আই কুইট

আই কুইট

আজ সকাল থেকে সময়টা যেন কিছুতেই ফুরিয়ে মাঝবেলায় আসতে চাইছে না। সেই কখন ভোর বেলা থেকে অয়ণ বার বার ঘড়ি দেখছে। কিন্তু দেখলেই কি ঘড়ির মোটা সরু কাঁটা গুলো এগোই। আজ অয়ণের কাছে একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন আজ ওর মেডিকেল এন্ট্রান্সের ফল বেরোনোর কথা। কাল খবরটা শুনেই পাশের বাড়ীর নির্মলা আন্টি এসে ঘর বয়ে খবরটা দিয়ে গেল। এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয় ওনার কাছে বাড়ী বয়ে রেজাল্ট আউটের খবর দিতে আসা তবু এলেন এবং কিছুটা ব্যাঙ্গের ফোড়ন ছিটিয়ে রেখে গেলেন। নির্মলা মিত্রের যাওয়ার পর অয়ণের মা বিরক্ত হয়ে অয়ণের বাবাকে বলেছিল, "দেখলে কেমন এসে অপমান করে গেল,। বাবা কিছু বলেনি কিন্তু অয়ণ জানে এই না বলার মধ্যেও খোঁচা কতটা। আর নির্মলা আন্টি সে বলবে না কেন যতই হোক তার ছেলে মেডিক্যাল এন্ট্রাস ক্যাক করেছে গত বছর। ওর ছেলে বুবুন আর অয়ণ এক ব্যাচ মেট। সেই ছোট থেকে এক স্কুলে পড়েছে এক সাথে খেলে বড় হয়েছে। মাধ্যমিক দিয়েই অয়ণের মতো সেও একসাথে ভর্তি হয়েছিল নামী এক জয়েন্ট বেস কোচিং সেন্টারে। প্রথমবার ওদের কেউই সেই না দেখা সব পাওয়ার দেশের চাবি জোগাড় করতে পারল না। দুজনে আবার একসাথে পড়া শুরু করলো। সেবার ওয়েস্ট বেঙ্গলে না পেলেও বুবুন দক্ষিণ ভারতের এক বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হল। র‍্যাঙ্ক একটা হয়েছিল কিন্তু সেটা নীচের দিকেই। যেকটা টাকা ওর ডোনেশন বাবদ লাগল সেটা বুবুনের বাবার কাছে কোনো ব্যাপারই নয়। বুবুন অয়ণকেও বলেছিল কিন্তু এক র‍্যাঙ্কে কাজ করেও অয়ণের বাবার সে ক্ষমতা ছিল না। হয়ত লোন পেতেন কিন্তু মধ্যবিত্ত মেন্টালিটি বাদ সাধল। অয়নের সামনে দিয়ে বুবুন বেরিয়ে গেল। বাবা কিছু বলতে এলে অয়ন ওর বাবাকে জিঙ্গাসা করেছিল, বুবুনের বাবা যেটা ছেলের জন্য পারে সেটা ওর বাবা পারে না কেন। কোনো উওর দেয়নি ওর বাবা। বুবুনের একবছর কমপ্লিট হল বোধহয়। অয়নের এটা নিয়ে থার্ড় ট্রাই। দ্বিতীয়া বার জয়েন্টে চান্স না পাওয়ার পর বাবা সহ অনেকেই বলেছিল, "এবার অন্য কিছু কর, আরো তো ভালো ভালো কেরিয়ার অপসন্স আছে"। কিন্তু তত দিনে গোঁ মাথায় চেপে বসেছে অয়ণের, চান্স ওকে পেতেই হবে। ছাত্র হিসাবে অয়ণ খারাপ না তবে মেডিকেল এন্ট্রান্স এর জন্য যে বুদ্ধিদীপ্ত ক্ষুরধার মগজ লাগে তা ওর নেই। আসলে প্রথম