(১)


একটু একটু করে চেতনা ফিরে পাচ্ছিল রাতুল। সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা নিয়ে উঠে বসতে চেষ্টা করে সে। আস্তে আস্তে অন্ধকারে চোখ সয়ে যায়। একটা নরম শরীরে পা লাগে। সরে আসে সে। চারদিকে অসংখ্য প্যাকিং বাক্স। ওধারে দরজার পাশ দিয়ে চুইয়ে একটা আলোর রেখা ঢুকছে। ভাল করে চোখ রগরে উঠে বসে রাতুল। বুঝতে চেষ্টা করে সে কোথায়। একটা চলমান যানের ভেতর এটুকু বুঝতে পারে কিন্তু এ কেমন যান বুঝে উঠতে পারে না। হঠাৎ ঘরটা দুলে ওঠে। ভূমিকম্প হচ্ছে মনে করে কিছু একটা ধরে শরীরের ভার সাম্য রাখতে যায় সে। দুলে দুলে চলছে জিনিসটা। ঘরের মধ্যে এবার আরো তিনটে বাচ্চা ছেলে আর দুটো একটু বড় ছেলেকে দেখতে পেল। বাচ্চা তিনটে নেতিয়ে পরে রয়েছে এক কোনে।

অন্য ছেলে দুটো ভয়ার্ত চোখে ওর দিকে তাকাচ্ছিল। ও জিজ্ঞেস করলো -"এটা কোথায় ? আমি কোথায় যাচ্ছি?"

কিন্তু ছেলে গুলো উত্তর না দিয়ে ওকে দেখতে থাকে। শরীরের যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে উঠে দাঁড়ায় রাতুল। আলোর উৎসর দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজার পাশের ফুটোয় চোখ রাখে । তেমন কিছুই দেখতে পায় না এক খন্ড নীল আকাশ ছাড়া।

এদিকে কয়েকটা প‍্যাকিংবাক্সের পিছনে একটা গোল জানালা মত বন্ধ করা, ওটার দিকে এগিয়ে যায় সে। এদিকে আরো দুটো ছেলেকে দেখতে পায়, অজ্ঞান অথবা ঘুমন্ত মনে হল‌ো। জানালাটা খুলতেই চোখে পরল নীল জলরাশি। কাচের জানালার গায়ে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের নীল জল।

এর আগে কখনো সমুদ্র দেখে নি রাতুল। সিনেমা বা টিভিতে যতটুকু দেখেছে সেই বুদ্ধিতে বুঝতে পারল ও একটা বড় নৌকা বা

জাহাজের পেটের ভেতর রয়েছে।জাহাজ টা দুলে দুলে চলছে।

মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবতে বসে রাতুল ঠিক কি হয়েছিল!! .....জঙ্গলের ধারে ভাইকে খুঁজতে গেছিল রাতুল। একটা খয়েরী রং এর বোলেরো দাঁড়িয়ে ছিল জঙ্গলের ভিতর। রাতুলকে ডেকে ওরা জিজ্ঞেস করছিল কিছু। তারপর আর মনে পরছে না। মাথাটা ভার লাগছে।

চোদ্দ বছরের রাতুলের বুদ্ধি ওর বয়সী আর পাঁচটা বাচ্চার থেকে বেশি। কারণ ওর মা নেই। বাবাও বাইরে বাইরে থাকে। ছোট একটা ভাই আছে রাতুলের, মিতুল। দশ বছর বয়স। রাতুল এই চোদ্দ বছরেই ওর মা হয়ে উঠেছিল। ভাইয়ের জন্য ওকে অনেক কাজ করতে হতো। দুভাই একসাথে স্কুলে যেত। রাতুল নাইন আর মিতুল ফাইভে পড়তো দয়ানাথ আদর্শ বিদ্যালয়ে।

