সকাল থেকেই প্রিয়ার মনে আজ এক অদ্ভুত রকমের ফিলিংস হচ্ছে। অম্লানের সাথে বিয়ে ফাইনাল হওয়ার পর আজ প্রথম দেখা করবে দুজনা একান্তে। ফোনে কথা বলার সময় অম্লান ওই একটা আবদার করেছে বারবার প্রিয়ার কাছে। কর্মজীবনের টানাপোড়েন তার প্রেমটা ঠিক করে হওয়া ওঠেনি। তাই বিয়ের আগের চার মাস লুকিয়ে প্রেম করতে চায় প্রিয়ার সাথে। সত্যি কথা বলতে ফোনে কথা বলা মানুষটিকে প্রিয়াও জানতে চায় কাছ থেকে। গত মাসে প্রথম যেদিন দেখতে এসেছিল তখনই এক ঝলক দেখেছিল প্রিয়া অম্লানকে। মনের মানুষ হিসেবে যাকে কল্পনা করে এসেছে মনে মনে আজ তার সাথে অম্লানকে মিলিয়ে নেওয়ার পালা।

প্রিয়ার সাথে একমাস কথা হয়েছে অথচ তাকে পুনরায় দেখার সুযোগ হয়নি। কর্মসূত্রে অম্লান কলকাতা থেকে প্রায় ৬-৭ ঘন্টা দূরত্বে থাকে। সারা সপ্তাহ অফিস করে শনিবার রাতে বাড়ি আসে আবার সোমবার ভোরে বেরিয়ে পড়ে কর্মস্থলে। সেখানেই কাছাকাছি একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকে। আজ রবিবার কাল রাতে অম্লান বাড়ি ফিরেছে। সকাল থেকেই মূহুর্ত গুনছে কখন প্রিয়ার সাথে দেখা হবে। প্রিয়া অম্লানের কথা মতো মিথ্যে কথা বলে আজ ওর সাথে দেখা করতে আসবে। এই সব ভেবেই কেমন শিহরণ হচ্ছে শরীরে। প্রিয়া আজ অম্লানের অভিসারিকা। অম্লান মনে মনে ভাবে, "মেয়েটা তো একদম মিথ্যে কথা বলতে পারেনা। ঠিক সময়ে আসতে পারবে তো! তার মধ্যে বোকার মতো বায়না করেছি ওর হাতের চিড়ের পোলাও খাব। এতটা বাড়াবাড়ি না করলেও হতো। তার উপর যে মেয়েটা একদম সাজে না তাকে বলেছি কাজল পরে আসতে। আজ আমার জন্য বাড়িতে কেস না খায়! উফফ্ এত রোমাঞ্চকর পরিস্থিতিতেও কেমন একটা ভয় ভয় লাগছে।"

এখন সবে ১২টা বাজে সাড়ে তিনটের সময় প্রিয়ার বেরোনোর কথা। মায়ের রান্না হয়ে গেলে প্রিয়া রান্না ঘরে ঢুকল।প্রিয়াকে দেখে মা বলে উঠলো, "কি রে তুই কি করবি এখন রান্নাঘরে? হাতে ডিম, চিড়ে, পিঁয়াজ, টমেটো, কাঁচা লঙ্কা! ব্যাপারটা কি?" প্রিয়া হাসতে হাসতে বলে, "দেখোনা আজ ম্যাডাম এক্সট্রা নোট দিতে ডেকেছে। আর বিয়ের তিন মাস পরই তো এম. এ পার্ট টুর ফাইনাল পরীক্ষা। তাই আমিও আগে থেকেই সব রেডি করে রাখছি। বিয়ের সময় অনেক দিন কামাই যাবে। বন্ধুরা সবাই মিলে ধরেছে ক'দিন পর তো বিয়ে করে চলে যাবি। তোর হাতের কিছু বানিয়ে আমাদের খাওয়াতে হবে। তো আমি বললাম আমি চিড়ের পোলাও ছাড়া কিছু বানাতে পারিনা। ওরা বললো তাই খাব।" মা শুনে বলে, যাক তাও এর জন্য এই মুখো হলি! তবে তিন চারজনের জন্য এইটুকু চিড়েতে হবে? আরেকটু বেশি নে।" প্রিয়া: " ঠিক আছে আমি দেখে করে নিচ্ছি তুমি যাও রেস্ট নাও। গরমে পুরো ঘেমে গেছো তো।" এই বলে প্রিয়া ঝটপট অম্লানের জন্য চিড়ের পোলাওটা বানিয়ে ফেলে। তিনটে বাজতেই প্রিয়া রেডি হয়। আজ প্রথম ও কারোর জন্য সাজবে। নীল রং অম্লানের খুব পছন্দের তাই ও নীল রঙের একটা চুড়িদার পরেছে, কপালে ছোট্ট টিপ আর চোখে হাল্কা কাজল। কানে তো বরাবরই ছোট্ট একটা সোনার টপ পরে থাকে। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে তাই সাজতে সুবিধা হলো। বাবা সন্ধ্যার পর বেশি বাইরে থাকা পছন্দ করে না, তাই বুঝেসুজে এই সময়টি ঠিক করা। যাতে ৬ টার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসতে পারে। মাকে 'আসছি' বলে প্রিয়া বেরিয়ে পড়ে।

