মার্চ ফরওয়ার্ড !

কাঠের উনানে জোরে জোরে ফুঁ দিচ্ছিল তুলসি ।

সেই কোন ভোর পাঁচটায় উঠেই কাজে লেগেছে সে। এখনো কলমি শাক রাঁধা বাকি । বেলা কত হল কে জানে । ওদিকে বাপটা খক খক কাশছে আজই বেশি । আজ তো ওষুধ কেনার কথা ছিল । কিন্তু সে বেরোবে কি করে ! পা-টা ব্যাথায় এখনো টনটন করছে ।বসে বসে কুটনো কাটতে গিয়েও শিরায় টান ধরছে । কাল রাতে খামোকাই দামড়া দাদাটা পিটালো তাকে , মা-টাও তাল মিলিয়ে “বিয়ে করবি কিনা বল, নইলে ঘাড় ধইরে বাইর কইর‍্যা দিব।” শাসাচ্ছিল ।

সেও পালটা মুখ চালাল “ মুকে তাড়াইলে তুদের ঘর কেমনে চলবেক রে মা । ক’ দিকি ! মুই আছি ,তাই তুরা খাতি পাস । ফিরিতে পাই লা রে, গতর খাইট্যা কাম করি । আর ই যে বড়লাটের ব্যাটা , কামকাজ লাই, খালি দিনমান বুনটার পিছনে লাইগতে আসা !

উহ, মরদ হইছে বড় !”

তারপরেই ধাঁ করে তার পায়ে আছড়ে পড়ল চ্যালাকাঠ । তুরন্ত মাথাটা নামিয়ে নিয়েছিল বলে রক্ষা , নইলে অজ্ঞান হয়ে যেত । মা- দাদার মার, ঘাড় ধাক্কা আর হম্বিতম্বি আজকাল তার গা সওয়া । কিন্তু আজ শরীরটা জুত হচ্ছে না । ভাতের মাড় গালতে গিয়ে মাথাটাও ঘুরে গেল ক’চক্কর ।আজ কি যাওয়া হবে না তাহলে ! এখনো কলমি চাপানো হয় নি, কয়লা তোলা হয় নি , উঠান ঝাঁট বাকি , যক্ষারোগী বাপের আর পোয়াতি দিদির পথ্যি দেওয়া বাকি । বুড়োটা কাশছেও আজ বেশি । নাহ, আজ আর কামে যাওয়া হবে নি, জুত হচ্ছে না । কোমর থেকে নিচেকার পুরো শরীলটা আজ টনটনাচ্ছে । ওদিকে ওদের চিৎকারও বাড়ছে । বুড়ো বাপটার দিকে চেয়েও কেউ থামায় না ঝগড়া । হঠাৎ ধপ শব্দ । কি হল ! তুলসি পা টেনে টেনে কোনোক্রমে ছুটল বাইরের উঠানে ।



খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে মোহর স্তম্ভিত ।

বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী দুর্ঘটনায় প্রয়াত । ইস , স্কুপটা সে মিস করে গেল । সুনীলদা আজ অফিসে নির্ঘাত ডেকে পাঠাবেন । বাড়ির এত কাছে ঘটনাটা ঘটেছে , অথচ সে টেরও পেল না – এটা অফিসের কেউ বিশ্বাস করবে না ।

আসলে কাল পাপাইয়ের বায়নাক্কা এত চরম ছিল, গ্যালাক্সি ম’ল আর কেএফসি গেলে ছেলের তো হুঁশই থাকে না । তারউপর এখন পরীক্ষা শেষের সিজিন । উইক এন্ড মানেই মায়ের কাছে এটা সেটা বায়না । মোহর হাজার চেষ্টাতেও ‘না’ করতে পারে না । পাপাইয়ের বাবা আর মা দুইই সে । কালও একগাদা আবদার মিটিয়ে ছেলের ক্যারাটে ক্লাসের পাঁচটা এটাওটা কিনে যখন ফিরল রাত তখন ১০টা পার । সুনীলদা ফেব্রুয়ারির শেষেই বলে রেখেছিলেন মার্চে ‘নারীদিবস’ নিয়ে এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ চাই প্রখ্যাত লেখিকার । সেটা নিয়েই এদ্দিন ব্যস্ত ছিল মোহর, লেখিকার ডেট পাবে কি , তার আগেই তাঁর সেক্রেটারির নাম্বার জোগাড় করতেই কালঘাম ছুটেছিল তার । তারপরও ডেট-টাইমিং নিয়ে হাজারো ম্যাও সামলে কালই একটা এক্সক্লুসিভ নামিয়েছে । সেটার ফাইনাল এডিট নিয়ে রাতেই বসেছিল ।

