কেউ সাড়া দিল না কেন ? একবার উপরে গিয়ে ব্যাপারটা দেখে আসতে হয় নিজের চোখে। যেমন ভাবা, তেমন কাজ, চট করে সিঁড়ি দিয়ে দোতলাতে ঊথে গেলাম। দোতলাতে উঠতেই বুঝতে পারলাম, সিঁড়ির মস্ত বড় শালকাঠের দরজাটা সজোরে দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। আমি দুসেকেন্ড হতভম্ব হয়ে রইলাম, এত বড় ভারী দরজাটা কি করে নিজে থেকে বন্ধ হয়ে গেল তা বোধগম্য হল না কিছু।

গা’টা একটু ছমছম করে উঠল ঠিকই, তবে ক্যারম খেলার শব্দে আর নিজের ভিতরের উত্তেজনায় তা আর বেশীক্ষণ ধোপে টিকল না, দৌড়ে চলে গেলাম সোজা ক্যারম যেখানে রাখা থাকে, সেই ঘরে। দরজাটা ভেজানোই ছিল, হাট করে খুলে দিতেই – ওমা, কেউতো নেই, ঘরতো ফাঁকা, ক্যারম বোর্ড পড়ে আছে একপাশে, কেউ কোথাও নেই, তাহলে যে শব্দ শুনছিলাম আমি । না কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে, ব্যাপারটা কি, খোলতাই করতে হয়, আমাকে ভয় পাওয়ানোর আয়োজন নয় তো ? নিশ্চয়ই কোথাও লুকিয়ে পড়েছে সবাই, দরজা বন্ধ হবার আওয়াজে এদিকে ওদিকে লুকিয়ে পড়েছে ব্যাটারা, দাঁড়াও, মা আসুক তোমাদের দেখাচ্ছি মজা। কিন্তু দরজা বন্ধ হবার পরও তো স্ট্রাইকারের আওয়াজ পেলাম, তারপরে কেউ লুকোলে, ঘরের বাইরে আসলে, আমার চোখে তো পড়তই, আর ঘরের ভিতরে কেউ যে নেই সে তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, উঁহু, আমারই বোধহয় কোথায় ভুল হচ্ছে ভাবতে, কারণ শব্দটাতো এখনো শুনতে পাচ্ছি, হ্যাঁ, ঠিকই তো ঐ তো ক্যারমের আওয়াজ হচ্ছে, ও বুঝেছি, তার মানে ব্যাটারা তিনতলাতে বসে খেলছেন, ওখানেও একটা ছোট ক্যারমবোর্ড আছে। আমিই শুধুমুধু দোতলা বলে ভুল করেছি, যাই দেখি গিয়ে তিনতলাতে। অগত্যা আবার তিনতলাতে যাত্রা, তিনতলার সিঁড়ির মুখের কাছে যেতেই চমকে উঠলাম, আরে সেই ঘরটার তালা কে খুলল? এত সারাবছর বন্ধ থাকে।

ওহ তার মানে আমাকে ভুল বোঝানো, যাক সুযোগ যখন পেয়েছি, একবার ঢুঁ মেরে দেখিতো কি হীরে-জহরত আছে এই ঘরে। কাছে গিয়ে দেখি, দরজাটার একটা পাল্লা খোলা, অপরটা বন্ধ, আমি দুটো খুলে দিতেই নাকে একটা তীব্র ঝাঁঝাঁলো গন্ধ এসে যেন জোর ধাক্কা দিল, অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না, শুধু বুঝলাম, অন্যান্য সাধারণ ঘরের মতো এটাও একটা ঘর, তাতে একটা পালঙ্ক, বিছানা, বালিশ সব সুন্দর করে পাতা, আর বেশি কিছু দেখা যাচ্ছিলো না, তবে গা দিয়ে হঠাত যেন একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল, দেখলাম কপাল দিয়ে ঘাম ঝরছে আমার। আমি, আবার দরজাটা যেরকম ছিল সেরকম করে রেখে দিয়ে, আস্তে আস্তে উপরে তিনতলায় উঠে গেলাম, শরীরটা কেমন যেন ভারী হয়ে গেল বলে মনে হল, কিন্তু এবারে ভালো করে ক্যারমের শব্দটা অনুধাবন করে এগোতে লাগলাম। শব্দটা ক্রমাগত জোরে হচ্ছে, বেশ বুঝতে পারছিলাম লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। কিন্তু আবার, যেই তিনতলাতে পা দিলাম, সিঁড়ির দরজাটা আবার একই রকম ভাবে বন্ধ হয়ে গেল। মনটা হঠাত, ছ্যাঁক করে উঠল, বুঝতে পারলাম, এবারে আমার ভয় করছে, ভীষণ ভয় করছে, তাও সাহস করে সামনে এগিয়ে ঘরগুলোতে খুঁজতে শুরু করে দিলাম। কিন্তু কি হচ্ছে, আজকে কে জানে? এখানেও কেউ কোথাও নেই ? এত গুলো মানুষ কোথায় গেল ? রাজা দা, ও রাজা দা, কেন করছ তোমরা আমার সাথে, আমার ভয় করছে, এবারে এসো না, বলে ডাকছি সকলকে, কিন্তু কেউ কোথাও নেই, কেউ আসছে না, কিছুক্ষন হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম ঘরটাতে, বেশ বুঝতে পারছি, তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে, ওদিকে কুলকুল করে ঘেমে চলেছি, কিন্তু কি করব? নীচেও তো যেতে পারছি না, ক্যারমের শব্দটা আরো জোরে হচ্ছে কানে এবারে, মনে হচ্ছে, কান ফাটিয়ে দেবে।