অটোতে উঠতেই অম্লানের ফোন, "তুমি কোথায়? আমি এসে গঙ্গার পাড়ে বসে আছি। তুমি অটোথেকে নেমে গঙ্গার পাড়ে চলে এসো।" প্রিয়া: হ্যাঁ আমি অটোতে। কিন্তু তুমি কখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছ? বাড়ি থেকে আমাদের এখানে স্টেশনে আসতে তো তোমার ৩০ মিনিট লাগে। তুমি স্টেশন থেকে আবার অটো করে গঙ্গার পাড়েও চলে গেছো। অম্লান: আমি ১ ঘন্টা আগে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি ম্যাডাম। মাকে বললাম আমার একটু কাজ আছে বের হতে হবে, তাড়াতাড়ি খেতে দিও। ব্যাস তাড়াতাড়ি খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আচ্ছা আমার অভিসারিকা দয়া করে জলদি আসুন, আর কতক্ষণ অপেক্ষা করাবে?" প্রিয়া: "এই তো অটোথেকে নেমে গঙ্গার পাড়ের দিকেই যাচ্ছি।"

গঙ্গার পাড়ে পৌঁছে প্রিয়া এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে থাকে তার প্রিয়কে। কে যেন পিছন থেকে তার কাঁধে হাত রাখে, পিছনে ঘুরতেই দেখে অম্লানের হাসি মুখটা। দুজনে হাত ধরে গঙ্গার ধারে একটি গাছের নিচে বসে। হাওয়ায় প্রিয়ার চুল গুলো এলোমেলো হয়ে মুখে পড়ে। এই প্রথম অম্লান হাত দিয়ে প্রিয়ার চুলগুলো কানের পাশে সরিয়ে দেয়। প্রিয়া প্রথম কোনো পুরুষের ছোঁয়া পায়। লাজুক হাসিতে প্রিয়াকে আজ অপূর্ব লাগছে। অম্লান অপলক নয়নে চেয়ে আছে প্রিয়ার দিকে। প্রিয়া: "অমন করে কি দেখছ?" অম্লান: "আমার প্রিয়াকে। আচ্ছা একটু চোখ বন্ধ করবে?" প্রিয়া: "কেন?" অম্লান: "আরে বাবা করোই না! ভয় নেই তেমন কিছু করবনা।" অম্লানের কথা শুনে প্রিয়া চোখ বন্ধ করে। অম্লান পকেট থেকে একটা ছোট্ট কৌটো বের করে তার থেকে একটা সোনার নাকছাবি বের করে প্রিয়ার নাকে পরম যত্নে পরিয়ে দেয়। প্রিয়া চোখ খুলেই বলে, "এমা এসব আনতে গেলে কেন? আমি তো তোমাকে কখনও নাকছাবির কথা বলিনি।" অম্লান : "আমি কখন বললাম যে তুমি নাকছাবির কথা বলেছ? আমার বুঝি শখ হয় না বৌটাকে একটু সাজাই! আসলে আমাদের বাড়ির রীতি আছে বৌকে বিয়ের আগেই নাক ফুটিয়ে নাকছাবি পরতে হয়। তোমার মনে আছে তোমাকে একদিন বলেছিলাম তুমি নাকছাবি পরো? তুমি বলেছিলে যে ক্লাস এইটে নাক ফুটিয়ে সোনার নাকছাবি পরেছিলে, তবে পাথরটা বড় বলে ১ বছর পর খুলে রাখো। তারপর ক্লাস নাইন থেকেই তোমার নাক ফাঁকা। তবে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর তোমার মা আবার জোড়াজুড়ি শুরু করেছে নাকছাবি পরানোর জন্য। সেদিন থেকেই ঠিক করে ছিলাম আমি নিজে হাতে তোমায় নাকছাবি পরিয়ে দেব। আমি জানি তুমি বেশি উগ্র সাজ পছন্দ করোনা। তাই তো বন্ধুর দোকান থেকে নিজে পছন্দ করে এই ছোট্ট ছিলেকাটা নাক কড়াইটা নিয়ে এসেছি। নিয়ম রক্ষাও হল আবার আমার ভালোবাসার স্মৃতি চিহ্ন হিসেবেও তোমার কাছে সব সময় থাকবে। আমার স্পর্শকে অনুভব করতে পারবে যখন খুশি। প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমার কথা মনে পড়বে।" প্রিয়া: "তুমি এমন করে কি করে ভাবতে পারো গো? আমি তোমায় যত দেখছি অবাক হয়ে যাচ্ছি। কত সহজেই আমার ভালোলাগা মন্দলাগা গুলোকে আপন করে নিলে। তুমি সারাজীবন এই ছোট্ট ছোট্ট ভালোলাগা গুলোকেই মনে রেখো আর কিছু চাই না।" অম্লান: "ইচ্ছা তো হয় তোমায় উজার করে সব দিই। কিন্তু ওই যে লুকিয়ে প্রেম করছি বুঝে সুজে চলতে হবে না হলে তো তোমাকেই বিপদে পড়তে হবে। বেচারী বরের কথাও ফেলতে পারবে না আবার মা-বাবাকে মিথ্যে কথা বলতে গিয়েও হোঁচট খাবে। তাই অনেক ভেবেচিন্তে এই ছোট্ট উপহার আনলাম। মা জিজ্ঞেস করলে বোলো সোনার দোকান থেকে কিনেছ। ছোট্ট দেখতে আর দামটাও সাধ্যের মধ্যে তাই নিয়ে নিয়েছ। তোমার টিউশনের টাকায় দিব্যি একটা নাকছাবি কেনাযাবে, তাই বলতে গিয়ে ঘাবড়ে যেওনা।" প্রিয়া: "তুমি চিন্তা কোরোনা আমি ম্যানেজ করে নেব। সত্যি তুমি কত গভীরে ভাবতে পারো।"

