মা-এর বারণ টা শুনলেই মনে হয় ভালো হতো, ঠিক এমনটাই মনে হল নিধির। ক্লাস নাইন এ পড়ে সে, আজ তার বাংলা টিউশন ছিল নবীন স্যার এর বাড়ি, এতো ভালোভাবে পড়ান উনি যে ওনার ক্লাস টা মিস করতে ইচ্ছে করে না নিধির। শুধু নিধি নয় বাকী ছাত্র ছাত্রীদেরও ক্ষেত্রেও তাই।

শীতের দিনে এমন বৃষ্টি মেঘলা আকাশ, তায় আবার লোডশেডিং , এদিকে আবার নিধির বাবাও নেই বাড়িতে, ভাইকে নিয়ে বাবা ডাক্তার দেখাতে গেছে কলকাতা। মা এর ও তো শরীর টা ঠিক নেই, ঠিক থাকবেই বা কি করে, এমনিতেই সংসারের চাপ, ভাইটার চিকিৎসা... আর এরকম ওয়েদার শরীর, মনকে আরও খারাপ করে তুলছে। মা আজ নিজেই বারণ করেছিল, টিউশন-এ না আসার জন্য। এমনিতে খুব প্রবলেম না হলে যখন তখন টিউশন অফ করে দেওয়া... ব্যপারটাকে মা একেবারেই পছন্দ করে না, রীতিমতো জোর করেই আজ নিধি পড়তে এসেছিল। আজ অভিটাও পড়তে এলো না। অন্য দিনের চেয়ে আজ কম জন এসেছে পড়তে। বাবা থাকলে তাও বাইক-এ যাওয়া যেতো, আর অভি থাকলে তো ওর সাথে বাসেই যেতাম... ভাবল নিধি। সন্ধ্যে ৬ টা থেকে ৮ পর্যন্ত পড়ান স্যার। স্যারের বাড়ি থেকে বেড়িয়ে বাস স্ট্যান্ড-এ আসতে আসতে রাত ৮.২০ হয়ে গেলো। কিন্তু বাসের দেখা নেই, বাস স্ট্যান্ড-এ গুটি কয় লোক, নিধির কেমন ভয় ভয় করতে লাগলো, হঠাৎ মনে হল যদি কোন বাস-ই না আসে তবে কি হবে! শীতে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, তার উপর কেমন এক ঝোড়ো হাওয়া, সোয়েটার এ যেন শীত মানছে না, ব্যাগ থেকে চাদরটা বের করে ভালো করে জড়িয়ে নেয় গায়ে, তারপর ফোন করে মাকে কিন্তু নেটওয়ার্ক-ই তো নেই, মা তো চিন্তা করবেই আর বাড়ি পৌঁছালে যে কি পরিমান বকা খেতে পারে নিধি সেটাও নিধির কাছে আর একটা ভাবনার বিষয়। তবে আপাতত একটা বাস এলেই হয়, তিনটে স্টপেজ পরেই তো তাদের বাড়ি, বাস পেয়ে গেলে বাড়ি পৌঁছাতে আর কতক্ষণ। হঠাৎ নিধি চমকে উঠলো একটা চিৎকারে, একটা পাগল প্রায় নিধির গা ঘেঁষে চিৎকার করতে করতে চলে গেলো” অমাবস্যার রাত, আসবে ওরা আজ ঠিক আসবে, আমার ছুটকিও ঠিক আসবে, কাউকে ছাড়বে না... কাউকে না। নিধির ভয় আরও দ্বিগুণ হয়ে গেলো। যে নিধি ঘর থেকে সামান্য বারান্দায় বেরোতে গেলেও তার মা-ই স্বহায় সেখানে এরকম জটিল পরিস্থিতিতে নিধি যে কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। আশে পাশে তাকিয়ে দেখল বাস স্ট্যান্ড-এ গুটি কয় লোক সংখ্যায় আরও কমে গেছে। রাস্তার স্ট্রীট লাইট গুলোর আলোর তেজও কম আজ। কুয়াশায় খুব স্পষ্ট বোঝা যাছে না তবু দূর থেকে একটা আলোর রেখা দেখতে পেলো, ক্রমশ আরও তীব্ৰ হল সে আলো, হ্যাঁ একটা বাস আসছে, নিধি মনে একটু সাহস পেলো, এখান থেকে যে কোন বাস-ই তার বাড়ির রাস্তায় মোড় মাথায় দাঁড়ায়, তাই বাসটা স্টপেজে দাঁড়াতেই তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে সে। বাসে উঠে অবাক হয় সে, বাস যে একদম ফাঁকা, বাসের সব জানালা গুলো লাগানো, বাসের কন্ডাকটরকেও দেখতে পেলো না নিধি, ভীষণ ভয় পেলো নিধি, বাস থেকে নেমে যাবে কিনা ভাবতে ভাবতেই ঝড়ের বেগে বাস ছুটছে, নিধির আর কিছু করার নেই, একটা সিট-এ বসে পড়ল সে, হঠাৎ খটখট শব্দে সব কটা জানলা একসাথে খুলে গেলো, এক ঝাঁক ঠাণ্ডা হাওয়া এসে চোখে মুখে লাগলো, তারপর মাথা ঘুরিয়ে তার আশেপাশে তাকিয়ে দেখল বাস লোকে ভর্তি, একটা ছেলে এসে ওর পাশে বসলো। কিন্তু এখনও তো কোন স্টপেজ-এই বাস থামেনি তবে এতো লোক উঠলো কিভাবে, নিধির গলা শুকিয়ে আসছে, তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে বোতলটা বের করে দু ঢোক জল খেয়ে নিলো। পাশের ছেলে টা নিধিকে জিজ্ঞাসা করলো” তুমি সাপুই পাড়ার ঐ ব্রিজটা ক্রস করে ঐ ক্লাবের কাছে নামবে, তাই না, নিধি চমকে গেলো, “আপনি কি করে জানলেন?” ছেলেটা রহস্যময় কেমন একটা হাসল, বলল” এই বাসটা সোজা যাবে, তোমার গন্তব্যে যাবে না, তোমাকে নামতে হলে ব্রিজের কাছেই নামতে হবে।