চণ্ডীমণ্ডপের লন্ঠনের আলোটা এখনও টিমটিম করে জ্বলছে। ওপরের খড়ের চাল ছাইবার বাঁশের কাঠামোটা থেকে, কে যেন ওটা ঝুলিয়ে দিয়েছে। বাইরের স্যাঁতস্যাঁতে ঠাণ্ডা হাওয়ার ধাক্কায় দুলছে লন্ঠনটা, সেইসাথে নীচের মাটির ওপরের ছায়াগুলোও। কখনো লম্বা হচ্ছে, কখনো বা মোটা হচ্ছে, অদ্ভূত সব আলো-আঁধারীর আঁকিবুকি।

মাটির একচালা ঠাকুর-মন্দিরের দরজাটা হাট করে খোলা। ক'টা বেলপাতা, শুকনো ফুল, প্রায় পুড়ে যাওয়া তেল চুপচুপে কাপাস তুলোর সলতে, ধূপের পোড়া কাঠি, এইসব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মাটির দুয়ারটায়। নৈবিদ্যর থালা থেকে এদিক ওদিক পড়ে যাওয়া ফল মিষ্টির টুকরোর ওপর দিয়ে লাইন করে যাচ্ছে বাসাভাঙ্গা কালো ডেঁয়ো পিঁপড়ে দল। মন্দিরের দালানটা বেশ উঁচু, তাই জল উঠতে পারেনি। নাহলে ক'দিন ধরে যা বৃষ্টি হ'ল, সব ডুবে গিয়ে ঠাকুরকেও কোনো গৃহস্থের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হ'ত। চারদিক কাদায় প্যাচপ্যাচ করছে। নীচের চত্বরটায় নামলেই এক হাঁটু জল।

-----------

-"সব হুজুগ দেকলে পরে বাঁচিনে বাপু। মানুষের পেটে অন্ন নাই, আর এদের দ্যাকো, পুজো কচ্চে। বলি, কী লাভটা হ'ল শুনি?

বিষ্টি ধরল? সেই তো পড়েই চলেচে।

সেই কখন খেইচি, পেটে জ্বালা ধরে গেল। কেউ হেথা নেইও তো পোড়ারমুকোগুনো।

কে যায় গা? বলি, শুনতে পাচ্চুনি নাকি? আমি গো আমি, হেথা মণ্ডপে। ছেলেগুনো ফিরল ভাসান দিয়ে?"

-"অ বিধু খুড়ী! তুমি হেথা আঁধারে কী করচ বসে বসে? এমনধারা জলকাদায় কেউ মণ্ডপে বসে থাকে নাকি? ঘরকে যাও শিগ্গির।"

-"কে গা তোরা? বোসেদের বাড়ির বৌ-দুটো নাকি? তা সোমত্ত মেয়েছেলে, ঘরের বৌ সব, ভর সন্দেয় বাড়ির বাইরে ঘুরিস কেন লা আটকুঁড়ি?"

-"ওই ওই! পাগলি বুড়ি ফের গাল পাড়তে লেগেছে রে। সে বছর পুজোয়, ঐ বিনয়—বুড়ির ছেলেটা, রায়দিঘিতে ঠাকুর ভাসান করতে গিয়ে কাঠামো চাপা পড়ে ম'ল। সেই থেকে বুড়ি পাগল হয়েচে। গত ক'বচর ধরে ভাসানের দিনে এই মণ্ডপে বসে বসে বকবে শুদু। বৌমাটাকেও বলিহারী বাপু। বর মরতেই বেধবা শাউড়ির হাতে তিনবছরের এক রত্তি মেয়েটাকে ফেলে, কার না কার সাথে চম্পট দিল।

চল চল ছোটো-বৌ এখেন থেকে, নইলে বুড়ি আরও গাল পাড়ব।"

চটজলদি পা চালিয়ে এগিয়ে যায় গ্রামের অবস্থাপন্ন বোসবাড়ির দুই জা। ফাঁকা মণ্ডপে, চটের আধভেজা মোটা থলির ওপর বসে বসে, বিধুমুখী বিলাপ করতে থাকেন। লন্ঠনের আলোয় শীর্ণকায়া বৃদ্ধার ছায়াটা ক্রমশ দীর্ঘ হ'তে হ'তে ঠাকুরদালান টপকে বাইরের অন্ধকার ঝোপের মধ্যে মিশে যায়।

-------------

-"আজকালকার মেয়ে বৌ সব! একটুকুনিও লজ্জা নেই গা শরীরে। হ'ত আমাদের সময়, মজা টের পেত। সেই সেবার উনি, আমায় আর বিনুটাকে শহরে ঠাকুর দেখাতে নিয়ে গেলেন। বাপরে বাপ! কী ভিড়! কী উঁচু সব চালা। কত্ত উঁচু ঠাকুর। কত আলো।

তবু ঘোমটা একটুকুনিও সরাবার জো'টি নেই, যে ইতিউতি দেখব।"