প্রথম যখন স্কুলে ওর রোল এক থেকে পাঁচের মধ্যে থাকত তখন থেকেই অত্মীয়,পরিজন বন্ধুবান্ধব দের কাছে ওর পিঠে ভাল ছেলের স্ট্যাম্প পড়ে গেল। সে ভার বড্ড বেশী করে চেপে ধরেছে যত দিন গেছে। নিজে থেকে চেয়েও আর কোনোদিন খারাপ হয়ে ওঠা হয়ে উঠলনা ওর। সব সময় কোনো কিছু করার আগে ওকে একটা চিন্তা পেয়ে বসত, "লোকে কি বলবে" ফলে অন্যেরা যখন বয়ঃসন্ধি কালে প্রথম প্রথম ক্লাস ফাঁকি মেরে সিনেমা দেখতে গেছে অয়ণের পা যেতে গিয়ে বাঁধা পড়ে গেছে কোনো এক অদৃশ্য শিকলে। সকলে যখন পুজো পার্বনে হৈ হুল্লোড় করেছে তখন ভাল ছেলের তকমা ধরে রাখার তাগিদে অয়ণ বই মুখে পড়ে থেকেছে ঘরে। সবাই প্রেমে পড়েছে অয়ণ এড়িয়ে চলেছে। এভাবে থাকতে থাকতে একসময় কখন যে ওর বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে সরে এসেছে তা টেরো পাইনি। অয়নের জীবনের কাঠিন্য আরো বাড়ালো ওর মাধ্যমিকের ভাল রেজাল্ট। ভাল মুখস্ত বিদ্যা দিয়ে আশি সতাংশের উপর নম্বর ওর মার্কসিটে জুড়তেই ওর চারপাশের সকলে ভেবে নিল ডাক্তারি পড়া ওর পাক্কা। আর এটাই হল কাল। মাথায় মুকুট পরালে তা যেমন সহজে কেউ খুলতে চাই না তেমনি কেউ ভাল বলে পরিচিত হলে আর তা খারাপ হওয়া যায় না। অয়নের বেলাতেও তাই ছেলেটা জয়েন্ট জয়েন্ট করে নিজের এইচ এসে ভাল ফল করতে পারলো না কিন্তু তাতে ওর গোঁ গেল আরো বেড়ে। মেডিকেল ছাড়া জীবনকেই বৃথা মনে করতে লাগল ছেলেটা। লাস্ট দু এক বছর তো ওর রুম থেকে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছে। বেরোয় শুধু কোচিং এর সময়। এখন তো আর তাও বেরোয় না, নেটেই চলে আসে ওতেই পরীক্ষা দিতে হয়। বাইরে যাওয়ার কোনো ব্যাপার নেই। অয়ণের এই অবস্থা যে ওর বাবা মার চোখে পড়েনি তা নয়। অয়নের বাবা একবার চেষ্টা করেছিলেন যতে ছেলে এভাবে সময় নষ্ট না করে অন্তত একটা ভাল কলেজে কেমিষ্ট্রি কিম্বা ফিজিক্স নিয়ে ভর্তি হয়ে থাক। রাজী করানো যায় নি অয়ণকে। সাধারণ কলেজে অনার্স নিয়ে ভর্তি হওয়ার কথা যেন ওকে আরো বেশী জেদি করে তুল্লল। ধীরে ছেলেটা কখন যে আস্তে আস্তে একটা ডিপ্রেশন এ চলে গেছে তা কেউ টের পাইনি। জানালা দিয়ে সকালের নরম রোদ এসে পড়ছে অয়নের বিছানার বালিশে। আজ পড়া নেই। এতক্ষণ শুয়ে ছিল কিন্তু সারাক্ষণ শুধু ছটফট করেছে। এবার উঠে কেমিষ্ট্রি বইএর ভিতর থেকে এবছরের জয়েন্টর কোশ্চেন গুলো আবারো বের করে কত নম্বর পেতে পারে তার একটা এসেসমেন্ট