অন্দরমহল


তপনবাবু একজন ডাকসাইটে কেন্দ্রীয় সরকারের অফিসার ছিলেন । তার আমলে বাঘে গরুতে না হোক শেয়াল আর কুকুরে নাকি এক ঘাটেতেই জল খেতে বাধ্য হত। বাড়িতেও তার দোণ্ডর্দ প্রতাপ। পান থেকে চুন খসলেও সবার ওপরে (এবং অবশ্যই প্রথমে গৃহিণীর ওপরে) সাংঘাতিক রকমের চোটপাট চলত। দুই চাকরীরত ছেলেও বাবাকে খুবই সমীহ করে চলত। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো । সকালে অফিসের গাড়িতে ড্রাইভার সহ তপনবাবু বেরিয়ে গেলে বাড়িতে বিরাজ করত অখণ্ড শান্তি । এর মধ্যেই বড়ো ছেলের বিয়েটাও তিনি নিজে পছন্দ করা মেয়ে দেখেই সম্পন্ন করেছিলেন নিজে দাড়িয়ে থেকে। বেচারা দীপ্তমান একটা প্রেম করা দূরে থাক বাবার ভয়ে মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকাবার পর্যন্ত সাহস পায় নাই প্রাকবিবাহ জীবনে। আর ছোট ছেলে অংশুমান? তার কথা একটু পরে। আপাতত সে এম বি এ পাশ করে এক কর্পোরেট ফার্মে জুনিয়র অফিসার।

তা এহেন জাঁদরেল তপন কুমার ব্যানার্জি এখন রিটায়ার করে বাড়িতে সারাক্ষণ থাকবেন। তাই বাড়িতে ত্রাহি ত্রাহি রব। তবু যা অবশ্যম্ভাবি তাকে তো সবারই মেনে নিতে হবে। তো রিটায়ারমেণ্টের পরদিন সকালে উঠে কাজপাগল মানুষটাকে একা একা বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়তে দেখে বাড়ির সকলেই একটা বিষন্নতা অনুভব করছে।

এভাবেই চলল কিছুদিন । একদিন তিনি দুই ছেলে এবং গৃহিণীকে ডেকে বললেন দেখ এখন আমি রিটায়ার করেছি । তোমরা জান যে এই বিশাল সরকারি আবাস আমাকে কিছুদিনের মধ্যেই খালি করে দিতে হবে। তাই একটা নতুন ফ্ল্যাট বাড়ি কিনে রেখেছি । পেনশনের টাকাতো অর্ধেকের বেশিই চলে গেছে ওটা কিনতে। তা হোক। তাতে আমার কোন আফসোস নেই । তবে ভবিষ্যতে সংসার চালানোর ভার এবার তোমাদের দুই ভাইকেই নিতে হবে বৈকি । আমিও যতোটা পারি অবশ্যই সাহায্য করে যাব।

মাসখানেক বাদে চার কামরার নতুন ফ্ল্যাটে সবাইকেই চলে আসতে হয়। এখানে জায়গার সঙ্কুলান । বড় বেডরুমের দখল অবশ্যম্ভাবি রূপে তপনবাবুর আর পাশের বারো বাই চোদ্দোর বেডরুম নিশ্চিত নিয়মে বড়োছেলের। ছোটছেলের জন্য ডাইনিং স্পেসের মাঝেই পার্টিশন করে ব্যবস্থা করা হলো। যদিও অংশুমান একটু গাঁইগুঁই করছিল। কিন্তু এতেও অসুবিধে । এক দম্পতির অন্দরমহলের কথাবার্তা দেয়াল ভেদ করে পাশের ঘরে ঢুকে পড়ছে অহরহ। এবং তার ফলে স্বাচ্ছ্যন্দ এবং গোপনীয়তা দুটোই যে ব্যহত হচ্ছে সেটা একটু দেরিতে হলেও তপনবাবু বুঝতে পারলেন। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে । প্রথম প্রথম সবাই যে যার ঘর গোছানোতে ব্যস্ত । তার মধ্যেই কানে আসে বড়ছেলের ঘর থেকে কিছু কিছু টুকরো টাকরা শব্দ । যেমন একদিন কানে এল দীপ্ত তার স্ত্রী কে বলছে "ঠিকাছে আমিই না হয় বাবাকে বলব"। সাথে সাথে ওর স্ত্রী শর্মিষ্ঠা চাপা গলায় বলে 'আস্তে। বাবা শুনতে পাবেন।' কি শুনতে পাবার ভয়ে দীপ্ত আর তার স্ত্রীর কণ্ঠস্বর ফিসফিসানিতে রূপান্তরিত হলো জানতে পেলেন না কিন্তু মনের মধ্যে কথাটা গেঁথেই রইল, যদিও কাউকেই তিনি বুঝতে দিলেন না।

