ঝুমকো

এক

রিনিদের বাড়িতে বিকেলের বাসনটা আর মাজতে গেল না ও। ছুটতে ছুটতে সোজা বটতলায় পৌঁছল কাজল। বটের ঝুরিতে ঝোলানো ওর অলস দুপুরের সাথী দোলনাটার দিকে এখন তাকানোরও ফুরসত নেই তার। খুব সন্তর্পণে গাছ লাগোয়া ইস্কুলবাড়ির ভাঙা পাঁচিলটা পার হওয়ার সময় সে আরেকবার দেখে নিল চারপাশ।নাহ,কেউ নেই।এখন চৈত্র মাস।দুপুরের বাতাসে উষ্মার মত লেগে আছে গ্রীষ্মের উত্তাপ।সবে সাড়ে তিনটে বাজে।রাস্তাঘাট ফাঁকা।শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছল সে।বুকটা ধড়ফড় করছে। মাঠের অপরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে একলা পলাশগাছ। কাজলের জীবনের মতো ওকেও বসন্ত রাঙিয়ে দিয়েছে নতুনের ছোঁয়ায়।আসছে বৈশাখ বিমলের সাথে কাজলের বিয়ে।স্বামীর মৃত্যুর পর কাজলের মা বাড়ি বাড়ি ঠিকে কাজ করে,গত পনেরো বছরে, একমাত্র কন্যার জন্য জুটিয়ে ফেলেছেন বিবাহের প্রয়োজনীয় সামান্য কিছু গহনা।টাসেল দেওয়া ময়ূর লকেট, দুগাছা ব্রোঞ্জের চুড়ি আর একজোড়া ঝুমকো।নিরক্ষর, নিম্নবিত্ত, পিতৃহীন কাজল কিন্ত ওর স্বাভাবিক বোধেই গয়নার গায়ে মেখে থাকা মায়ের শ্রম আর স্বপ্নের ঘ্রাণটুকু শুষে নিয়েছিল নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে। মা আর ভাইয়ের প্রতি তার অসীম মমতা।স্নেহ।তবু আজ যা ও করছে, এত অপরাধবোধের পরও,এত ভয়ের পরও,তার জন্য কে যেন বারবার বুকের মধ্যে প্রতিধ্বনি তোলে........ঠিক,ঠিক,ঠিক.....এই তো চাই......কোনো দোষ নেই। শুকনো পাতায় পা পড়তেই মড়মড় শব্দ ওঠে। ইস্কুলবাড়ির এটা পিছনের দিক।তেঁতুল, শিমূল কাঁঠালগাছের ভিড়ে পরিত্যক্ত কয়েকটা ভাঙাচোরা ঘর। জায়গাটা এই সময়েও অন্ধকার। সাবধানী চোখে চারিদিকে তাকায় সে।কেউ নেই। কোনের ভাঙা দরজাটায় আস্তে আস্তে টোকা দেয়। শাড়ির কোচরে হাত রেখে ফিসফিসিয়ে ওঠে," বাবলু,বাবলু......."

