সেই শ্রাবণের রাতে


বয়স্ক লোকটা অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে আছে ছোট্ট তানির দিকে | তানির বুকটা শুকিয়ে এল | 'ছেলেধরা' নয় তো ! সাথে একটা ঝোলাও আছে দেখছি | লোকটা আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে -- এবার তানি কি করবে ? এখানের সব রাস্তাই তো ওর অজানা | কোন দিকে যাবে ! সন্ধ্যেও হয়ে আসছে | এমনিতেই ভয়ে ভেতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে তারপর আবার 'ছেলেধরা' ! আর বোধহয় বাড়ি ফেরা হল না | মা-বাবার মুখটা মনে আসতেই চোখ দুটো জলে ভরে উঠল | পেছন ফিরে দৌড়তে যাবে ওমনি বুড়ো লোকটা খপাৎ করে ধরে ফেলল তানিকে |

এদিকে তখন স্কুল বাসটা সবে স্কুলে পৌঁছেছে | তানির বাবা , সুজয়বাবু স্কুল গেটের সামনে মেয়ের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে | একে একে সবাই বাস থেকে নামল | কিন্তু তানি কই ? ব্যাপারটা প্রথম নজরে আসে সুজাতা-ম্যাডামের | তিনিই লিস্ট ধরে একে একে বাস থেকে'যাত্ৰী'দের নামাচ্ছিলেন | কথাটা তানির বাবার কানেও গেল | তিনিও ছুটে এলেন | এরপর হুলস্থূল কাণ্ড বেঁধে গেল | চলল একে অপরের দোষারোপের পালা | স্কুল থেকে পিকনিকে নিয়ে যাওয়া এই প্রথম নয় -- কোনওবারই কোন অঘটন ঘটে নি | আর সেটাই হয়ত কাল হয়েছে ! টিচারদের একটু গাফিলতিতেই ঘটল এমন ঘটনা | তানির বাবা তানিকে খুব ভালোবাসেন আর তানিও | তানির যত আবদার সব ওই বাবার কাছেই | বাবাকে কোনও কথা না বললে তার ঘুমই হয় না | তাই প্রথমে খবরটা শুনে সুজয়বাবু বিশ্বাসই করতে পারলেন না , তারপরশোকাকুল হয়ে বসে পড়লেন | কিন্তু শোকের সময় এটা নয় | মনকে শক্ত করে সুজয়বাবু উঠে দাঁড়ালেন | ম্যাডামদের সাথে আলোচনা করে স্থানীয় থানায় ফোন করলেন |
একটু পরেই পুলিশের জিপ স্কুল গেটের সামনে এসে দাঁড়াল | সব খবরাখবর নিয়ে তাঁরা ওই পার্কে আবার যাওয়াই মনঃস্থির করলেন | সাথে গেলেন হেডমিসট্রেস কাকলি ম্যাডাম আর সুজয়বাবু | সময়ও অনেকটা পেরিয়ে গেছে | তানি কোথায় আছে , কেমন আছে ? বারবার খারাপচিন্তা গুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে সুজয়বাবুর |…তানির মাও নিশ্চয় এতক্ষণে খবরটা পেয়ে গেছে |… কি করছে কে জানে !

পার্কটা বেশি দূরে নয় , 20-25 মিনিট পরেই পৌঁছানো গেল সেই নেহেরু পার্কে | বেশ বড় সড় পার্ক | ততক্ষণে চারপাশ বেশ অন্ধকার | গাছ-গাছালি ভেতরটা আরও বেশি অন্ধকার করে রেখেছে -- বাইরে থেকে বিশেষ কিছুই চোখে পড়ে না | সামনের বড় গেটটায় একটাবড় তালা ঝোলানো | তারই একপাশে একটা ছোট্ট ঘর আর তার সামনে একটা চৌকি পাতা | তাতে একটা চৌকিদার বসে বসে অত্যন্ত মননিবেশ সহকারে বাম হাতের তালুতে কিছু নিয়ে ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে সযত্নে ঘর্ষণ করে চলেছে | সাব-ইন্সপেক্টর জয়ন্তবাবু ওর কাছেগিয়ে দাঁড়াতেই পাহারাওয়ালা বাম হাতটা পেছনে করে একটা পেল্লাই সেলাম ঠুকল | "কোন বাচ্চা মেয়েকে দেখেছেন ?" ~ দু'একটা কথার পর আসল কথাটা জিজ্ঞেস করলেন জয়ন্তবাবু |

"বাচ্চা মেয়ে ! বয়স কত ?"