দুজনে গল্প করতে করতে কখন যে সময় বয়ে গেল কারোর খেয়াল নেই। হঠাৎ অম্লান বলে ওঠে, "আরে আমার চিড়ের পোলাও কই?" প্রিয়া ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স বের করে নিজে হাতে অম্লানকে চিড়ের পোলাও খাইয়ে দেয়। অম্লানও পরম তৃপ্তিতে তা খেতে থাকে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। চারিদিকে সোনালী আভা পড়ন্ত বিকেলের মাধুর্যতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। অম্লানও এই মাধুর্যতার সাথে একাত্ম করে ফেলেছে তার প্রিয়াকে। গোধূলির সোনালী আভা সোনার নাকছাবির উপর এসে পড়ে প্রিয়াকে করে তুলেছে অপরূপা। যাওয়ার আগে প্রিয়ার কপালে অম্লান ছুঁইয়েছে তার তৃষ্ণার্ত ঠোঁট। লাজে রক্তিম আকার ধারণ করেছে প্রিয়ার মুখমণ্ডল। এই বার উঠতে হবে দুজনকেই অম্লান কিছুতেই ছেড়ে যেতে চায়না তার প্রিয়াকে। কিন্তু প্রিয়া যে এখনো শৃঙ্খলে আবদ্ধ। অম্লান প্রিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, "নাকছাবিটা পরিয়ে দিতেই তোমাকে কেমন বৌ বৌ লাগছে। মনে হচ্ছে একচিলতে সিঁদুরে রাঙিয়ে দিয়ে তোমাকে নিয়ে চলেযাই আমার ছোট্ট কুঠিরে। জানো আমি যেখানে থাকি সেখানে প্রতিটি মুহূর্ত সাক্ষী হয়ে আছে তোমার আমার প্রেমালাপের। তাই তুমি গেলে আমার ওই ছোট্ট কুঠির পূর্ণ হবে।" প্রিয়া: "অমন করে বোলোনা আমারও তো যেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু বিয়ের আগে কেমন করে যাব? বিয়ে হোক তারপর যাব আমাদের কুঠিরে। এতদিন গেল আর ক'টা মাস অপেক্ষা করো প্লিজ। তবে আজ যে উপহার দিলে আমি তাকে সারাজীবন আগলে রাখব কথা দিলাম। আচ্ছা এবার উঠতে হবে পৌনে ছ'টা বাজে।" অম্লান: "আবার অপেক্ষা.... অনন্ত অপেক্ষা। আবার কবে দেখা করবে বলো? আমার যে তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে।" প্রিয়া: "ঠিক আছে পরে জানিয়ে দেব। প্লিজ লক্ষ্মীটি এমন উতলা হোওনা। তুমি তো সব সময় আমার কাছেই থাকবে। এই নাকছাবির স্পর্শে, প্রতি নিঃশ্বাসে। চলো এবার কিন্তু অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে।" দুজনে হাতধরে স্টেশনে এসে যে যার গন্তব্যস্থলের দিকে পা বাড়ায়। মনে নিয়ে যায় একরাশ ভালো লাগার অমূল্য স্মৃতি।

প্রিয়া ও অম্লানের বিয়ের পাঁচ বছর পূর্ণ হল। অম্লানের কর্মে উন্নতি হয়েছে। বদলেছে ওদের জীবন যাত্রা। ওদের পছন্দ অপছন্দ। শুধু বদলাইনি প্রিয়ার নাকের নাকছাবিটা। আজও অম্লানের ভালোবাসার প্রথম উপহারের স্মৃতিকে আগলে রেখেছে প্রিয়া প্রতি মুহূর্তে। এই ছোট্ট ছোট্ট ভালোবাসার স্মৃতি চিহ্ন গুলোই তো ভালোবাসায় পূর্ণতা দেয় তাই না! ক'জন তা মনে রাখতে পারে?

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.