“ তার পর গোটা বাসের লোক হাড় হিম করা হাসি হেসে উঠলো। নিধি তাড়াতাড়ি সিট ছেড়ে বাসের দরজার কাছে গিয়ে চিৎকার করে নামবো নামবো। বাস দাঁড়ায় , নিধি একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বাস পুরো ফাঁকা, কেও কোথাও নেই। তার পাশে বসা ছেলেটাও না। কোন রকমে বাস থেকে নেমে দাঁড়ায়। বাস টা নিমেষেই কোথায় চলে গেলো বোঝাই গেলো না, এখন তাকে ফ্লাইওভার এর নিচ দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে হবে, আগে একদিন দুদিন অবশ্য হেঁটে গেছিলো কিন্তু তখন সাথে অভি সাথে ছিল আর বিকেল বেলায় গল্পে গল্পে বাড়ি পৌঁছে গেছিলো, ইশ কেন যে আজ বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিলাম। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখল নিধি রাত ৯.৩০ বেজে গেছে, মাকে আআর একবার ফোন এ ট্রাই করবে বলে ব্যাগ থেকে ফোন টা বের করে দেখে ফোন এর চার্জ শেষ। অগত্যা আবার সাহস জুগিয়ে এগোতে থাকে, এতক্ষণ রাস্তার আলো গুলো ক্ষীণভাবে জ্বলছিল, হঠাৎ-ই সব নিভে গেলো দাঁড়িয়ে পড়ল নিধি, ভয়ে মনে মনে রাম রাম বলতে থাকে সে, এবার রাস্তার আলো গুলো টুনি বাল্ব এর মতো জ্বলা নেভা করতে শুরু করলো। আবার হাঁটতে শুরু করলো নিধি ... এবার সব লাইট নিভে গেলো, একদম অন্ধকার হয়ে গেলো চারিদিক,আবার হাঁটা থামালো, মাগো বলে চিৎকার করে উঠলো নিধি একবার, কিন্তু বাড়ি তো তাকে ফিরতেই হবে, অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে আবার পথ চলা শুরু করলো, এলোমেলো ঠাণ্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগলো তার, কে যেন ঠাণ্ডা নিঃশ্বাস ফেলছে তার ঘাড়ে, কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে, আবার রাস্তার আলো গুলো জ্বলা নেভা শুরু করেছে, ঐ আলোতে হঠাৎ নিধির নজর পড়ল ছোট্ট একটা মেয়ে ফ্রক পড়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে, নিধি ভাবল মেয়েটা যখন আসছে তখন নিশ্চয় তার বাবা মা ও আশে পাশেই আছে কোথাও, তারপর তার কাঁধে বরফের মতো ঠাণ্ডা স্পর্শ... পিছন ফিরে দেখে বাসে তার পাশে যে বসেছিল সেই ছেলেটা, নিধির হাত পা ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, চিৎকার করার চেষ্টা করছে কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরাচ্ছে না। আশপাশ থেকে আরও কতো কালো ছায়া এসে নিধিকে ঘিরে ধরেছে, এই শীতের রাতেও নিধি ঘেমে উঠেছে, দৌড়ে পালাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পা যেন সরছে না। ধীরে ধীরে সেই ছায়া মূর্তি গুলো উধাও হয়ে যায়। নিধি দৌড়াতে থাকে প্রাণপণ চেষ্টায়, এবার নিধির সামনে পেছনে অশরীরী আত্মা গুলো মানুষের রূপ নিয়ে এগিয়ে আসতে থাকে, কারোর গা দিয়ে রক্ত ঝরছে, কারোর হাত কাটা, কারোর মাথা থেথলে গেছে। সকলেই হাসছে সেই বাসের মতো হাড় হিম করা হাসি। প্রচণ্ড ভয়ে নিধি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। নিধির মা অস্থির হয়ে ওঠে, এতো রাত হল মেয়ে এখনও আসেনি, ঘর বার করে শেষে একটা টর্চ নিয়ে ঘরে তালা লাগিয়ে বেড়িয়ে পড়ে। ক্লাবের ছেলেরা তখনও ছিল ক্লাবেই, নিধির মা গিয়ে বলতেই খোঁজ খবর করে সবাই, অবশেষে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায় নিধিকে।


দু দিন জ্বর নিয়ে খুব ভুগেছে মেয়েটা। তারপর একটু সুস্থ হলে মা আর সবাইকে ঘটনা টা বলে নিধি, কিন্তু কেও বিশ্বাস করেনি অভি ছাড়া, কারণ অভিও একদিন দেখেছিল ছোট্ট একটা মেয়েকে, রাস্তা পাড় হতে হতে হঠাৎ মিলিয়ে গেছিলো।

পড়ে শোনা যায় লোক ভর্তি একটা বাসের এক্সিডেন্ট হয়ে সব লোক মারা যায়, আর সেই বাস এ ছুটকি বলে শুধু একটা বাচ্চা ছিল, তার নাম ছুটকি আর তার বাবা শোকে পাগল হয়ে গেছে। তবে শুধু অমাবস্যার রাতে কিম্বা একলা মানুষ থাকলেই যে এরকম পরিস্থিতি হয় কিনা সে প্রশ্নের উত্তর আজও জানা যায়নি।


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.