"এই ক্লাস ফোর এ পড়ে …"

"এখানে আজ সেরকম ভিড় হয় নি যদিও, তবুও অনেক ছেলেমেয়েই এসেছিল | কেমন করে বলব বলুন !"

এর ফাঁকে আরেক জন পাহারাওয়ালা ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে , সে হয়ত পাশের দোকানগুলোর কোনও একটায় ছিল | সে হঠাৎ মাথা চুলকে বলল ~ "নীল রঙের ফ্রক - তার উপর গোলাপি সোয়েটার পরে ছিল কি ?"

সুজয়বাবু সামনে দাঁড়িয়েছিলেন , তিনি ভয়ার্ত কণ্ঠে বললেন ~"হ্যাঁ "

পাহারাওয়ালাটা আবার বলল ~"ওই রকম পোশাক পরা একটা মেয়েকে একটা বুড়ো লোকের সাথে যেতে দেখেছি -- মেয়েটার ওই রকম পোশাক আর বুড়োটার ছেঁড়া জামা তাই আমি কিছুটা অবাক হয়েছিলাম | কিন্তু এখানে তো অনেক রকম মানুষ আসে , আমরাবুঝবো কেমন করে বলুন ?"

সুজয়বাবু বিমর্ষ হয়ে পড়লেন |

তবু পার্কের তালা খোলা হল | কাকলি ম্যাডাম পিকনিকের জায়গাটায় নিয়ে গেলেন -- টর্চ লাইট দিয়ে আশে পাশের জায়গাগুলো ভালোভাবে দেখা হল | পার্কের বাইরেটাও দেখা হল | কিন্তু সব প্রচেষ্টাই ব্যৰ্থ হল | সবাই নিরাশ হয়ে ফিরে এলেন | পুলিশ চেষ্টা কোরছে এইআশ্বাস দিয়ে যখন সুজয়বাবু আর কাকলি ম্যাডামকে স্কুলের সামনে নামিয়ে দিয়ে জিপটা অদৃশ্য হল তখন ঘড়িতে প্ৰায় ন'টা |

সুজয়বাবুর মনে তখন একটা কথাই বার বার আসছিল ~"এবার তানির মাকে কি বলব ?" ধীর পদক্ষেপে তিনি এগিয়ে গেলেন | দরজা খোলাই ছিল , বারান্দাটা পেরিয়ে ঘরে ঢুকতেই সামনা সামনি হল তানির মায়ের সাথে | বিধ্বস্ত চোখ-মুখ দেখেই বোঝা যায় খবরটাতিনি পেয়েছেন | সুজয়বাবুকে দেখে তিনি ফেটে পড়লেন | আর্তস্বরে জিজ্ঞেস করলেন ~"আমার তানি কই ?" সুজয়বাবু নিজের কষ্টটা কোনক্রমে চাপা দিয়ে যতটা সম্ভব শান্ত ভাবে বললেন ~"পুলিশ খুঁজছে -- এসে যাবে " | বলেই ভেতরে ঢুকে মুখ লুকালেন | পুরো বাড়িটা হঠাৎ থমমেরে গেছে | পুরোনো চাকর দীনু-কাকাও কেমন নিস্তেজ হয়ে বারান্দার এক কোনে বসে আছে | পাশের বাড়ির দু'এক জন এসেছিল তারাও সান্ত্বনা দিয়ে একে একে সরে পড়ল |

