অকাল বৃষ্টি

অকাল বৃষ্টি

সোমবারের দুপুরে কড়া রোদে নিকিতা সাধারণত ব্যস্ত থাকে অফিসে কম্পিউটার স্ক্রিনে। দুপুরের রোদের তেজের সঙ্গে বাড়তে থাকে কাজের চাপ। মায়ের ফোন ধরার সময়টুকু থাকে না। তবে ফোনের সঙ্গে তার সম্পর্কটাও তেমন ঘনিষ্ট নয়। আর ফেসবুক? একটা অ্যাকাউন্ট আছে। তবে কাজের কাজ তেমন কিছু না থাকলে তবেই চোখ পড়ে ফেসবুকের দিকে। অনভ্যস্ত হাতে নাড়াচাড়া করতে থাকে ফেসবুকের এর অ্যাকাউন্ট থেকে তার অ্যাকাউন্ট। অফিস থেকে ছুটি তেমন কোনও দরকার না পড়লে নেয় না। দুই বছরের চাকরী জীবনে এখনও তেমন কোনও দরকার দু তিন বারের বেশি পড়েনি। নিকিতা সম্পর্কে তার কাছের লোকেরা এমনই বলে। তবে আজকের দিনটা কেমন যেন অন্যরকম। বাইরের কড়া রোদে সে এখন মহাব্যস্ত ফেসবুকে। একটা চ্যাটবক্স খোলা আছে। নিজেই মেসেজ করে যাচ্ছে। আর উত্তরের আশায় ছটফট করেছে । মাঝে মাঝে ফোনের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ ফোন করবে। তার অপেক্ষাতে বসে আছে। সেই অপেক্ষাতে অফিসে মিথ্যে অজুহাতে ছুটি। চেনাদের কাছে এই নিকিতা অচেনা হলেও আজকের দিনটা তার কাছে ভীষণভাবে সত্যি। অবাক চোখে মা খানিকক্ষণ দেখলেন মেয়েকে।

- কিরে অফিস যাবি না।

- না কিছু কাজ আছে। বিরক্ত করো না, আমাকে একা থাকতে দাও।

- কি জানি কিসের কাজরে বাবা বলে গজগজ করতে করতে রান্না ঘরে চলে গেলেন। সত্যি বড় কাজ। তার সঙ্গে ফোনে একবার কথা বলার কাজ। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিকিতার টেনশন যেন বাড়তে থাকল। প্রথমে মনে হয়েছিল চার্জ নেই বলে সৈকতের ফোনটা সুইচড অফ হয়ে গেছে। কিন্তু এত বেলা অবধি সুইচড অব থাকে না। তবে কী রাতের কথাগুলো…

…না না আর ভাবতে পরছে না। দখিনা বাতাসে উইন চাইনের আওয়াজ বড় বিটকেল লাগছে। বিছানা থেকে দেখা নারকেল গাছটাও নিকিতার মতো কেমন থম মেরে আছে। নিকিতার জীবনে বড় কোনও ঝড়ের পূর্বাভাস যেন দিয়ে যাচ্ছে গাছটা। আগের থেকে কত প্রিপারেশন নিয়ে তবেই সৈকতকে বলেছিল ১০ বছরের জমানো গ্লানির কথা। কিন্তু কেন বলল সৈকতকে। সেই লাঞ্ছনার কথা তো কাউকে বলিনি। অতীত তাকে সবার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে বলে তাকে লুকিয়ে রাখতো। আর সেই অতীতই তাকে সৈকতের থেকে দূরে সরিয়ে দিল। কিন্তু কী ছিল তার দোষ। জ্যেঠুর ছেলেকে নিজের দাদা ভাবতো এই। রান্নাবাটি খেলার ছলে যে দাদা ধীরে ধীরে ..

উফফ আর ভাবতে পারছে না। প্রথমে নিজের লজ্জা মনে হলেও পরে মনে হয়েছে, লজ্জা তো তার নয় সেই ছেলেটার যে তার বোনের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েছে। লজ্জা তো সেই বাবার যে বংশের মান রাখতে মেয়ের প্রতি অবিচার করেছে। অনেরবার প্রতিবাদ করার কথা মনে হয়েছে। জোর গলায় বলতে ইচ্ছা করেছে আমার কোনও দোষ ছিল না। কিন্তু কোথাও, কিসের একটা ভয়ে, নিজের না বলা কথাগুলো লুকিয়ে রেখেছে। জ্যেঠুর ছেলে মাঝে মাঝে বাড়ি এলে সিঁটিয়ে গেছে। কিন্তু না ১০ বছরে একদিন তো দূরের কথা এক বারের জন্য প্রতিবাদ করতে পারেনি। সেদিনের মায়ের মতো হয়তো তাকেও বকুনি খেতে হবে। সেদিন মাকে বলেছিল, মেয়েকে সামলে রাখতে পারো না। সারাদিন কী কর। সব দোষ তো তোমার। কিন্তু সেদিন মায়ের দোষ কোথায় ছিল এখনও বুঝে উঠতে পারেনি নিকিতা। তবে প্রতিবাদও করতে পারেনি। নিজের লজ্জা বলতে নাচার নিকিতা অবশেষে কিনা বাবার পছন্দ করা পাত্রকেই সবার অজ্ঞাতে বলেছিল। মনে হয়েছিল এ বাবার মতন নয়। মনে হয়েছিল এ তার কথা বুঝবে। জমে থাকা রাগ, না বলা প্রতিবাদ, সব সারা রাত জেগে বলেছিল নিকিতা। কী আশ্চর্য্য, সব মন দিয়ে শুনছিল। তারপরে ফোন সুইচড অব। বাবার পছন্দ করা ছেলে বাবার মতো হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কীরে সেই ছেলেকে ভালোবাসতে শুরু করে নিকিতা, কেন ছেলেদের প্রতি বিতষ্ণা দূরে পাঠাচ্ছিল সে । তবে সব ছেলে কী এক?

