একটি প্রেমের গল্প---

----------------- ।/।বাদেরায়পুর রোড ।\।-------------

নির্মাল্য কুমার মুখার্জি।

-ক-
এক হাতে বাজারের ব্যাগ। অন্য হাতে পলি প্যাকে দুধ। কপালের ঘাম চশমার ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে নামছে। অফিস দশটায়, ঘড়িতে এখন আটটা চল্লিশ। অথচ গলির মুখ আটকে ভ্যান দাঁড় করিয়ে বেকুবের মত লোকটা এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কি করে পাশ কাটাব কে জানে। আবার আমাকেই পছন্দ হল হতভাগার,
-বাবু, এই ঠিকানাটা কওন দিকে একটু বলে দেবেন?



ভ্যানের ওপর চাপান ডালপালা মেলা গ্রিলের স্তূপ। বিপজ্জনক ভাবে শাখা প্রশাখা বার মেলে আছে। গলির মুখের একপাশে পুরোন বাড়ী সশব্দে ভাঙ্গা হচ্ছে। আরেক পাশে সদ্য নির্মিত বহুতলের বিভিন্ন তল জুড়ে পাথর কাটার তীব্র আর্তনাদ। নির্মাণ এবং বিনির্মাণের যুগল বন্দি বাজছে এলাকা জুড়ে।
কিছুটা বিরক্তির সঙ্গে আধময়লা চিরকুটখানা টেনে নিলাম। লেখা- বিশাল জয়সয়াল। ৩/৪৭ বাদেরায়পুর রোড। কলি- ৩২।
-কউন দিকে হতে পারে বাবু? সুবে সে হয়রান হতে হতে থকে গেলাম একদম।
বুকের রক্ত যেন লাফ দিয়ে উঠল। বাদেরায়পুর রোড? ৩/৪৭? নম্বরটাও কি এক? ঠিক মনে পড়ে না আর। কতদিন হয়ে গেল !



যে ফ্ল্যাটে সদ্য ভাড়া নিয়ে উঠেছি তার নম্বর হল ২/৪৩/১২, বিজয় গড়, কলকাতা -৩২। বাদেরায়পুর ও কলি- ৩২। কিন্তু চোখে পড়েনি কোনদিন মনেও পড়েনি। আজ এই লোকটা কোথা থেকে উদয় হয়ে আমার মাথাটা খারাপ করে দিল দেখছি।
বেচারাকে দাঁড় করিয়ে না রেখে বললাম,
-দেখ ভাই, আমি এখানে নতুন এসেছি। ঠিক বলতে পারলাম না। ঐ চায়ের দোকানের ছেলেগুলো কে জিগ্যেস কর, বলে দেবে।
পিঠ ঝুঁকিয়ে ডালপালা মেলা গ্রিলের বোঝা টেনে নিয়ে এগিয়ে গেল লোকটা।
সাড়ে নটা নাগাদ নাকে মুখে গুঁজে হন্তদন্ত হয়ে রাস্তায় নামলাম। অলরেডি মিনিট সাতেক লেট। ডান হাতে ‘বিবেকানন্দ পাঠাগার’। উলটো দিকের গলিটা ধরলাম। একটু শর্টকাট হবেই বাস স্ট্যান্ড। কিন্তু ঝুঁকি হল চারচাকা ঢুকলেই জ্যাম হয়ে যায়।
মাঝামাঝি যেতেই বাঁ হাতের সরু গলিটার ভেতর থেকে গ্রিল সমেত ভ্যানওয়ালার পুনরাবির্ভাব। মুখ দিয়ে বার হয়ে এল,
-কি হল? পাওনি?
-না বাবু। রোড পেলাম মগর নম্বরটা পেলাম না ।
-ভাল করে দেখ পাবে। রাস্তা যখন পেয়েছ ...।।
-রাস্তাটার দিমাগ খারাব আছে। কিছুটা যাবার পর অচানক গায়েব হয়ে গেল। এক আদমি বলল , পার্কের ডান দিকে নাকি ঔর একটা বাদেরায়পুর রোড আছে। সেখানে এই নম্বর না মিললে ফির পানি ট্যাঙ্কির পশ্চিমে যেতে হবে। ওখানে দুসরা একঠো বাদেরায়পুর রোড মিলেগা। আজিব বাত। একহি রাস্তা কা সব মকান এক সাথ হি রহনা চাহিয়ে। রাম জানে ক্যা লিখখা হ্যায় আজ নসীব মে...
ওর থেকেও অসহায় মনে হল নিজেকে-কেন যে এত চেনা লাগছে নামটা ...।। কোথায় শুনেছি? অথচ মনে করতেই পারছিনা...।।