ঘড়িতে তখনও 10টা বাজে নি হঠাৎ বাইরের দরজায় টোকা পড়ল | দীনু-কাকা দরজা লাগিয়ে এসেছিল কিছুক্ষণ আগে | এখন দরজায় টোকা পড়ার সাথে সাথেই ধড়-ফড় করে তানির মা-বাবা দু'জনেই ছুটে গেলেন -- যদি তানির কিছু খবর থাকে ! তারপর দরজা খুলতেই--- একটা আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল সবার মনের মধ্যে -- এ তো কোন তানির খবর নয় এ যে তানি স্বয়ং ! সাথে একটা পক্বকেশ বুড়ো | তানির মা তানিকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগলেন , চোখ বেয়ে জল অঝোরে ঝরে পড়তে লাগল | সুজয়বাবুও মেয়েকে কোলে তুলে আদরকরে আবার ওর মায়ের কাছে দিয়ে বৃদ্ধ লোকটার দিকে এগিয়ে গেলেন | বৃদ্ধ লোকটা ছেঁড়া জামার কোনে দু'চোখ মুছল | সুজয়বাবু তাকে ভেতরে ডাকলেন | লোকটি ভেতরে এল | পরনে একটা রংচটা ছেঁড়া-ফাটা জামা আর ততোধিক পুরোনো একটা প্যান্ট , মাথার চুল উসকো-খুসকো আর কাঁধে একটা ময়লা ছোট ঝোলা | সুজয়বাবু জিজ্ঞেস করলেন ~"আপনি কে ? কিভাবে আমার মেয়ের দেখা পেলেন ? এখানে এলেনেই বা কেমন করে ?"
তানি হঠাৎ হাসতে হাসতে বলে উঠল ~"বাবা তুমিও ওকে চিনতে পারো নি | আমিও প্রথমে পারি নি …" তানিকে মাঝখানে থামিয়ে বৃদ্ধ লোকটি বলল ~"তুমি হয়তো আমায় চিনতে পারো নি বাবা | একদিন তোমরাই আমাকে বৃষ্টির রাতে আশ্ৰয় দিয়েছিলে |" সুজয়বাবু অন্যমনস্কহলেন -- তাঁর স্মৃতিপটে ভেসে উঠল সেই মাস মাস ছয়েক আগের এক বৃষ্টিমুখর শ্রাবণ মাসের রাতের কথা |

