শরদিন্দু ইদানীং নাকি খুব নাক ডাকছে। ইউনিভার্সিটিতে সেদিন সে টিফিনের পর ফাকা ক্লাসরুমের বেঞ্চে শুয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল তা আর নিজেরই মনে নেই। তারপর যখন চোখ মেলে তাকালো তখন তো তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টার শোরগোল পড়ে গেছে রীতিমত ওর বন্ধুদের মধ্যে। অল্পসময়েই চারিদিকে রটে গেল শরদিন্দূর নাসিকাগর্জন কাণ্ড। বেচারা প্রচুর প্যাক খেয়ে বাড়ি ফিরেছিল সেদিন। কিন্তু ওর নিজের কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না ব্যাপারটা। কই, এতদিন তো নাক ডাকতো না ও! কেউ কমপ্লেইন করেনি কোনোদিন। এই যে ছুটি পেয়ে প্রতি সপ্তাহে বাড়ি যায়, তখন তো প্রায়দিনই মায়ের পাশে শুতে হয় ওকে। কই, মাও তো কখনো বলেনি সে কথা! নিশ্চই ওর বদ বন্ধুগুলোই এসব মিথ্যে রটনা রটাচ্ছে! এই বয়সে সে নাক কেন ডাকতে যাবে খামোখা? না, সর্দি-কাশি-সাইনাস এসব কিছুরও তো সমস্যা নেই শরদিন্দুর।
শরদিন্দু শহরতলিতে একাই থাকে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে। ওর আদিবাড়ি সেই হুগলীতে। ইউনিভার্সিটি আর টীউশনি নিয়ে ভালোই দিন চলে যাচ্ছে তার। এরমধ্যে বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। শরদিন্দু নাক ডাকার ব্যাপারটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু একটা ব্যাপারে বেশ খটকা লাগে তার। গত পরশু ওর ডিপার্টমেণ্টেরই সুশীল এসেছিল ওর বাড়িতে আড্ডা দিতে। বেশী রাত হয়ে জাওয়ায় সেদিন আর সুশীল ফিরতে পারেনি। তাই সেইরাতে খাওয়া দাওয়ার পরে শরদিন্দু আর সুশীল একসাথেই শুয়ে পড়েছিল। কিন্তু ঘুমিয়েছিল একজনই - শরদিন্দু। সকালে উঠে সুশীল রেগেমেগে বলেছিল - "এরকম বীভতস ভাবে কোন মানুষ নাক ডাকতে পারে, সেটা তোকে না দেখলে জানতেই পারতাম না! উফ! কি সাঙ্ঘাতিক! সারারাত শুধু - ঘরর ঘরর ফোস ফোস! এক মুহূর্তও দুচোখের পাতা এক করতে পারলাম না!"
সুশীল চলে যাবার পরে শরদিন্দুর মনে একটু খচখচ করতে লাগল ব্যাপারটা। সত্যিই কি সে এতটাই বীভতস ভাবে নাক ডাকে? অথচ সে নিজে তো কিচ্ছু টের পায়না! কি অদ্ভুত! অনেক ভেবে শরদিন্দু একটা বুদ্ধী বের করল। সে ঠিক করেই নিলো যে সে নিজেই পরীক্ষা করে দেখবে এই ব্যাপারটা।
যেমন ভাবা তেমন কাজ। সেদিন রাতে মোবাইলফোনের রেকর্ডারটা অন করে শুয়ে পড়ল শরদীন্দু। আগামীকাল তাতে শুনে দেখা যাবে সে কীরকম নাক ডাকে! পরেরদিন ছুটি ছিল। রোববার। তাই উঠতে একটু বেলা হয়ে গেল ওর। উঠেই ওর মনে পড়ল ফোনের কথাটা। ফোনটা হাতে নিয়ে রেকর্ডারটা বন্ধ করতে গিয়ে সে দেখল ওটা শোবার পরে একঘণ্টা রেকর্ডীং হয়ে নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে।টানা আট ঘণ্টা রেকর্ডীং করা সম্ভব নয় মোবাইল ফোনে। অগত্যা যতটুকু হয়েছে সেটাই শোনা যাক। শরদিন্দু প্লে বোতামটা টিপে দিল।