এরমধ্যে কখন যে ঘটনাটা ঘটল সে টেরই পায় নি । নাহ, আজ ঝাড় খাওয়া কপালে নাচছে । সুনীল ওঝা এমনিতে ভাল ‘বস’ , সহকর্মীদের সাথে বন্ধুর মতই আচরণ করেন , প্রব্লেমে পড়লে সবার আগে হাত বাড়িয়ে দেন , মোহরের মত কর্মঠ জার্নালিস্ট তার অন্যতম ফেবারিট । কিন্তু খবরের স্কুপ মিস করলে এ হেন সুনীলদার মাথা ঠান্ডা করতে বেগ পেতে হয় ।

যাক গে, পরে একদিন নাহয় শিল্পীর বাড়ি গিয়ে স্ত্রী-পুত্রের ইন্টারভিউ নিয়ে একটা পেজ-থ্রী আর্টিকেল নামিয়ে দেবে ।

টোস্ট চিবোতে চিবোতে পরপর ইস্যুগুলোকে সাজিয়ে নিচ্ছিল সে । প্লেটটা রান্নাঘরে দিতে গিয়ে আজকের ‘নারীদিবস’ নিয়ে লেখিকার ইন্টারভিউতে হালকা চোখ বুলিয়ে নিল । নাহ, আপাতত কিছু মিস্টেক নেই । এটা জমা দিয়ে আজ সুনীলদাকে ম্যানেজ করতেই হবে ।

ঢং ঢং !! ন’টা । সুজাতা রান্নাঘর থেকেই চেঁচালো “ও দিদি, আজও কি সে মহারানী আসবে না, নাকি গো! সব্বার ছুটি আছে , খালি এই সুজাতার নেই, বল।”

- আহ ! চুপ কর তো । দাঁড়াও দেখছি ।

তুলসির নাম্বারটা ট্রাই করল ,কিন্তু সেই নট রিচ্যবেল । উফ , কি যে করে মেয়েটা। তিনদিন ধরে কামাই, ফোনেও নেই। একদম বেপাত্তা । কিন্তু বিনা নোটিশে কামাই করার মেয়ে তো তুলসি নয় । মোহরের কপালে ভাঁজ পড়ল । দশটার ক্যাবে বেরোতেই হবে । এরমধ্যে পাপাইকে ঘুম থেকে তোলা , স্কুলের জন্য রেডি করানো।

“অ্যাই পাপাই ... পাপু সোনা ... এবার ওঠ ...” ডাকতে যাবে , এমন সময় কলিং বেল ক্যাড়ক্যাড় করে উঠল ।

সুজাতাই দরজা খুলেছে । আর তার পরেই বাজখাঁই কন্ঠে “ ও গো, দেখ কে এইয়েচে , বাব্বা! কদ্দিন বাঁচবি রে তুই , মেলা লম্বা জীবন তোর । দিদি গো দেখ দেখ মহারানী এয়েছেন...”

পাপাইকে বাথরুমে দিয়ে তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে মোহর দেখল দরজায় তুলসি ।

এসেই কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, সুজাতার কথার জবাব পর্যন্ত না দিয়ে অভ্যাস মত ছুটে গেল ব্যলকনি । র‍্যাক থেকে ঝাড়ু তুলে, ঝড়ের গতিতে ঝাঁট দিতে লাগল, যেন এই ক’দিনের না আসাটা আদৌ ঘটেইনি । ঘড়ির কাঁটাও ছোটার বেগ মাঝে মাঝে কমিয়ে ফেলে , কিন্তু তুলসির বেগের খামতি নেই ।

মোহর খানিকক্ষণ ব্যাপারটা লক্ষ্য করে তুলসির সামনে দাঁড়াল ।

- কিরে ! একটু দাঁড়া । বাব্বা , এদ্দিন এলি না তার কোনো জবাব দিবি না ! কি হয়েছিল ?