এই মুহূর্তে রাতুল বুঝতে পারছিল ওকে কোথাও পাচার করা হচ্ছে। সমুদ্র দেখে এটাও বুঝতে পারে অনেক দূরে কোথাও, হয়তো অন্য কোনও দেশে। চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পরে। রাতুল চোখ মুছে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে নেয় ওকে পালাতে হবে। একবার মিতুলের মুখটা মনে পড়ে। মনে মনে ভাবে মিতুল তাকে খুঁজে না পেয়ে কি করবে? বাবাও বাইরে গেছিল কয়েক দিনের জন্য। সে কতদিন এখানে আছে তাও বুঝতে পারে না।

দরজাটা খুলে দুটো লোক ঢুকেছিল। একজন পুরো নিগ্ৰোদের মত। অন্য জন ফর্সা, টিকালো নাক, কিন্তু চোখ দুটো ভয়ংকর। আর একটা কান নেই। নাকের পাশটাতেও কাটা একটা দাগ, যা মুখটাকে আরো সাংঘাতিক করে তুলেছে। ওরা দরজা খুলে ঢুকতেই এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস আর এক রাশ আলো এসে ঢুকল। রাতুল কি করবে বুঝতে না পেরে প্যাকিং বাক্সের আড়ালে সরে গেছিল। লোক গুলো একটা গামলা আর দুটো বড় জলের বোতল নামিয়ে দিয়ে ভাঙা ভাঙা হিন্দি আর ইংরাজিতে বড় ছেলে দুটোকে বলল খাবার থাকল, সবাই যেন খেয়ে নেয়। এদিক ওদিক তাকিয়ে রাতুল কে দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করল ওদের ওর কথা। রাতুল নিজেই বেড়িয়ে এলো, ওর পেটে অসহ্য চাপ আসছিল। তক্ষুনি টয়লেটে যাওয়া দরকার। ও বেড়িয়ে এসে হিন্দিতে বলল যে ওর টয়লেট পেয়েছে। লোক দুটো নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে কি যেন বলল, রাতুল বুঝতে পারলো না। ইশারায় ওদের অনুসরণ করতে বলায় ওদের পিছন পিছন এগিয়ে গেল। ঘরের বাইরে একটা সিঁড়ি দিয়ে ওরা উপরে উঠে এলো। পাশে একটা টয়লেট ওকে দেখিয়ে দিল। টয়লেট থেকে বেড়িয়ে রাতুল দেখল জাহাজটা খুব বেশি বড় না। ও পাশে চওড়া ডেক। তারপর বিশাল নীল জলরাশি। এক ঝাঁক নাম না জানা পাখি উড়ে যাচ্ছিল মাথার উপর দিয়ে।

ওরা জোর করে ওকে আবার নিচে পাঠিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। ঘরের ছেলে দুটো ঐ গামলা থেকে রুটি তুলে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল।রাতুলের ও খিদে পেয়েছিল। গামলায় শুধু শুকনো রুটি পরে রয়েছে। ও খিদার মুখে একটা তুলে নিলো। খেতে খারাপ না। মিষ্টি মিষ্টি। তবে বড্ড শক্ত। দুটো রুটিতেই চোয়াল ব্যথা হয়ে গেছিল ওর। কয়েক ঢোক জল খেয়ে ও ছেলেগুলোর পাশে গিয়ে বসল। বাকি তিনটে তখনো ঘুমাচ্ছে অথবা জ্ঞান ফেরে নি।

অন্য ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে ও বলল -" আমি রাতুল। বাড়ি নর্থ বেঙ্গল। " হিন্দিতেও বলল। এবার একটা ছেলে বলল -" আমি আকাশ, আর ও হরি। বাড়ি মালদায়। আমাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আরবে। "