প্রথম পনেরো মিনিট কোনো শব্দই পাওয়া গেল না। শুধু ফ্যানের ব্লেডের একটা ক্ষীণ শব্দ সবসময়ই পাওয়া যাচ্ছে। একটু পরেই একটা হালকা ফোসফোস শব্দ শুনতে পেল শরদিন্দু।এই মানেটা তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে সেটা তারই নাক ডাকার আওয়াজ। ঘুম আরো গাঢ় হলে নিশ্চই এই আওয়াজটা আরো জোরালো হবে। সেই অপেক্ষাতেই শরদিন্দু কান পেতে বসেই রইল ঠায়। হঠাত ২৫ মিনিটের মাথায় একটা অদ্ভুত শব্দে সে চমকে উঠল। সে ট্র্যাকটা 'পজ' করে আবার পিছনে এসে শুনতে লাগল। সে ঠিক শুনছে তো? হ্যা! এই তো সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে! এতো একজনের হাসির শব্দ! অত রাতে তার ঘরে কেউ ঢুকেছিল নাকি? একজন পুরুষের কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে সে। হাসিটাও তার খুব চেনা মনে হল। কী সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার রে বাবা! কার হাসির আওয়াজ রেকর্ড হয়ে গেছে তার ফোনে? রাত ২টোর সময় কে তার ঘরে এল? আর এলেও শরদীন্দু কিচ্ছু টের পেল না! এ কি করে সম্ভব! চোর টোর আসে না তো তার ঘরে! সে তো তালা দিয়েই ঘুমিয়েছিল। খাট থেকে নেমে শরদীন্দু ছূটে গেল দরজায়। নাহ! সব তো বন্ধই রয়েছে,ঠিক যেমন বন্ধ করে সে শুতে গিয়েছিল। তালাটাও বন্ধ অবস্থাতেই ঝুলছে। বাইরে থেকে কিছু খুলে বা ভেঙ্গে কারোর ভিতরে আসার কোনো চিনহই তো দেখতে পাচ্ছে না সে! তবে?
ফোনে রেকর্ডটা তখনও বেজে চলেছে। পঞ্চাশ মিনিটের মাথায় আবার একটা শব্দ। কে যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। কন্ঠস্বরটা স্পষ্ট নয় একেবারেই, তাই বোঝা গেল না কি কথা হচ্ছে। তারপর কোনো একটা ধাতুর পাত্র মাটীতে পড়ে যাবার মত ঝনঝন শব্দ। শরদীন্দু শিউরে উঠল। এতকিছু তার ঘরে কাল রাতে ঘটেছে? কিন্তু সে কিচ্ছু তো টের পেল না! এটা কিভাবে সম্ভব! এত কিছু ফিসফাস, শব্দ, কণ্ঠ ওর রেকর্ডিঙে এলোটা কিভাবে সেটাই এখন সে ভাবতে লাগল।

পরদিন সকালে উঠে আবার রেকর্ড প্লেয়ারটা চালালো শরদিন্দু। হ্যা এবারো সেই একই রকম ব্যাপার। নানারকম হাসি ও ফিস্ফাস শব্দ সে শুনতে পেল। তার সারা ঘরে কে যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে।অথচ দিনের বেলাতে বা তার জেগে থাকা অবস্থায় সেই আগন্তুক সত্তার কোনো উপস্থিতিই টের পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কি কোনো ভৌতিক ব্যাপার ঘটছে তার সঙ্গে? শরদিন্দু চাইছিল না এসব ভূতপেতনীর ব্যাপারটা টেনে আনতে কিন্তু পরপর দুদিন যে জিনিস ঘটলো তাতে আর কোন ব্যখ্যাই সে খুজে পাচ্ছে না। সে ব্যাপারটা সুশীলকে জানাবে ঠিক করল। হ্যা একটু প্যাক তাকে খেতে হবে হয়ত, কিন্তু ও জানে সুশীল বুঝবে। সুশীল ছেলেটা ভালো। গ্রাম থেকে আসার পরে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে তাকে নানাভাবে সে সাহায্য করেছে তাকে। সুশীল ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট বয়। তবে খুব ইন্ট্রোভার্ট বলে ওর বেশি বন্ধু নেই। আসলে পড়াশুনোতে ভালো বলে সবাই ওকে নাক উচু ভাবে। আসলে কিন্তু তা নয়। শরদীন্দুর সঙ্গে ওর প্রথম থেকেই সখ্যতা শুরু হয় এবং এখন এই অবস্থাতেও তাই সুশীলের নামটাই ওর সবার আগে মনে পড়ল।