তানির বর্ষাকালটা খুব ভাল লাগে | সেদিন সন্ধ্যে হতে না হতেই বৃষ্টি এসে পড়েছিল | রাত হোক বা দিন বৃষ্টি পড়লেই তানি দোতলায় গিয়ে জানালাটায় পা তুলে বসে বসে বাইরে বৃষ্টি পড়া দেখে | সেদিন মায়ের কাছে বকুনি খেয়ে ওখান থেকে নেমে গিয়ে পড়তে বসেছিলকিন্তু তারপর আবার প্রায় আটটার সময় গিয়ে বসে ওই নির্দিষ্ট জানালার উপর | তখনও অঝোরে বৃষ্টিধারা ঝরছে | গৃহহীন গাছগুলো নিশ্চুপ হয়ে ভিজছে | তানিদের বাড়িটা ঠিক রাস্তার পাশেই আর এই জানালাটা ও-পাশেই | রাস্তায় যে ইলেকট্রিকের খুঁটিগুলো আছে তাতে ক্লাবেরছেলেরা একটা করে বাল্ব লাগিয়ে দিয়েছে | ফলে পথ এবং পথযাত্রী দুই-ই বেশ ভালো ভাবে জানালাটা দিয়ে দেখা যায় ; আর দেখা যায় সামনের আম , পেয়ারা , নারকেল , তালগাছগুলো | তাই ওই জায়গাটা তানির এত প্রিয় | হঠাৎ কিছু দেখতে পেয়ে তানি দোতলার পাশের ঘরেঢুকল | এই ঘরে তানির বাবা মোটা মোটা বই নিয়ে নাড়া চাড়া করেন | তানি ছুটে গিয়ে বাবার হাত ধরে টানতে শুরু করে ~"বাবা , চল না দেখবে …" | অগত্যা সুজয়বাবুকে আসতেই হল | জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ওই লাইট-পোস্টের ক্ষীণ আলোয় দেখলেন একজন বয়স্ক লোকসামনের আমগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে -- দেখে যতটা মনে হয় এ পাড়ার কেউ তো নয়ই -- কোনও গরীব শ্রেণীর বুড়ো লোক হয়তো ! তানি বলল ~"ওকে ভেতরে দাঁড়াতে বল না , বাবা | বৃষ্টিতে ভিজলে ওর সর্দি হবে তো !" সুজয়বাবু সম্মতি দেবার আগেই তানিরমায়ের গলা শোনা গেল ~"না , একদম না | এই সব লোককে একদম বিশ্বাস নেই |" কিন্তু মেয়ের জেদ আর সুজয়বাবুর আংশিক প্রশ্রয়ে তানির মা পিছু হঠতে বাধ্য হলেন | তিনি হন্ হন্ করে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ালেন | সুজয়বাবু আর তানি একটা ছাতা নিয়ে নীচে নেমে এলেন| তানিকে বারান্দায় দাঁড় করিয়ে তিনি ছাতাটা নিয়ে ওই বৃদ্ধ লোকটার কাছে গেলেন | লোকটা কিছুতেই রাজী হয় না , শেষে তানির কথা বলতে সুর খানিকটা নরম হল | সুজয়বাবু ওকে নিয়ে বারান্দায় উঠলেন | বৃদ্ধ লোকটার পরনে একটা মলিন ছেঁড়া জামা , রংচটা প্যান্ট আরকাঁধে একটা ছোট্ট ঝোলা | সব বৃষ্টিতে ভিজে একেকার হয়ে গেছে | তানির বাবা বললেন ~"আপনি এখানে বসুন আমি দেখি একটা কিছু নিয়ে আসি ; এই ভিজেগুলো রাতে পরে থাকলে তো অসুখ বাঁধিয়ে বসবেন |" বৃদ্ধটি বলল ~"না , না কিছু হবে না , ওসব আমার গা সওয়া হয়েগেছে |" কিন্তু সুজয়বাবু শুনলেন না | বাবা ভেতরে যেতেই তানি প্রশ্ন করল ~"দাদু , তোমার ঘর কোথায় ?" বুড়োর চোখ দুটো ছল্ ছল্ করে এল | বলল ~"আমার ঘর নেই , দিদিভাই …" ঘর নেই ! তা কি করে হয় ! ছোট্ট তানি বুঝে উঠতে পারে না | তার স্কুলের সব বন্ধুদেরএমনকি ম্যাডামদেরও তো ঘর আছে তবে এর ঘর নেই কেন ? লোকটি সজল নয়নে ঝোলাতে হাত ভরে কয়েকটা চকোলেট বার করে তানির হাতে দিল | চকোলেটগুলো জলে ভিজে গেছে | তানি হাতে নিয়ে একবার মা-র দিকে তাকাল … মা দরজার পাশ থেকে সজোরে ঘাড়নাড়ছেন | তানি চকোলেটগুলো হাতে ধরে কি করবে বুঝতে পারছে না এমন সময় বাবা নিজের একটা পাঞ্জাবি-পাজামা এনে বৃদ্ধ লোকটির হাতে দিলেন | "এত সুন্দর পাঞ্জাবিটা আমায় দিয়ে নষ্ট কোরো না , বাবা | এটা রাখো | আমার কিচ্ছু হবে না |" ~বুড়োটা জানাল | সুজয়বাবুদৃঢ় ভাবে জানালেন ~"মানুষের জীবনের থেকে কোনও কিছুই দামী নয় |" তারপর , অন্য প্রসঙ্গ ধরলেন | কথা প্রসঙ্গে যা জানা গেল তা এই ~ লোকটা ভিখিরি , ভিক্ষা করেই খায় , ভিটে-মাটি কিছু নেই , আত্মীয়-স্বজনও কেউ কোথাও নেই | পাশের গ্রামে "শ্রাবণী-মেলা" হচ্ছেসেখানেই সে গেছিল দুটো পয়সা , খাবারের আশায় | তা সন্ধ্যে থেকেই নামাল বৃষ্টি | ভেবেছিল রাতটা সামনের স্টেশনের প্লাটফর্মে কাটাবে কিন্তু এ পর্যন্ত আসার পর বৃষ্টি আরও তেড়ে-ফুঁড়ে নেমেছে -- আর যেতে পারে নি |
সুজয়বাবু যাবার সময় বলে গেলেন ~"বৃষ্টি থামুক আর নাই থামুক আপনি রাত্রে যাবেন না |" তারপর দীনুকাকাকে ডেকে বলে গেলেন রাতে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে | বারান্দাটা ফাঁকা পড়ে থাকে ওখানে একটা চৌকিও আছে | বৃদ্ধের রাতে শোয়ার ব্যবস্থা ওখানেই হল |