কেমন জানি মন থেকে মানতে পারছিল না। বিশ্বাসে পরিণত হলেও কোথাও যেন মনে হচ্ছে না অন্য কারণও হতে পারে ফোন সুইচড অব হয়ে গেছে। আরেকবার ফোন করা যেতেই পারে। না এখনও তো ফোন সুইচড অব। এবার বাবা কিছু জানতে চাইলে কী বলবে? নিকিতা এবার সত্যিকারের খুব ভয় পেয়ে গেছে। কিন্তু ভয় পেলেও এই অতীতটা না জানিয়ে সে কী করে বিয়েতে বসত। নানা সে যা করেছে ঠিক করেছে। অতীতেতের কথা সে জানাবে তার হবু বরকে। সে যেই হোক। তার জন্য যা পরিস্থিতি হবে তা মানতে প্রস্তুত। না হলেও হতে হবে।

- নিকি, নিকি কোথায় তুই?

বাবা রিটার্য়ের পর কেমন যেন খিটখিটে হয়ে গেছে। তবে এখন মেজাজ খাপ্পা হয়ে উঠল কেন? তবে কী ..

- কীরে কাল সৈকতকে কী বলেছিস?নিকিতার হাত পা কাঁপছে। তার মানে সৈকত বাড়িতে সব বলে দিয়েছে। অবশেষে তার ধারণাটাই ঠিক হল। সৈকতও বাবার মতো। এবার উত্তরটা দিতেই হবে।

- বাবা আমি আমার অতীতটা বলেছি।

- কেন তোর লজ্জাটা তোর কাছেই রাখতে পারতিস। সব কিছু ঠিক হয়ে যাবার পর তোর কথাগুলো কি না বললেই চলছিল না।

- না বাবা চলছিল না।

নিকিতা নিজেও বিশ্বাস করতে পারছে না, তার বাবার সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারে। কিন্তু এতদিন বাদে কথাগুলো বলতে পেরে বেশ ভাল লাগছে। তাই আর চুপ নয়, সে বলে যেতে লাগল।

- প্রথমত আমি মনে করি না সেদিনের ঘটনায় আমার বা মায়ের কোনও দোষ ছিল না, বা আমার কোনও লজ্জা থাকার কথা। যা দোষ ছিল তোমার দাদার ছেলের আর তোমার চিন্তাভাবনার। আর দ্বিতীয়ত আমি তাকেই বিয়ে করব যার আমার অতীতটা নেওয়ার ক্ষমতা আছে।

- জানিস ওরা বিয়েটা ভেঙে দিতে চাইছে?

- ওরা ভেঙে দিতে চাইছে। আর আমি ভেঙে দিচ্ছি। আর একটা কথা আমাকে বিয়ের জন্য এখন জোর করো না। সময় হলে হবে, না হলে হবে না। বিয়ে না হলে কিচ্ছু যায় আসে না। তবে জোর করো না। যদি খুব বোঝা মনে হয় বলে দিতে পারো, যা ইনকাম করি একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে নিজেরটা চালিয়ে নিতে পারবো।

বলেই সজোরে দরজাটা বন্ধ করে কাঁদতে থাকলো নিকিতা। খুব জোরে জোরে। ১০ বছর ধরে জমিয়ে রাখা কান্না, ভুল লোককে বিশ্বাস করার কান্না, এত দিন বাদে নিজের কথা বলতে পারার কান্না, অপমানের জবাব দেওয়ার কান্না। ঘরের ঝড়ের মধ্যে কখন যে বাইরে মেঘ করেছে নিকিতা খেয়াল করেনি। তার চোখের জলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাইরে অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে। আর সেই বৃষ্টির জল নারকেল গাছের পাতা ছুয়ে মুছে দিচ্ছে তার গাল। নতুন লড়াইয়ের আগে নিকিতিার সামনে থাকা সব জঞ্জাল যেন সরিয়ে দিচ্ছে এই অকাল বৃষ্টি।

==============================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.