সুশীলকে ফোন করে চলে আসতে বলল শরদিন্দু। ও এলে সব খোলসা করে বলা যাবে ওকে। শরদিন্দু বেশ ভয় পাচ্ছে একলা থাকতে। যদি ভূতের উপদ্রব নাও হয়, তবুও অচেনা লোক যে তার ঘরে ঢুকেছে বা ঢোকে একথাও তো সে উড়িয়ে দিতে পারছে না। বাড়িওলাকেও বলে দেখবে সেরকম কিছু হলে। আপাতত শরদিন্দু মনে মনে গুনগুন করে গান ধরল, ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে...’ এটা ওর খুব প্রিয় গান। সময় পেলেই এই সুরটাই নিজের মনে গুনগুন করে। শরদিন্দু দুপুরবেলাটা বাড়ির বাইরেই কাটালো সেদিন। বাড়ির ভিতরে যেন তা গা ছমছম করছে। শুধু মনে হচ্ছে কেউ তাকে দেখছে, কেউ তার কথা শুনছে। আর বারবার মনে পড়ছে ভয়েস রেকর্ডিংটার কথা।
বিকেলে সুশীল এল। সুশীলকে সবটা জানাবার পর রেকর্ডিংটাও শোনাল। সুশীলের মত মেধাবী ছেলেও এর কোনো সদুত্তর দিতে পারল না। কিছুক্ষন গুম মেরে বসে সুশীল জিজ্ঞেস করল, “ ব্যাপারটা কবে থেকে শুরু হয়েছে?”
-“ওই তো তুই যেদিন এলি আমার বাড়িতে। তার পরেরদিনই আমি রেকর্ডিং শুরু করি। মানে গত পরশুর আগের দিন থেকে। তারপর পর পর দুদিন একই জিনিস হচ্ছে। সবটাই তো শুনলি নিজের কানেই। আমার জাস্ট মাথা কাজ করছে না রে।“
-‘হুম। তুই ভূতে বিশ্বাস করিস?’
-“না , মানে। আমি জানিনা এসব। অবশ্য আমাদের গ্রামে অনেকদিন আগে একজনকে নাকি ভূতে ধরেছিল। তখন আমি খুব ছোট। সেই থেকে একটা ভীতি বা যাই বল রয়ে গেছে। মানে ঐ অন্ধকারের মতই আর কি। অজানা জিনিসেই মানুষের যত ভয়। কেন, তুই কি ভৌতিক ব্যাপার কিছু দেখছিস নাকি?”
সুশীল বলল, “দ্যাখ, আমি কোনো পসিবিলিটিই উড়িয়ে দিতে চাইছি না।তবে এই ঘরে রাতের বেলা যদি ফিসফিস শব্দ হয় তাহলে এছাড়া আর কি বলা যায়? চোর তো আসে না নিশ্চই। কারণ দরজা জানালা তো বন্ধই থাকে। তোর বাড়িওলাকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়? উনি যদি কিছু লক্ষ্য করে থাকেন আর কি! যদি এই বাড়ির কোনো ভৌতিক ইতিহাস থাকে তাহলে সেটাও জানতে পারা যাবে ওনার থেকেই।“
শরদিন্দু সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল।
বাড়িওলা ওপরেই থাকে। ওরা আর সময় নষ্ট না করে চলে গেল ওপরে।
বাড়িওলা রমানাথ বসু লোকটার চেহারাটাই খুব মজার। তুলসী চক্রবর্তীর মত ঠিক। তিনি দুজন ছেলেকে নিয়ে নাটকের মহড়া দিচ্ছিলেন নিজের ঘরে। শরদিন্দু কে দেখতে পেয়ে বললেন, “ এসো বাবা, এসো। কিছু বলবে? কলটা আবার খারাপ হল নাকি...”
- “না কাকাবাবু, আসলে অন্য একটা আলোচনা ছিল আপনার সঙ্গে। আপনার কি এখন একটু সময় হবে?”