দোতলায় উঠতেই তানির মায়ের প্রশ্নবাণের সামনে পড়ে তানি আর তানির বাবা | প্রথমেই তানির হাত থেকে চকোলেটগুলো নিয়ে জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলেন | তারপর তানির বাবার দিকে ফিরে বললেন ~"তোমার কি দিন দিন বুদ্ধি-শুদ্ধি লোপ পাচ্ছে ! জানা নেইশোনা নেই এরকম একটা লোককে বাড়িতে এনে রাখলে ! এখন রোজ রোজ কি সব ঘটনা ঘটছে তা কি তুমি জান না ! এরা …" সুজয়বাবু মাঝপথে তাঁকে থামিয়ে বললেন ~"দ্যাখো কম বুদ্ধি যেমন মানুষের অহিত করে তেমনি বেশি বুদ্ধিও অনেক সময় তার থেকেও অনেক বেশিঅনিষ্ট করে |" তারপর নির্দিষ্ট ঘরটির দিকে তিনি পা বাড়ালেন | তানিও বাবার পিছু নিয়েছিল -- হঠাৎ তানির মা তাকে জোর করে কোলে তুলে বিড়-বিড় করে কি সব বলতে বলতে পাশের অন্য একটা ঘরে ঢুকে পড়লেন |

বাবাকে জড়িয়ে ধরে সে রাতে শুয়ে শুয়ে তানি অনেক প্রশ্ন করেছিল -- বাবা , ওর বাড়ি নেই কেন ? ওরা থাকে কোথায় ? তানির বাবা তানিকে যা বলেছিলেন তা ও বোঝে নি -- অনেক রাত পর্যন্ত তানি সেদিন জেগেছিল , চোখে যেন ঘুম আসতেই চায় না | এ পৃথিবীতেযে এমনও লোক আছে যাদের বাড়ি নেই -- একথা যেন তানির বিশ্বাসই হয় না | এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়ে | দেরিতে ঘুমনোয় উঠতেও দেরি হল | বাইরে ঝলমলে রোদ উঠেছে , কালকের ঝড়-বৃষ্টি এখন অতীত | ঘুম থেকে উঠেই তানির মনে পড়ে গেল সেই দাদুটারকথা -- ছুটে গিয়ে নীচে নেমে দেখে -- শূন্য চৌকিটা আগের মতই ফাঁকা পড়ে আছে আর পাশের টেবিলে নামানো আছে কালকে বাবার দেওয়া সেই পাঞ্জাবিটা আর তার পাশেই নামানো রয়েছে কয়েকটা চকোলেট | মুখ ভার করে তানি উঠে গেল উপরে | সুজয়বাবু সবই দেখছিলেন | তিনি আগেই খোঁজ নিয়েছেন | বৃদ্ধ লোকটি দীনু-কাকার শত অনুরোধেও কাল পাঞ্জাবিটা পরে নি -- বলেছিল এভাবে থাকা ওর অভ্যেস আছে | সকালে দরজা খুলতেই সে তানির জন্য কয়েকটা চকোলেট রেখে চলে যায় |

তারপর থেকে তানির চোখ জানালা দিয়ে কতবার ওই গৃহহীন মানুষটিকে খুঁজেছে -- তা সুজয়বাবু ভালোভাবেই জানেন |

আজ সেই লোকটিই কিনা তাঁর সবচেয়ে দামী 'সম্পদ'টা এভাবে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছে ! সুজয়বাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন ~"কিন্তু আপনি ওকে দেখলেন কোথায় ?"

