মৃত্যুর ফাঁদে



তখন আমার সাত বছর বয়স; বর্ধমানের দোতলা বাড়ি, বাগান, বন্ধু ইত্যাদি ছেড়ে চলে যেতে হল মধুপুর। মা-বাবার অকাল প্রয়ানে চার চারজন মামার আশ্রিত হলাম আমি। একান্নবর্তী পরিবার। অনাথ হলাম না ঠিকই। কিন্তু এক ডজন ভাই-বোনের ফাইফরমাশ খাটতে গিয়ে নিজের সখ- আহ্লাদ বলে আর কিছুই রইল না। ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে খাটাল থেকে দুধ আনা, বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে দাদাদের ঘুড়িতে মাঞ্জা দেওয়া, দিদিদের গানের ক্লাসে পাহারা দেওয়া, বড় মামীর নির্দেশে ধোপার কাছ থেকে কাপড় গুনে নিয়ে আসা। ন’মাসীর পান, জর্দা এনে দেওয়া, ফুলদির প্রেমপত্র পাচার করা ইত্যাদি।


রবিবারও ছুটি নেই। হয় মেজদার সঙ্গে যেতে হত মাছ ধরতে, কিংবা বড়দার সঙ্গে বন-মুরগী শিকারে। দুটি কাজেই ভয় ছিল আমার নিত্য সঙ্গী। হলহলে সাপ প্রায়ই পায়ের ওপর দিয়ে চলে যেত এঁকেবেঁকে; বর্ষাকালে জোঁক,কেঁচোর সমারহ। ওদের দেখলেই আমার পিলে চমকে যেত। তারপর মাছের চারা দিতে দিতে ঘুমে ঢুলে পড়লে মিলত গাট্টা। জঙ্গলে গেলেই গা ছমছম করত। হাতির দল বা হায়না ডাকলে পিলে চমকে যেত। এছাড়া অপটু হাতে তৈরী মাচা থেকে পড়ে যাবার ভয়। সব মিলিয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত আমার। এরপরও শিকার ফসকে গেলেই নাকি আমার দোষ; ঘরে ফিরে আমাকেই মুরগী হতে হত আর ককর-কক ডাকতে হত। ভাই-বোনেরা তাই দেখে হেসে লুটোপুটি খেত । “ ও মুরগী কি ডিম পাড়বি রে? ভীতুর ডিম?”আমি মরমে মরে থাকতাম। কিন্তু ওদের একি অদ্ভূত মজা!


মুখ বুজে সব সহ্য করতে করতে ভুলেই গিয়েছিলাম আমি কে? আমার নাম কি? ভাই বোনদের মধ্যে সবথেকে গুনবতী ছিল চারুদি। খুব যে সুন্দরী ছিল তা নয়, তবে সারা দেহে, মুখে কি এক প্রশান্তি। ঠিক যেন সরস্বতী ঠাকুর। গলার স্বরটিও তেমন মিষ্টি। যেহেতু চারুদি লেখাপড়ায় খুব ভাল, তাই ঘরে গিয়ে তাকে বিরক্ত করা বারণ ছিল। তবুও কৌতূহল বশতঃ আমি একদিন তার ঘরে গেলাম। আ! কি সুন্দর ঘর। ঘরে ধুপের গন্ধ। সরস্বতী মূর্তির কাছে ধুপদানি জ্বলছে। চার দেওয়ালে কত মনীষীদের ছবি। আলমারীতে থাক থাক বই সাজানো। কি একটা আকর্ষন অনুভব করলাম; চলে গেলাম আলমারীর কাছে। যেই একটা বই নিতে যাব অমনি পেছন থেকে চারুদি বলে ওঠে

“কি করছিস রে ওখানে?”

“কিছু না চারুদি…”

“বই চুরি করতে এসেছিস বুঝি?”

“ না। চারুদি। বিশ্বাস করো…আমি দেখছিলাম…”

“হুম…” বলেই চারুদি আলমারীর উপরের তাক থেকে একটা বই নিয়ে আমার হাতে দিয়ে বলল,

“নে, ধর। পড়িস…” মাথায় হাত বুলিয়ে বলল চারুদি।

বইটা হাতে নিয়ে আমার চোখে জল এসে গেল। সেটা হঠাৎ করে কিছু পাওয়ার আনন্দে নাকি, চারুদির ভালবাসার ছোঁয়া পেয়ে, জানিনা। এর আগে তো কেউ আমার ভাল লাগাকে আমল দেয় নি!


শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত ও ইন্দ্রনাথ। ঘরে ফিরে এক নিশ্বাসে পড়ে ফেললাম বইটা। সেই থেকে বই পড়া আমার নেশায় রূপান্তরিত হল। যখনই সময় পেতাম চারুদির কাছে চলে যেতাম। বই আনতে। শুধু যে বই পড়তাম তা নয়, কত যে আলোচনা চলত বই নিয়ে। চারুদি কত বিদেশী লেখকদের কথা য় বলত সেক্সপীয়ার, শেলী, ওয়ার্ডসোয়ার্থ। একটু যখন বড় হলাম, পড়লাম ব্ল্যাক টিউলিপ। নৃশংসতার মাঝেও প্রেমের এমন বিচরণ! প্রেমের আরও বই দিল চারুদি। রাজলক্ষী ও শ্রীকান্ত, চোখের বালি, কৃষ্ণকান্তের উইল আরও কিছু। কিন্তু প্রেমের গল্প মন আমার ছুঁতেই পারল না। যেমন ছুয়েছিল অ‍্যাডভেঞ্চারের গল্প। ইন্দ্রনাথ তো আমার হৃদয়ে ছিলই, রবিনহুড, শঙ্কর, ফেলুদা, কিরীটি বোমকেশ, শার্লক হোমস প্রত্যেকেই যেন নিজের মত করে আমাকে সাহস যোগাতে থাকল। এইসকল চরিত্রের প্রভাবে মুখচোরা, ভীরু ছেলেটা ক্রমে সাহসী হয়ে উঠল। এতটাই যে মৃত্যুকে ভয় না পেয়ে জয় করতে চাইল সে।


ততদিনে চারুদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বইয়ের গোটা আলমারীও তার সঙ্গে তার শ্বশুর বাড়ি চলে গিয়েছে। স্বভাবতই বই পড়ার সখ থেকে আমি বঞ্চিত হলাম। তার কিছুদিন পরেই আমি মধুপুর থেকে বর্ধমানে চলে আসি। কলেজে ভর্তি হই। মামা-মামীদের ইচ্ছে ছিল না। তারা ভাবতে পারেন নি যে তাদের ভীরু ভাগনেটা এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে। দিদা কেঁদে কেটেই একশা।

“পারবি ভাই…একা থাকতে?”

“কেন নয়? আমি তো এখন নাবালক নই।”

হ্যাঁ। আঠারো পেরিয়ে যেতেই আমি আমার বাবার এস্টেটের মালিক হলাম। আমার নিজের বাড়িতে ফিরে এলাম। দু’মহলা বাড়িতে সদস্য বলতে আমি আর বলাই কাকা। বলাইকাকাই এ বাড়ির কেয়ারটেকার। অনেকে উপদেশ দিলেন, ভাড়া দিতে, কিংবা স্বেচ্ছা সেবী সংস্থাকে অথবা অফিস কারবারীকে ছেড়ে দিতে কিছু অংশ। আমি নারাজ। আমি আমার বাড়িকে মনের মত করে সাজালাম। বাগানে নতুন গাছ পুঁতলাম, ঝোপ ঝাড় পরষ্কার করলাম। বুড়ো গাছের ডাল ছাঁটলাম।

“আ! কি আরাম! এখন আমি স্বাধীন…আমার খুশী, আমার সখ শুধু আমারই নিজের…” সারাদিন কলেজ করে বিকেলে চলে যেতাম লাগোয়া আদিবাসী গ্রাম গুলোতে বা নদীর ধারে কিংবা জঙ্গলে, অথবা শ্মশানে এমনকি মুসলিমদের কবরেও। ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতাম সেখানে। সঙ্গে থাকত অবশ্যই কোন না কোন অ্যাডভেঞ্চারাস বই। মৃত্যুকে জয় করার নেশা যেন আমায় পেয়ে বসল।


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.