দুই

মুখের মেকআপ তুলতে তুলতে আয়না দিয়ে মিনুর দিকে তাকালেন অপরাজিতা।জড়োসড়,কাঁচুমাচু ভঙ্গি। এখন রাত সাড়ে এগারোটা,মিনু কিছু না বললেও সবটা বুঝতে পারছেন তিনি।প্রোগ্রামের দিনগুলো এটা রুটিনে দাঁড়িয়ে গিয়েছে।স্টেজ সেরে, কস্টিউম পাল্টে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয় অপরাজিতার আর তখনো...... -"কি রে আজও না খেয়ে বসে আছেন?" নরম গলায় জিজ্ঞাসা করেন মিনুকে।বেচারি চাকরি আর অপারগতার মাঝখানে আটকা পড়ে আছে। আর দশটা আয়ার মতো নয় মিনু।ভদ্র, বিবেকবান। অপরাজিতা ব্যক্তিগতভাবে ভারি পছন্দ করেন ওকে।মিনু সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।"আমি অনেকবার বলেছি দিদি, মাসিমা কিছুতেই কথা শুনছেন না।আগে তাও দাদা ছিলেন সামলাতে পারতেন, এখন তো আপনাকে ছাড়া কাউকে মানেননা। একবারের বেশী দুবার কিছু বললেই রেগে যান।বলেন, 'কাজু আসুক, সব বলে দেব।'আমি নাকি ওনার ওপর অত্যাচার করি। এদিকে ডাক্তারবাবু বারবার বলে দিয়েছেন,খাওয়া দাওয়া,ওষুধপত্র সব যেন টাইমে হয়।আর তোমার দিকটাও একটু দেখ দিদি।সারাদিন এত পরিশ্রম। নাচ,প্রোগ্রাম,স্কুল।তারপর বাড়ি এসে এত ঝক্কি.... "আমার খাবারটাও মায়ের ঘরে নিয়ে আয় মিনু, একসাথে খেয়ে নেব।" মাঝপথে মিনুকে থামিয়ে উঠে পড়েন বিখ্যাত ভারতনাট্যম শিল্পী অপরাজিতা।মনে তার ভাবনার দোলাচল।'কাজু আসুক সব বলে দেব'।কানে বাজে কথাগুলো।কয়েকটা মাত্র শব্দ অথচ কি অপরিসীম ভরসা তার মধ্যে।বিশ্বাস। 'কাজু আসুক'।দু হাজার স্কোয়ার ফুটের সুবিশাল ফ্ল্যাটের সবথেকে বড় বারান্দা লাগোয়া ঘরটাতে থাকেন ওরা।মানসিক ভারসাম্যহীন সবিতা আর ওনার স্মৃতিরা।দরজা ভেজানো। আলতো করে ঠেলে ঘরে ঢোকেন অপরাজিতা।"এখনো খাওনি কেন মা?কত রাত হয়েছে বলতো! এইরকম করলে চলে?" -"আমি একাই রাত করে খাচ্ছি বুঝি? সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে কে? নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। আর একটা মাস পরে যার বিয়ে তাকে দেখলে বোঝার উপায় আছে!" রাগত মূখে অপরাজিতার দিকে তাকান তিনি।"নিজের দিকে একবার তাকিয়ে দেখেছিস কাজু।কেমন চেহারা হয়েছে।কি রঙ দেখে বিমলের মা পছন্দ করল আর কি কালিকুষ্ট বন্ন হয়েছে মেয়ের।রোদে রোদে চরে বেড়ালে হবে না!"স্থির চোখে তাকান তাঁর কাজুর দিকে।গলায় সন্দেহ ঘনিয়ে আসে,"আজও গিয়েছিলি নাকি ওইটার কাছে? কিরে বল" আকস্মিক চিৎকারে চমকে ওঠেন মধ্যচল্লিশের অপরাজিতা। উত্তেজনায় ঈষৎ দুলছেন সবিতা।"গিয়েছিলি না? কি মধু পাস বলত ওই নরকে? ছিঃ! " ঘৃণায় শিউরে ওঠেন বৃদ্ধা।বুকের তুমূল ঝড়টা কে চেপে পরম মমতায় তিনি জড়িয়ে ধরেন সবিতাকে।"কোথাও যায়নি মা।কোথাও যাব না।বাবলু আর নেই মা।কোত্থাও নেই।শুধু তোমার কাজু আছে মা।এসো, খেয়ে নাও দেখি....

তিন

পিঠের ক্ষতগুলোর ওপর ওষুধ লাগানোর সময় খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল বাবলুর। না বললেও বুঝেছে কাজল।তবু ওর শান্ত,গভীর চোখ দুটো শুষ্ক জমিনের মতো খটখটে।ভেতরে ধিকি ধিকি আগুন।কাজলের চোখ ভিজে যায়।কি অপরাধে নিজের বাবা তার সন্তান কে এমন করে মারতে পারে!কেন কেউ বুঝতে পারে না বাবলুকে!কই তার তো অসুবিধে হয়নি ওর মন পড়ে নিতে।সারদা বিদ্যামন্দির এ যখন প্রথম দেখে বাবলু কে ওভাবে।রাগ হয়নি তো তার! তাহলে সমাজের এত ক্রোধ কিসের! টিফিনের সময় স্কুলের পেছনদিকে নিয়ে গিয়েছিল বাবলু ওকে।রংচটা জামার ভেতর থেকে বার করেছিল লাল টুকটুকে একটা দোপাট্টা। সহপাঠীদের সম্ভাব্য বিদ্রূপের আড়ালে,শিক্ষিকাদের বিস্মিত ঘৃণার আড়ালে,শিমূলগাছের তলায়, শুধুমাত্র নিজের প্রিয় বন্ধুর সামনে, ভারি যত্ন করে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নেচেছিল বাবলু।মম চিত্তে নিতি নৃত্যে.....হাওয়ায় উড়ছিল মুঠো মুঠো তৃপ্তি। আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠেছিল সাত বছরের কাজু। কই রাগ হয়নি তো তার!রাগ হয়নি তো যখন সরস্বতীপূজোর সকালে সবার অগোচরে বাবলু ওকে বলেছিল,"আমারও তোর মতন শাড়ি পড়তে ইচ্ছে করে রে কাজু।খুব ইচ্ছে করে।"

