ফুসফুসের রোগের জন্য সিগারেট ছাড়তে বাধ্য হয়েছে শঙ্কর। তবে লিভারের রোগটা এখনও ধরা পড়েনি বলে মদটা চলে।


ঘড়িতে সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা। খুব বেশি কড়া পানীয় না ছুঁয়ে শঙ্কর মনস্থির করেছে - বিয়ার। ছোট ঘরটার এক কোণে রাখা মিনি-ফ্রিজ থেকে দুটো প্রমাণ মাপের বিয়ারের বোতল বের করে গত এক ঘন্টা ধরে দায়িত্ব নিয়ে সেগুলো খালি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সে। তিনবার খালি হয়েছে কাঁচের পিচার। শেষ বোতলে যেটুকু পড়ে আছে তাতে আরও একবার পিচার ভর্তি হয়ে যাবে। ঢালবো ঢালবো করছে যখন, তখন হঠাৎই কানে লাগানো ওয়ারলেস ব্লুটুথ হেডসেটটা জানান দিল যে ফোন আসছে -


- শঙ্কর বলছি।


- জানি, জানি!


- আলবার্ট?


- বুলস আই!


- আমার চার সন্তানের মধ্যে যে তুই এইভাবে নিরাশ করবি, দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি আমি। অথচ আজ বলতে দ্বিধা নেই যে তুই বাকি তিনজনের চেয়ে অনেক বেশি উর্বর ছিলিস। তবে এত কিছুর পরও আমার সাথে কথা বলার সাহস করছিস দেখে অবাক না হয়ে পারছি না।


- সাহস থাকবে না কেন? কোনও দোষ তো আমি করিনি।


- তাই? আমার সামনে আয় তাহলে। আমার চোখে চোখ রেখে বল কথাগুলো!


- বলবো, বলবো। সব বলবো। আসলে তোমার সাথে দেখা করতে চাইলেই পারবো না তো!


- কেন পারবি না?


- শিব, চার্লি আর লাল দেখা করতে দেবে না।


- বাজে বকিস না আলবার্ট। ওরা কেন আটকাবে তোকে?


- আটকাবে, কারণ তোমার ট্রেড-সিক্রেট ফাঁস করে দেওয়ার জন্য যাকে দায়ী মনে করো, আসলে সে নির্দোষ। তোমার কান বিষিয়েছে ওই তিনজন, সেটাও অনেকদিন ধরে। তারপর প্ল্যান করে আমাকে ফাঁসিয়েছে। আর এখন তোমাকে বলছে যে, আমি তোমার প্রাণ নিতে চাই!


- শেষ কথাটা কী করে জানলি? ফোন ট্যাপ করছিস? নজর রাখছিস আমার ওপর?


- না। বাকী তিনজনের ওপর। ওরা তোমাকে ডোবাচ্ছে অনেকদিন ধরেই। তোমাকে সরিয়ে দেওয়ার প্ল্যানও ওদের রেডি! আর তাতে ইন্ধন কে জুগিয়েছে জানো? এই লাইনে তোমার আজন্মের রাইভাল, হাতকাটা কানাই।


- গল্প দিস না আমায়। আমাকে সরানোর ক্ষমতা কারও নেই!


- বাকিদের কথা জানি না, তবে আমার আছে। চার নম্বর পিচারটা ঢালবে না?


- সান অফ এ বিচ!


লোকচক্ষুর আড়ালে জঙ্গলের ভিতর শঙ্করের এই ডেরার কথা আলবার্ট, শিব, চার্লি আর লাল ছাড়া কেউ জানে না। অস্থায়ী এই একতলা বাড়িটায় তিনটে ঘর। তার মধ্যে একটা শঙ্করের অফিস। এখান থেকেই সে কন্ট্রোল করে তার যাবতীয় চোরাচালান, মেয়েপাচার, ড্রাগ-ডিল! শঙ্করের হাত এক কালে অনেক লম্বা ছিল। তার ভয়ে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেতো বললেও কম বলা হয়। তবে এখন বাজারে জন্ম নিয়েছে আরও অনেক খেলোয়াড়। শঙ্করের প্রতিপত্তি কমেছে আগের থেকে।