কিছুক্ষন ধরে মনটাকে শান্ত করে শক্ত করলাম, না নীচে তো নামতেই হবে, একবার যদি নীচে নামতে পারি, তাহলে সোজা হারাকার কাছে। হারাকাকার নামটা মনে পড়তেই অনেকটা সাহস মনে চলে এলো, আবার এক দৌড়ে সিঁড়ির দরজার সামনে হাজির হলাম। দরজাটা হাত দিয়ে টেনে খোলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু একি! এ দরজা তো খুলছে না। এত বড় শালকাঠের দরজা মনে হচ্ছে যেন উল্টোদিক থেকে কেউ লক করে দিয়েছে। এবারে কি করব ? ছাদে চলে যাব? কিছুই মাথায় আর ঢুকছে না আমার, ওমা, মাগো, তুমি কোথায় ? আমায় বাঁচাও মা। বুক ফেটে কান্না বেড়িয়ে আসতে চাইছে, অনেক কষ্টে সামলাচ্ছি, বেরোবার কি উপায়, কিছু বুঝে পাচ্ছি না। স্ত্রাইকারের শব্দটা থেমেছে এতক্ষনে, কিন্তু এবার অন্য একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছি। কেমন একটা ঝুম ঝুম শব্দ, হ্যাঁ, থিল শব্দটা উপরের দিকে আসছে সিঁড়ি দিয়ে, আরে এত কারোর নুপুরের শব্দ। মেরুদন্ড দিয়ে হিমেল স্রোত নেমে গেল, শব্দটা অনেকটা কাছে মনে হচ্ছে। আর সময় নেই, আমি পড়ি কি মরি করে একছুট, ছুটে সোজা ছাদে। কিন্তু হায়, আজকে ভাগ্য আমার অসহায়, ছাদের দরজাটাও যথারীতি বন্ধ হয়ে গেল। এবারে কি করব, অথচ নূপুরের শব্দ আরো কাছে যেন ঠিক আমার পিছনেই আসছে সিঁড়ি বেয়ে। কিন্তু যে আসছে, সে তো দরজার কোন বাধা পাচ্ছে না। আমি তো দরজা খোলার আওয়াজ পাচ্ছিনা কোনও। তবে কি সে ? কে সে ?

আমার মাথার ঠিক নেই, হঠাত মনে হল, আরে চিলেকোঠার ঘরটা তো ছাদের উপরে, ওখানে লুকিয়ে থাকবো ? যেমন ভাবা তেমন কাজ, কারণ আর কিছুই নয়, চিলেকোঠার ঘরে ভেতরের দিকে দেওয়ালটা এমন ভাবে জানলার মতো করে কাটা যে, উঁকি দিয়ে ওখান থেকে পুরো সিঁড়িটা দেখা যায় নীচ পর্যন্ত। ওখানে গেলে দেখতে পারবো কেউ এলো কিনা, আর উপর থেকে চেঁচাতে পারব। কিন্তু ঐ ঘরের দরজাও যদি বন্ধ হয়ে যায়? কি করব, কি করব, ভাবতে ভাবতে, ছাদের উপরে পড়ে থাকা একখানা আধলা ইটের দিকে নজর পড়ে গেল। সাথে সাথে দৌড়ে ইটটা তুলে নিয়ে চিলেকোঠার ঘরে ঢুকে গেলাম। দরজাটা বন্ধ হবার আগেই একটা পাল্লার নীচে ইটটা রেখে দিলাম, যাতে দরজাটা বন্ধ না হয়ে যায়। ঘরে ঢুকে দেখি, ক্যারমবোর্ডটা চিলেকোঠার ঘরে রাখা, কিন্তু কেউ নেই। আমি বেশ বুঝতে পারছি, একটা দমবন্ধ করা ভয়ঙ্কর পরিবেশে আটকা পড়ে গেছি।