-খ-


রাতের খাওয়া শেষ হলে হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল। লাফ দিয়ে উঠে খাটের নিচ থেকে ট্রাংকটা টেনে বার করলাম। প্রায় বত্রিশ বছরের সঙ্গী এই ট্রাংক। কত জায়গায় ঘুরেছে আমার সঙ্গে। ভেতরে অসীম যত্নে সাজান আমার মার্কশিট, সার্টিফিকেট, অফিসের জরুরী সার্কুলার। আর......।
সবার নিচে একটা বিবর্ণ , ছেঁড়া ফাইল। পলি প্যাকের আবরণ ছাড়া তাকে বাঁচান অসম্ভব। তাই পরপর দু খানা
প্লাস্টিক প্যাকেট দিয়ে মুড়ে রেখেছি। দীর্ঘ পঁচিশ বছরের দাম্পত্য ও সন্তান বহুল জীবনের একমাত্র গোপন দলিল এই ফাইলখানা। দুনিয়ার নজর এড়িয়ে রাখা। স্মৃতি বিস্মৃতির মাঝামাঝি এখন এর অবস্থান।
ভেতর থেকে সাবধানে প্রথম চিঠিটা বার করলাম।



১৯।৯।৮০
বাদেরায়পুর রোড
কলকাতা -৩২।
রজতদা,
আমার হাফইয়ারলির নম্বরগুলো পাঠালাম। ম্যাথে-৭৪। কেমিস্ট্রি- ৮২। ফিজিক্সে- ৮৮। বাকিগুলো নিয়ে আপনার কাছে কোনদিন বসিনি। তাই আর জানালাম না। সব্বাই বলছে, এই উন্নতিতে আমার নাকি কোন কৃতিত্ব নেই। সবটুকু আপনার হাতযশ। প্রতিবাদ করলাম না , তাহলে আপনার সত্যিকারের কৃতিত্বটুকু খাটো হয়ে যায়। ইচ্ছে হলে উত্তর দেবেন।
বিশাখা।
সকালে ঘুম ভাঙতে দেরি হল। রক্তে চিনির পরিমাণ ঠিক রাখতে হলে হাঁটতে হবে। ডাক্তারের নির্দেশ অন্তত চার কিলোমিটার। ভোর পাঁচটা থেকে ছটা হল আদর্শ সময়। কিন্তু বিশাখা কাল আমাকে একটা বিনিদ্র রাত উপহার দিয়েছে। তাই সন্ধ্যে বেলা হাঁটতে বার হ্লাম।বাদেরায়পুর রোড আমাকে নিশির ডাক ডাকছে। তিনের সাতচল্লিশ হল তার কুহক চোখের মণি।
সেন্ট্রাল রোড ধরে একটু উত্তরদিকে গেলেই ডান হাতে একটা গলি। শেষ মাথায় একটা রিচার্জ-জেরক্স-ইন্টারনেট ক্যাফে। ভাবলাম আগে কিছু টপ আপ ভরেনি। তারপর অভিযান শুরু করব।
টপ-আপের ছেলেটি বেশ ধারাল ।



টাকা পয়সা মিটিয়ে প্রশ্ন করলাম,
-আচ্ছা ভাই, বাদেরায়পুর রোডটা কোন দিকে বলতে পারেন?
-কত নম্বর চাই আপনার?
-তিনের সাতচল্লিশ।
-ল্যান্ড মার্ক কিছু জানা আছে?
ধারাল মানুষটার ধার ক্ষীণতর।
-না মানে তেমন কিছু নেই। ঐ শুধু নম্বরটাই ভরসা।
-আপনি এক কাজ করুন। বাঁ দিকের রাস্তাটা ধরে এগিয়ে যান। সামনে একটা তেমাথা পাবেন। দেখবেন দোতলা একটা ক্লাব বাড়ি। যোগবানী সঙ্ঘ। সামনে ছোট মাঠ। উলটো দিকে শনি মন্দির। তার পাশ দিয়ে সোজা চলে গেছে বাদেরায়পুর রোড।
শনি মন্দিরের মুখেই ঝকঝকে গ্লো সাইন বোর্ড। জ্বলজ্বল করছে ‘লোকনাথ মেডিকেল, পাঁচের সতের , বাদেরায়পুর রোড, কলি- ৩২’।



