গাজন উৎসব

আমি গ্রামের মেয়ে ‚ তাই আমাদের গ্রামে যেভাবে এই উৎসব পালিত হতে দেখেছি ‚ তারই কিছু স্মৃতি রোমন্থন করছি | আমার ছোটবেলায় ‚ চড়ক সংক্রান্তির দুদিন আগে থেকেই উৎসব শুরু হয়ে যেত | আমাদের বাড়ী একেবারে বড় রাস্তার ধারেই | এই উৎসবটা স্থানীয় এক ঘোষেদের বাড়ীতেই মূলত হত | ওদের বাড়ীটা আমাদের বাড়ী থেকে বিশেষ দূরে নয় ‚ তাই ঢাকের শব্দ আমরা বাড়ী থেকেই পেতাম | গাজনের তিনদিন আগে কয়েকজন ‚ লালে অথবা হলুদে ছোপানো ধুতি পরে ‚ কিছু বাড়ী থেকে মাগন নিত | ঐ চাল দিয়ে ওরা ঐদিন হবিষ্যি করত | রাত্রে শুধু ফল খেত | তারপর রাত দশটা নাগাদ শিবের পূজো শুরু হত | অনবরত ঢাকের আওয়াজ ‚ সেই সঙ্গে ওদের চিৎকার ‚ তারকেশ্বরের সেবা লাগে ......মহাদেব ‚ জলেশ্বরের সেবা লাগে .....মহাদেব.... ছোট্ট শিবলিঙ্গ ওরা পুকুরে রেখে দিত | সারারাত পুজো করে ‚ ঐ ঘোষেদের বাড়ীর একজন বয়োঃজ্যেষ্ঠ ‚ যিনি মূল সন্ন্যাসী হতেন ‚ তিনি জলে নেমে সেই শিবলিঙ্গ তুলে আনতেন | তারপর ঐ শিবকে তাম্রপাত্রে রেখে ‚ আকন্দ ফুলে পূজো করে ‚ শিবলিঙ্গ মূল সন্ন্যাসীর মাথায় চাপিয়ে ‚ সঙ্গে একজন ছত্রধারী এবং জন দশ-পনের সন্ন্যাসী সহ ‚ আমাদের গ্রামের প্রতিটি বাড়ীতে যেতেন | আমাদের মায়েরা উপোষ করে থাকতেন | ঠাকুর নিয়ে ওরা বাড়ী-বাড়ী গিয়ে একটু নাচানাচি করত | মায়েরা দুধ ‚ গঙ্গাজল দিয়ে পূজো করতো ‚ তারপর বেশ অনেকটা করে সিধে দিত | সিধে মানে ‚ চাল ‚ আনাজপাতি এবং দক্ষিণা বাবদ কিছু | তবে ওরা শুধুযে আমাদের গ্রামে ঘুরত তা নয় ‚ আশে-পাশের তিন-চারটে গ্রামেও যেত | তেমনি তাদের গ্রাম থেকেও ঐভাবে শিব নিয়ে সন্ন্যাসীরা আসতেন আর মায়েরা সারাদিন উপোষ থেকে পুজো করেই যেতেন | তারপর সন্ধ্যেবেলা ‚ যে যার গ্রামে ফিরে নীল পূজো করত | মায়েরাও ঐ নীলপূজোর জন্যে আমাদের হাতে ডালা পাঠিয়ে দিয়ে ‚ তারপরে জলগ্রহণ করত | ঐদিন মা বেশ মুখরোচক জিনিষ করতো | ভিজেছোলা ভাজা‚ নুন্-লংকা দিয়ে আর কাঁচা আমের আম-মাখা মানে আম বেটে লংকা-নুন দিয়ে ‚ ওঃ এখনো ভাবলে জিভে জল আসে | পরদিন হত চড়ক বা গাজন | সেটাও ঐ ঘোষেদের বাড়ীর সামনের মাঠেই হত | সেই উপলক্ষে মেলাও বসত | আমরা মেলা দেখার জন্য পার্বণী পেতাম | ভাই-বোনেরা মিলে হৈ হৈ করে যেতাম | সেখানে লম্বা-লম্বা বাঁশ বেঁধে রাখা থাকতো | ছোট-বড় সব সন্ন্যাসীরা কিছু ফল নিয়ে ঐ বাঁশের ওপরে উঠে শিবের নাম নিতে-নিতে ঐ ফলগুলো এদিক-ওদিক সবাইকে ছুঁড়ে দিয়ে ‚ দাঁড়াত | একজন তার কোমরের কাপড়টা ধরে থাকত ‚ অনেক নীচে ‚ মোটা দড়ির জালের ওপরে বারোটা বঁটি পরপর সাজানো থাকতো ‚ কোমরটা ছেড়ে দিলেই দুই হাত লম্বা করে ‚ সেই বঁটির ওপরে পড়ত ‚ ভাঙ্গর ভোলা চরণের সেবা লাগে অথবা জটাধারীর চরণের সেবা লাগে ‚ এইসব বলতে-বলতে | আমরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখতাম ‚ কোনদিনও কাউকে কোথাও কেটে যেতে দেখিনি | তারপর আরো ছোটখাটো দু-একটা খেলা করত সন্ন্যাসীরা | কেউকেউ আবার দূরের পুকুরে ডুব দিয়ে ভিজে কাপড়ে দন্ডি কাটতে-কাটতে পূজোর জায়গায় আসত | তারপর কেউকেউ বুক চিরে একফোঁটা রক্ত দিত | এসব মারাত্মক ব্যাপার দেখে শিউরে উঠতাম | তারপরে মেলায় একটু ঘুরে ‚ টুকটাক কিনে ‚ সন্ধ্যের একটু আগেই বাড়ী ফিরতাম | জানিনা এখনো সেরকম কিছু হয় কিনা.......

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.