মাথা নাড়েন বিধুমুখী। বৈধব্য, সম্তানহারানোর শোক সবই যেন কোন গতজন্মের কাহিনী মনে হয়। এখন শুধু এই চরাচরব্যপী অন্ধকার, বৃষ্টির ধারা, কর্দমাক্ত পথ, এটাই চরম সত্যি। কে যেন সেই সক্কালবেলাটিতে বসিয়ে দিয়ে গেছিল, মন্দিরের দাওয়ায়। প্রসাদ দেওয়া হবে এই বলে। চিঁড়ে বাতাসা ফল প্রসাদ খেয়েছেন বিধু। কোঁচড়ে বেঁধেও নিয়েছেন ঘরের লোকগুলোর জন্য। লোক বলতে তো ওই ছ'বছরের নাতনীটা।

বিধুর মনে থাকেনা অত শত। ছানিপড়া চোখে কখনো দেখে ছোট্ট বিনু ডাঁশা পেয়ারায় কামড় বসাচ্ছে। কখনো দেখে উনি, মানে বিনুর বাবা, দাওয়ায় বসে হাতপাখা টেনে হাওয়া খাচ্ছেন। কখনো বা দেখে ঘোমটা মাথায় বৌমা কোলের মেয়েটাকে ঝিনুকে করে কোমলি গাইটার দুধ খাওয়াচ্ছে।

কোনটা যে সত্যি কোনটা যে মিছে স্বপ্ন বুঝতে পারেননা আজকাল বিধু।

-"নাহ্ বড্ড গা শিরশির করচে! সব মনে হয় ঘর চলে গেচে। আর কিচু খেতে দেবেনে। এমন বাদলাদিনে নিরিমিষ্যি মুগ ডালের খিচুড়ি আর পোস্তবড়া। আহা! বিনু আর বিনুর বাপ কলাই-এর থালা চেটে খেত গো!

ও লো, কে আচিস লো! এই ধাপটা এট্টুন নাব্বে দে না বাপ। বড্ড পেছল যে। পড়ে গেলে প'রে নতুন সাদা কাপড়টা নোংরা হবেনি? বিনুর বাপ চলে যেতে এটা দেছিল, বাউনঘর থেকে।"

---------

কাদায় পিছল মাটির দাওয়া থেকে নিচের হাঁটুজলে ভরা চাতালটায় নামতে গিয়ে জোরে হড়কে যান বিধুমুখী। পুরোপুরি পড়ে যাওয়ার আগে দুটো কচি কচি হাত ধরে ফেলে তাঁকে। একটুখানি কাদাজলের ছোপ ধরে সাদা থানে।

-"অ ঠাকমা! সাবধানে লাববে তো। কত জল নীচে। সাপখোপও রয়েচে। আমি যে বল্লুম ভাসান দেকে আসচি, তুমি হেথায় বসে থাকো!"

-"কত'খন বসব রে আবাগীর বেটি। পেটে মোচড় দিচ্চে খিদেয় যে!"

-"অ! এই নাও ধরো দুটো বাতাসা চেবাও দেকি। ঘরকে গিয়ে আরো দুটো দোবো। জল মুড়ি দিয়ে খেয়ে, ঘুমিও।"

-"তাই দে দিকিনি তবে!

অ্যাই অ্যাই তোর ওই হাতে কী রে? বড় মতন। পেচনে নুকোলি! দ্যাকা শিগ্গির, দ্যাকা।"

-"ওহ্ ঠাকমা! এ তো ঠাকুরের মাতার শোলার মুটুক গো। ওরা ভাসসে দিচ্চিল আমি চেয়ে নিইচি। এই নাও ধরো। তোমার একটা, আমার একটা।"

আনমনা হয়ে হাত বাড়িয়ে মুকুটটা নেন বিধুমুখী। মাথায় চাপিয়ে পেছনের তারটা অশীতিপর হাতে পেঁচিয়ে শক্ত করে আটকে দেন। নাতনীর হাত থেকে অন্য মুকুটটা নিয়ে, তারও মাথায় পরিয়ে দেন।

-"ঠাকমা তোমায় দুগ্গাঠাকুরের মত লাগচে যে।"

-"হুমমম, উনিও বলতেন।"

-"কে ঠাকমা?"

-"কেউ না। তোকেও তো মা-দুগ্গা লাগচে যে রে বিমলি।"

ঠাকুমার কথায় খিলখিল করে হেসে ওঠে বিমলা। ফিসফিস করে বিধুমুখীর কানের কাছে বলে,

-"আমি তো মাদুগ্গা-ই গো ঠাকমা। চলো এবার ঘরকে চলো দেখি। এতটা পথ জল ঠেলে যেতে হবে ত।"

---------

লন্ঠনের টিমটিমে আলোয় তখনও ছায়া পড়ছে, কাদাজলের ওপর। একটা না দুটো মানুষের বোঝা যাচ্ছে না। জমা জলে ছপছপ করে হাঁটার আওয়াজ। জলের ছল-ছলাৎ এ ছায়াগুলো টুকরো হচ্ছে, আবার জুড়ছে, ফের ভাঙছে। ধীরে ধীরে দুটো অবয়ব আরো দূরে চলে যাচ্ছে। দুঃখ, কষ্ট, শোক, বাধা, বিপত্তিকে পদানত করে, মাথায় জয়ের শোলার শিরোপা পরে এগিয়ে চলেছে।

কতশত মহিষাসুর নানারূপে, অহরহ বধ হয় মর্ত্যের দেবীর হাতে, কেউ তার খবর রাখেনা....

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.