এত কাছে, তবু বেচারা ভ্যানওয়ালা কে একটুও সাহায্য করতে পারিনি। সাহায্য তো বিশাখাকেও করতে পারিনি।
পাঁচের সতের থেকে তিনের সাতচল্লিশ কতদূর? দুটো আলাদা লেন। এখন এগচ্ছি পাঁচ নম্বর ধরে। পরপর চলছে নম্বরগুলো। লেটার বক্সে, গ্যারেজের পাল্লায়, রোলিং শাটারে, দেওয়ালে –আলকাতরা, রং , চকখড়ি , কলিচুনের পোঁচ, শিল্পীর তুলির টান—প্রায় সবরকম ভাবে, যে, যেভাবে পেরেছে, নম্বর লিখে রেখেছে। কিন্তু হায়-
‘সুহৃদ সঙ্ঘ’ পার হতেই ধন্দে পড়ে গেলাম। নম্বরের শৃংখলা উধাও। মায় রাস্তার নামটিও গায়েব। উধাও বাদেরায়পুর রোড। ক্লাবের ডান হাতের বাড়িটার দেওয়ালে প্লেট বসান-‘ আশুতোষ আঢ্য রোড’ । উল্টো দিকে বাপুজি নগরে ঢোকার মুখে গলিটার নাম ‘রাঘব কাঞ্জিলাল লেন’ । সোজা জলের ট্যাঙ্ক ছাড়িয়ে যে রাস্তা চার্চের দিকে চলে গেছে সেখানে একটা লাইট পোস্টের গায়ে সাইন বোর্ড। তাতে স্পষ্ট করে জানান হয়েছে -‘মিশন রোড’।আর আমার ঠিক পেছনে সারা গায়ে হ্যালজেনের আলো মেখে শুয়ে আছে বাদেরায়পুর রোড।
রাত গাঢ় হলে পরের চিঠিটা আবার বার করলাম।



১৩।১০।৮০
৩/৪৭ বাদেরায়পুর রোড
কলকাতা- ৩২
রজতদা,
আপনি লিখেছেন মাত্র মাসখানেকের তত্ত্বাবধানেই যার এতটা উন্নতি সেখানে শিক্ষকের কোন বিশেষ কৃতিত্ব নেই। ছাত্রীটি ছিল কেবল সঠিক পথ নির্দেশের অপেক্ষায়। একথা মানতে আমি কিন্তু মোটেও রাজি নই। মোমবাতি জ্বালতে দেশলাই লাগে। কিন্তু কেবল আগুন ছোঁয়ালেই দপ করে বাতিটা জ্বলে ওঠেনা। সামান্য সময় লাগে যতক্ষণ না সে নিজেকে গলিয়ে নিজের আলোটুকু খুঁজে পায়।
পরীক্ষার নম্বরই একমাত্র আলো নয়। জীবনের মোমবাতি তার শিখার দুপাশে দুটো হাতের আড়াল খোঁজে , ঝড়- ঝঞ্ঝা , উত্থান পতনের মাঝখান দিয়ে চলতে গিয়ে যাতে নিভে না যায়। আপনি আপনার হাত দুটো সরিয়ে নিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু শিখাটা এখনও তার নিজস্ব জ্বলন খুঁজে পায়নি। কলকাতায় এলে একবার দেখা হওয়া কি অসম্ভব?
বিশাখা