রাতুল আগেই বুঝতে পেরেছিল এমন কিছু হয়েছে। এমন সময় আড়মোড়া ভেঙ্গে আরেকটা বাচ্চা উঠে বসল। বারো তেরো বছর বয়স হবে। ভাল বাড়ির বোঝা যায় দেখলে। রাতুল জানালাটা খুলে দেওয়ায় আলো আসছিল কিছুটা। রাতুলের মিতুলের কথা মনে পরে গেছিল। গিয়ে বাচ্চাটার পাশে বসে ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলো সে। বাচ্চাটা বিহারের। কিষাণগঞ্জ থেকে ওকে ধরে এনেছে বলল। একে একে অন্যদের ও জ্ঞান ফিরল। এই ঘরে ওরা মোট আটজন ছিল। তিনজন বাংলাদেশের, আরেকজন নেপালের। রাতুল সবাইকে বোঝাল এই জাহাজ থেকে পালানো যাবে না। চারদিকে জল। জাহাজ কোথাও নোঙর করলে চেষ্টা করতে হবে। হরি বলল-" এরা সাংঘাতিক। এসব ভেবো না তুমি। আমরা দেশের বাইরে চলে এসেছি। টাকা পয়সা নেই। কোথায় যাব পালিয়ে ??"

বাচ্চাদের মধ্যে যে সবচেয়ে ছোটো তার নাম রিও। ভাঙ্গা হিন্দিতে জানাল সে রাতুলের সঙ্গে আছে।

রাতে আবার এক গামলা রুটি দিয়ে গেছিল লোক গুলো। এর মধ্যে সমুদ্রের একঘেয়ে দুলুনিতে সবার শরীর খারাপ করেছে। রিওর শুধু বমি হচ্ছিল। ঘরটায় গরম। হাওয়া নেই। চাপা দুর্গন্ধে সবার অস্বস্তি হচ্ছিল।

পরদিন সকালে রাতুল দরজা ধাক্কাতে থাকে। এবার একটা অন্য লোক আসে। লোকটা পরিষ্কার বাংলায় জানতে চায় কি হয়েছে? রাতুল ওকে বলে -" এখানে এভাবে থেকে সবাই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের উপরে হাওয়া আসে এমন একটা জায়গায় থাকতে দাও।"

-" ওপরে তোদের রাখা যাবে না। ঘর নেই। "

-" এখানে সবাই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। মরেও যেতে পারে এই দম বন্ধ করা পরিবেশে। আমাদের বাইরে থাকতে দাও। জলের ভেতর কেউ তো পালাতে পারবে না।"

লোকটা দরজা বন্ধ করে ফিরে যায়। কিছুক্ষণ পরে আগের লোক দুটো আসে। রাতুল আবার বলে যে তাদের বাইরে নিয়ে যেতে। অনেকেই টয়লেটে যেতে চাইছে। সবার শরীর খারাপ লাগছে। এবার লোক গুলো বলল ওদের ওপরে নিয়ে যাবে কিন্তু পালাতে গেলেই জলে ডুবে মৃত্যু হবে।

ওপরে বাথরুমের পাশের একটা ছোট ঘরে রাখা হল। আর তখনি রাতুল দেখল পাশের ঘরে বেশ কয়েকটি মেয়েকে রাখা হয়েছে। মেয়ে গুলো ভয়ার্ত চোখে ওদের দেখছিল।

সেদিন বিকেলে বাংলা জানা লোকটা এসে ওদের বলেছিল সবাইকে কিছু কিছু কাজের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ঠিকমত কাজ করলে ভাল খেতে পড়তে পাবে সবাই। আরো ছয় সাত দিন সবাইকে এভাবে সমুদ্রে থাকতে হবে। তবে বসে না থেকে ওরা যদি সবাই কিছু কিছু কাজ করে সময় কেটে যাবে। রাতুল ভাবছিল এটাই ভাল সুযোগ, ওদের সম্পর্কে আরো কিছু জানা যাবে। ও এককথায় রাজি হয়ে গেছিল।

পরদিন থেকে রাতুলকে মেশিন ঘরে কিছু কাজ দিয়েছিল লোকটা। এখন রাতুল ওর নাম জানে, সবাই ওকে রাভি বলে ডাকছিল। ঐ নিগ্ৰোটার নাম জন। আর নাক কান কাটার নাম উমর। এ ছাড়াও আরো চার পাঁচ জন আছে। আকাশ আর হরিকে সাফাইয়ের কাজ দিয়েছে। রিও আর বাকিরা রান্নাঘরের কাজে লেগেছিল। রাতুল দেখেছিল জাহাজটা ছোটো হলেও দুটো লাইফ বোট ছিল। কিন্তু নৌকা সে কখনো চালায় নি আর সমুদ্রের বুকে ঐ লাইফ বোটের ভরসায় ঝাঁপিয়ে পরা আর আত্মহত‍্যার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই।