চালালো মনে মনে। এটা প্রথমবার নয়, যবে থেকে জয়েন্ট শেষ হয়েছে তবে থেকে অনন্ত দিনে চার পাঁচ বার ও এই কাজ টা করে থাকে। মনে মনে নিজেই একটা প্রাসাদ বানাই আবার নিজে হাতেই তা ভেঙে ফেলে। হিসেব শেষে নিজ মনে বিড়বিড় করল তমাল দা এর থেকে কম এন্সার রাইট করে চান্স পেয়ে গেছে গত বার আর ও এর থেকে অনেক বেশী করেছে ও কি পাবে না। তমাল বলে ছেলেটি বয়েসে বড় হলেও ওর সাথে জয়েন্ট কোচিং এ পড়ত আগের বার চান্স পেয়েছে। ওদের বাড়ী অয়ণের দের বাড়ী থেকে বেশী দূরে নয়, মাঝে মাঝে যায় অয়ন ওদের বাড়ী তবে আড্ডা মারতে নয় নিজেত স্বার্থে, তমালের কাছে জয়েন্ট ক্র্যাক এর বিভিন্ন আঁট ঘাঁট জানতে। মানুষ এর চিন্তা এবং বড়ই বিচিত্র সে তার নিজের সৃষ্টি হয়েও তাতে তার লাগাম নেই। নিজের মনেই সে ছুটে বেড়াই। বেলা বাড়ার সংগে সংগে পাল্লা দিয়ে অয়ণের অস্থিরতা বেড়েছে। অয়নের বাবা মাও আজ আস্থির ওর আগামী ভবিষ্যৎ নিয়ে। অয়ণের বাবা আজ অফিসে যায় নি। এমনটা তিনি গত দু বছর যাবৎ করে আসছেন। সত্যি বলতে কি, পালিয়ে বাঁচেন। এই দিন টা অফিসে গেলেই সবাই ছেঁকে ধরবে, অয়নের জয়েন্টএর রেজাল্ট জানতে চেয়ে পীড়াপীড়ি করবে এবং শেষে যদি জানতে পারে যে অয়ণ চান্স পাইনি তাহলে যার ছেলে বা মেয়ে পেয়েছে সে প্রায় ঢাক্য নিনাদ করে জানাবে, কিছুটা জ্বালা ধরাতে। এসব থেকে বাঁচতে অয়নের বাবা এসব এড়িয়ে থাকাই শ্রেয় মনে করেছেন। দুপুর গড়িয়ে এল সেই মুহুর্ত টিভিতে রেজাল্ট এনাউন্স করে অঙ্কের বাড়া কমার হিসেব শুরু হল। তার কিছু ক্ষণ পরে আসতে লাগল তিন চার জন ছেলে মেয়ের মুখ মুখে পেল্লাই সাইজের রসগোল্লা ধরে পোজ দিতে দিতে। রসগোল্লা অবস্থা তখন ন যযৌ ন স্ততৌ এর মতো। এবার শুরু হবে ফর্মুলা পাঠ, মানে কি খেয়েছে, কি পড়েছে, কত জন টিচার ছিল,কত ক্ষন পড়েছে, খেলা করত কিনা আর তার সাথে একটু ইমোশনাল টাচ কার বাবা কত গরীব,মা ঠোঙা বানাই কিনা এই সব আর কি। এসব গতে বাঁধা ছবি আর দেখতে ভাল লাগে না মাধবী মানে অয়নের মায়ের। আজ সার্ভার জাম বলে বাড়ীর নেটে কাজ করছে না। অয়ন তাই রেজাল্ট জানতে পাড়ার মোড়ের সাইবার ক্যাফেতে গেছে। আসলে এটা একটা কুসংস্কার। অয়ন বিশ্বাস করে ও নিজে হাতে রেজাল্ট দেখলে যদি তা খারাপ হয় তাই তা এড়াতে এই সাইবার ক্যাফে। বেশ ভীড় আজ ক্যাফে। বেশীরভাগ কম বয়সী ছেলে অয়নের সমগোত্রীয়। সবাই রেজাল্ট জানতে এসেছে। আজকে অল ইন্ডিয়া