তো এরপর একদিন গৃহিণী অনিমা এসে তপনবাবুকে বললেন তুমি তো বাড়িতেই বসে থাক। তাই তুমি সংসারের কিছু কাজ যেমন ধর সকালের বাজার করা বা এধরণের ছোটখাটো কাজগুলো করে দিলে একটু সুবিধা হয় ।

তপনবাবু উল্টে অনিমা কে বললেন "শর্মিষ্ঠা তাই বলছিল নাকি ? না এটা দীপ্তর কথা ?"

অনিমা মৃদুস্বরে বলল। "আহ কি সব বলছ? তুমি তো বাড়িতে বসেই থাক। দীপ অংশু দুজনেরই তো অফিস থাকে । সামান্য বাজার করা বৈ তো নয়।"

"না অনি। কথাটা তোমার মন থেকে বেরুলে আমার আপত্তি থাকত না। কিন্তু ছেলের বৌ যদি তোমার সংসার তোমার বর্তমানেই চালাতে শুরু করে দেয় তাহলে সেটা চিন্তার বিষয় বৈকি ।"

"আহ আস্তে। শমী তো বলেনি । "

"তাহলে স্ত্রীর নির্দেশে দীপ"।

"তুমি জানলে কি করে?"

"আজকাল অন্দরমহলের কথাবার্তা কিছু কিছু কানে ঢুকে পড়ে যে ।" তপনবাবুর নিরীহ জবাব ।

স্রেফ পাঁচ ইঞ্চির দেয়াল। আর আজকাল তো দেয়ালেরও কান রয়েছে । তাই এদিকের অন্দরমহলের কথা ওদিকে পৌছাতেও সময় নেয় নি।

পরদিন থেকে তপনবাবু বাজারে যাওয়া শুরু করলেন ঠিকই কিন্তু পরিবেশটা একটু থমথমে হয়ে গেল। তবে বেশকিছুদিন ধরেই থমথমে আবহাওয়া । অন্দরমহলের শীতলযুদ্ধ এর মাঝেই যেকোনো মূহুর্তে শুরু হয়ে যাবার একটা আশঙ্কা ।

তপনবাবুর সেই রাশভারী চেহারাটা ক্রমশই যেন ভেঙে পড়ছে । ছোট বাড়ি । তাই যতোই নিস্তব্ধতা বজায় রাখার চেষ্টা চলুক একটা চাপা স্রোত যেন বয়েই চলেছে। একদিন তপনবাবু ব্যালকনিতে বসে রয়েছেন । হঠাৎই চোখে পড়ল একটি মেয়ের সাথে গল্প করতে করতে অংশু পাশের পার্কে ঢুকল। ওদের কথা শোনা না গেলেও ওদের মনের ভাব বেশ দৃশ্যমান । আরো একটা ঘা খেলেন পিউরিটান তপনবাবু । প্রেশারটাও মনে হয় আরও বেড়েছে ।

আরেকদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল ওনার । আবারো শুনলেন চাপা গলায় ফিসফিসানি পাশের ঘরের দেয়াল ভেদ করে আসছে। নিশীথ রাতে ছেলে-ছেলের বৌর পার্সোনাল কথা শোনার ইচ্ছা বা রুচি একেবারেই ছিল না। কিন্তু হঠাৎ বাড়ি বদলের কথা কানে আসায় নিজের আদর্শের কথা ভুলে গিয়েই উৎকর্ণ হয়ে উঠলেন। আবারো বৌমার গলা "কিগো কথার জবাব দিলে না যে? বাড়ি বদল করলে ঝঞ্ঝাট কত কমে যেত সেটা ভেবে দেখেছ ?"

"আচ্ছা এখন ঘুমাতে দাও। কাল বিকেলে আমি অফিস থেকে সোজা তোমার বাপের বাড়ি চলে যাব। তুমিও চলে যেও। ওখানে বসে ফ্রিলি আলোচনা করা যাবে খন। আপাতত অন্দরমহলের খবর অন্দরেই থাক নাহয়।"

"ওগো শুনছ? শরীরটা ভালো লাগছে না।" স্ত্রীকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেন তপনবাবু। এধরণের ঘটনা আজ প্রথম নয় । কাঁচাঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় অনিমা কিছুটা বিরক্ত । গজ গজ করতে করতে উঠে বললেন "কি আবার প্রেশার বাড়ল ? ওষুধ তো তোমার সাইড টেবিলের ড্রয়ারেই ছিল । নিজেও নিয়ে নিতে পারতে।"