মেশিন ঘরের এক ঘেয়ে আওয়াজে মাঝে মাঝে মাথা ধরে যেত। ও ডেকের উপর এসে দাঁড়াত। মেয়েদের ঘরটা বন্ধ থাকত সব সময়। এক মাত্র খাবার দিতে দুবার খোলা হত। অবশ্য গরাদ দেওয়া জানালা দিয়ে দেখা যেত মেয়েগুলো নেতিয়ে পরে রয়েছে। ওদের ঘরের সামনে একটা মহিলা পাহারায় থাকতো সব সময়। রাতুল সবার বিশ্বাস অর্জন করে নিয়েছিল ধীরে ধীরে। রাভি বলেছিল তাকেও ছোটবেলা এভাবে তুলে এনেছিল বাংলাদেশ থেকে। আরব দেশ গুলোতে কাজের জন্য প্রতিবছর প্রচুর প্রচুর ছেলের দরকার হয়। এভাবেই ভারত নেপাল বাংলাদেশ থেকে প্রচুর ছেলে মেয়ে ওদেশে পাচার করা হয়। শেখদের খিদমতে মেয়েও লাগে প্রচুর। ওদেশে মেয়েদের চাহিদা ভীষণ।

পরদিন একটা ভূখণ্ড দেখতে পেয়েছিল রাতুল। ওদের জাহাজটা দাঁড়িয়ে ছিল মাঝ সমুদ্রে। দূরের সবুজ ভূখণ্ডটা নাকি ওমান। একটা বড় নৌকা এসে লেগেছিল ওদের জাহাজের গায়ে। অনেক গুলো মেয়েকে আর চারটা ছেলে কে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রিও আকাশ হরি আর রাতুল থেকে গেছিল জাহাজেই। স্যাটেলাইট ফোনে লোকগুলো অন্য ভাষায় কিছু আলোচনা করছিল। এ ভাষাটা রাতুলের জানা নেই। ও মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল শুধু।

বিকেলে আবার যাত্রা শুরু হল। তিনটে মেয়ে আর ওরা চারজন এখন জাহাজে থেকে গেছে।উমর বলেছিল আরো তিনদিন লাগবে যেখানে ওরা যাচ্ছে সেখানে পৌঁছাতে। রাতে রাতুল ডেকে বসে আকাশ দেখছিল। পরিষ্কার আকাশে প্রচুর তারা দেখতে দেখতে ওর বারবার বাড়ির কথা বাবার কথা ভাইয়ের কথা মনে পরছিল। ওরা এতদিন ওকে খুঁজে না পেয়ে কি করছে কে জানে। কয়েক বছর আগে ওদের পাড়ার সৃজন বলে একটা ছেলেও হারিয়ে গেছিল। লিপি আর পিউ বলে দুটো মেয়েও হারিয়ে গেছিল কয়েক মাস আগে। সবাই ভেবেছিল উঠতি বয়সের মেয়ে বোধহয় পালিয়ে গেছে কারো সাথে।কিন্তু আর খোঁজ পাওয়া যায় নি। আজ হয়তো ওকে নিয়েও লোকে গল্প বানাচ্ছে। বাবা আর ভাই কি ভাবতে পারবে ও এত দূরে জাহাজে চরে চলেছে আরব মুলুকে।

ওদের স্কুল থেকে একবার শিশু দিবসে একটা সিনেমা দেখিয়েছিল সব বাচ্চাদের, "লাইফ অফ পাই" । ওর আজ নিজেকে সেই সিনেমার ছেলেটার মত মনে হয়। চারদিকে জলের মাঝে সে ভেসে চলেছে কোথায় কে জানে।


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.