-গ-


রাম ঠাকুরের আশ্রমের কাছে এক কলিগ কাম বন্ধুর বাড়ি থেকে আড্ডা মেরে রওনা দেওয়ার সময় বলে দিল--
এদিকটা তো তুমি তেমন চেন না , কেবল ‘কেষ্টর মিঠা পান’ লেখা সাইনবোর্ড খেয়াল রেখ। অটো রুট থেকে ঐ দোকানের স্টপেজে নেমে পূব দিকে একটা গলি দিয়ে শর্ট কাট করলে তোমার নতুন বাসায় পৌছতে মিনিট দুই আড়াই বাঁচবে।
একটু আড়ষ্ট ছিলাম, কারন পথটা নতুন। ঠিকই আসছিলাম কিন্তু নারকেল বাগান কালীমন্দিরের কাছে এসে একটু গুলিয়ে গেল। ডান হাত না বাঁ হাত ? ধারে কাছে কেউ নেই যে একটু জিগ্যেস করে নেব। ঝুঁকি নিয়েই বাঁ হাতে ঘুরলাম। একটা রেলিং ঘেরা মাঠ পার হতেই পাথর কাটার পরিচিত শব্দ কানে এল।
ঐত’ সেই নতুন ফ্ল্যাট বাড়ি। আলো জ্বলছে দু একটা ফ্লোরে। কর্কশ শব্দ হচ্ছে সমানে। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই বুঝলাম এ অন্য ফ্ল্যাট। উলটোদিকের মনিহারি দোকানটার সাইনবোর্ড অনুযায়ী এই রাস্তার নাম ‘ইব্রাহিমপুর রোড’।



সামনের মোড়ে রুটীর দোকান। হাত রুটি আর রুমালি। চারটে রুটির অর্ডার দিয়ে বললাম,
-ভাই, বিবেকানন্দ পাঠাগার কোন দিকে?
রুটি ভাঁজ করে হাতে ধরিয়ে বলল,
-আমাদের দোকানের পাশ দিয়ে গলি বরাবর এগিয়ে যান। দেখবেন আড়াআড়ি একটা রাস্তা পড়বে। ওখান থেকে ডান হাত নেবেন। তারপর দেখবেন একটা ফুচকার দোকান। ওইখানে কাউকে আবার জিগ্যেস করে নেবেন।
মোড় ঘুরতেই ফুচকাওয়ালাকে আর হদিস করতে পারলাম না । অথচ ডান দিকে ঠিকই ঘুরেছি। যা থাকে কপালে বলে এগোতেই দেখি সামনে একটা নতুন আলো ঝলমল ফ্ল্যাট। চারতলা। একতলা পুরো গ্যারেজ। গেটের মাথায় আলাদা ভাবে বোর্ড লাগান- ‘ইন্দ্রলোক। ৩/১৩ , বাদেরায়পুর রোড। কলকাতা- ৩২’।
এতদিন বাদে তিন নম্বর বাদেরায়পুর রোড এল! কোথায় যে লুকিয়ে ছিল কে জানে। তের থেকে সাতচল্লিশ কতদূরই বা হবে আর? আজ ঠিক ধরে ফেলব। তবে অনেকটা গভীরে যেতে হতে পারে আমাকে। সাবধানে, চারিদিকে নজর রেখে।



তিনের তের থেকে তিনের আঠাশ অবধি বেশ এলাম।ধন্দে পড়ে গেলাম তারপর। রাস্তাটা ডান হাতে বাঁক নিয়ে ঢালু হয়ে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে একটা পুকুরের দিকে। লম্বাটে ধরনের বেশ বড় জলাশয় ।পুকুর না বলে ঝিল বলাই ভাল। সদ্য কিছু জমকাল আলোক স্তম্ভ লাগান সত্ত্বেও রেলিং ঘেঁসে ঝাউ আর দেবদারু গাছের নিচে অন্ধকার ঘাপটি মেরে আছে।
বেঞ্চিগুলোয় নিবিড় যুগল। ঝিলের উলটো দিকে টানা লম্বা উঁচু পাঁচিল। আলোহীন, নম্বরহীন। একটা প্রহেলিকার মত মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। পাঁচিল ঘেঁসে ভুতগ্রস্থের মত এগিয়ে চললাম। গোটা একপাক মারবার পর হতাশ হয়ে জলের দিকে তাকালাম। স্তম্ভের মাথা থেকে আলোগুলো টুকরো টুকরো হয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে পৈশাচিক উল্লাসে নৃত্য করছে। বুঝলাম- পেয়েও হারালাম ৩/৪৭ , বাদেরায়পুর রোড।
যে চিঠিতে আমি বিশাখাকে হারাচ্ছি , রাত গভীর হলে সেই চিঠিটা আবার খুললাম।