অফিসঘরে ঢোকার দরজার ঠিক উল্টোদিকেই বড়মাপের স্বচ্ছ কাঁচের জানলা। তার বাইরেই বয়ে চলেছে নদী। নদীর ওপারে আরও কিছুটা জঙ্গল। তারপর শুরু হয়েছে পাহাড়। জানলার সামনে এসে দাঁড়ায় শঙ্কর। জানে যে জানলা খুললেই উত্তুরে হাওয়ায় গা শিরশির করে উঠবে। সে তেমন কিছুই করে না। ফোনে পিচারের কথাটা বলায় সে ভালোই বুঝতে পেরেছে যে নদীর ওপার থেকে তার ওপর অনেকক্ষণ ধরেই নজর রেখেছে আলবার্ট। নিজের মনে সে যুক্তির কাটাকুটি খেলে - ঘরের ভিতর আলো খুব কম, এই সন্ধ্যায় অত দূর থেকে দূরবীন কাজে দেবে না। তার মানে, নাইট-ভিশান আছে এমন স্নাইপার রাইফেল!


- তাহলে আমাকে শেষ করে ফেলার সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললি?


- হা হা হা! আসলে আমি তোমার ডানহাত হয়ে উঠছিলাম ক্রমশ। সেটা ওদের সহ্য হচ্ছিল না। এখন ওরা নিশ্চই তোমার দরজার বাইরে? তোমাকে পাহারা দেওয়ার অভিনয় করছে?


- কথা না ঘুরিয়ে আমি যা জিজ্ঞাসা করলাম তার জবাব দে।


- আমার কাছে খবর আছে আজই কিছু একটা করবে ওরা তিনজন। তাই সিদ্ধান্ত একটা নিতেই হল।


ঘরের দরজা খুলে আচমকা ঢুকে আসে শিব, চার্লি আর লাল। ওরা বয়েসে অনেক ছোট শঙ্করের থেকে। বহুবছর আগে অনাথ আশ্রম থেকে চারজনকে একসাথে নিয়ে এসেছিল শঙ্কর। ট্রেনিং দিয়েছিল মন প্রাণ ভরে। যদিও এই লাইনে কেউ কারও নয়, তবুও ইচ্ছে ছিল যে নিজে হাতে গড়া এই অপরাধের সাম্রাজ্য ওই চারজনের হাতে সঁপে দিয়ে অবসর নেবে সে। কিন্তু আজ ঘটছে অন্য কিছু।


তিনজনের হাতেই রিভলভার। তাদের স্থির লক্ষ্য শঙ্কর। লালের ঠোঁটে জ্বলতে থাকা সিগারেটের গন্ধ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ঘরের ভিতর। শঙ্কর বুকে ভরে নেয় পোড়া তামাকের সেই গন্ধ। সিগারেট ছেড়ে দিলেও তামাকের গন্ধে তার আজও মন কেমন করে ওঠে। সে ভাবে, আলবার্ট সত্যি কথাই বলছিল। পিঠে ছুরি মারলো শেষে তিনজন একসাথে।


অস্থির চোখে প্রমাদ গুনলো শঙ্কর।


তারপর গুলি চলার শব্দ! তবে অনেক দূরে কোথাও। কাছেই যে নিচু আওয়াজটা পাওয়া গেল সেটা কাঁচে ফুটো হওয়ার - খুচ, খুচ, খুচ! সীমিত, দৃঢ়, অব্যর্থ!


শঙ্করের চোখের সামনে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল তিনটে দেহ। তাদের বন্দুক আর গলার স্বর দুইই বোবা হয়ে চেয়ে রইল শঙ্করের দিকে। আর কানের ভিতর বেজে উঠল আলবার্টের গলা -


- একটা কথা না বলে পারছে না এই সান অফ এ বিচটা, মেয়েপাচারটা এবার বন্ধ করলে হয় না?


- ঘরে ফের আলবার্ট! তারপর এই রাজত্ব তোর। সবকিছু তোর। তুই যা ঠিক করবি তা-ই হবে। তুই শুধু ঘরে ফের।


ওপাশ থেকে কিছু না বলে ফোন কেটে দিল শঙ্করের চতুর্থ সন্তান। শঙ্করও চোয়াল শক্ত করলো। কিছুই ঘটেনি এমন ভাব করে পিচার ভরতে লাগলো চতুর্থ এবং শেষবারের জন্য।



।।সমাপ্ত।।













bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.