- কিছু না, শরীলটা জুত ছিল নি । বাপের অসুখ বেড়েচে ,আমার জ্বর, গায়ে-পায়ে, সারা শরীলে ব্যথা । তাই...

- “বাপ্স ! বলিস কি ! একসাথে শরীরের এত কিছু বিকল হয়ে গেল তোর !” হাসি চেপে মোহর আবার বলল, “ জানিস, কাল আমাদের বাইপাসে এক বিখ্যাত গায়কের এক্সিডেন্ট হয়েছে । আমি তো জানতেই পারি নি রে । তুই কিছু শুনেছিস ?”

- না তো । কে গো ? খুব বড় কেউ ?

মোহর পেপারে ছাপা ছবিটা দেখায় । তুলসির মুখের কোনো রেখা বদলায় না । ‘অহ’ বলে নিচু হয়ে ঝাড়ু তুলতে যাবে দেখে মোহর অবাক স্বরে বলে , “কিরে চিনতে পারলি না ! জি বাংলায় প্রায় গাইত, দেখিস নি ! নামও জানিস না ?”

-কে জানে গো দিদি । আমি চিনি নে ।


এবার একটু ঠোঁট ফুলালো মোহর । চারবছর ধরে যে মেয়ে কাজ করছে তার ঘরে , যাকে বোনের মত করে একটু একটু করে শিক্ষিত করার চেষ্টা করেছে সে, সে আজ এত বড় একটা খবরে গ্রাহ্য করছে না ! এত নামিদামী মানুষকে ‘চিনি না’ বলে দিল !

- বল তো, আজ কি দিন ?

-(ঝাড়ু থামিয়ে) আজ তো... সোমবার গো ।

- ধুর , কি বার সেটা বলছি না ;আজ কি দিবস জানিস ?”

-তারিখ বলছ ?

- আরে তারিখ নয় । আজ ‘নারীদিবস’ । তোকে লাস্ট ইয়ার বললাম না ! আজ আমাদের দিন , মানে মেয়েদের দিন । গর্বিত মোহর ভুরু নাচাল ।

-আজ কি মেয়েদের ছুটি মেলে ?

- ছুটি ! মানে ? দাঁড়া তোকে গল্পটা বলি - সে অনেক কাল আগের কথা । ১৮৫৭ সালে আমেরিকায় ,নিউইয়র্কে শ্রমিকদের মজুরির ফারাক দূর করতে পথে নেমেছিল সুতো কারখানার নারীশ্রমিকরা । অনেক আন্দোলন টান্দোলন করে তারা নিজেদের অধিকার আদায় করেছিল । তাই ৮ ই মার্চকে তাদের উদ্দেশ্যে স্মরণ করে বিশ্বের সব কর্মরত মহিলাদের জন্য ‘নারীদিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।’

ড্রেস করতে করতে যখন তুলসিকে এত লম্বা লেকচারটা দিচ্ছিল মোহর , তখন তুলসি একমনে সবটা শুনছিল কিন্তু ‘হুম’...’অ’ ছাড়া বিশেষ সাড়া দিচ্ছিল না ।

পাপাইকে দুধের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে মোহর বলল, “ কিরে , সব তো শুনলি ; বল তো ‘নারী’ বানান কি ? সেদিনই তোকে সরল বানান শিখিয়েছি না , দেখি কেমন মনে আছে।”

-‘মনে লাই গো’। এক মুখ হেসে তুলসি জানালো ।

-“তুই কি রে! ছ’মাস আগে হুট করে বললি পড়তে চাস । আমি বই দিলাম, খাতা পেন দিলাম । অক্ষর পরিচয় শেখালাম । দিব্যি দশ অবধি নামতা মুখস্থ করেছিলি । গত সপ্তাহে বানান শেখালাম। আর এখন কিছু ‘মনে লাই’ ? আচ্ছা, বল তো যিনি মারা গেলেন তাঁর নামটা কি ? এটা কিন্তু এক্ষুনি বলেছি । মনে করে বল ।“