কিছুক্ষন সব চুপচাপ, কিন্তু তারপরে যে ঘটনাটা ঘটল তার জন্য একেবারেই অপ্রস্তুত ছিলাম আমি, হঠাৎ আবার নুপুরের শব্দ শুরু হল, ঠিক যেন কোন মহিলা হেঁটে আসছে, আমি সাথে সাথে জানলার খোলা জায়গা দিয়ে মাথা গলিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলাম, এক অচেনা মহিলা সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে, তবু আমি শুধু তার মাথার খোলা চুল ছাড়া কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না উপর থেকে। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, কে আছো বাঁচাও, আমাকে। কিন্তু তার উত্তর যা পেলাম তাতে আমার হাড় হিম হয়ে গেল, আচমকা দেখি মহিলা মাথা উঁচু করে আমার দিকে তাকালো, আর মুখ দিয়ে এক বিকট ঘড়ঘড় আওয়াজ বের করতে লাগল, মহিলার মুখ বলে কিছুই ছিল না, শুধু মাথার চুলটুকে ছাড়া, মুখটা পুরো কালো গাঢ় অন্ধকার, আর ঐ বিকট আওয়াজ, ওটা হাসি না কান্না, না অন্য কিছু বুঝে আগেই, আমার মাথার সাঁ করে আধলা ইটটা তীব্র গতিতে জানলার খোলা জায়গা দিয়ে নীচের দিকে নেমে গেল, আর সাথে সাথে একরাশ অন্ধকার করে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল, আমি ছুট্টে গিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করতে লাগলাম আর প্রাণপণে মাকে ডেকে যাচ্ছিলাম। দরজা কিছুতেই খুলতে না পেরে, দরজার পাশ দাঁড় করানো খিলটাকে নিয়ে গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে দরজায় বাড়ি মারতে লাগলাম। ভাগ্যদেবী বোধহয় একটু প্রসন্ন হলেন, একদিকে পাল্লাটা কমজোরী ছিল, খিলের বাড়ি খেয়ে পাল্লাটা কাত হয়ে পড়ে গেল। আমি আর কালবিলম্ব না করে ভাঙ্গা জায়গা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসলাম। তারপর একবার ছাদের এককোণা থেকে অপরকোণা ছুটে বেরোতে লাগলাম, ছাদের দরজা ভাঙ্গা বা খোলার মতো সাহস বা গায়ের জোর কিছুই আমার ছিল না, উদভ্রান্তের মতো খালি ছুটতেই থাকলাম। কিন্তু তাতেও কি আর শান্তি পেলাম ? আচমকা মনে হল যেন মহিলা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, আমি যত ছুটছি, নুপুরের ছন ছন শব্দও তত জোরে হচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন ঠিক আমার পেছনেই সে ছুটে চলেছে, আমি প্রাণপণে প্রাণপণ করে একবার এধার আর একবার ওধার ছুটে চলেছি, এখন আর ঘাম বেরোচ্ছে না, চোখ থেকে অঝোর ধারায় জল বেরোচ্ছে, আর মুখ থেকে কান্না ও চিৎকার মিলে মিশে একটা গোঙ্গানোর মতো আওয়াজ বেরোচ্ছে।

মা বলার চেষ্টা করছি, কিন্তু পারছি না, হারা কাকা বলার চেষ্টা করছি তাও পারছি না, গলা থেকে কোন আওয়াজ বেরোচ্ছে না। আর পারছি না, হঠাত চোখে পড়ল টিভি এন্টেনাটা, সামনে গিয়ে এন্টেনার ওপারে উঁকি দিয়ে দেখতে পেলাম দোতলা থেকে শুরু হওয়া খড়ের ছাউনির পোলট্রি ফার্মটা, ছাদের চারপাশে আমার প্রায় বুক ও কোমরের সমান উচু করে দেওয়াল দেওয়া। আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না, হুমড়ি খেয়ে ঝুকে পড়লাম ছাদের নীচে, একহাতে এন্টেনা ধরে রইলাম, আমার পা দুটো শুন্যে ছাদের উপরে আর কোমর থেকে মাথা নীচে মাটির দিকে খড়ের ছাউনির ওপরের দিকে। মাথা আর কাজ করছিল না, ক্রমাগত মনে হচ্ছিল আমার পা ধরে যেন কেউ টেনে ধরে আছে, নাহলে আমার কখন নীচে পড়ে যাবার কথা।