জলখাবারের রুটি দুটো আজ আর খায়নি সে।আলু ভাজার সাথে ,ছেঁড়া খবরেরকাগজটার ওপর ধীরে ধীরে রাখে সেগুলো।সেদিন প্রাণ বাঁচাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে তার কাছেই এসেছিল ও।রক্তাক্ত দেহ,ক্ষত বিক্ষত মন।একটুও চিন্তা করতে হয়নি কাজলকে।সবার থেকে লুকিয়ে এখানে এনে তুলেছিল বাবলুকে।ওর ছোট্ট বেলার বন্ধুকে।গত তিন দিন ধরে রয়েছে ও।মশা,টিকটিকি,ইঁদুর এর মাঝে,একা,অন্ধকারে দাঁতে দাঁত চেপে পড়ে রয়েছে।দিনে দুবার আসে কাজল।খাবার আর জল নিয়ে।তবে এভাবে আর কতদিন?কাল সারারাত ভেবে তবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।সকালবেলা তীব্র কথা কাটাকাটি হয়েছিল মায়ের সাথে।বাবলুর সাথে ওর যোগাযোগের খবরটা ভাই ই হয়ত তুলেছে মায়ের কানে।রাগে উত্তেজনায় মা কাঁপছিল।" কিসের এত পিরিত তোর ওই হিজড়েটার সাথে হ্যাঁ? বল বল বল......" পাগলের মতো এলোপাথাড়ি চড় মারছিল মা।"কোথায় আছে ও? কোথায় দেখা করিস তোরা? বলবি না? দাঁড়া কালকের মধ্যে খুঁজে বার করব আমি।তারপর দেখি কি করিস তোরা।"আর সময় নষ্ট করেনি কাজু। খাটের নীচে চালের বস্তার তলায় ছিল পোঁটলাটা।বিয়ের গয়না।মা কাজে বেরোতেই শাড়ির তলায় ওটা নিয়ে ছুট.........

চার

সবিতা ঘুমিয়ে পড়লে নিজের ঘরে ফিরলেন অপরাজিতা।বাইরে মেঘ ডাকছে। সেইদিনের মতো।আশ্চর্য তিরিশ বছর কেটে গেল তাও মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা।কাজু বিয়ের সমস্ত গয়না তুলে দিয়েছিল বাবলুর হাতে।কাঁপা গলায় উচ্চারণ করেছিল মোক্ষম তিনটে শব্দ, "পালা বাবলু,বাঁচতে চাস তো পালা।" কাজুর পরনের শাড়ি ঘোমটা দিয়ে পড়ে পালিয়েছিল পনেরো বছরের মানুষটা।ট্রান্সজেন্ডার।ছুট ছুট....পায়ে পায়ে হাওড়া স্টেশন...... চায়ের দোকানে কাজ......মার আর অত্যাচারের কাহিনি।"পালা বাবলু পালা।" পালাতে পালাতে 'আশ্রয় অনাথাশ্রম '। জীবন মোড় নিল নতুন দিকে।নিজের স্বপ্নের দিকে ধাবিত বাবলু জানলো ও না যে একইরাতে চোর আর চরিত্রহীনার অপবাদ নিয়ে পালিয়েছে কাজুও।শূন্য হাতে।

কাজলের বিয়ের গয়নাগুলো কাজে লেগেছিল।শুধু ঝুমকোটা প্রানে ধরে বিক্রি করতে পারেনি সে।কাজু নিরুদ্দেশ হওয়ার পরেই মাথা খারাপ হয়ে যায় সবিতার।কাজুর ভাইটা তখনো ছোটো।পায়ের তলায় এক চিলতে জমি পেতেই পুরোনো পাড়ায় ফিরেছিল বাবলু।কাজলদের বাড়ি গিয়েছিল।নোনাধরা উঠোনে এক উন্মাদিনী মায়ের সামনে, এক অপুষ্ট কিশোরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল বাবলু। এসে দাঁড়িয়েছিল এক নতুন রূপে। জামদানি শাড়ি, কপালে টিপ,হাতে চুড়ি আর কানে...... সোনার ঝুমকো। প্রতিভাসম্পন্ন নৃত্যশিল্পী অপরাজিতা।সবিতার পায়ে হাত দিতেই 'কাজু রে ' বলে জড়িয়ে ধরেছিলেন বৃদ্ধা।ভুলটা আর ভাঙার সাহস হয়নি তার।পনেরো বছর ধরে কাজল হয়ে সবিতার পাশে আছেন তিনি।ভাই জানত সব।গত মাসে সেও গেছে মুম্বাই,চাকরি নিয়ে।কাজল কে আর পায়নি সে।কাগজে বিজ্ঞাপন, থানা পুলিশ.....লাভ হয়নি।অগণিত মানুষের ভিড়ে হারিয়ে গেছে সে.....দিয়ে গেছে সাহস, ভালোবাসা, পরিবার,পরিচয় আর......সোনার ঝুমকো।

========================================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.