রমানাথ বললেন, “হ্যা এসো। ভিতরের ঘরে এসো।“
ওরা ওকে অনুসরণ করে ভিতরে গিয়ে বসল। শরদিন্দু ব্যাপারটা পুরোটাই তাকে খুলে বলল সব। সব শুনে রমানাথ বাবুর মুখটা থমথমে হয়ে গেল খানিক। তিনি বললেন, “মিথ্যে বলব না বাবা, তবে এই বাড়ির একটা ভৌতিক ইতিহাস রয়েছে। কয়েকবছর আগে এক দম্পতি আমার এখানে ভাড়া থাকত। ওই ঘরেই। তারা একদিন রাতে সুইসাইড করেছিল। কিন্তু মারা যাবার আগে তারা নিজেদের শেষমুহুর্তের বার্তালাপ, হাসিগুলিকে রেকর্ড করেছিল একটা টেপ রেকর্ডারে। পরেরদিন সকালে ওদের ডেডবডি দুটো আবিস্কার করে কাজের লোক। তারপর থানা পুলিশ সে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার। তারপর অনেকদিন পরে একজন ভাড়াটিয়া এসেছিলেন। তিনিও আমাকে কমপ্লেন করেছিলেন যে তিনি ওই ঘরটিতে অন্য একজনের উপস্থিতি টের পান। তিনি এতই ভয় পেয়ে গেছিলেন যে আর বেশিদিন থাকেননি এখানে। এরপর আর কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি। অনেক ভাড়াটেই তো এল গেল কিন্তু আর কোনো কিছুই কেউ বলেননি। আজ অনেকদিন পর তুমি এসব কথা বলাতে আমার পুরোনো কথাগুলি মনে পড়ে গেল।“
শরদিন্দু আর সুশীল দুজনেই দুজনের দিকে তাকাল। শরদিন্দুর মুখ কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
সুশীল ওকে সাহস দিয়ে বলল, “আরে অত চিন্তা করিস না। ভূত ফুত বলে তো আমার তেমন কিছু মনে হচ্ছে না। ঠিকাছে আজকে আমি থাকব তোর সঙ্গে রাতে। দেখি কি হয়।“

রাতের খাবারটা সুশীলই রান্না করল। শরদিন্দুর মুখে হাসি নেই, সারাদিন কি একটা ভাবনাতে যেন হারিয়ে গেছে ও। একটা অজানা ভয় ওর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে শুধু। রাতের খাবার দাবার সেরে দুজনে বসে রইলো ঠায় জেগে। নানারকম গল্প করতে লাগল সময় কাটাবার জন্য।মোবাইলের রেকর্ডারটাও অন করেই রাখল ওরা টেবিলের ওপরে মাথার কাছে। রাত তখন প্রায় একটা। কিছুই অস্বাভাবিক ব্যাপার তারা টের পায়নি এতক্ষন। কিন্তু শরদিন্দু বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারল না। ওর দুচোখ বেয়ে ঘুম নেমে আসছে শুধু। এ যেন মরণঘুম। সুশীল আর ওকে বিরক্ত করল না। বেচারা ভয় পেয়েছে খুব। সুশীল আরেকটু জেগে থাকার জন্য একটা সিগারেট ধরালো। এখনো অব্দি তো সে কিছুই বুঝতে পারছে না। সিগারেটটা শেষ হতেই সুশীল আর জেগে থাকতে পারলো না। ওরও ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। শরদিন্দুর পাশেই ও ঘুমিয়ে পড়ল। ঘরের আলোটা নেভানোর কথাও আর মনে ছিল না ওর।
পরেরদিন সকালে প্রথমে সুশীলেরই ঘুম ভাংল। ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভেঙ্গে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল খাটের ওপরেই। পাশেই শরদিন্দু মরার মত ঘুমোচ্ছে। কি অলস ছেলে রে বাবা! সুশীল টেবিল থেকে মোবাইলটা নামিয়ে আনল। তারপর চালালো ফোনের রেকর্ডিংটা। কোনো শব্দই আসছে না তার কানে। সেই ফ্যানের ব্লেড ঘোরার ক্ষীণ শব্দ শুধু ভেসে আসছে। সুশীল ফরোয়ার্ড করতে লাগল ট্র্যাকটা। হঠাত একটা জায়গায় এসে সে থেমে গেল। এই তো ফিসফিস শব্দ। তারপরেই ঘরে হেটে বেড়াবার শব্দ কারো। কই, সে তো কাল এই ঘরেই ছিল। কারোর শব্দে তো ঘুম ভাঙ্গেনি তার! এটা কি করে সম্ভব? এত গাঢ় ঘুম তো তার হয়না কোনোদিন। ব্যাপারটা শরদিন্দুকে জানানো দরকার।
-“শরত, ওঠ। দ্যাখ রেকর্ডিংটা সেই একইরকম এসেছে রে। দ্যাখ তো কিছু বুঝতে পারছিস কি না! কথাগুলো খুব অস্পষ্ট রে... এই শরত... ওঠ!”