এইভাবে কতক্ষণ ছিলাম জানি না, একসময় নীচে থেকে এক জটলার আওয়াজকানে এল, কোনরকমে দেখলাম সকলে ঘরে ফিরেছে, উঠানে দাঁড়িয়ে গল্প করছে, প্রাণপণে নিজের শেষ শক্তি দিয়ে মা বলে চেঁচিয়ে উঠলাম, তৎক্ষণাৎ সকলে মিলে উপরে তাকিয়েই আমায় দেখতে পেল। আমি সকলের চিৎকার শুনতে পারলাম। আমার মা বিস্ময়ে স্থানুবৎ হয়ে গিয়েছিলো, মাকে আমি বলছি মা আমি আসছি, এখানেই ঝাঁপ দিচ্ছি, আর পারছি না, কিন্তু ঝাঁপ আর দিতে পারলাম না। আমার পা যেন অদৃশ্য চুম্বক দিয়ে কেউ আটকে রেখেছে উপরে, ওরকম ভাবেই ঝুলে থাকলাম,

তারপরের কিছুক্ষনের মধ্যেই, বাবলিমাসি দৌড়ে এলো, আমাকে টেনে তুলল, তারপর কোলে নিয়ে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে নীচের দিকে নামতে লাগল। আমি কাঁদতে কাঁদতেই জিজ্ঞাসা করলাম, দরজা গুলো খুলছে কি করে, আবার আশ্চর্যের ব্যাপার আমরা একটা করে তলা নামতেই আবার দরজাগুলো বন্ধ হয়ে গেল নিজে থেকেই। বাবলিমাসি কোনও জবাব না দিয়ে শুধুমাত্র – ও কিছু না, বলে আমাকে নিয়ে সোজা নীচে নেমে এলো। নীচে মাকে দেখে মায়ের কোলে উঠেই আমি জ্ঞান হারালাম।

জ্ঞান যখন ফিরল, দেখলাম নীচের একটা ঘরে শীতলপাটির উপরে শুয়ে আছি, আমার মাথার কাছে, মা’, মামাদিদা , বড় মামী সকলে বসে আছে, মা একটা হাতপাখা জোরে জোরে হাওয়া করছে। আমার জ্ঞান ফিরতেই, মা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠে বলল, আমায় ক্ষমা কর পিকু, সোনা আমার, আমার তোকে সাথে করে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু ভাবলাম তুই তো হারাদার সাথেই আছিস, তাই আর তোকে সাথে নিইনি। খুব ভুল করেছি আমি, খুব ভুল করেছি, এমন জানলে আমার নিয়ে যাওয়াই উচিত হত।

আমি ক্ষীণস্বরে বললাম, কোথায় গিয়েছিলে মা তোমরা ? মা উত্তর দেওয়ার আগেই মামী বলে উঠল, আসলে আমরা গ্রামের সব বাড়িতে পূজোর নেমন্তন্ন করতে গিয়েছিলাম রে, আসতে একটু দেরী হয়ে গেল, কিন্তু বুঝতে পারি নি যে তুই এরকম কাণ্ড বাধাবি, বেশ তো ছিলিস হারাদার সাথে, আমরা এসে তোকে ডেকে নিলেই আসতিস ঘরে।

আমি ফের কিছু বলার আগেই, হারাকাকার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, "কি বলছ দিদিমিনি, পিকুবাবুর মা’ই তো ওকে ডাকল, ঘরে আসার জন্য, তারপরেই তো ও আমার কাছ থেকে ঘরে চলে এলো।" মা যারপরনাই বিস্মিত হয়ে বলল – “না, আমি তো ওকে ডাকি নি, আমি তো ভেবেইছিলাম যে ফিরে এসে ওকে ডাকব”।

হারাকাকা অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, তাহলে কি নিশির............?