কেন যে স্ত্রীকে আসলে মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গাতে হলো সেটা অনিমাও ঠিকই বুঝতে পারলেন ছেলে ও ছেলেবৌএর ফিশফাস কথোপকথন থেকে । আর পরদিন যখন সকালে উঠে দীপ মাকে বলল "আজ আমার অফিস থেকে ফিরতে দেরি হবে। ডিনারটাও অফিসেই সেরে আসব" তখন শর্মিষ্ঠা বলে উঠল "তাহলে মা তুমি যদি অনুমতি দাও তবে ওই বাড়ি থেকে আজ ঘুরে আসব?" অনিমা সব বুঝেও কিছুই হয় নি এভাবে পুত্রবধূকে অনুমতি দিয়ে দিলেন।

পরেরদিন রাতে সস্ত্রীক বড়োছেলে যখন শ্বশুরবাড়িতে আলোচনায় নিমজ্জিত তখন এবাড়িতে ছোটছেলে বাবার সামনে হাজির । "বাবা। আমি একটি মেয়েকে ভালোবাসি তুমি বোধহয় জান। তো ওই মেয়েটিকে আমি বিয়ে করতে চাই । " এই সোজাসাপটা কথা শুনে তপনবাবু হতবাক। তবুও আমতা আমতা করে বললেন " আমি? আমি কি করে জানব।"

অংশু "বাবা শাক দিয়ে মাছ না ঢাকতে তো তুমিই আমাদের শিখিয়েছিলে। আর তোমার অন্দরমহলের কথাও আমার কাণে মাঝে মাঝে ভেসে আসে কি না।"

হতবাক তপনবাবু বললেন "মেয়েটির বাড়ি কোথায়? ওর পরিচয়?" অংশু এর জন্যে প্রস্তুত ছিল । বলল "ওর নাম রাজিয়া খাতুন। সিন্ধ্রি মুসলমান । বাবার ওষুধের বড় বিজনেস রয়েছে । ও এখন আমার সহকর্মী ও বটে এবং আমার ধর্মপত্নীও বটে। আজকেই আমরা দুজনে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করেছি যেটা ওঁর বাবাকে রাজিয়া এতক্ষণে বলে দিয়েছে নিশ্চয়ই ।" কোনও প্রত্যুত্তর না পেয়ে অংশু ভয়ে ভয়ে বাবার মুখের দিকে তাকাতেই ভয় ত্রাসে রূপান্তরিত হয় । দেখে বাবার মুখ থেকে গাঁজলা বেরুচ্ছে । সাথে গো গো করে শব্দ । তারপরের ঘটনা খুব তাড়াতাড়ি ঘটতে থাকে । মাত্র তিনদিন অচৈতন্য অবস্থায় কোলকাতা শহরের একটি বিখ্যাত নার্সিংহোমের আই সি ইউ তে ছিলেন। এবং এরপর অনিমার সিঁথির সিঁদুর চিরকালের জন্য মুছে দিয়ে তিনি অন্য জগতে চলে গেলেন।

তারপর আরও তিনটি বছর পার হয়ে গেছে । বড় বেডরুমটা এখন বড়ো ছেলের দখলে। এবং পাশের বেডরুমে সস্ত্রীক অংশুমান অধিষ্ঠান করছে। না না ওরা মাতৃভক্ত সন্তান। মাকে কেউ নির্বাসনে পাঠায় নি। একলা বুড়ো মানুষ । আর তাই অংশুর আগের শোয়ার জায়গায় ওনাকে থাকবার অনুরোধ করা হয়েছিল । কিন্তু অনিমা দেবী স্বাধীনচেতা মহিলা আর তাই স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে বর্তমানে একটি বৃদ্ধাশ্রমের অধিবাসী ।

আমার কথাটি ফুরোল। নটে গাছটি মুড়োল।

অনিমা দেবীর বয়স এখন সত্তর । মাতৃভক্ত দুই ছেলেই সস্ত্রীক মাসে একবার করে এসে মাকে কিছু টাকা দিয়ে যায় এবং অনুরোধ করে "মা। বাড়িতে ফিরে চল।" কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। তবে ওনার একটাই আফশোস। ওনার নিজের মানুষটি যে জীবনে একটাই ভুল করেছিলেন যার খেসারত তিনি নিজের জীবন দিয়ে বুঝিয়ে গেলেন। সবার অন্দরমহল যে খুব কাছাকাছি থাকলেও মুশকিল সেই কথাটাই বুঝতে চান নাই তিনি নিজে এবং অনেকে ।

***

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.