সুশীলের এবার খটকা লাগল। শরদিন্দু উঠছে না কেন? অন্তত ‘হ্যা হু’ তো করবে। শরদিন্দুর কাঁধ ধরে তার দিকে মুখটা ফেরাতেই সুশীলের বুকটা কেঁপে উঠল। একদম নিথর মরার মত ভারী হয়ে গেছে শরদিন্দু। সুশীল হাতটা ওর নাকের কাছে নিয়ে গেল – সে কি! নিশ্বাসও তো পড়ছে না। তবে কি শরদিন্দু মারা গেছে?
- “ শরত, এই শরত।“ অনেক ডাকাডাকি আর ধাক্কাধাক্কির পরও শরদিন্দু এতটুকুও নড়ল না। সুশীলের খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছে। সে তাড়াতাড়ি রমানাথ বাবুকে ডাকতে ছুটল দোতলায়। একটু পরেই রমানাথ বাবু দৌড়ে এলেন নীচে। পাড়ার এক ডাক্তার কে ডাকা হল। তিনি এসে জানালেন শরদিন্দুর গতকাল রাতেই ঘুমের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর কারণটা সম্ভবত ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক।

শরদিন্দুর মৃত্যুর প্রায় চৌদ্দ দিন হয়ে গেছে। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বলছে হার্ট অ্যাটাকেই মারা গিয়েছে শরদিন্দু। রমানাথ বাবু নিজের ঘরেই বসে আছেন এক সন্ধ্যাবেলা। তার মনেও বেশ অশান্তি চলছে এই কদিন ধরে। তার বাড়িটাও ফাকা হয়ে গেছে। তিনি বসে একটা নাট্যপত্রিকা পড়ছিলেন। এই নাটক নাটক করেই তিনি সর্বস্ব খোয়ালেন জীবনের। সংসারটা শুধু ভাড়ার টাকায় কি আর চলে? দুটোর মধ্যে একটা ভাড়াটে এভাবে চলে যাবে বছরের শেষে তিনি ভাবতেও পারেননি। সংসারটা চালানোর জন্য তার টাকাটা তার খুব দরকার। এইসবই ভাবছিলেন তিনি এমন সময় তার দরজায় কেউ কড়া নাড়ল।
-কে?
- “আমি। আসতে পারি ভিতরে?” একটা পুরুষ কন্ঠ বলে উঠল বাইরে থেকে। গলাটা রমানাথের চেনা।
-“আসুন আসুন।“
কিন্তু পুরুষটি একাই ঢুকলেন না। তার সঙ্গে একটি বছর পঁচিশের মেয়েও ঢুকল।
রমানাথ বাবু একটু ভয় পেয়ে গিয়ে বললেন, “ইনি কে, মানে এনাকে তো ঠিক চিনলাম না সুশীল।“
সুশীল হেসে বলল,” ভয় পাবেন না রমানাথ বাবু। এনাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেন। ইনি আমার বাগদত্তা পৌলমী। আমরা পরের বছরেই বিয়ে করছি।“
রমানাথ বাবু তবুও সহজ হতে পারছেন না। এরা যা ধুরন্ধর লোক! এরা সব করতে পারে।
সুশীল বলল, “ আপনার সঙ্গে কিন্তু পৌলমী আজ আড্ডা মারতে এসেছে। জানেন তো , পৌলমীই হচ্ছে সেই মেয়ে যার কথা আপনাকে বলেছিলাম। না থাকলে তো আমাদের প্ল্যানটা এক্সিকিউট হত না।“
-“কেন বলুন তো?”