১৭।১২।৮০
৩/৪৭,বাদেরায়পুর রোড।
কলকাতা -৩২
রজতদা,
জীবনে আমি যে জিনিসটাকে সবচেয়ে ঘৃণা করি তা হল অজুহাত। হতেই পারে আমার বাবা অল আসাম টি- বোর্ডের চিফ মেডিক্যাল কন্সাল্ট্যান্ট। বাইশটা বাগানের হেলথ এ্যান্ড হাইজিনের দায়িত্বে। কখন দেশে থাকে কখন বিদেশে , আমিও জানতে পারিনা। মা চলে যাবার পর কৃষ্ণ নগরের মাসিই আমার জীবনের সব।রঞ্জনা কেবল আমার মাসতুতো বোনই নয়, আমার সবচেয়ে বড় বন্ধুও।
আমার জন্যেই মাসি কৃষ্ণনগর ছেড়ে , রঞ্জনাকে ছেড়ে কলকাতায় এসে পড়ে থাকত নিজের সংসারকে বঞ্চিত করে। কাজের মাসির কাছে সেই রকম যত্ন পাওয়া যায় না যতটা নিজের মাসির কাছে পেতাম।
পুজোয় আর গরমের ছুটিতে আপানর কাছে সায়েন্স সাবজেক্ট নিয়ে বসবার কথাটাও মাসি আর রঞ্জনা আমাকে জানায়। ওদের সবার যে আপানাকে ভীষণ পছন্দ সে কথা আমাদের জানাতে মাসি দেরি বা দ্বিধা কোনটাই করেনি।


মায়ের ফেলে যাওয়া এই একমাত্র স্মৃতির ভার একা বহন করবার ক্ষমতা বাবাও হারিয়ে ফেলছিলেন ক্রমশ। তাই চাইছিলেন বাগানেই আমাকে রেখে একটি শিক্ষিত রুচিবান ছেলের হাতে দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে। কেবল মেশোমশাই একবার বলেছিলেন-
-ওরা ব্রাহ্মন। রাজি নাও হতে পারে।
আপনি কিন্তু বলটা সেই দিক দিয়ে খেললেন না। রঞ্জনাকে জানিয়ে দিলেন, আপনি একমাত্র সন্তান। আপনার পক্ষে বাবা-মা ছেড়ে বাগানের ডেপুটি ম্যানেজার হয়ে অতদূর চলে যাওয়া অসম্ভব। এই অবধি ঠিকই ছিল। কিন্তু রঞ্জনার কাছে শুনলাম আপনি সাব-রেজিস্ট্রারের চাকরি নিয়ে কোচবিহার জয়েন করেছেন। আচ্ছা , কোচবিহার থেকে ডুমডুমা চা বাগান কি অনেকটাই দূর?


সাব-রেজিস্ট্রারের বদলে নর্থ ইস্টের সবচেয়ে বড় বাগানের ডেপুটি- ম্যানেজারের চাকরিটা নিলে খুব বেশী লোকসান আপনার হত বলে আমার মনে হয়না । জানেন, মাঝে মাঝে মনে হ্য়—আমি কি ভুল করলাম? আমি যে আপনার চোখের আলোয় আমাকে দেখেছিলাম—
বাবা মা কে আরও ভাল করে দেখাশুনো করতে পারবেন এই প্রার্থনা জানাই। বিশাখা।



-ঘ-


আজ পুকুর পাড়ের উল্টো দিক থেকে শুরু করলাম।পরিষ্কার দিনের আলো। চারিদিক ঝলমল করছে। সকালের রোদ হাতির পালের মত পুকুর দাপিয়ে চান করছে।
এক কোনে একটা চায়ের দোকান। দোকানি বুড়ো মানুষ। ধীরে সুস্থে উনুন ধরাচ্ছে।
বেঞ্চিতে বসে বললাম,
-চা হবে?
-হবে। তবে ওয়েট কত্তি হবে আম্নারে।
-করছি।
বেঞ্চিতে বসতেই আজ ভোরবেলা পড়া চিঠিটার লাইনগুলো মাথার ভেতর চলতে শুরু করল।