-“হে হে! মনে লাই গো । এক জেবনে সবাই রে কি চেনা যায় দিদি ! নামিদামি, আতি পাতি... কত কিছু রয়ে যায়, চিনাই হয় না , জানাই হয় না। আমি চিনি লাই উনাকে । চিনলে কি লাভ হবেক বল !’’ লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দ্রুত হাতে ন্যাতা চালায় তুলসি । চিরুনি ধরা হাত চুলের ভেতরেই থেমে গেল মোহরের । মেয়েটার গলার স্বর এমন কেন ! বুকের ভেতর যেন ছ্যাঁত করে লাগল । ওপাশে সুজাতার প্রেসার কুকারেও ছ্যাঁ ছ্যাঁ করে সিটি পড়ল ঠিক তিনটে । পাপাই স্কুল ড্রেসে তৈরি হচ্ছে আর সুজাতার সাথে কি নিয়ে হাত পা নেড়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গপ্প করছে ।

- “ অ্যাই ! কি হয়েছে রে তোর ? পাকা পাকা কথা বলছিস বড়! শরীরটরির আজো খারাপ ,নাকি ! কি হয়েছে এই ক’দিন , খুলে বল দিকি !”

-নাহ দিদি, বাপের মুখটা মনে পড়ছে গো ...মুর শরীল ঠিকই আছে। পরশু রাতে ওরা ফের মেরেছে আমারে । মেলা ঝগড়া হয়েছিল দাদাটোর সাথে । চ্যালাকাঠ দিয়ে মেরেছে। মুই ডরাই লাই । খুব ঝেড়েছি । খাইও লাই সারা রাত। সকালেও তড়পানি থামায় নি , তাই দেখে ১০০ ডায়াল করছিলুম, ফোনটা কাড়ি লিয়ে ভাট্টিতে জ্বালাই দিল মা’টো । ইদিকে বাপটা উয়াদের আটকাইতে গেইয়ে ধাক্কামুক্কায় পড়ে গেল। দিয়ে মাথা ফাটিয়েছে । কাল থেকে হাসপাতালে ভর্তি । কাশিটা কমছে না, জানো । রক্ত আসছে ক্ষণে ক্ষণে । তার উপর মাথায় সেলাই, এখুনু ওষুধ কেনা বাকি। এ মাস ফুরাতেও মেলা দেরি । টাকা পাইব্য কেমনে ! এই হাবিজাবি ভাবি আর ঘুম হয় নাই , শরীলটায় জুত পাচ্ছি না । কুনোবার তো ইমন হয় না, কিন্তু ইবার ডর লাগছে গো ।”

ভেজা গলায় খুব অনুচ্চ স্বরে এতটা বলে তুলসি কাপড় কাচতে গেল ।


মোহর স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইল । ঘড়িতে তখন দশটা পাঁচ।

ক্যাব মিস হয়ে গেছে , অনেকক্ষণ ।

বিছানায় খানিক্ষণ বসে থেকে পার্স খুলে তুলসিকে ডাকল সে ,“ এটা রাখ । আর কিছু লাগলে বলিস । আজ থেকে ক’দিন তোকে আসতে হবে না । বাবার ওষুধ কেনার পর নিজের জন্যও কিনবি । আর এই ধর, এই মলমটা দিলাম । পা তো ফুলে গেছে দেখছি । গরম জলে সেঁক নিয়ে রাতে লাগাবি। চিন্তা করিস না , তোর মত মেয়ে যে বাবার আছে তার এত সহজে কিছু হবে না । যা এবার । বাবা সুস্থ হলে, তুই সুস্থ হলে তবে আসিস কাজে । কেমন !”

দৃশ্যতই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তুলসি জিজ্ঞেস করল “ এত্ত গুলান টাকা দিছ ! ছুটিও দিছ দিদি । আমার কাজ ছাড়াই করি দিবে না তো?”

-“ধুর পাগলি , এবার মার খাবি । আজ নারীদিবস না ? ধরে নে, এটা বকশিস । এবার যা পালা ।“

তুলসি ডুকরে উঠল ; কিন্তু যাওয়ার সময় মুখটা ভরে গেল আলোয় ।

মোহর পাপাইয়ের হাত ধরে ছুটল বাসস্ট্যান্ডের দিকে । আজ মনটা বড্ড হালকা লাগছে তার । লাগবেই তো , আজ নারীদিবস না !

যাহ শুধু আজ কেন ; তুলসি, সুজাতা বা মোহরের মত মেয়েদের তো রোজদিনই নারীদিবস । ভাবতেই হেসে ফেলল সে ।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.