পৌলমী নিজেই এবারে বলে উঠল, “রমাবাবু আপনি এতটা বোকা তো নন। এখন এমন ভাব করছেন যেন কিছুই জানেন না! মানছি আপনি শুধু টাকার জন্যেই আমাদের সাহায্য করেছেন কিন্তু তাই বলে আপনি যে কিছুই জানেন না তা তো নয়। আমি আপনাদের পটাশিয়াম ক্লোরাইডের মত এত দুষ্প্রাপ্য বিষ দিয়ে সাহায্য করলাম আর আমাকেই চিনতে পারছেন না! জানেন তো এই বিষ পাওয়া খুব কষ্টকর ব্যাপার। রক্তে এর ট্রেস পাওয়া যায় না, আর সোজা গিয়ে আঘাত করে হার্টে। তাহলেই ভাবুন ল্যাব থেকে জোগাড় করা কতটা পরিশ্রমের কাজ ছিল। ভাগ্যিস রসায়ন নিয়ে পড়ি তাই... “
রমানাথ বাবু এসব কথা আশা করেননি। তার শুধু ভয় হচ্ছে কেউ যদি শুনে ফেলে।
সুশীল চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল, “তাই বলে তুমিও সব ক্রেডিট নিও না পৌলমী। আমিই তো ওর ঘরের চারিদিকে মিনি স্পিকার লাগিয়েছিলাম। আর সেদিন রাতে ওর রান্নাতেও আমিই তো কায়দা করে ওটা মিশিয়ে দিয়েছিলাম। হাহাহা, ব্যাটা টেরই পেল না কিছু!”
পৌলমী বলল, “ও সেই স্পিকারের মধ্যেই তুমি আগে থেকে রেকর্ড করে রাখা পায়ের আওয়াজ ইত্যাদি ভরে দিয়েছিলে! তাই তো!”
- একদমই তাই! স্মার্ট গার্ল!
পৌলমী প্রেমিকের কমপ্লিমেন্ট পেয়ে জ্বলজ্বল করে উঠল। তারপর হঠাত নিজেই বলে উঠল, “ কিন্তু রাতের বেলা ওই স্পিকারগুলো কে চালাতো কে?”
সুশীল একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে বলল, “ আরে বুঝলে না? রমানাথ বাবুর কাছে রিমোট দিয়েছিলাম আমি। উনি যেহেতু বাড়িওলা, সুতরাং ডুপ্লিকেট চাবিও ছিল ওনার কাছে। উনি রাতের বেলা পা টিপে টিপে ঢুকতেন তারপর স্পিকার গুলি হাল্কা করে চালিয়ে দিতেন। আর ঘরে ঢুকে উনি একটা আনাস্থেসিয়া স্প্রে করে দিতেন, যাতে শরদিন্দুর ঘুম না ভেঙ্গে যায়। মঞ্চে উঠে কিভাবে পা টিপে যেতে হয় সেটা থিয়েটার করার দরুণ রমানাথ বাবু ভালই জানেন। কি ঠিক বলছি তো রমানাথ বাবু?”
এতক্ষনে রমানাথ একটা কথাও বলেননি। সব শুনছিলেন চুপ করে। এবারও কিছু বললেন না। শুধু মুখ তুলে তাকালেন সুশীলের দিকে।
সুশীল বলল, “ এই নিন রমানাথ বাবু। থ্যাঙ্কস আ লট। এই নিন আপনার টাকাটা।“ সুশীল পকেট থেকে একটা চেক বের করে দিলেন রমানাথের দিকে। রমানাথ নীরবে হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিলেন টাকাটা। সত্যিই টাকার খুব দরকার তার।
সুশীল বলল, “ তাহলে এবারে উঠি!এই পেমেন্টের জন্যই এত দূরে আসা। আমি কথা দিয়ে খেলাপ করি না কিন্তু।“
রমানাথ বাবু এবারে মুখ খুললেন। কাচুমাচু করে বললেন, “ সবই যখন বললেন তখন এটা খুব জানতে ইচ্ছে করছে যে কেন মারলেন শরদিন্দুকে?”