১৮।৯।৮১
৩/৪৭,বাদেরায়পুর রোড।
কলকাতা -৩২
রজতদা,
ভেবেছিলাম আর আপনাকে বিরক্ত করব না । কিন্তু কেন যে করছি কে জানে।
তারপর একটু কাটাকুটি্র পর---
জানেন , হঠাত বাবা চলে গেলেন। ল্যাটিচিউড লংগিচিউড বলতে পারব না ।তবে এটুকু জানতে পেরেছি –সমস্ত স্মৃতির অবশেষ এই বাদেরায়পুর রোডে ফেলে রেখে ইটালির কাছাকাছি কোথাও সমুদ্রের গভীরে ডুবে যাওয়া একটা প্লেনের ভেতর ঘুমিয়ে পড়েছে লোকটা।
রঞ্জনার কাছে যে টুকু খবর পেয়েছি তাতে আপানর এখন মধুচন্দ্রিমায় ব্যস্ত থাকার কথা। অযথা বিরক্ত করবার জন্য দুঃখিত। একটাই অনুরোধ, ভুলে যাবেন।
বিশাখা



-বাবু চা।
চমকে উঠে গ্লাস হাতে নিয়ে বললাম,
-আচ্ছা , আপনার এই দোকান কতদিনের?
-তা—আ—ধরেন সেই বাঙলা দেশ যুদ্ধের পরপরই।
-থাকেন কোথায়?
- দোকানেই থাকি।
-বাড়ি?
-ক্যানিং।
বুঝলাম , এই লোকটার কাছে আছে আসল হদিশ -
-আচ্ছা, পুকুরের ঐ পাড়ে যে বাদেরায়পুর রোড, সেটা এই পাড়ে এসে আর পেলাম না কেন? শেষ হল কোথায়?
-আম্নি কারে খোঁজেন? কত লম্বর?
-তিনের সাত চল্লিশ। এক দিদিমণি থাকত। মিষ্টি দেখতে। কোঁকড়া চুল। একটু বেশী লম্বা। ওরা এখানকার লোক নয়। বাবা আসামের লোক। মেয়ে এখানে থেকে পড়াশুনা করত।
-চা বাগানের ডাক্তার বাবুর মেয়েরে খোঁজেন?



হাতের চা গেলাস টপকে পাঞ্জাবির ওপর চলকে পড়ল।
-চেনতেন নাকি ওনাদের?
-হ্যাঁ—মানে—না –মানে—ঠিক...।
-আত্মীয় হন নাকি? ঐ মাসি আর তার মেয়ে ছাড়া আর তেমন কাউকে আসতে দেকিনি কখনও । তা এদ্দিন বাদে খোঁজ কত্তিচেন যে? অতবড় দুঃসময়ে কোথায় ছেলেন?
- দুঃসময়? মানে আমি একটু বাইরে ছিলাম তখন...। বিদেশে।



হাত তুলে পুকুর পাড়ের উত্তরের লম্বা পাঁচিল ঘেরা জায়গাটা দেখাল সে। কাল রাতে ঠিক সেখান থেকে উধাও হয়েছিল বাদেরায়পুর রোড।
বেশ উঁচু পাঁচিল। ভেতরে নজর চলে না। কেবল ঝাঁকরা কিছু ডালপালা পাঁচিল টপকে উঁকি মারছে।
-অইটে হল ডাক্তার বাবুর বাগান বাড়ি। বিশাল এরিয়া। বিগে খানেকের ওপর বাগান-পুকুর- বাংলো। ঐ এক মেয়ে আর এক কাজের নোক , আর কেউ থাক্তনি ঐ অত্ত বড় বাড়িডায়। মাঝে মদ্যে এক মাসি আর তার মেয়ে আসি থাকত।
চা ঠাণ্ডা হচ্ছে আর আমার সমস্ত প্রান গলার কাছে উঠে এসে দপদপ করছে। মনে হচ্ছে এক লাফে পাঁচিল টপকে ঢুকে যাই।
-ডাক্তার বাবুও বেশ কয়েকবার আমার দোকানে আসিয়া চা খায়া গেচেন। বড় নিরংকারি মানুষ ছেলেন। আমার মেয়েডার পিলে বারিছিল। বিনি পয়সায় ওসুদ দেচেন কতদিন।