এন্ট্রান্সের রেজাল্ট বেরোচ্ছে এক সাথে তাই এতো ভীড়। অয়ন অপেক্ষা করে, চাইলে আগেও লাইন পেয়ে জেত কিন্তু ইচ্ছে করেই সবার শেষে রেজাল্ট দেখতে চাই ও। আস্তে আস্তে ভীড় কমতে লাগল। কেউ কেউ একরাশ হাসি আর আনন্দ নিয়ে বাড়ী যাচ্ছে আর কেউ কেউ চোখের জলকে শাসন করতে পারছে না। যত এসব দেখে অয়ণের ভিতর জেন কি একটা আরো বেশী করে চেপে বসে যেতে থাকে। এবার অয়নের পালা, অয়ন কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের রোল নং এন্ট্রি করে সার্চে দিল। সার্চিং হচ্ছে। এই সময় অয়নের মনে হচ্ছে যেন কোথাও ছুটে পালিয়ে যায়, কোথাও যেখানে কেউ তাকে চেনে না, কেউ তাকে ভাল ছেলে বলে কাঁটার মুকুট পরিয়ে দেবেনা। অবশেষে রেজাল্ট এল। না এবারো হয়নি। এবার কি করবে নিজের এডমিট কার্ড টা পড়ে যায়। ওটার আর দরকারি বা কি। কোথায় যাবে এখন অয়ন, না বাড়ি ফিরতে পারবে না। আনমনে হাঁটতে থাকে। চলতে কখন রেলস্টেশন এর কাছে এসে পড়েছে খেয়াল নেই। ঘোর কাটল আগুয়ান সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসের আওয়াজে। কিন্তু ততক্ষনে সব শেষ। অয়ন এখন জড়পদার্থ। এখন আর চাপ নেই। জড় পর্দাথের চাপ থাকে না। কেউ যেন বেল বাজিয়েয় চলেছে, ওই বোধহয় অয়ণ এল মাধবী নিজ মনে আওড়াই। দরজা খুলে দেখে অন্য একটি বাইশ তেইশ বছরের ছেলে। মুখটা খুব চেনা চেনা। মাধবী কে দেখে ছেলেটি একরাশ হাসি মুখে বলে আমি মোড়ের সাইবার ক্যাফের মালিক আজ সকালে অয়ণ আমার দোকানে এসেছিল রেজাল্ট দেখতে, কিন্তু তখন ও ওর রোল নং ভুল দেওয়ায় ওর রেজাল্টও ভুল দেখিয়েছিল। ও আর এক বার চেক না করেই বেরিয়ে যায় এই এডমিট টা ফেলে। আমি অনেক ডাকি কিন্তু ও শুনতেই পেল না। পরে আমি একটু ফাঁকা হলে নাম্বারটা আবার দিয়ে দেখি কৌতূহল বসত দেখি অয়ন র‍্যাঙ্ক করেছে মেডিকেলে। তাই দোকান বন্ধ করে বাড়ী যাবার সময় ভাবলাম সুখবর টা আর এই এডমিট টা দিয়ে যায়। ভাল খবর মিষ্টি খাওয়াতে হবে কিন্তু। মাধবী এবার মুখে হাসি নিয়ে বল্লল নিশ্চয়, খাওয়াবো। এত ভাল খবর দিলে। অয়ন আসুক ও নিজে গিয়ে দিয়ে আসবে। ও এখনো বাড়ী ফেরেনি। ওদিকে পুলিশ সদ্য তালগোল পাকানো শরীরের কাছে এল ময়নাতদন্তে। নাম পরিচয় কিছুই নেই বুক পকেটে শুধু একটা সাদা কাগজ তাতে লেখা আছে "আই কুইট"।

===========================================================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.