তারপর তানি আর ওই বৃদ্ধ লোকটার কথা থেকে যা বোঝা গেল তা হল এই -- বিকেল বেলায় সব কিছু হয়ে যাবার পর স্কুলের ম্যাডামরা গোছ গাছে ব্যস্ত ছিলেন , তানি আর কয়েক জন বাসের সামনে দাঁড়িয়েছিল | হঠাৎ পাশের রঙ্গন গাছটার ঝোপ থেকে একটা বাচ্চাকাঠবেড়ালি উঁকি মারে | তানি ওকে ধরতে যায় | তানি যতই বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওর কাছে যাবার চেষ্টা করে অবুঝ কাঠবেড়ালিটা ততই দূরে সরে যায় | এভাবে কতক্ষণ কতটা চলেছে তানি বুঝতেই পারে নি | যখন খেয়াল হল তখন দেখল সে সম্পূর্ণ অন্য জায়গায় -- কোথায় বাস ! কোথায় ম্যাডামরা ! পার্কও প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে | এরপর তানি ইতস্ততঃ এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে থাকে কিন্তু ম্যাডামদের দেখা পায় না --- হঠাৎ দেখে একটা বুড়ো লোক অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে | প্রথমে তানি চিনতে পারে নি , ভয় পেয়ে গিয়েছিল | পরে বুঝতেপারে এ সেই বর্ষা রাতের দাদু | লোকটি এই পিকনিকের মরশুমে মাঝে মধ্যেই ওখানে যায় -- বেশ দু'টো পয়সা , বাড়তি খাবার-দাবার পাওয়া যায় | তানিকে কিছুক্ষণ দেখেই সে চিনতে পারে | তারপর তানির কাছ থেকে সব কিছু জানতে পারে | এখন রাতের মধ্যে বাড়ি না গেলেবাড়ির সবাই চিন্তা করবে ! কিন্তু যাবেই বা কি ভাবে ! হাতে তো বিশেষ পয়সাও নেই ! কোনও উপায় না পেয়ে শেষে কোলে-কাঁধে করেই এতটা পথ নিয়ে আসে | মাঝে মাঝে একবার করে বিশ্রাম করে আর হাঁটতে থাকে | পথে যেখানেই দোকান পেয়েছে তানির জন্য কিছু না কিছুকিনে দিয়েছে | এই শীতেও গলদঘর্ম হয়ে পৌঁছায় তানিদের বাড়িতে |

সুজয়বাবু অবাক হন ~"আপনি এই বয়সে এতটা পথ হেঁটে এলেন !" বৃদ্ধ লোকটা স্মিত হেসে জানায় ~"ও আমাদের অভ্যেস আছে " | সুজয়বাবুর চোখ ছল্ ছল্ করে আসে , তিনি পকেট থেকে কয়েকটা একশ টাকার নোট বার করে লোকটার হাতে দিতে যান……বুড়োলোকটা সজল নয়নে জানায় ~"বাবা , আমি ভিখিরি হতে পারি , অমানুষ নই !" "কিন্তু…" পাশ থেকে তানির মায়ের গলা শোনা যায় | তিনি কখন উঠে গিয়ে ভেতর থেকে সেই পাঞ্জাবিটা আর একটা কম্বল নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন কেউ এতক্ষণ খেয়ালই করে নি | তিনি বলে চললেন~"…এগুলো আপনাকে নিতেই হবে -- কেউ ভালোবেসে কিছু দিলে না করতে নেই |" "আর…" তানি আর তানির বাবা একসাথে বলে উঠল ~"…আজ রাতে এখানেই থাকতে হবে " |


এখানে বলে রাখি সেই বুড়োর আর যাওয়া হয় নি | তানি তাকে ছাড়ে নি | সেই বৃষ্টিধোয়া শ্রাবণ রাত একজন গৃহহীনকে যেমন একটা আশ্ৰয় দিয়েছিল তেমনি তানিকে ফিরিয়ে দিয়েছিল তার না দেখা দাদুকে |

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.