- এখন কে থাকে ঐ বাড়িটায় ?
গলার কাঁপন কোন রকমে চেপে রেখেছি আমি।
-ঐ জমি, বাড়ি, বাগান, সবকিচুর মালিক এখন হল গে বিশাল জয়সোয়াল। ব্যাটা নামেও বিশাল , কামেও বিশাল।
-জয়সোয়াল কি ঐ সম্পত্তি কিনে নিয়েছে?
-কিনে? গেরাস করি নেল বলেন। বাগান-জংগল-বাদা-ভেড়ি-চা-পাট-তামাক , এক ধরনের লোক থাকে না , সব খায় আর হজম করি ফ্যালে? জয়সোয়াল হল তাই। এখন খাচ্চে জমি। পোমোটারি ধরে পেট ফুইলে ফেলাচ্চে। হার মানলে কেবল দিদিমণির কাচে।
- হার?


- তাছাড়া আর কিইবা কই। চা বাগানের শেয়ার কেনা দিয়ে শুরু হল ডাক্তার বাবুর সঙ্গে পিরীত। আর তেনার মিত্যুর পরদিন থেকেই দাঁত নখ বার করি ফেলালে। সব দখল করি নেলে, কেবল কায়েম কত্তি পাল্লেনা দিদিমণির ওপর। সিঁথেয় সিঁদুর নেপে দিলিই কি মন পাওয়া যায়?
- সিঁদুর?
- যদিও বিয়েডা হয়েছেল নাম মাত্তর। সম্পত্তি গেরাস করবার জন্যি কত আলো কত শানাই বাজাল। কিন্তু দিদিমণি সাড়া দেলে না । ঝড়ের আগে গুমোটের মত থম মেরে রইলে।
মাজে মাজে ভোরবেলা আমার দোকানের পেছন্ডায় আসি শিউলি গাছের তলা থেকি ফুল কুরুত। তারপর আঁজলা করি ছেটায়ে দেত পুকুরে।
-এখন গেলে দেখা পাব ওনাদের ?
লম্বা শ্বাস ফেলে বুকের খাঁচা একদম খালি করে নিল লোকটা। তারপর বলল,
-সে চান্স আর নেইকো।
-কেন? চলে গেছেন নাকি কোথাও?
-না গো না-- বিয়ের পরের বছর দশমীর ভোর থেকি পাওয়া গেল না দিদিমণিরে। খোঁজ খোঁজ ,কোথাও নেইকো। শেষে দেখা গেল জলে ভাসছে শিউলি ফুল কডা । তখন থানা পুলিশ ডেকে পুকুরে জাল ফেলাল জয়সোয়াল।
বেলা গড়ালে পাওয়া গেল । লোকজন ধরাধরি করে...।।
বলতে বলতে গলা ধরে এল লোকটার---



একটু সামলে নিয়ে বলল,
-যেন ভাসান দেওয়া দূগগা পিতিমে ফের তোলা হল জল থেকি। একদম ঘুমায়ে ছেল জলের ভেতরে।
ধুতির কোন দিয়ে চোখ মুছল লোকটা, বলতেই থাকল।
-বাড়ি তোলপাড় করি ফেললে পুলিশ। যদি একখান চিরকুট পাওয়া যায় তাইলে বাঁচান যায় জয়সোয়াল কে। কিন্তু কিসসু পাওয়া গেল নাকো।
লাস্টে জয়সোয়াল অনেক অনেক ট্যাকা দিয়ে পুলিসের মুক বন্দ করি দেল।
আর পারালাম না । উঠে পড়লাম।



সত্যিই তো। শেষ চিঠিটাকে চিঠি বলা যাবে না কিছুতেই। একটা চিরকুট বলা যায় বড় জোর।
-রজতদা, মাটির ওপরে এত বাতাস , তবু মাঝে মাঝেই দম আটকে আসে আমার । আর জলের অত নিচে চারিদিক একদম বন্ধ,একখানা উড়োজাহাজের ভেতর ছটফটিয়ে মরবার সময় কেমন লেগেছিল বাবার বড় জানতে ইচ্ছে করে,,,,


চিঠিটায় নাম তারিখ কিছুই ছিল না । ছিলনা বাদেরায়পুরের ঠিকানাটাও।
-------
সমাপ্ত।


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.