কথাটা শুনেই আমার সারা গায়ে আবার কাঁটা দিয়ে উঠল। আমি প্রাণপণে মা’কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলাম, আমি আর এখানে থাকবো না, আর এখানে থাকবো না, এক্ষুনি বাড়ি চল মা, আমি আর থাকব না। মা আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল, তোর বাবাকে খবর দেওয়া হয়েছে, এক্ষুনি এসে পড়ল বলে, ততক্ষনে দুমুঠো খেয়েনে সোনা আমার ।

একঘণ্টার মধ্যে বাবা গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে চলে আসল। আমাকে আর মা’কে নিয়ে বাবা ফিরে চলল বাড়ির দিকে, পেছনে পড়ে রইল আমার সাধের গ্রাম কুমুদপুর, মনসাপূজো, বলি দেওয়া দেখা, আর আমার অত্যন্ত প্রিয় হারাকাকা। গাড়িতে ওঠার সময় পরিষ্কার দেখেছিলাম হারাকাকার চোখের কোণাটা চিকচিক করছে, হয়ত বুঝতে পেরেছিল যে এই জন্মে আর আমার সাথে তার দেখা হবে না।

এই ঘটনার পর প্রায় দশ বছর আমি আর কুমুদপুর মুখো হইনি, প্রতিজ্ঞাও করেছিলাম যে আর কখনো ওমুখো হব না, কিন্তু দশবছর পর যখন হারাকাকার মৃত্যুসংবাদ পেলাম, আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না, আমি আর বাবা দুজনেই গিয়েছিলাম, না গেলে হয়ত নিজের কাছেই ছোট হয়ে যেতাম সারাজীবনের জন্য। তবে হ্যাঁ, উপরে উঠবার দুঃসাহস আর দেখাতে পারি নি। তবে নীচেই ছোটবেলার সেই স্মৃতি খুলে দিল দ্বার এক অজানা ঘটনার। শুনতে পেলাম ঘটনার পেছনের আসল ঘটনা, আমার বড়মামীর চেয়েও নাকি এক বড় মেয়ে ছিল মামাদাদু আর দিদার, ঘটা করে মেয়ের বিয়েও দিয়েছিলেন, কিন্তু শ্বশুরবাড়ি সুবিধার হয় নি, সারাদিন রাত অশান্তি লেগেই থাকত, আর তাই একদিন রেগে মেগে সব ছেড়ে দিয়ে চলে এল বাপের বাড়িতে, সাতদিন পর স্বামীও রাগ ভাঙ্গিয়ে বউকে নিয়ে যেতে আসল, অনেক কথা হল, গল্পও হল, রাতে দোতলার ঐ ঘরটাতে স্বামী-স্ত্রীকে ঘড় সাজিয়ে থাকতে দেওয়া হয়েছিলো। সকাল বেলায় কেউ ঘুম থেকে উঠছে না দেখে মামাদিদা নিজে ডাকতে যান ওদেরকে, গিয়ে দেখেন দরজার একটা পাল্লা খোলা ও আর একটি পাল্লা ভেজানো। পাল্লা খুলে তিনি আঁতকে ওঠেন, দেখেন, মেয়ের নীথর শরীর পড়ে আছে বিছানায়, জামাই পলাতক। রাতের অন্ধকারে মেয়েকে গলাটিপে মেয়েকে খুন করে জামাই গা ঢাকা দিয়েছে। এরপরে থানা, পুলিশ সব হয়েছে, কিন্তু জামাইের কোন খোঁজ কেউ পায় নি আর। সেই মেয়ের অতৃপ্ত আত্মা নাকি ঘরময় ঘুরে বেড়ায়, তবে আমার আগে নাকি আর কারোর কোন ক্ষতি করেনি।

আমি সব শুনে চুপ করে উঠে চলে এলাম। গাড়িতে আসতে আসতে ভাবছিলাম, যদি আমার ক্ষতি করার ইচ্ছে থাকত তার, তাহলে কেন আমায় মারল না ? আমার পা দুটো পেছন থেকে আটকে কে রেখেছিল? নীচে ঝাঁপাতে গিয়েও কেন পারছিলাম না আমি ? আমাকে কি সত্যি আটকে রেখেছিল সে? তাহলে তো আমায় বাঁচিয়েছে সে। তবে সেই বীভৎস মুখ, আর আওয়াজ, কেমন করে ভুলব, ক্যারমের স্ট্রাইকারের আর নুপুরের ছন ছন আওয়াজ, তবে আবার সে যদি আমার কোন ক্ষতি নাই করতে চেয়েছিল, হঠাৎ করে এইবারেই আমায় ভয় দেখালো কেন? আর দোতলার ঘরের তালাটাই বা কে খুলেছিল, এসব প্রশ্নের কোন উত্তর পাব কি? কেই বা দেবে এই প্রশ্নের উত্তর, প্রশ্নগুলোকে আমার মনের মণিকোঠায় চিরতরে তালা মেরে রেখে কুমুদপুরকে পিছনে ফেলে অনেক অনেক এগিয়ে এলাম আমি।

**************************************************************

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.