সুশীলের মুখটা থমথমে হয়ে গেল। সে বলল, “ আমি বেশি প্রশ্ন পছন্দ করি না রমাবাবু। তবু জিজ্ঞেস করলেন বলে বলছি। শুনুন, আমি আমার ডিপার্টমেন্টের টপার। আর ওই মালটা গ্রাম থেকে এসেছে। ভালো করে ইংরিজিও বলতে পারে না। সালা আমার সঙ্গে পড়াশুনোতে টক্কর দিতে এসেছিল। লাস্ট সেমিস্টারে ও টপ করেছে উনিভার্সিটিতে। আমার দয়াতে থেকে, আমারই নোটস পড়ে আমার থেকে বেশি পেয়ে নিজেকে খুব বড় হনু ভেবেছিল মালটা। আমি কোনোদিন সেকেন্ড হইনি, আর হবও না। তাই ফাইনালের আগে ওকে সরাতেই হত আমার। মালটা খুব বেড়েছিল। গত দুমাস ধরে দেখছি পৌলমীর দিকেও অন্য নজরে তাকাত। আমার আর সহ্য হয়নি... ব্যাস ফন্দি এঁটে সরিয়ে দিলাম ওকে। আচ্ছা চলি।“
-“দাড়ান।“ রমানাথ বাবুর চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছে।
- মানে? কিছু বলবেন নাকি?
- না, শুধু একটা খবর আছে আপনার জন্য।
-কী খবর?
-একজন অতিথি এসেছেন আপনাদের সঙ্গে দেখা করবে বলে।তিনি ভিতরে অপেক্ষা করছেন।
- শালা তুই পুলিসে খবর দিয়েছিস নাকি? জেনে রাখ তুইও কিন্তু বাচবি না।
রমানাথ শান্ত গলাতেই বললেন, “ছি ছি পুলিশ কেন! ওসব কেউ না। আপনার খুব চেনা কেউ একজন তিনি।“
সুশীল হনহন করে ভিতরে ঘরে ঢুকল। খাটের ওপর শুয়ে আছে... এ কি!
রমানাথ বাবুর লাশ পড়ে রয়েছে ঘরের খাটের ওপরে।পেটের কাছে গভীর ক্ষত। নাড়িভুড়ি বেরিয়ে এসেছে। রক্তে সারা খাট ভেসে যাচ্ছে। কি বীভতস! সুশীলের বমি পেয়ে গেল। কিন্তু রমানাথ বাবু তো এতক্ষণ বাইরের ঘরে তার সঙ্গে কথা বলছিল। এটা কী করে সম্ভব? সুশীল একদৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। কিন্তু বাইরের ঘরে বেড়িয়ে এসেই সে হোচট খেয়ে পড়ে গেল মাটিতে। নিজেকে সামলে তাকাতেই সে দেখল পৌলমীর নিথর দেহ পড়ে আছে মাটিতে। চোখ দুটো যেন বেড়িয়ে আসছে মুখ থেকে। ওর নিথর দেহেই পা লেগে ও পড়ে গেছে।
আর এই ঘরে কেউ নেই। সুশীল ঘেমে চান করে যাচ্ছে। তার মাথা কাজ করছে না কিছুতেই। সে পালাতে চেষ্টা করল কিন্তু প্রাণপনে চেষ্টা করেও সে দরজা খুলতে পারল না।
সুশীল পাগলের মত করতে শুরু করেছে। এমন সময় তার সামনের ইজি চেয়ারে এসে তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। ইজি চেয়ারে তার দিকে পিছন ফিরে কেউ বসে দোল খাচ্ছে। ক্যাচ কোচ ক্যাচ কোচ। সুশীল দেওয়ালের সঙ্গে সিটিয়ে গেল।
ইজিচেয়ারে দুলতে থাকা ব্যাক্তিটির মুখ দেখা যাচ্ছে না। সে আধো অন্ধকারে বসে দুলেই চলেছে তখন থেকে। শুধু একটা গান ভেসে আসছে ওখান থেকে – নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে... চুপি চুপি বাঁশি বাজে বাতাসে...
এই কন্ঠস্বরটা খুব খুব চেনা সুশীলের।সে মুখ থেকে কিছু বলার আগেই দপ করে যেন পৃথিবীর সব আলো মুছে গিয়ে অন্ধকার গ্রাস করল সারা ঘরটাকে।
(সমাপ্ত)

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.